কুরবানির সামাজিক শিক্ষা ও নানা কথা

5

 

ঈদুল আদহা বা আযহা বা কুরবানির ঈদ নিছক কোন আনন্দের দিন নয়। বিশ্ব মানবতার জন্য অনুসরনিয় ও অনুকরনিয় একটি মহান দিন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর অতুলনীয় আত্মত্যাগ, আল্লাহর নির্দেশের প্রতি অবিচল আনুগত্য থাকার যে শিক্ষা, কুরবানির মূল উদ্দেশ্য তা আজ বিশ্বমানবতার জন্য অনন্য শিক্ষা। ঈদ ও আদহা দুটিই আরবী শব্দ। ঈদ এর অর্থ উৎসব বা আনন্দ। আদহার অর্থ কুরবানি বা উৎসর্গ করা।
হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ তা’লার আদেশ পালনের উদ্দেশ্যে তার প্রাণপ্রিয় জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর পূর্ণ সম্মতিতে হযরত ইসমাইল (আঃ)কে কুরবানি করতে উদ্যত হন। পবিত্র মক্কার নিকটস্থ ‘মীনা’ নামক স্থানে ৩৮০০ (সৌর) বছর পূর্বে এ মহান কুরবানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর ঐকান্তিক নিষ্ঠায় সন্তুষ্ট হয়ে মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে তাঁর পুত্রের স্থলে একটি পশু কুরবানি করতে আদেশ দেন। আল্লাহর প্রতি অবিচল আনুগত্য, নজির বিহীন নিষ্ঠার এ মহান ঘটনা অনুক্রমে আজও মীনায় এবং মুসলিম জগতের সর্বত্র আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে ও মানবতার কল্যানে পশু কুরবানীর এই রীতি আমাদের সমাজ ব্যবস্হা প্রচলিত। কুরবানির এই শিক্ষা মূলত বিশ্ব মানবতার জন্য কেয়ামত পর্যন্ত অনন্য নজির হয়ে থাকবে। তাই মুসলিম জগতের সর্বত্র সকল সক্ষম মুসলমানদের জন্য এ কুরবানী করা ওয়াজিব করা হয়েছে। (মতান্তরে সুন্নাতে মুআক্কাদা)।
ঈদুল আদহা বা আযহা মুলত ১০ই যু’ল-হিজ্জা ( যিলহজ্জ্ব ) যে দিন পবিত্র হজ্জব্রত পালনকালে হাজিরা মীনা প্রান্তরে কুরবানি করেন এবং তৎপরবর্তী দুই দিন, মতান্তরে তিন দিনও যে কেউ চাইলে কুরবানি করতে পারে। কুরবানের ঈদ বা ঈদুল আযহা বা আদহা আরব দেশে ‘উদিয়া’ নামে পরিচিত।আমরা অনেকেই তা হয়ত জানি না। কুরবানি মূল উৎস ও তাৎপর্য ও আমরা বুঝতে চাই না। পশু ক্রয়ের অর্থ হালাল কিনা, না হলে কুরবানি যে সহি হবে না জেনে ও তা যাচাই করি না। কুরবানির মূল বিষয় ছিল মূলত নিজকে উৎসর্গ করা আল্লাহ তরে, নিজকে বিলিয়ে দেওয়ার শিক্ষা মানবতার কল্যানে যদিও তা আমরা স্মরণে স্মরি না।
আমরা জানি, প্রতিটি মুসলমানের জন্য বছরে যে দুটি মহা আনন্দের দিন ঘুরে ঘুরে আসে যে শিক্ষা ও বার্তা নিয়ে তা ভুলে আজ প্রতিটি মুসলমান কত বেশি দামে,কত বড় পশু ক্রয় করবে সে প্রতিযোগিতায় মাঠে নেমেছে যা এই মহান দিনের মূল আদর্শকে ¤øান করে দেয়। যদিও মুসলিম সমাজ ব্যবস্থায় ঈদুল আদহার শিক্ষা হচ্ছে সমাজে ধনী দরিদ্রের মধ্য সুসম্পর্ক তৈরি হবে ও বৈষম্য মুছে যাবে ও মানবতা বোধ জাগ্রত হবে।
আজ সে শিক্ষা সবাই ভুলে যাচ্ছে। ঈদুল আদহা কে আমরা অনেকেই আজহা বা আযহা বলে থাকি। মূলত আরবি ‘দয়াদ’কে আমরা আমাদের সুবিধা মত বাংলায় কখনও ‘দ’ বলে থাকি আবার কখনও বা ‘জ’ বা ‘য’ বলে থাকি। যেমনি আমরা ‘রাদিয়া’ কে রাজিয়া আর ‘মার্দিয়া’ কে ‘মার্জিয়া’ বলি। উচ্চারণে বা লিখতে কোন অসুবিধা নেই হয়ত অনেকে বলতে পারেন তবে সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয় যখন লেখনী বা উচ্চারণ অর্থ ও তাৎপর্যে ব্যাপক রদবদল বা ভিন্নতা সৃষ্টি করে এবং বক্তার মূল বক্তব্য বা উদ্দেশ্যকে সম্পূর্ণ ব্যাহত করে। মূলত দুহা হল সকাল বেলা বা ভোর। সূর্য উঠার পূর্ব মুহূর্তে যে হালকা আলো আধারি পরিবেশ থাকে সেই মুহূর্তটিকে সাধারণত আরবিতে দুহা বলা হয়। এই দুহা