কর্ণফুলি অববাহিকার বন্যপ্রাণী

8

মুশফিক হোসাইন

[তৃতীয় কিস্তি ও শেষ পর্ব]
কর্ণফুলি অববাহিকা বলতে বোঝায়, বিস্তীর্ণ এক জনপথ ও অঞ্চল। এই নদী চলার পথে যে সকল এলাকা অতিক্রম করেছে ; তাকে বিভিন্নভাবে করেছে সমৃদ্ধ। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মানুষের পাশাপাশি বাস করে কীট-পতঙ্গ ও বন্যপ্রাণী। এখানে আরো আছে উদ্ভিদ ও লতাগুল্মের বৈচিত্র্যময় সমাহার। দেশের অন্য কোথাও এতো বৈচিত্র্যতা দেখা যায় না। সাগর নদী পাহাড় ও চির সবুজ বনভ‚মির নান্দনিক মেলবন্ধনে সমৃদ্ধ। অথচ আমাদের অবিমৃশ্যকারীতার কারণে বৈচিত্র্যময় এই সম্পদ ও ঐতিহ্য দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষের করাল গ্রাস থেকে কোন কিছুই বাদ যাচ্ছে না। ভবিষ্যত প্রজন্ম ও গবেষকদের কর্মস্পৃহাকে জাগ্রত করার লক্ষ্যে কর্ণফুলি অববাহিকার বন্যপ্রাণীর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া গেল। এ তালিকাকে একটি অপেশাদার চেক লিস্ট বলা যেতে পারে।
ইঁদুর : কর্ণফুলি অববাহিকায় যে সকল বন্যপ্রাণী বাস করে তাদের কেউ কেউ ছন্নছাড়াভাবে সংখ্যায় হাতে গোনা দু-চারটি। আবার কেউ কেউ লক্ষ কোটিতে। শেষের দলে আছে বিভিন্ন প্রজাতির ইঁদুর। এরা রডেনশিয়া বর্গের প্রাণী। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে এরা সবচেয়ে বড় পরিবার। বিশ্বের বন্যপ্রাণীদের মধ্যে এই পরিবার দখল করে আছে ৪০ শতাংশ। এই পরিবারেরর প্রাণীদের উপরে ও নিচের পাটিতে দু’টো করে ছেদন দাঁত থাকে। জীবনধারণের জন্য এদের সারাক্ষণ কাটাকুটিতে ব্যস্ত থাকতে হয়। এ অববাহিকায় ধারি ইঁদুর, কালো ইঁদুর ও নেংটি ইঁদুর বাস করে। নেংটি ইঁদুরকে চাটগাঁইরা ‘বাইট্টা অন্দুর’ বলে থাকে। কর্ণফুলি অববাহিকার পাহাড়ে, গ্রামে-গঞ্জে, শহরে, হাটে বাজারে এরা বাস করে। চট্টগ্রামে সমুদ্র বন্দর, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার কারণে প্রচুর শস্য গুদামের অবস্থান। এছাড়া পাইকারি আড়ত ও বাজারের জন্য বিখ্যাত। ফলে এ সকল এলাকায় ধারি ইঁদুর বেশি বাস করে। এরা শস্যদানা ভোজি ও ক্ষতিকর পোকা মাকড় খায়। শস্যক্ষেত ও বাড়িঘরের শস্যগোলার আশেপাশে কালো ইঁদুর বেশি বাস করে থাকে। কালো ইঁদুর মাঝারি গড়নের। শরীরের চেয়ে লেজ বড়। শস্যদানা, ফল ফলারি, গাছের কাÐ, বাঙের ছাড়া ও মেরুদন্ডী ও অমেরুদন্ডী প্রাণীও খেয়ে থাকে। বলা যায় এরা সর্বভুক। নেংটি ইঁদুর ছোটখাট হলেও দেখতে সুন্দর। ঘরবাড়ি, দোকান পাট, গুদামসহ সর্বত্রই এদের পদচারণা। ঘরের আসবাসপত্র, দলিল দস্তাবেজ খেলনা সবই কেটেকুটে নাস্তানাবুদ করে দেয়। এরা দৈর্ঘে দুই থেকে আড়াই ইঞ্চি লম্বা হয়ে থাকে। একসঙ্গে আট থেকে দশটি বাচ্চা প্রসব করে। সকল ইঁদুর বাদামি, কালচে বাদামি বা লালচে বাদামি রঙের হয়। উৎকণ্ঠার বিষয় প্রায় সকল ইঁদুর প্লেগসহ নানা রোগ বালাইয়ের বাহক। এদের সংখ্যা অপ্রতিরোধ্যভাবে বেড়েই চলেছে। স্তন্যপায়ী প্রাণী ছাড়াও কর্ণফুলি অববাহিকায় অস্তন্যপায়ী, উভচর ও পাখির ব্যাপকভাবে উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। নিম্নে উভচর বন্যপ্রাণীর নমুনা প্রদান করা হলো। উভচর প্রাণী জলে ও ডাঙ্গায় বাস করে। পাখি নিয়ে অন্যত্র বিস্তারিত লেখা হবে।
ব্যাঙ/ভেক : কর্ণফুলি অববাহিকার নদী নালা জলাশয় ছাড়াও বনবাদারে, পাহাড়ে এদের দেখা মেলে। অত্র এলাকায় বুনো ব্যাঙ, ভাউয়া ব্যাঙ (কোলা ব্যাঙ) গেছ ব্যাঙসহ বেশ কয়েক প্রজাতির ব্যাঙের দেখা মেলে। এরা শীতল রক্ত বিশিষ্ট মেরুদন্ডী প্রাণী। এদের ত্বকের মধ্যে আঁইশ লুকানো থাকে। এরা বেশির ভাগ জলাভূমির আশেপাশে থাকে। তবে এদের কেউ কেউ স্থলে ও বৃক্ষে অভিযোজিত করে নিয়েছে। স্থলে বা বৃক্ষে বাস করলেও প্রজনন ও সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য এদের জীবনচক্রে পানি অপরিহার্য। সাধারণত কীটপতঙ্গ অমেরুদন্ডী প্রাণী খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে। ফসলের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে শস্যের উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে রখে। ব্যাঙ প্রজাতির সবচেয়ে বড় সোনা ব্যাঙের দেখাও মেলে। ব্যাঙ মানুষের খাদ্য তালিকায় স্থান পাওয়া এবং কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের কারণে বিলুপ্তির পথে। রপ্তানির জন্য কোথাও কোথাও ব্যাঙের চাষ হয়ে থাকে। ব্যাঙের জীবন কাল ৭ থেকে ১০ বছর। দৈর্ঘ্য প্রজাতি ভেদে ৫ থেকে ১৫ সে.মিটার। প্রজনন ঋতু বর্ষাকাল। জলাশয়ে ডিম ছেড়ে সংখ্যা বৃদ্ধি করে। ছত্রাকের আক্রমণেও ব্যাঙ মারা পড়ে। পাহাড়ি উপজাতি ও বাঙালিদের কেউ কেউ ব্যাঙ খেয়ে থাকে। ব্যাঙ মানুষের উপকার করে থাকে নানা ভাবে। এরা ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে যেমন উপকার করে তেমনি মাংস সরবরাহ করে পুষ্টির যোগান দেয়। বিজ্ঞান গবেষণা ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষার ক্ষেত্রে এরা অদ্বিতীয়।
কাছির/কচ্ছপ/কাইট্টা : কর্ণফুলি অববাহিকার পাহাড়ে, নদী খাল বিল জলাশয় ও পুকুরে কচ্ছপ দেখা যায়। এমন কী বায়জিদ বোস্তামীর মাজারসংলগ্ন পুকুরে বিশেষ প্রজাতির কচ্ছপ আছে শতবর্ষ ধরে। আবার পতেঙ্গসহ সমূদ্র মোহনা ও উপক‚ল দেখা মেলে সামুদ্রিক কচ্ছপ। কিলোনিয়া বর্গের সকল সদস্যদের কাছির বলা হয়ে থাকে। এদের দেহ গোলাকার এবং শক্ত। শক্ত খোলের ভেতর সমস্ত অঙ্গ-পতঙ্গ লুকিয়ে রাখে। দেহের উপরিভাগ উত্তলের মতো কৃত্তিকাবর্ণ এবং নিচের দিকের অংশ চ্যাপ্টা বক্ষস্ত্রাণ। পেছনে ছোট লেজ, সামনে গলা ও মাথা। যা তারা প্রয়োজন মতো বের ও