কিশোর গ্যাং এর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ চাই

33

 

সা¤প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম নগরীতে কিশোর গ্যাং এর উৎপাত বেড়েছে। এই কয়েকদিন আগেও ছুরিকাঘাতে এক কিশোর নিহত হয়েছে। কিশোর অপরাধীরা ‘গ্যাং’ বা গ্রুপ সৃষ্টি করে বিভিন্ন অপরাধ করে বেড়াচ্ছে। জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথে। এই কিশোরেরা সমাজের মধ্যে নিজেদের মতো করে নতুন এক সমাজ গড়ে তুলছে। ওই সমাজের সংস্কৃতি, ভাষা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, আচার-আচরণ সবকিছু আলাদা। বিগবস, নাইন এমএম, নাইন স্টার, ডিসকো বয়েজ ইত্যাদি নামে গড়ে তুলছে অদ্ভূত এবং মারাত্মক ‘কিশোর গ্যাং’। যার ফলে সংঘটিত হচ্ছে নানাবিধ অপরাধ। আধিপত্য বিস্তার, ছিনতাই, চুরি, পাড়া বা মহল্লার রাস্তায় মোটরসাইকেলের ভয়ঙ্কর মহড়া, মাদক এবং ইয়াবা সেবন ও বিক্রি, চাঁদাবাজি, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা এমনকি খুনখারাবিসহ বিভিন্ন হত্যাকান্ডের সাথে জড়িয়ে পড়ছে ভবিষ্যত সমাজের অপার সম্ভাবনাময়ী এসকল গ্যাং-এর তরুণ এবং কিশোর সদস্যরা। প্রশাসন এ অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার পরও কিশোর গ্যাং এর অপরাধীদের কোনভাবেই থামানো যাচ্ছেনা। প্রসঙ্গত, এ দেশে ২০১২ সাল থেকে কিশোর গ্যাং নামক একটি অপরাধ চক্রের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হলেও ২০১৭ সালে ঢাকার উত্তরায় অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র আদনান কবির খুনের পর এদের কর্মকাÐ আলোচনায় আসে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে মাঠে নামে। নিকট অতীতের বেশ কিছু ঘটনা (কিশোর অপরাধ) তোলপাড় করেছিল সারা জনপদে। প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্র উঁচিয়ে হত্যার উৎসবে মেতে উঠছে কিশোর অপরাধীরা। মেধাবি স্কুলছাত্রকে প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনাও ঘটে এই নগরেই। ক্ষেত্রবিশেষে ধরা- ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় অপরাধীরা। ধরা পড়লেও শাস্তি কতটুকু হবে তা নিয়ে শংকিত ভুক্তভোগী মানুষ ও তাদের পরিবার। নানা ধরনের অপরাধ করার কৌশল রপ্ত করছে এইসব কিশোর অপরাধীরা। হেন অপরাধ নেই যা তারা করছে না। কিছুদিন আগে একটি জরীপে উল্লেখ করা হয়েছিল, চট্টগ্রামে ৩০০ স্পটে সক্রিয় রয়েছে প্রায় ৫৫০ কিশোর অপরাধী। দেশের অন্যান্য স্থানেও যার কমতি নেই। কিশোর অপরাধীরা আবার বিভিন্ন গ্যাং এর মাধ্যমে তথাকথিত ‘বড় ভাইদের’ আষ্কারা পেয়ে অপরাধ করে বেড়াচ্ছে।
সাধারণ মানুষের অসহায় এ অবস্থা থেকে মুক্তি না মিললে সমাজে বাস করাও দায় হবে। বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, অনেক ভালো স্কুলের মেধাবি শিক্ষার্থীরাও এ ধরনের অপরাধের সাথে জড়িয়েছে। স্কুল ফাঁকি দিয়ে গ্রæপের আস্তানায় যোগ দেয়। সেখানে তথাকথিত বড় ভাইরা তাদের নানা অপরাধের অপকৌশল শিখিয়ে দেয় বলে বিভিন্ন তথ্যে উঠে এসেছে। এসব তথ্য প্রশাসনের হাতে আসার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হতবাক হয়ে পড়ছেন, অপরাধের সাথে স্কুল ছাত্রদের জড়িত থাকার তথ্যে চমকে উঠেন। এ নিয়ে মা, বাবা, অভিভাবক, আত্মীয়-স্বজন চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। মাদকের ছড়াছড়ি