চলতে থাকে সূর্য উঠবার পর সূর্য রশ্মির তীক্ষèতা বৃদ্ধি পাওয়া পর্যন্ত। এই সময়কালীনের মধ্যে যে কার্যক্রম বা ব্যবস্থাপনাগুলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা দিয়েছেন সেইগুলো পালন বা পরিচালনা করাকে বলা হয় ‘আদহা’ বা ‘উদিয়া’। ঈদুল আদহা সকাল থেকে কিছু নির্ধারিত কার্যক্রম পালন করতে হয় তাই এর নাম ঈদুল আদহা। আর উদিয়া বলতে ঈদুল আদহাতে সামগ্রিকভাবে যে কার্যক্রম পালন করতে হয় তাকে বোঝায়। তম্মধ্যে রয়ছে মসজিদে বা ঈদগায় গিয়ে দুই রাকা’ত সালাত আদায় ও খোৎবা শোনা ও পশু কুরবানি করা।
এখানে আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, তাহলো কুরবানি নিছক কোনো ব্যক্তিগত ত্যাগের নাম নয়। এটি পিতা, পুত্র তথা একটি পরিবারের সমষ্টিগত ত্যাগের প্রতিফলন। ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে, কুরবানি করার পর ঐ হালাল প্রাণী হতে প্রাপ্ত মাংস তিন ভাগ করতে হয়। এক ভাগ কুরবানি দাতা গ্রহণ করবে,এক ভাগ নিকট আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বিতরণ করবে আর বাকি এক ভাগ দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করবে। এই ছাড়া ও দরিদ্রদের মাঝে কুরবানির মাংস বিতরণের মধ্যে দিয়ে মূলত ধনী দরিদ্রের মধ্যে একটি সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।সমাজ উন্নয়নে ও বৈষম্য দুরীকরণে কুরবানিকৃত পশুর চামড়া বিক্রি করে ঐ বিক্রির টাকা গরিবের মাঝে বিতরণ করার বিধান ও ইসলামে রয়েছে। তবে কুরবানি দাতা কুরবানির ঐ পশুর চামড়া, চর্বি বিক্রি করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ বা টাকা নিজে ভোগ করার ক্ষেত্রে ইসলামে নিষেধ রয়েছে (হিদায়া, আলমগীরী, শামী) তবে আমাদের দেশে সাধারণত কুরবানির পশু চামড়া বিক্রির অর্থ দরিদ্রদের মধ্যে কিংবা মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত গরিরদের জীবন মান উন্নয়নে বা এতিমখানার দরিদ্র ছাত্রদের কল্যানে দান করা হয়ে থাকে। মূলত এই ধরনের কর্মকান্ড ও শিক্ষা সমাজ ও মানবতার কল্যানে অগ্রণী ভ‚মিকা রাখে।
এই ছাড়াও আমাদের মনে রাখা ভাল, কুরবানের পশু জবাইয়ের সময় দোয়া পড়া সুন্নত, না জানলে বা না পড়লেও কুরবানি হয়ে যাবে। জবাইয়ের সময় কুরবানিদাতাদের নাম বলার ও প্রয়োজন নেই। কেননা সব বিষয়ে মহান আল্লাহ নিজে অবগত। নিজ গৃহে পালিত পশু দ্বারা কুরবানি করতে পারলে সবচেয়ে উত্তম। কুরবানির পশু নিজ অর্থে কেনা যায়, যে কেউ কুরবানির পশু কিনে দিলে বা কুরবানি করার টাকা বা মূল্য হাদিয়া দিলেও হবে এতেও উক্ত ব্যক্তির ওয়াজিব কুরবান আদায় হয়ে যাবে। অন্যদিকে কুরবানি করার পর জবাই করা পশুর মাংস প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন কে দেওয়ার মধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহানুভূতি ফুটে উঠে ও আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের নিয়ে এক সাথে খাওয়ার মাধ্যমে সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ তথা পারস্পরিক মমত্ববোধ তৈরি হয়ে থাকে। এমনকি পারস্পরিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায় এবং গড়ে উঠে একটি সুন্দর সমাজব্যবস্থা। এই ছাড়াও আমাদের সমাজ ব্যবস্হায় কয়েকজন মিলে যে কুরবানি করার প্রথা চালু রয়েছে তাতে প্রত্যেকের মমত্ববোধ ও উদারতা ফুটে।