সংকোচন করতে পারে। এদের চোয়ালে দাঁত নেই তবে চোয়ালগুলি এমনভাবে ঢেউ খেলানো। যা খাবার বা কিছু ধরে রাখার মতো শক্ত ও সামর্থ। এদের আঙ্গুল নখরযুক্ত। কাছিম অতিরিক্ত দূষিত পদার্থ রক্তে ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে। কাছিম শত শত বছর বাঁচার তথ্য আছে। কাছিম ও খরখোসের দৌড় নামে ঈশপের একটি বিখ্যাত গল্প আছে। এতে প্রমাণিত হয় কাছিম অতিশয় ধৈর্য্যশীল প্রাণী। বিভিন্ন উপজাতি, হিন্দু বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকেরা কাছিমের মাংস খেয়ে থাকে। সে কারণে দেশের চাহিদা এবং ভারতে পাচারের জন্য প্রচুর কাছিম মারা পড়ে। এ সকল চাহিদা পূরণ হয় দেশের বন্যপ্রাণীর উৎস থেকে। পাহাড়ের হলদে কাইট্টা কাছিম এবং বায়জিদ বোস্তামীর কাছিম পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না বলে প্রকাশ। এই কাছিম আমাদের অমূল্য সম্পদ। কাছিম পোকামাকড়, কাঁকড়া, মাছ ইত্যাদি খেয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে কাছিম বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে। এদের ওজন গড়ে ২ কেজি থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। বংশ বৃদ্ধির জন্য কাছিম ডিম পাড়ে। ডিম ২০ থেকে শতাধিক। তারা বালুচরে, ঘরের ভেতর ডিম পেড়ে দেয়। প্রাকৃতিকভাবে ডিম ফোটে। ছানা লালন পালনে এদের ভ‚মিকা কম।
টিকটিকি : মানুষের ঘর-দোরে যেমন বাস করে আবার গাছ-গাছালি বন-বাদাড়েও এদের দেখা মেলে। টিকটিকির চারটি পা আছে। এদের মুখ খানিকটা সরু। উভয় চোয়ালে দাঁত থাকে। টিকটিক শব্দ করে ডাকে বলে এদের নাম টিকটিকি। এদের বেশকিছু প্রজাতি আছে। এদের চামড়া নরম, তবে পিঠে দানাদার আঁইশ থাকে। জিহŸা প্রসারণশীল, মোটা ও খাটো। চোখের পাতা সংকোচন ও সম্প্রসারণশীল নয়। এদের লেজ খসে গেলেও পুনঃগজায়। সকল প্রজাতির আঙ্গুলের গোড়া প্রশস্ত, সোজা এবং নখরযুক্ত। আঙ্গুলের পাত দ্বিখন্ডিত। সব টিকিটিকি বছরে একজোড়া ডিম পাড়ে। ডিমের যত্ন নেবার কেউ থাকে না। ভ্রুন আপনা আপনি বেড়ে উঠে। দৈর্ঘে ৮ সে.মিটার চোখ ও ঊর্ধ্ব গ্রীবার মধ্যবর্তী স্থানে কাল দাগ থাকে। গায়ের রঙ খয়েরি, লালচে, বাদামি হলেও সবুজ দাগ থাকে। দেহের নি¤œ ভাগ হলদে। এরা প্রায় ৩ থেকে ৫ বছর বাঁচে। এরা বিষাক্ত নয়, শান্ত স্বভাবের। তবে বিপদ দেখলে কামড়ায়। স্ত্রী-পুরুষের পৃথক যৌনাঙ্গ থাকে। টিকটিকি নিয়ে অনেক মিথ আছে, বাস্তবে তা সত্য নয়। তারপরও অনেকেই টিকটিকি দেখলে ভয়ে আঁতকে উঠে।