আর সন্ত্রাসের উপাদানগুলো হাতের কাছে পাওয়ায় কিশোর অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। দ্বিধা করছে না কোন অপরাধ করতে। ‘বড় ভাইদের’ সহযোগীতা পেয়ে তারা দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে অপরাধ করে বেড়াচ্ছে। কে কোন সময় খুন, গুম কিংবা অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হবে তা বলার কোন উপায় নেই। অনলাইনে নানা পর্ণ সাইট ও অশ্লীলতায়ও আসক্ত হচ্ছে কিশোররা। দিনরাত ফেসবুক, ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটির মধ্য দিয়ে সময় ব্যয় করার কারণে পড়ালেখাও লাটে উঠছে। করোনায় স্কুল বন্ধের সুযোগে যা একেবারে তলানীতে পৌঁছায়! যে কারণে, মাথায় আর সুবুদ্ধি আসে না। এসব বিষয়ে মা,বাবা, অভিভাবককে খোঁজ খবর রাখতে হবে, বিপথে পা বাড়ানো আঁচ করতে পারলেই শুরুতে যেভাবেই হোক তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। শুরুর দিকে যদি শোধরানোর ব্যবস্থা করা যায় তাহলে অপরাধের সাথে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসে। আমাদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কিশোর অপরাধ সহ সব ধরনের অপরাধ থেকে মুক্ত রাখতে সচেষ্ট হতে হবে। অনেক সময় রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ও কিশোর অপরাধ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। আমাদের নেতাদের উচিত হবে না কোন অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয়া। তাদের উচিত শিশু-কিশোরদের অপরাধ থেকে মুক্ত রাখার জন্য কর্মসূচি তৈরি করা। সমাজের সচেতন ব্যক্তিবর্গকেও এগিয়ে আসতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিবারের ইতিবাচক ভূমিকা। মা-বাবা, অভিভাবকদেরকে নিজেদের সন্তানদের ব্যাপারে নিয়মিত খবরা খবর রাখতে হবে। কার কার সাথে সে বন্ধুত্ব করছে, কোথায় কখন কী করছে, কোথায় যাচ্ছে ইত্যাদির ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে তাদের চেষ্টার কমতি থাকতে পারবে না। ছোটবেলা থেকে শিশুদের সুশিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। দিতে হবে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা। যেসব কারণে কিশোররা অপরাধে জড়াচ্ছে তার মূলে পৌঁছাতে হবে। আমাদের পাঠ্যপুস্তকগুলোতেও শিক্ষামূলক, নৈতিক বিষয়বস্তু সংযোজন করতে হবে। নীতিহীন শিক্ষা থেকে শিশু-কিশোরদের বাঁচাতে এর কোন বিকল্প নেই। পাশাপাশি আইনের আওতায় এনে অপরাধীর কঠোর শাস্তির নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধের সাথে জড়িত সংশ্লিষ্টদের মানসিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য কাউন্সেলিং করা যেতে পারে। কিশোর অপরাধকে কোনোভাবেই বাড়তে দেয়া যাবে না। গোড়াতেই নির্মূল করতে হবে কিশোর গ্যাং। কারণ, কিশোররাই জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের মাঝেই লুকিয়ে আছে আগামীর নেতৃত্ব। কিশোর গ্যাং এর এই দৌড়াত্ম্য বন্ধে প্রশাসনের পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা।শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল কাজের পরিবেশ তৈরি করে দিলে এবং উন্নয়নমূলক কাজের দিকে আগ্রহী করে তুলতে পারলে কিশোর গ্যাং নামক দুঃস্বপ্নের আধিপত্য কমে যাবে বলে আশা করা যায়।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট