কাকুই’র একুশে ফেব্রুয়ারি

148

পাড়ার স্কুল-কলেজের ছেলেরা গতরাতে শহীদ মিনারটাকে ধুয়ে মুছে চকচকে করে ফেলেছে। ভোরে প্রভাতফেরি শেষে সবাই এসে জড়ো হয়েছে শহীদ মিনারে। এবারই প্রথমবারের মতো এতো হৈ চৈ করে শহীদ দিবস পালন করা হচ্ছে কাকুই’র পাড়ায়।
পাড়াটার ভাগ্য মন্দ। যারাই লেখাপড়া শেষে, তারাই শহরবাসী হয়ে যায়। পাড়ার রাস্তাঘাট ও অন্যান্য অবকাঠামো অনেকটা সেকেলে। কাকুই এবার নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলো। সে এবং সহপাটী কয়েকজন মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, এ বছর পাড়ায় ছেলে-মেয়ে নিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করবে পাড়াতেই।
গতকালই সে ঘোষণা দিয়েছে যে, আজকের অনুষ্ঠানে সে একটা চমক দেখাবে। বিশেষ করে বয়স্কজনরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে-কি সেই চমক? জিলাপি আর নিমকির ব্যবস্থা করায় ফুলশিশুদের আগমনে অনুষ্ঠানস্থল কিচির-মিচিরএ ভরে উঠেছে।
ছাত্র-ছাত্রীরা একের পর এক বক্তৃতা দিয়ে সামনে এসে বসে পড়ছে শ্রোতার কাতারে। খালি কন্ঠে গানও চলছে বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে-নৃত্যও চলছে হঠাৎ হঠাৎ।
কাকুই মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ঘোষণা দিলো, ‘কালকে বলেছিলাম চমক দেখাবো। এবার সেই প্রত্যাশিত চমক।’
অনেকটা নার্ভাস হয়ে গেল নিমাই কাকা। কাকুই যখন তাকে ডেকে এনে হাতে মাইক্রোফোন ধরিয়ে দিলো তখন সে রীতিমতো কাঁপছে।
তার চোখ রেখে কাকুই কেবল উচ্ছারণ করলো, ‘নিম্মু কাকু’ বাস। মরা গাঙে বান আসলো যেন।
‘আঁই লেয়া-পড়া ন জানি। ইতারলাইবুলি আঁই আঁর এই সত্তইর বছর বয়সত ন জাইনতাম একুশ ফেব্রুয়ারি কী? আজিয়া থোরা থোরা জান্নি। আঁরার এই ভাষারলাই পাকিস্তানির মিলেটারির হাতত্ বউত্ বাঙালিয়ে হাসি হাসি পরাণ দিয়ে। ইতারা ব্যাগুনে বইঅর ভাষায় বক্তৃতা দ্যয়নে, ব্যাগুনে বুজিত্ ন পারি। সে ভাষাত্ আঁই কথা কইর হেই ভাষায় ব্যাজ্ঞুনে বক্তিতা দিলে বঅর মজা হইতো। কাকুইয়া আজিয়া জিয়ান দেখাইয়ে আঁরার পাড়াত্, হিয়ান চল্লিশ বছর আগে হইলে ভালা হইতো। ব্যাজ্ঞুন ভালা থাইক্যো। আঁর বক্তৃতা শেষ।‘-বক্তৃতা শেষ করলো নিমাই কাকু।
প্রচন্ড করতালিতে অনুষ্টানস্থল মুখরিত হয়ে ওঠে। মাইক্রোফোল হাতে নিয়ে কাকুই বলতে থাকে, আজ আমার জীবন সার্থক হলো। নিম্মু কাকু জানতো না একুশে ফেব্রুয়ারি কী! আজ কিছুটা হলেও জানতে পেরেছে। তেলা মাথায় তেল নয়, একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এটাই। সবাইকে ধন্যবাদ। অনুষ্ঠান শেষে সবাই মহানন্দে নিজ নিজ বাড়ির দিকে পা বাড়ালো।