কাপ্তাই লেকে পানি কমছে ওয়াসার দুশ্চিন্তা বাড়ছে

14

এম এ হোসাইন

কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে চালু আছে মাত্র একটি। লেকে পানির স্তর কমে যাওয়াতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ধস নেমেছে। এই সময়ে ৯৪ এমএসএল (মিনস সি লেভেল) পানি থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র ৮৪ এমএসএল। লেক থেকে এখন যে পরিমাণ পানি ছাড়া হচ্ছে তাতে সাগরের লবণাক্ত পানি উজানে উঠা আটকানো যাচ্ছে না। কর্ণফুলী হয়ে সাগরের লবণাক্ত পানি আঘাত করছে ওয়াসার মোহরা ও মদুনাঘাট প্রকল্পে। অমাবস্যা-পূর্ণিমাতে বেশি লবণাক্ততায় বন্ধ রাখতে হচ্ছে ওয়াসার উৎপাদনও।
শুষ্ক মৌসুম আসলেই কিছু সময়ের জন্য লবণাক্ততা সমস্যায় ভুগতে হয় চট্টগ্রাম ওয়াসাকে। প্রায় প্রতিবছর একই সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে সংস্থাটিকে। জোয়ারের সঙ্গে সাগরের নোনা জল কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে প্রবেশ করায় পান করার অযোগ্য হয়ে পড়ে ওয়াসার সরবরাহ করা সুপেয় পানি। এতে কিছু সময় পানির উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় সংস্থাটি। ফলে নগরবাসীর দুর্ভোগের পাশাপাশি দেখা দিতে থাকে সুপেয় পানির সংকটও। এবার সংকট বড় আকারে দেখা না দিলেও ওয়াসার আশঙ্কা বাড়ছে। কারণ কাপ্তাই লেকে পানির স্তর অনেকে নিচে নেমে গেছে। লেকের পর্যাপ্ত পানি পাওয়া নিশ্চিত করা না গেলে ওয়াসার উপর বড় চাপ আসতে পারে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহ বলেন, আমরা কয়েকবার মিটিং করেছি, দুটি গেট যেন চালু রাখা হয় সেটার সিদ্ধান্ত আছে। এখন পানির স্তর বেশি নেমে গেছে। স্তর বেশি নেমে যাওয়ার নানা কারণ থাকতে পারে। দীর্ঘদিনের লেক, সেখানে যেভাবে ড্রেজিং হওয়ার কথা সেটা হয়তো হয়নি। এরমধ্যে বৃষ্টি হলে তেমন সমস্যা হবে না।
পানিতে লবণাক্ততার সমস্যা নতুন নয়। ১৯৯৪ সাল থেকে প্রায় প্রতিবছরই এ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে নগরবাসী। ১৯৮৭ সালে হালদা তীরে মোহরা প্ল্যান্ট স্থাপনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ শুরু করে চট্টগ্রাম ওয়াসা। উৎপাদনে যাওয়ার সাত বছরের মাথায় প্ল্যান্টটিতে লবণপানি আঘাত শুরু করে। এরপর থেকে প্রতিবছর পানিতে লবণাক্ততা দেখা দিলে সেটার জন্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে দায়ী করে আসছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। গতবছর (২০২৩ সাল) ওয়াসার মোহরা প্রকল্পে সর্বোচ্চ লবণাক্ততা ধরা পড়ে। প্রতি লিটারে লবণাক্ততা ধরা পড়ে ৩২শ মিলিগ্রাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী পানিতে লবণাক্ততার সহনশীলতা প্রতি লিটারে ৪০০ থেকে ৬০০ মিলিগ্রাম। বৃষ্টি না হলে এবার লবণাক্ততার পরিমাণ আরো বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বলেন, কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি গেট সার্বক্ষণিক চালু আছে। লেকের পানির স্তর কমলেও আমরা যোগাযোগ রাখছি যেন অন্তত একটি হলেও চালু থাকে। এখন অমাবস্যা-পূর্ণিমাতে লবণাক্ততা বেশি হলেও অন্যান্য সময়ে সহনশীল আছে। জোয়ারের সময়ে লবণাক্ততার আঘাত হয়, বেশি হলে তখন কিছু সময়ের জন্য পানি সরবরাহ কমিয়ে দিতে হয়।
কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে পর্যাপ্ত পানি ছাড়া না হলে জোয়ারের সময় সাগরের লবণাক্ত পানি ওপরের দিকে উঠতে থাকে। কখনো কখনো লবণাক্ত পানি মদুনাঘাট হয়ে হালদা নদীতে পর্যন্ত উঠে যায়। ইতোমধ্যে চলতি বছরে ওয়াসা প্রতি লিটারে দুই হাজার ১০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণাক্ততা পেয়েছে। লবণাক্ততা ঠেকাতে জোয়ারের সময় পানির উৎপাদন বন্ধ করে দেয় ওয়াসা। তাছাড়া বিকল্প হিসাবে টিউবওয়েলের পানির সংমিশ্রণ ঘটানোর মাধ্যমে সংকট মোকাবেলার চেষ্টা চালায়। তবে এই সময়ে পানির উৎপাদন কমে সংকট দেখা দেয় নগরে। অনেককেই খাওয়ার সুপেয় পানি সংগ্রহের জন্য দূর-দূরান্ত পর্যন্ত পাড়ি দেন।
বর্তমানে ওয়াসার আবাসিকে গ্রাহক সংযোগ ৭৮ হাজার ৫৪২টি এবং বাণিজ্যিক সংযোগ আছে ৭ হাজার ৭৬৭টি। চট্টগ্রামে দৈনিক পানির চাহিদা আছে ৫০ কোটি লিটার। চারটি পানি শোধনাগার প্রকল্প থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ৪২ থেকে ৪৫ কোটি লিটার পানি। প্রয়োজনের তুলনায় নগরবাসী ৫ থেকে ৮ কোটি লিটার পানি কম পাচ্ছে। তাছাড়া উৎপাদিত পানির ৩০ শতাংশেরও বেশি অপচয়ের খাতায় উঠে। যে কারণে কিছু এলাকায় সংকট লেগেই থাকে।
উল্লেখ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী প্রতি লিটার পানিতে ১৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০ মিলিগ্রাম লবণ থাকলে তা পান করা যায়। বর্তমানে ওয়াসার মোহরা প্রকল্পের নদীর পানিতে ২১০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণ পাওয়া গেছে।