তক্ষক : তক্ষককে অনেকে পান্ডা নামে ডাকে। বনজি নানা ওষদের জন্য তক্ষক বা পান্ডার তেল পথে ঘাটে বিক্রি হতে দেখা যায়। এদের ডাক থেকেই তক্ষক নামের উৎস। চাটগাঁইয়ারা বলে টোংতাং। ঘরে-দোরে, বনে-বাদাড়ে, গাছে এদের বাস। নিভৃত ও নির্জন আলো আধারি পরিবেশ এদের পছন্দ। একই ফোকরে ও গর্তে বছরের পর বছর এক দম্পতি বাস করে। দিনের আলোতে গর্তের মুখে এসে মাথা বের করে ডেঁকে উঠে। খুব অল্প লোক জীবিত তক্ষক দেখেছেন। কিন্তু ডাক শুনেছে হাজার মানুষ। অন্ধকারের জন্য স্ত্রী পুরুষ যোগাযোগের জন্য ডাকের ব্যবহার অপরিহার্য। দ্বিতীয়: বাসস্থান দখলে রাখা বা টেরিটরি দখলে রাখার জন্য ও ডাকে। দেহ ১৭০ মিলিমিটার লেজ ১৭০ মিলিমিটার। মাথা পেট আঙ্গুল মোটা। মাথার উপর বহু আকৃতির আঁইশ, পিঠে সাজানো আঁইশ থাকে। কীট-পতঙ্গ, ছোট ইঁদুর, পাখির ছানা, সাপ ইত্যাদি খেয়ে থাকে। এদের দাঁত শক্ত, কোন কিছু শক্তভাবে কামড়ে ধরে থাকে। সাধারণত: নিশাচর। প্রজনন কাল ৪ থেকে ৫ মাস। এশিয়ার দেশগুলোতে বনাজি, আয়ুর্বেদ ও আধুনিক চিকিৎসায় এদের ব্যবহার আছে। কর্ণফুলি অববাহিকার শহরে গ্রামে বনে বাদাড়ে এরা বাস করে। বিদেশে পাচারের কারণে এরা বিপদের মুখোমুখি।
রক্তচোষা : রক্তচোষাকে চাটগাঁইয়ারা বলেন নৌ-পিয়নি। কেউ কেউ কাকলাসও বলেন। কর্ণফুলী অববাহিকার পাহাড়ে, পাড়া গাঁয়ের ঝোঁপঝাড়ে এদের দেখা মেলে। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস এরা মানুষের রক্ত চুষে নেয়। ইংরেজিতে ও এর নাম ইষড়ড়ফ ঝঁপশবৎ মূলত: আত্মরক্ষা বা প্রতিরক্ষার কারণে এরা দেহের রঙ পরিবর্তনকরে থাকে। টিকটিকির মতো দেখতে হলে আকারে লম্বা। এদের পিটের পাখনাগুলোতে কাঁটা থাকে। প্রতি পায়ে পাঁচটি করে আঙ্গুল থাখে। কানের পর্দায় কোন আঁইশ থাকে না। দেহ খসখসে। ত্বকের কিছু অংশ অন্যটির উপর উঠে গিয়ে ঢাকা। আইশগুলো নির্দিষ্ট মাপে ঢাকা ও রীতিতে সাজানো। এরা অতিনিরীহ প্রাণী। সরীসৃপ গোত্রের। এদের রঙ বাদামী। পিঠের কাটা বেশ বড় বড়। দেহ ১০০ মিলি মিটার, লেজ ৩০০ মিলি মিটার। এরা দিনের বেলা চলাফেরা করতে পছন্দ করে। প্রজনন কাল এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর। প্রজননের পর স্ত্রী নরম মাটিতে কয়েক সেন্টিমিটার গর্ত করে ৬ থেকে ২০টি ডিম পারে। সাদা, লম্বাটে ও নরম খোসার ডিমগুলো ছয়-সাত সপ্তাতে ফোটে। প্রজনন মৌসুমে পুরুষ গিরগিটির পা দুটোসহ মাথা থেকে বুক পর্যন্ত কমলা-লাল রঙ ধারন করে। প্রজনন পরবর্তী দেহের রঙ কালচে বা কালচে ধুসর। অনেক সময় স্ত্রীর দখল নিয়ে পুরুষ গিরগিটি মারামারি করে থাকে। এরা প্রধানত: কীটপতঙ্গ ভোজী হলেও ডিম ছোট কাঁকড়া, ব্যাঙ্গাছি ও ছোট মেরুদÐী প্রাণীতে অরুচি নেই। বন ও ঝোঁপঝাড় বিলুপ্ত হওয়ার কারণে এরা হুমকির মুখে। অথচ এরা অপকারী কীটপতঙ্গ খেয়ে মানুষের উপকার করে থাকে।