ধনীর সম্পদে যেভাবে অসহায় মানুষের অধিকার রয়েছে,অনুরূপ কুরবানির পশুর মাংসে ও অসহায়-গরিব-দুস্থ প্রতিবেশীর অধিকার রয়েছে।কোরবানের ঈদের সময় আমরা যেমন কুরবানির পশুর মাংস দুস্থদের মধ্যে বিলি-বণ্টন করি, ঠিক তেমনিভাবে আমরা যেন সব সময় দুস্থদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারি এটি কুরবানি বা ঈদুল আদহার সামাজিক শিক্ষা। এ মর্মে পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আর কুরবানির উটকে (পশু) আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন বানিয়েছি; তোমাদের জন্য তাতে রয়েছে কল্যাণ।
সুতরাং সারিবদ্ধভাবে দন্ডায়মান অবস্থায় সেগুলোর ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো, যখন সেটি পড়ে যায় তখন তা থেকে খাও। যে অভাবী, মানুষের কাছে হাত পাতে না এবং যে অভাবী সাহায্য চায়, তাদের খেতে দাও’ (সূরা হাজ্জ-৩৬)। কাজেই একজন ধনী বিত্তশালীর নৈতিক দায়িত্ব হল সে গরিব দুঃখী ও দুস্থ মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা করবে সে শিক্ষাই পবিত্র ঈদুল আদহা বা আযহা থেকে আমরা গ্রহণ করতে পারি। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরানের বলেন,হে নবী! কিতাবি গণকে আদমের দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের ঘটনা ভালো করে বর্ণনা করেন তারা যখন কুরবানি করেছিল, তখন একজনের কুরবানি কবুল হলো। কিন্তু অন্যজনের কুরবানি কবুল হলো না। ক্ষিপ্ত হয়ে সে বলল, আমি তোমাকে খুন করবো। অপরজন বলল, প্রভুতো শুধু সেই মহান আল্লাহ, আল্লাহ সচেতন দের কুরবানিই কবুল করেন। (সূরা মায়েদা, আয়াত-২৭)।
অন্যদিকে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরানে বলেন, হে নবী! ওদের বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ-আমার সবকিছুই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্যে। তিনি একক ও অদ্বিতীয়। এ আদেশই আমি পেয়েছি। আমি সমর্পিতদের মধ্যে প্রথম।’ (সূরা আনআম, আয়াত ১৬২-১৬৩)। কেননা কুরবানি করা হচ্ছে এক ধরনের ইবাদত। কুরবানির পশুকে আল্লাহ তাঁর মহিমার প্রতীক করেছেন।পবিত্র কোরানে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মনে রেখো, কুরবানির মাংস বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, আল্লাহর কাছে পৌঁছায় শুধু তোমাদের নিষ্ঠাপূর্ণ আল্লাহ সচেতনতা। অতএব আল্লাহ তোমাদের সৎপথ প্রদর্শনের মাধ্যমে যে কল্যাণ দিয়েছেন, সেজন্যে তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করো। হে নবী! আপনি সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ দিন যে, আল্লাহ বিশ্বাসীদের রক্ষা করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না। (সূরা হজ, আয়াত ৩৭-৩৮)।
করোনা আগামীতে হয়ত ভিন্নরূপে আরো ভয়াবহ আকার ধারন করতে পারে কেননা গত বছরের তুলনায় ইতিমধ্যে করোনা তার রূপ পরিবর্তন করছে। এক ঢেউ যেতে না যেতে আরেক ঢেউের কবলে পড়ে লন্ডভন্ড হচ্ছে মানুষের জীবন। যেন কিছুতে কিছুই হচ্ছে না মানুষের জীবন, জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে। কাজেই প্রত্যেক কে স্বাস্থ্যবিধি, কুরানের শিক্ষায়, প্রত্যেক ধর্মের ধর্মীয় ভাবধারায় জীবন পরিচালনা করা সহ ও সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে মানবতার কল্যাণে এগিয়ে আসতে হবে ও পবিত্র ঈদুল আদহার আত্ম উৎসর্গের শিক্ষা গ্রহণ করে মানবতার কল্যাণে সবাইকে এক যোগে কাজ করে ধনী দরিদ্র বৈষম্য দুর করে একটি সুন্দর শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা হোক সেটি সকলের প্রত্যাশা।
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও গণমাধ্যমকর্মী