কিংবদন্তী কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর

8

 

“ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে” এন্ড্রু কিশোরের সেই বিখ্যাত গান কেবলই আমাদের সকলের মনকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। সত্যিই তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। জীবনের সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন জীবনের পরপারে।
বাংলা গানের এই নন্দিত কণ্ঠশিল্পী “প্লে-ব্যাক সম্রাট” নামে পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশের আধুনিক ও চলচ্চিত্র জগতের কালজয়ী অনেক গান তাঁর কণ্ঠে সমৃদ্ধ হয়েছে। সুখ, দুঃখ, হাসি-আনন্দ, প্রেম-বিরহ সব অনুভূতির গানই তিনি গেয়েছেন।
১৯৫৫ সালের ৪ নভেম্বর এন্ড্রু কিশোর জন্মগ্রহণ করেন রাজশাহীতে। পিতা ক্ষিতিশচন্দ্র বাড়ুই ও মা’ মিনু বাড়ুই। তাঁদের আদি নিবাস ছির গোপালগঞ্জের কোটালী পাড়ায়।
দেশ ভাগের সময় এন্ড্রু কিশোরের পিতা ক্ষিতিশ চন্দ্র বাড়ুই ও মা’ মিনু বাড়ুই তাঁদের আদি নিবাস গোপালগঞ্জের কোটালী পাড়া ছেড়ে রাজশাহীতে চলে আসেন। পিতা-মাতা উভয়েই খ্রিষ্টান মিশনারী হাসপাতালে চাকুরী নেন।
শৈশবে এন্ড্রু কিশোর রাজশাহীর বিবি হিন্দু একাডেমী স্কুলে পড়াশোনা করেন। ৭১’ এর স্বাধীনতার পর প্রথমে পিতা ও পরে তাঁর মা মারা যান। রাজশাহীতে তাঁর বড় বোন ডা. শিখা বিশ্বাসের আদর-উস্নেহ ভালোবাসায় বড় হন শিল্পী।
১৯৭৩ সালে রাজশাহী সিটি কলেজ থেকে এইচ.এসসি পাস করেন। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্টে মাষ্টার ডিগ্রি করেন। শৈশবে এন্ড্রু কিশোরের সঙ্গীতে হাতে খড়ি হয় রাজশাহীর প্রয়াত ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চূর হাতে। ছোট বেলা থেকেই সঙ্গীতে অনুরক্ত ছিলেন তিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনায় লেখাপড়া করলেও গানই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। যুদ্ধের পর তিনি রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, আধুনিক গান, লোক সঙ্গীত ও দেশাত্মোবোধক গানে রাজশাহী বেতারের তালিকা ভুক্ত শিল্পী হন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন কালে তাঁর কণ্ঠের সুনাম রাজশাহী শহর এবং এর আশে পাশে ছড়িয়ে পরে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি কিশোর কুমারের গানকে হুবহু গাইতেন। সে সময় রাজশাহী শহরে সর্বত্রই দূর্গা-পূজা জমতো এন্ড্রু কিশোরের গানে।
চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শুরু করেন ১৯৭৭ সালে আলম খানের সুরে “তুফান মেইল” চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে। গানটি ছিল “অচিনপুরের রাজকুমারী নেই যে তার কেউ”। এরপর “প্রতীক্ষা”, “এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’’র পর নিজের ক্যারিয়ারের শুভ সূচনা হয় ১৯৮২ সালে “বড় ভালো লোক ছিল” সিনেমা দিয়ে। এ সিনেমার “হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস” এর জনপ্রিয়তার পাশাপাশি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পান। কিংবদন্তী সুরকার আলম খান ও এই সিনেমা দিয়ে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার অর্জন করেন। এরপর এন্ড্রু কিশোরকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। তাঁর রেকর্ডকৃত দ্বিতীয় গান বাদল রহমান পরিচালিত “এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী” চলচ্চিত্রে “ধুম ধাড়াক্কা”। কিন্তু এন্ড্রু কিশোর সবার কাঝে পৌছে যান “ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে” গানের মধ্য দিয়ে। মনিরুজ্জামান মনিরের লেখা গানটির সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন আলম খান। এরপর একটার পর একটা প্লে-ব্যাক করে গেছেন সাফল্যের সঙ্গে এন্ড্রু কিশোর।