অঞ্জন/আচিলা : কর্ণফুলি অববাহিকার লোকজন একে আচিলা বলে ডাকে। সিন সিডি গোত্রের চারটি গণের অধীনে মোট আটটি প্রজাতি দেশে দেখা যায়। এতদঞ্চলে সকলেই বসবাস করে। পাহাড় টিলা, ঝোঁপঝাড় গ্রাম গঞ্জ এমন কি শহরের বাগান এলাকায়, স্যাঁত সেতে ও আদ্র পরিবেশে এদের দেকা মেলে। এদের দেহে চকচকে আঁইশ থাকে। দূর থেকে দেখলে মসৃণ মনে হয়। হালকা আলো এদের শরীর চিকচিক করে। পা অপেক্ষাকৃত ছোট। হালকা আলো এদের শরীর চিকচিক করে। পা অপেক্ষাকৃত ছোট। সকল …জিহবা সংকোচনশীল ও সম্প্রসারণশীল। এদের দেহ মাথা থেকে পায়ুর দৈর্ঘ্য ৭ সেন্টি মিটার। এদের লম্বা লেজ থাকে। লেজের মাথা ভোঁতা, দেহের দৈর্ঘ্যরে দ্বিগুণ। দেহ নলাকার, রঙ বাদামি, তামাটে এবং কালচে মিশ্রণ। এরা পতঙ্গভোজী, কীটপতঙ্গ খেয়ে মানুষের উপকার করে। এরা নির্বিষ, মানুষকে পারতপক্ষে কামড় দেয় না। অতি শান্ত ও নিরীহ প্রাণী। কিন্তু সাধারণ মানুষ এদের চকচকে শরীর দেখে ভয় পায়। সাপ দেখলে মানুষ যেভাবে মারতে উদ্যত হয় তেমনি এদের ক্ষেত্রেও। বনবনানী কমে যাওয়ার কারণে এবং কীটনাশকের অতিমাত্রায় ব্যবহারের কারণে এরা হুমকির মুখে। এদের প্রজনন কাল এপ্রিল থেকে জুন। গর্তে এরা ডিম পাড়ে।
গুইসাপ : কর্ণফুলি অববাহিকায় তিনটি প্রজাতির দেখা মেলে। তবে বেশি দেখা মেলে কালো গুই ও সোনা গুই। মোহন এবং উপকূলীয় অঞ্চলে বড় গুই দেখা যায়। গুইসাপ দেশের অর্থকরী সম্পদ। এদের চামড়া বিদেশে রপ্তানি হয়। এটাই ওদের নির্মূল হওয়ার কারণ। দেশে বনবনানী কমে আসায় এদের আবাস ভূমি ও খাদ্য এবং প্রজনন সীমিত হয়ে আসছে দিনের পরদিন। বাণিজ্যিকভাবে চাষের উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। এদের চামড়া থেকে নানাবিধ সৌখিন জিনিস প্রস্তুত হয়ে থাকে। এরা মাংশাসী। এরা ফসলের মাঠের পোকা, ইঁদুর, সাপ ডিম খেয়ে মানুষের উপকার করে থাকে। গুই এক ধরনের গিরগিটি। এদের জিহবা লম্বা, সরু এবং অগ্রভাগ দ্বিখন্ডিত। সাপের মতো সংকোচনশীল। জিহবা সাপের মতো মুখের অগ্রভাগে লিকিলিক করে। শরীর দানাদার ও গোলাকার আঁইশ দ্বারা আবৃত। লম্বা লেজ। বিপদ দেখলে আক্রমণকারীকে লেজ দিয়ে আঘাত করে। দাঁত পিছনের দিকে বাঁকানো। জিহবা রাসায়নিক দ্রব্যে সংবেদনশীল। তবে এরা নির্বিষ। স্বভাব সাপের মতো। তুন্ড থেকে পায়ুর দৈর্ঘ্য ১.৮ থেকে তিন মিটার। দেহ জলপাই, সবুজ রঙের এবং সজ্জা হলুদ রঙের। তাতে কালো রঙের ফোটা থাকে। তুন্ড সুঁচালো। গ্রীবা লম্বা, লেজ চাপ্টা। এরা দিনের বেলা সক্রিয় থাকে। জীবন্ত পোকা, সাপ, মাছ ও খেতে পছন্দ করে থাকে। এদের প্রজননকাল জুন থেকে সেপ্টেম্বর। এরা ৮ থেকে ২০ টি ডিম পাড়ে। কর্ণফুলি অববাহিকার পাহাড়ে, গ্রামে শহরের ঝোঁপেঝাড়ে এরা এখনও বেঁচে আছে। তবে যেভাবে নগরায়ন হচ্ছে, বনবনানী ধ্বংস হচ্ছে, পাহাড়, নদী দখল হচ্ছে অচিরেই এরা সংকটাপন্ন প্রাণী হিসাবে বিবেচিত হবে। কারণ মানুষ এদের ভয় করে না। মারতে পারলে চামড়া বিক্রি করে অর্থ লাভ হবে।
