কিসলু ভাইয়ের লাঠির গল্প

20

চৌধুরী শাহজাহান

মুসা নবীর লাঠি বা ছড়ি নয়। জিয়াউল হাসান কিসলু ভাইয়ের লাঠি। লাঠি ব্যবহার করেন শারিরীক কারণে। তবে তিনি লাঠিয়াল নন। তিনি আমাদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ। শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের সোনালি সময় কাটিয়েছেন চট্টগ্রাম শহরে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল নক্ষত্র। সেই সময়টা চট্টগ্রাম ছিল সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার চারণভূমি। গান ও নাট্যচর্চায় সরব ছিল পুরো চট্টগ্রাম জুড়ে। তিনি বহুদিন পর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এসেছেন চতুর্থ বাঙলা সম্মিলন যোগ দিতে। বাঙলা সম্মিলন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্রদের প্রাণের সংগঠন। সম্ভবত প্রথম সম্মিলন হয়েছিল ২০০৮ সালে ফয়েজ লেকে মহাসমারোহে। দ্বিতীয় সম্মিলন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। তৃতীয় সম্মিলন সী বিচে।
কিসলু ভাই চলাচলের সুবিধার জন্য একটি ছড়ি ব্যবহার করেন। আমাদের দেশে বয়স বাড়ার সাথে সাথে ছড়ির ব্যবহার দেখা যায়। যারা ছড়ি ধরেন ছুড়িরা তখন দূরে চলে যান। কথাটা শতভাগ সত্য নয়। বিশেষ করে কিসলু ভাইয়ের ক্ষেত্রে। হামিলিনের বাঁশিওয়ালার মতো তিনি ছড়ি দিয়ে অনেক ছুড়ি কাছে টেনে এনেছেন। কারো বয়স তিরিশের বেশি নয়। হা হা হা—। অনেক সতীর্থকে দেখলাম চুটিয়ে চুটিয়ে প্রেম করতে। চুটিয়ে প্রেম না করলেও অন্তত নিবিড়ভাবে বন্ধুদের সাথে সময় কাটিয়েছেন। ফেইসবুকে ভাসমান ছবিগুলো তা-ই প্রমাণ করে। সতীর্থরা কবিতা, গান আর স্মৃতিচারণে সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখলেন চারুকলা প্রাঙ্গন। রবি ঠাকুরের সেই স্মৃতি জাগানিয়া গান-
“পুরানো সেই দিনের কথা
ভুলবি কি রে হায়
ও সেই চোখের দেখা, প্রাণের কথা,
সে কি ভোলা যায়,
পুরানো সেই দিনের কথা
ভুলবি কি রে হায়
ও সেই চোখের দেখা, প্রাণের কথা,
সে কি ভোলা যায়
আয়, আরেকটি বার আয় রে সখা,
প্রাণের মাঝে আয়
মোরা সুখের দুখের কথা কব,
প্রাণ জুড়াবে তায়।” – উপস্থিত সবাইকে আবেগী করে তোলে।
লাঠিটা কিছু সময় আমার কাছে ছিল। তিনি যখন সদলবলে মঞ্চে এলেন তাঁকে সহযোগিতা করলেন কথাশিল্পী আজাদ বুলবুল। ছড়িটি আমাকে দিয়ে আজাদ বলল, এটি তোমার কাছে রাখ। কিসলু ভাইকে নামার সময় দিবে। তিনি স্মৃতিচারণমূলক কথামালা শুরু করলেন। সময় একটু বেশি নিয়ে আবেগী হয়ে গেলেন। মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে অতি স¤প্রতি অবসর গ্রহন করেছেন। নাটক ও অভিনয়ের সাথে সংসার করছেন তিন দশকেরও বেশী সময় ধরে। দুই বাংলায় তিনি সমান জনপ্রিয় নাটক ও অভিনয়ের কারণে। মমতাজউদ্দিন আহমেদ স্যার ছিলেন তার নাট্যগুরু। অনেক অজানা কথা শুনলাম। ভালো লাগলো। ভিসি শিরিণ আপাসহ আরো কয়েকজন বিভাগের শিক্ষক সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিলেন। এদিকে জোবাইদা ঝিনুক, রুহু রুহুল, আহমেদ হাফিজ ইকবাল, শ্যামল কান্তি দত্ত, সালাহ উদ্দিন, মোহাম্মদ নেছার, মুকুল চৌধুরীসহ আমরা বেশ কয়েকজন কবিতাপাঠ/আবৃত্তি করার জন্য দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি। উপস্থাপকদের প্রতি ভিতরে ভিতরে বিরক্ত হচ্ছিলাম, কিন্তু কিছু বলতে পারছি না। তাদের একজন অগ্রজ এবং অন্যজন অনুজ। অন্যদিকে ছোটবোন মুকুল অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কারণে পায়ে ব্যাথা অনুভব করতে লাগলো। এক পর্যায়ে মঞ্চের পিছনে বসে সে বিশ্রাম করে। ইতোমধ্যে দেরী হবে দেখে কয়েকজন সতীর্থ দর্শকসারিতে দর্শক হয়ে চলে গেল। আমরা কয়েক জন রয়ে গেলাম। আজাদ বেশ কয়েকবার মঞ্চে পাক খেলো।
আমিও কিসলু ভাইয়ের লাঠি নিয়ে মঞ্চের পেছনে পায়চারি করতে লাগলাম। জনান্তিকে বলে রাখি, আজাদ বুলবুল আমার সিনিয়র ভাই, ১৯-তম ব্যাচ। আমি ২৪-তম। অনুষ্ঠানে চব্বিশ ব্যাচের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তেইশ ব্যাচের ইউনিক ড্রেসকোড বসন্তের আগাম বার্তা দিয়ে গেল। আজাদকে নাম ধরে ডাকলে সে অখুশি হয় না। বরং খুশি হয়। চমৎকার একজন মানুষ। তাকে বললাম, লাঠিসহ আমার একটি ছবি তোল। সে ছবি তুললো। দেখতে চাইলাম। দেখালো। দেখলাম ছবিটি সুন্দর লাগছে। তাকে ধন্যবাদ দিলাম। সে গ্যালারিতে গিয়ে অগ্রজ-অনুজদের নিয়ে সেল্ফি তুলতে লাগলো। আমি লাঠি নিয়ে আরো কিছুক্ষণ পায়চারি করলাম। আর ভাবতে লাগলাম, এরকম একটি লাঠি আমারও তো লাগবে। হয়তো সেদিন আর বেশি দূরে নয়। মনে মনে বললাম, হায়রে জীবন!
আমাদেরকে এখনও মঞ্চে ডাকা হচ্ছে না। কথামালা চলছে। অতঃপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। তখন প্রায় ২টা বাজে বা আরেকটু বেশি। কিসলু ভাইকে তার লাঠিসহ দর্শকসারিকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে মঞ্চে ফিরে আসলাম। সঙ্গে একজন আপাও ছিলেন। উপস্থাপক ঘোষণা করলেন, সময় স্বল্পতার কারণে আপনাদের কাউকে নাম ধরে ডাকছি না। সবাই এক সাথে মঞ্চে চলে আসুন এবং নিজের নাম বলে যার যার কবিতা পাঠ করুন। রুহুল ভদ্র ভাষায় ঘোষণার জবাব দিয়ে স্বরচিত কবিতা পাঠ করলেন। আমিও প্রিয় কবি ত্রিদিব দস্তিদারের কবিতা পাঠ শেষ করে মধ্যাহ্ন ভোজের কিউতে দাঁড়ালাম।