প্লে-ব্যাক সম্রাট এন্ড্রু কিশোর বাংলা চলচ্চিত্রে সর্বাধিক ১৫ হাজার গান পেয়েছেন। জীবনে প্রথম গান গেয়ে পেয়েছিলেন ৮০০ টাকা। চলচ্চিত্রে তাঁর চেয়ে বেশি জনপ্রিয় গান আর কারও নেই। তাঁর গাওয়া গানগুলির মধ্যে উল্লেখ যোগ্য গান হলো- জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প, ডাক দিয়েছেন দয়াল আমারে, হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস, আমার বুকের মধ্যে খানে, আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি, আমার বাবার মুখে প্রথম যে দিন শুনেছিলাম গান, সবাই তো ভালোবাসা চায়, ভেঙ্গেছে পিঞ্জর-ভেঙ্গেছে ডানা, পড়েনা চোখের পলক, ওগো বিদেশীনি, পদ্মপাতার পানি, আমি চিরকাল প্রেমের কাঙ্গাল, তুমি মোর জীবনের ভাবনা, চাঁদের সাথে আমি দেবো না, বেদের মেয়ে জোসনা আমায়, ভালো আছি ভালো থেকো, ভালোবেসে গেলাম শুধু ভালোবাসা পেলাম না, আমি তোমার মনের মাঝি, আমার গরুর গাড়িতে ইত্যাদি আরো অনেক জনপ্রিয় গান।
বাংলা চলচ্চিত্রের গানে অবদান রাখার জন্য তিনি আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পেয়েছেন- বড় ভালো লোক ছিল (১৯৮২ খ্রি.), সারেন্ডার (১৯৮৭ খ্রি.), ক্ষতিপূরণ (১৯৮৯ খ্রি.), পদ্মা মেঘনা যমুনা (১৯৯১ খ্রি.), কবুল (১৯৯৬ খ্রি.), আজ গাঁয়ে হলুদ (২০০০ খ্রি.), সাজঘর (২০০৭ খ্রি.) ও কি জাদু করিলা (২০০৮ খ্রি.)।
বাচসাস পুরষ্কার (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি) পেয়েছেন পাঁচ বার- প্রিন্সেস টিনা খান (১৯৮৪ খ্রি.), স্বামী-স্ত্রী (১৯৮৭ খ্রি.), প্রেমের তাজমহল (২০০১ খ্রি.), মনে প্রাণে আছো তুমি (২০০৮ খ্রি.) ও গোলাপি এখন বিলেতে (২০১০ খ্রি.)। মেরিল প্রথম আলো পুরষ্কার সহ দেশ-বিদেশে অসংখ্য পুরষ্কার পেয়েছেন।
আশি-নব্বই দশকের এমন কোন বাংলা সিনেমা খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠের ছোঁয়া পড়েনি। প্রয়াত নায়ক রাজ্জাক, জাফর ইকবাল থেকে শুরু করে ইলিয়াস কাঞ্চন, মান্না, সালমান শাহ, রুবেল কিংবা হালের নায়ক শাকিব, রিয়াজ সবাইকে তার কণ্ঠ দিয়ে পর্দায় রাঙিয়ে দিয়েছিলেন এই কিংবদন্তী। বাংলা গানের এই কণ্ঠ শিল্পী তাই প্লে-ব্যাক সম্রাট” নামে পরিচিত। প্লে-ব্যাকে রুণা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন ও কনকচাঁপার সঙ্গে জুটি বেঁধে অসংখ্য জনপ্রিয় গান গেয়েছেন এন্ড্রু কিশোর।
প্লে-ব্যাকের বাইরে এসে নিয়মিত অ্যালবাম, টেলিভিশনেও গান করেছেন এন্ড্রু কিশোর। জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদিতেও তাঁর প্রথম গান “পদ্ম পাতার পানি নয়”। পরবর্তীতে সঙ্গীত বিষয়ক রয়্যালিটির শো’র বিচারক হয়েছেন তিনি।
সুরকারদের মধ্যে আলম খান ও আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সঙ্গে বেশি কাজ করেছেন তিনি। এছাড়া আলাউদ্দিন আলী, সত্য সাহা, শেখ সাদী খান থেকে হালের ইমন সাহা সবার সঙ্গে কাজ করে গেছেন তিনি। গীতিকার হিসেবে গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মনিরুজ্জামান মনির, মোঃ রফিকুজ্জামান থেকে কবির বকুল অনেকের লেখা গানই গেয়েছেন। দেশের গন্ডি পেরিয়ে কলকাতায় ও প্লে-ব্যাকে বেশ কয়েকটি গান করেছেন।
