কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারে না

12

রাজধানী ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য শহরের কোথাও কোন নিরাপত্তা নেই যেন। মার্কেট, বাজার, খাবারের দোকান কিংবা বাসা-বাড়ি। মনুষ্য সৃষ্ট সংকট আর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীন কর্মকান্ডে হঠাৎ আগুন লেগে সবকিছু ছায় হয়ে যাচ্ছে। মাল আর প্রাণ দুটিই ছায় হয়ে উড়ে যায় বাতাসে। আর বাতাসে ভাসে পোড়া লাশের গন্ধ! সর্বশেষ তদন্ত কমিটি আর প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুণতে গুনতেই এক অধ্যায়ের শেষ হয়, শুরু হয় আরেক অধ্যায়। পুরান ঢাকায় নিমতলী থেকে বেইলি রোডের ঘটনাগুলোর পরম্পরা একই সূত্রে গাঁথা। কিন্তু সুধরানোর যে ব্যবস্থা তা হয়ে উঠেনা কিংবা উদ্যোগ নেয়া হয়না। ফলে আগুনে পুড়ে কঙ্খাল হওয়ার বিকল্প আর কিছুই থাকেনা। নিমতলার কথা চকবাজার না হয় মগবাজার অথবা চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় মর্মান্তিক অগ্নিকান্ডে বহু মানুষের হতাহতের পর ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ, পুলিশ, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ঘটনার উৎসের কথা বলে মার্কেট কিংবা ঘর-বাড়ির মালিকের উপর দায় চাপিয়ে ছিটকে পড়েন। শতশত পরামর্শ এবং ভবিষ্যতের করণীয় নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা সরকার থেকে বলা হয়। বাস্তবে এর কোন প্রতিফলন দেখা যায় না। রাজধানী নিতলা ও চকবাজারের চুরিহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পর বলা হয়েছিল পুরান ঢাকা থেকে সকল রাসায়নিক গুদাম-কারখানা ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেয়া হবে। কিন্তু নেয়া হয়নি এখনও পর্যন্ত। ওই দুই ঘটনায় অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর শোক না কাটতেই বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে আগুনে বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুতে ফের চিরচেনা দৃশ্যপটই আমরা দেখতে পাচ্ছি। একদিকে বহু পরিবারের স্বজনদের বুক ফাটা আর্তনাদ, অন্যদিকে অগ্নিকান্ড প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর একে অপরের ওপর দায় চাপানোর প্রতিযোগিতা! পুড়ে যাওয়া মানুষগুলোর লাশের উপর দাঁড়িয়েই আমরা দেখব তদন্ত কমিটি গঠন, তবে প্রতিবেদন দৃশ্যমান হবেনা।
একজন কবির লেখা ‘অঙ্গার হওয়া মানুষ জানো না’ শীর্ষক মর্মস্পর্শী কবিতাটির কথা মনে পড়ে। রোমেন রায়হান নামক এ কবি লিখেছেন ‘অঙ্গার হওয়া মানুষ জানো না/ আমরা যে কথা জানি/ এসেছে মন্ত্রী, এসেছে মেয়র/ এসেছে মহান বাণী।/ বসন্ত বলে পাতার আড়ালে/ কোকিলের কুহু কুহু/ এসেছে মিডিয়া খবরের খোঁজে/ সাথে কিছু আহা, উঁহু।/ মর্গে, স্বর্গে যেখানেই থাকো/ খুশি হবে তুমি জেনে/ তোমার মৃত্যু নিছক সংখ্যা/ সকলে নিয়েছি মেনে…।’
এ কয়টি লাইন আজকের বাস্তবতা। পড়ে সত্যিই মনে হচ্ছে এসব মৃত্যুর মিছিল কেবলই একটি ‘সংখ্যা’ মাত্র। নইলে বেইলি রোডে দুর্ঘটনা কবলিত ভবনটির সিড়ি ব্লক করে সেখানে সিলিন্ডার রাখার মতো মৃত্যুরফাঁদ দেখার মতো কি কেউ ছিল না? প্রতিটি দুর্ঘটনার পর যেসব কারণ আমরা জানতে পারি, দূর্ঘটনার পূর্বে সেসবের প্রতিকার করার কি কোন কর্তৃপক্ষ নেই? এ সংক্রান্ত আইনের প্রয়োগ করার জন্য সংশ্লিষ্টরা সব সময়েই কি ঘুমিয়ে থাকেন? তাদের সেই ‘জেগে ঘুমিয়ে থাকা’ ঘুম কবে ভাঙবে, তা আমরা জানি না। কিন্তু প্রতিটি ঘটনার মত বেইলি রোডের মর্মান্তিক এই অগ্নিকাÐের পর আবারও প্রবলভাবে একটি কথা ভেতর থেকে উচ্চারিত হচ্ছে-এই ভাবে আর চলতে পারে না, চলতে দেওয়া উচিত নয়।
উল্লেখ্য যে, গত এক দশকে অসংখ্য অগ্নি দুর্ঘটনা আমরা দেখেছি । ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে সারাদেশে দেড় লাখ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় একহাজার ৪৯০ জনের মৃত্যু এবং ৬ হাজার ৯৪১ জন দগ্ধ হয়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ২২ হাজার ২৮৩টি অগ্নিকান্ডে ২ হাজার ১৩৮ জনের মৃত্যুর তথ্য জানা যাচ্ছে। গেল ৫ বছরের অগ্নি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যাও কম নয়। এ অগ্নি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো বছরজুড়ে কি পদক্ষেপ গ্রহণ করে তা আমরা জানি না। কিন্তু কোন দুর্ঘটনা সংঘটিত হলেই প্রত্যেককে আমরা সরব হতে দেখি। তারা পরস্পর পরস্পরকে দায় চাপাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বছরজুড়ে তদারকি ও আইন অমান্যে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার তৎপরতা দেখা যায় না। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সিটি কর্পোরেশনসমূহের কিছু সংখ্যক কর্মকর্তা কর্মচারিদের যোগসাজসে একটি সিন্ডিকেট নিয়ম-নীতির শৈথিল্য দেখানোর তৎপরতায় লিপ্ত থাকে। যাদের কারণে অুিগ্নদূর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। অগ্নিকান্ড প্রতিরোধে মাঝেমধ্যে কিছু মহড়ার আইওয়াশ আমরা দেখি যা নিতান্তই লোক দেখানো। বিপুল সংখ্যক ভবন অগ্নিকান্ডের ঝুঁকির মধ্যে রেখে এই আইওয়াশে আমরা যে তিমিরে ছিলাম সেই তিমিরেই রয়ে যাই। অনিয়ম এবং আইওয়াশ এ দুটি বন্ধ করা না গেলে আগামীতে আরও বড় অগ্নিকান্ড হয়ত দেবাসীকে দেখতে হবে। দেশের মানুষ ঘোষণা কিংবা আশ্বাস নয়, অগ্নিকান্ড প্রতিরোধে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ চায়। সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি অনুধাবন করে পদক্ষেপ নিবে-এমনটি প্রত্যাশা।