কিডনি

15

আজহার মাহমুদ

খুব ভোরে আজ কলিমের ঘুম ভেঙে যায়। কারণ কলিমের বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হচ্ছে। হঠাৎ কলিমের বাবার কি হয়েছে কে জানে! চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার পর কলিম ডাক্তার খুঁজছে। একটা নার্স এসে তার বাবাকে দেখছে। কলিম তার পরিবারকে খুব ভালোবাসে। কতটা ভালোবাসে সেটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। বাবার প্রতি অনেকটা দুর্বলতাও আছে তার। বাবাকে এমন অবস্থায় দেখে কলিমের ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। সারাদিন হাসপাতালের এদিক থেকে ওদিক ছুটছে। একমুঠো ভাত পেটে দেয়নি। বাবার এমন হাল দেখে চোখের জল ফেলছে শুধু কলিম। কলিমের ছোট ভাই ঢাকায় আছে। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। আর ৬ মাস পরেই চাকরিতে জয়েন করবে। একটা ভালো চাকরির অফার এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হলেই চাকরিতে জয়েন করবে তার ভাই। বাবার অসুখ হওয়ার পর থেকে কলিম তার ভাইকে পড়াশোর খরচ দিতে পারতো না। তার ছোট ভাইও বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। বিভিন্ন সংগঠনে আবেদন করে এখন বেশ সুন্দর ভাবেই পড়াশোনা করছে সে। সংসারটা কলিম কোনোভাবে চালায়। কলিমও পড়াশোনায় বেশ ভালো ছিলো। চাকরির কারণে পড়াশোনাটাও হলো না কলিমের। তার বন্ধুরা এখন মাস্টার্স শেষ করে চাকরি করছে।
কলিমের মাথায় এখন একটাই চিন্তা। তার বাবার চিকিৎসার জন্য কত টাকা খরচ হতে পারে! তার হাতে এখন ৫ হাজার টাকাও নেই। ঘর ভাড়া, ওষুধ খরচ আর বাবা-মাকে নিয়ে দু-বেলা ভাত খেতেই তো হিমশিম খেতে হয় কলিমকে। সেখানে চিকৎসার জন্য টাকা কীভাবে থাকবে।
সরকারি হাসপাতাল তাই মোটামোটি চলছে কলিমের। আজ সাতদিন কলিমের বাবা হাসপাতালে। এখনও ডাক্তাররা পরিক্ষা করে দেখছে তার বাবার সমস্যা কি। কয়েকটা পরীক্ষায় কলিমের সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কলিম তার বন্ধু থেকে ৫ হাজার টাকা ধার নিয়েছে। সেগুলো দিয়েই চলছে মোটামোটি।
কলিমকে আজ ডাক্তার ডেকেছে। গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবে বলে মনে হচ্ছে কলিমের। কলিম ডাক্তারের রুমে শান্তভাবে প্রবেশ করলেও বেশ অশান্তিতে আর অস্বস্থিতে বের হয়ে এসেছে। এমন কথা শুনার জন্য কলিম প্রস্তুত ছিলো না। ডাক্তার বলেছে কলিমের বাবার কিডনি দুটোই নষ্ট হয়ে গেছে। খুব তাড়াতাড়ি যদি একটা কিডনি না পাওয়া যায় কলিমের বাবাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। এই মুহূর্তে কলিমের পায়ের নিচে মাটি নেই বলে মনে হচ্ছে কলিমের। চারপাশে দুচোখ দিয়ে ঘোর অন্ধকার দেখছে। কলিম এমন একটি সময়ের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। বাবার কিডনি নষ্টের খবরটা মাকে জানানো মাত্র মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো।