এন্ড্রু কিশোরের গানের খ্যাতি দেশের বাইরেও রয়েছে। ভারতের পশ্চিম বঙ্গ থেকে মুম্বাই পর্যন্ত, ছিল তাঁর গানের পরিচিতি। উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ রাহুল দেব বর্মণ তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়ে মুম্বাই নিয়ে যান এবং তাঁকে দিয়ে হিন্দী গান করান। গান শেষে দেশে ফেরার সময় আর.ডি.বর্মণ তাঁকে সেদেশে গানের জন্য থেকে যেতে বলেছিলেন উন্নত শিল্পী জীবনের আশায়। দেশ প্রেমিক বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের প্লে-ব্যাক সম্রাট এন্ড্রু কিশোর বিনয়ের সঙ্গে সে আবেদন প্রত্যাখান করেছিলেন এবং বলেছিলেন নিজের দেশ বাংলাদেশেই তিনি থাকতে চান। নিজের দেশকে তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন। আমৃত্যু বাংলাদেশের মানুষের জন্য তিনি গান গেয়েছেন। আসলে এন্ড্রু কিশোর ছিলেন বিশাল হৃদয়ের মানুষ, মানবিক চেতনায় অনন্য। তাঁর দেশ প্রেমের দৃষ্টান্ত অতুলনীয়। তিনি রেখে গেছেন আমাদের জন্য অসীম শুন্যতা। তিনি সু-সময় ও দুঃসময়ও সঙ্গীতকে আঁকড়ে থেকেছেন। তিনি সঙ্গীতকে অন্তরাত্মা দিয়ে ভালোবেসেছেন। তাঁর সব সংযম, বিচার বুদ্ধি, ভালোবাসা সব সঙ্গীতকেই কেন্দ্র করেই।
গত বছর ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে এন্ড্রু কিশোর উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যান। প্লে-ব্যাক সম্রাট খ্যাত গায়ক এন্ড্রু কিশোর দীর্ঘ দিন ক্যান্সারে ভুগছিলেন। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক সিম জুন থাইয়ের অধীনে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়। বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে চিকিৎসায় অর্থ সহায়তার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ভাবে তাঁর খোঁজ খবর রেখেছিলেন। সিঙ্গাপুরে দীর্ঘ নয় মাস চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরেন তিনি কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। রাজশাহীতে তাঁর বোন শিখা বিশ্বাসের ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬ জুলাই ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যু কালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর (১৯৫৫-২০২০ খ্রি.)। তিনি স্ত্রী লিপিকা এন্ড্রু, ছেলে জে এন্ড্রু সপ্তক, মেয়ে মিনিম এন্ড্রু, আত্মীয় স্বজন, গুণগ্রাহী সহ সারা বিশ্বে অগণিত ভক্ত শ্রোতা রেখে গেছেন।
মেয়ে মিনিম এন্ড্রু সংজ্ঞা অষ্ট্রেলিয়ার সিডনিতে গ্রাফিক ডিজাইন ও ছেলে জে এন্ড্রু সপ্তক অষ্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ণে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে পড়াশোনা করছেন।
এন্ড্রু কিশোর অজস্র কালজয়ী গানের মাধ্যমে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন বহুযুগ এমন কি যুগ-যুগান্তর চিরদিন-একথা দ্বিধাহীন ভাষায় বলা যেতে পারে। বাংলা সিনেমার গানে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দী প্লে-ব্যাক সম্রাট। তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তিনি সব শ্রেণির শ্রোতার কাছে জনপ্রিয় শিল্পী হয়ে উঠতে পেরেছিলেন।