কলকাতার সব হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীদের ভিড় দালালদের খপ্পরে পড়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন অনেকে

650

কলকাতা থেকে ফিরে শনিবার সকাল ১০টা। মুকুন্দুপুর বিশেষায়িত এনএইচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাসপাতাল। হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য গেছেন নোয়াখালীর শামীম আহমেদ খান। ডাক্তার দেখানোর জন্য অপেক্ষার ফাঁকে বললেন, তিনি এসেছেন এক সপ্তাহ আগে। আসার পরদিন ডাক্তার দেখিয়েছেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষাও শেষ হয়েছে। ২০ হাজার টাকার টেস্ট করিয়েছেন। কলকাতা আসার কারণ হিসেবে তিনি বললেন, বাংলাদেশে একেক হাসপাতালে টেস্ট রিপোর্ট একেক রকম আসে। বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি। তাছাড়া ডাক্তাররাও সময় দিয়ে দেখেন না। একারণে টাকা বেশি গেলেও এসেছেন কলকাতায়। একই হাসপাতালে পাওয়া গেল ফেনীর কবির হোসেনকে। তিনি নিউরো বিশেষজ্ঞ দেখাতে গেছেন। তিনিও ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকার টেস্ট করিয়েছেন। পাশের আরেক বিশেষায়িত হাসপাতাল মেডিকায় গিয়ে পাওয়া গেল রাউজানের সমির চৌধুরীকে। তিনি হার্টের ডাক্তার দেখাতে এসেছেন। পাশের হাসপাতাল এএমআরআইতেও দেখা গেল ফটিকছড়ির কাজল চৗধুরীকে। তিনি অর্থোপেডিকস বিশেষজ্ঞের কাছে এসেছেন।
এ তিন বিশেষায়িত হাসপাতালে দেখা গেল বাংলাদেশি রোগীদের ভিড়। প্রতিটি বিভাগেই বাংলাদেশি রোগী। তবে হৃদরোগ বিভাগেই সবচেয়ে বেশি।
শুধু এ তিন হাসপাতাল নয়, কলকাতার সবগুলো বেসরকারি হাসপাতালেই বাংলাদেশি রোগীদের আধিক্য। তবে অনেকে প্রতারণার শিকার ও দালালদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এক তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন তিন হাজারের অধিক লোক যান ভারতে। আকাশ পথ ও বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়েই তারা ভারতে প্রবেশ করেন। প্রতি মাসে এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ভারতে যান। তাদের প্রায় সকলেই মেডিকেল ও ভ্রমণ ভিসা নিয়ে সেদেশে যান। নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসা করাতে গেলে মেডিকের ভিসা নিয়েই যেতে হয়। তবে কিছুদিন আগে ভারত সরকার সে নিয়ম কিছুটা শিথিল করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো অপারেশন বা জটিল রোগী না হলে ভ্রমণ ভিসা নিয়েও চিকিৎসা করানো যাবে।
সূত্র জানায়, মেডিকেল ভিসা নিয়ে যান অল্প সংখ্যক লোক। বেশিরভাগই ভ্রমণ ভিসা নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করান। কলকাতা ছাড়াও ব্যাঙ্গালোর, চেন্নাই, দিল্লীতেও চিকিৎসা করাতে যান অনেকে।
কলকাতায় ৩০টিরও বেশি বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। এর মধ্যে মুকুন্দুপুর এনএইচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাসপাতাল (আরএন ঠাগুর), মেডিকা হাসপাতাল, আরএমআই, কোটারি হাসপাতাল, ঈগলস হাসপাতাল, উডল্যান্ড হাসপাতাল, এপোলো হাসপাতাল, রুবি হাসপাতাল, মল্লিক বাজার নিউরো ইনস্টিটিউট ও কলকাতা হাসপাতাল অন্যতম।
গত কয়দিনে এসব হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি হাসপাতালেই অসংখ্য রোগী। এদের অর্ধেকই বাংলাদেশি। হাসপাতালগুলোতে তাদেরই ভিড় বেশি। ভ্রমণ ভিসায় গেলেও মূলত চিকিৎসাই মূল লক্ষ্য।
হৃদরোগ, ক্যান্সার, নিউরো, অর্থোপেডিকস, গ্যাস্ট্রো, স্ত্রী রোগসহ নানাবিধ সমস্যা নিয়ে যান লোকজন।
তবে চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রতারণার শিকারও হচ্ছেন অনেকে। দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব খোয়াচ্ছেন অনেকে।
অনেকে অভিযোগ করেছেন, অহেতুক টেস্ট দেয়া হয়। যা প্রয়োজন নয়, তাও করতে বলা হয়। ১০ থেকে ৩০ বা ৪০ হাজার টাকার টেস্টও করাতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো হাসপাতালে অতিরিক্ত দামও নেয়া হয় টেস্টের। বাইরের ডায়ানস্টিক সেন্টারগুলো থেকে বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে দিগুণ-তিনগুণ বেশি টাকা আদায় করা হয়। তাই চিকিৎসা করতে গিয়ে টেস্টেই লাখ লাখ টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে রোগীদের।
হাসপাতালের ঢোকার পথে দালালরা অপেক্ষা করতে থাকে। রোগী বা স্বজনরা গেলেই তাদের সাথে ভাব জমাতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে অমুক হাসপাতাল ভাল, খরচ কম, তমুক ডাক্তার ভাল-ইত্যাদি বলে তাদের নির্দিষ্ট হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। অনেকে তাদের কথায় বিশ্বাস করে টাকা পয়সা খোয়ায়। ভালো হাসপাতালে নেয়ার কথা বলে অখ্যাত কোনো ক্লিনিকে নিয়ে যান। এভাবে প্রতারিত হয়ে চিকিৎসা না করেই ফিরে আসেন অনেকে।
সূত্র জানায়, হাসপাতালের আশপাশের বাসা-হোটেল ভাড়াও অতিরিক্ত আদায় করা হয়। সব মিলিয়ে বিপাকে পড়ে যান বাংলাদেশ থেকে যাওয়া রোগী ও তাদের স্বজনরা।
চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের ডা. রতন কান্তি সাহা বলেন, আমাদের দেশে উন্নত চিকিৎসা রয়েছে। জটিল রোগীও ভাল হচ্ছে। সব রোগেরই উন্নত চিকিৎসা হচ্ছে। অহেতুক লক্ষ লক্ষ টাকা বিদেশে গিয়ে খরচ করা হচ্ছে।