এা হয়তো ভাবছে বাবাকে বোধহয় আর বাঁচাতে পারবো না। মা জানে আমার সামর্থ্য সম্পর্কে। মাকে বলেছি এটা যাতে ছোট ভাইকে না বলে। সে কোনো ধরনের চিন্তা ছাড়া পড়াশোনা করুক এটা সবাই চাই। ছোট ভাইয়ের আবার পরীক্ষা শেষেই চাকরি হবে। এখন এসব শুনলে সেও সব ছেড়ে চলে আসবে। মূলত কিডনির পাওয়া এবং সেই কিডনির জন্য টাকা খরচ করা দুটোই কলিমের কাছে আকাশ-কুসুম ব্যাপার। কলিমের আত্মীয় স্বজনও নেই যে বললে সাহায্য করবে। কলিম এক বন্ধুর সাথে আলাপ করে জানতে পারলো দশ লক্ষ টাকায় কিডনি ম্যানেজ হতে পারে। কিন্তু কলিমের হাতে তো দশ হাজার টাকাও নেই এখন। দশ লক্ষ টাকা কীভাবে ম্যানেজ করবে সেই চিন্তায় রাতে ঘুম হলো না কলিমের। অনেক ভেবে কলিম সিদ্ধান্ত নিলো তার কিডনি তার বাবাকে দিবে। কলিম এ বিষয়ে ডাক্তারদের সাথে কথা বলে ঠিক করে নিলো। ডাক্তারদের কলিম বলেছিলো এই কথা যেন তার বাবা-মা কেউ না জানে। কলিম তার কিডনির অপারেশন করাতে গিয়ে দেখলো অনেক টাকা খরচ হবে। সেই টাকা ম্যানেজ করাও কঠিন। তখন কলিম এক লক্ষ টাকা একটা এনজিও থেকে ঋণ নেয়। সেই টাকা তার মাকে দিয়ে কলিম বলে, “মা আমি ঢাকায় যাচ্ছি বাবার কিডনির সন্ধানে। কলিমের অপারেশন করাতে গিয়ে ডাক্তারদের অবস্থা ছিলো মারাত্মক। কলিমের একটা কিডনি প্রায় ড্যামেজ। কলিমের ভালো কিডনিটা নিয়ে নিলে কলিমেরও একসময় তার বাবার অবস্থায় পড়তে হবে। কিন্তু কলিম অপারেশনের আগেই বলেছে অপারেশন শেষ হওয়ার পর জ্ঞান ফিরলে তার বাবাকে সে সুস্থ দেখতে চায়। ডাক্তারদের তার কষ্টের কথাও বলেছে। ডাক্তাররাও সেজন্য আর পিছপা হয়নি। কলিমের কিডনি নিয়ে তার বাবার শরীরে দিয়েছে।
এক সপ্তাহ পর কলিম এবং তার বাবা সুস্থ। কলিম তার বাবাকে নিয়ে বাসায় ফিরলো। এইসব কথা তার ছোট ভাইও জানে না। কলিমের মা একটু অবাক হলো! এতো অল্প সময়ের মধ্যে কিভাবে সব সম্ভব হলো। তাদের আর্থিক অবস্থাও ভালো না। কলিম তার মাকে বলতো ঋণ করেছে। এভাবে মাসখানিক যেতে না যেতেই কলিমের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কলিম ডাক্তার দেখিয়ে যেটা সন্দেহ করেছে সেটাই পেয়েছে। ডাক্তার তাকে বেশি বেশি পানি খেতে বলছে। তার কিডনি ৭০ পার্সেন্ট অকার্যকর হয়ে গেছে। এভাবে একদিন কলিম মারা যায়। কলিমের মৃত্যুর পর তার পরিবার অনেকটা ধারণা করে নিয়েছে কলিম তার বাবার জন্য কিডনি দিয়েছে। কলিমের বাবা এই কষ্ট কোনোভাবেই নিতে পারছেন না।
এদিকে কলিমের ছোট ভাই ৫০ হাজার টাকা বেতনের চাকরি পেয়েছে। কলিমের মৃত্যু সকল সুখের ভেতর শোক হয়ে চলে এলো। কলিমের বাবা হয়তো ভাবছেন এমন সুখ তিনি কখনও আশা করেননি। কিন্তু নিয়তির এমন বিধানের কাছে তিনিও অসহায়। ছোট ছেলেকে নিয়ে কলিমের বাবা-মা এখন বেশ ভালোই আছে। কলিম হয়তো দূর থেকে দেখে বেশ শান্তি অনুভব করছে।