সাপ : কর্ণফুলি অববাহিকার গ্রামে গঞ্জে পাহাড়ে বন-বনানী, নদী খাল বিল জলাশয় এমন কী সমুদ্রেও নানা প্রজাতির সাপ বাস করে। এদের পা না থাকার কারণে বুকে ভর করে এঁকে বেঁকে চলে। মূলত এরা নিশাচর। এদের কারো কারো বিষ আছে আবার কেউ কেউ নির্বিষ। সাপের বিষ প্রাণঘাতী। তবে নির্বিষ সাপের সংখ্যা বেশি। তারপরও মানুষ সাপ দেখলে ভয় পায়। সাপের গায়ে আঁইশ থাকে। সাপ খোলস বদলায় সাপ জলে স্থলে যেমন চলতে পারে তেমনি গাছ ও বাইতে সক্ষম। সাপের মুখের অগ্রভাগে দুটো দাঁত থাকে। এই দাঁতের মধ্যেই বিষ থলি থেকে বিষ ঢেলে দেয়। সাপ দ্রুত বেগে চুটতে পারে। সাপ সাধারণত: কাউকে আক্রমণ করে না। মুখোমুখি হলে বা আঘাত পেলে নিজে বাঁচার জন্য আক্রমণ করে। ফনা তুলে ছোবল দিতে পরাঙ্গম। সাপ শীতল রক্ত বিশিষ্ট মেরুদন্ডী প্রাণী। বর্ষাকালে সাপ প্রজনন করে। তারা ১০ থেকে অধিক সংখ্যক ডিম পাড়ে। ডিম পেড়ে বালি, পাতা, খড় দিয়ে লুকিয়ে রাখে। পাখির মতো ডিমে তা দেয় না। ডিম প্রাকৃতিক নিয়মে ফোটে। সাপ বাচ্চা পালনে খুব কম সময় ব্যয় করে। এরা প্রাণীজাত খাদ্য বেশি পছন্দ করে। কর্ণফুলি অববাহিকায় যে সকল সাপ বেশি দেখা মেলে তারা হলো, বিভিন্ন প্রজাতির ধোরা সাপ, দারাজ, লাউডগা, বেত আচড়া, সবুজ বোড়া, শঙ্খিনি, গোখরা, পদ্মগোখরা পাহাড়ি বিবিধ সাপ, কালাচ/কেউটে প্রবাল সাপ/কোরাল ¯েœক, অজগর ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। দু-মুখো সাপ বলে একটি সাপের কথা প্রচলিত থাকলে এরা একধরনের কেঁচো। এক তথ্যে জানা যায় বাংলাদেশে বছরে প্রায় এক লাখ মানুষকে সাপে কাঁটে। তারমধ্যে মারা যায় প্রায় ছয় হাজার। কর্ণফুলি অববাহিকায় বছরে ৫০০ থেকে ৭০০ মানুষকে সাপে কাঁটলেও মৃত্যুর সংখ্যা খুবই নগন্য। কর্ণফুলি অববাহিকার প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে এতদঞ্চলে প্রচুর সাপের দেখা মেলে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে সাপের বিষ সংগ্রহের জন্য একটি সাপ পালনও প্রজনন কেন্দ্র আছে। কর্ণফুলি অববাহিকায় অসংখ্যা বন্যপ্রাণী বাস করে। তাদের বিবরণ দিতে গেলে রীতিমতো গবেষণাপত্র সম্পাদন করতে হবে। বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে সরীসৃত ও পাখি প্রজাতি একটি বৃহৎ অংশ জুড়ে আছে। বাংলাদেশে যতপাখি দেখা যায় তার বৃহত্তম অংশ কর্ণফুলি অববাহিকায় দেখা মেলে। এছাড়াও এতদঞ্চলের ভূমি ও প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে অসংখ্য কীটপতঙ্গের ও দেখা মেলে। বক্ষমান প্রবন্ধে উৎসাহী পাঠকের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য সংক্ষিপ্তভাবে বন্যপ্রাণীরা তালিকা ও ক্ষুদ্রপরিসরে বিবরণ দেয়া হলো। এর বাইরে আরো শত সহস্র নয় লক্ষ কোন প্রাণী আছে যাদের বিবরণ দেয়া গেল না। এখানে যাদের আকৃতি বড় এবং যাদের সাধারণভাবে দৃশ্যগোচর হয় তাদের প্রাধান্য দেয়া হলো। ভবিষ্যতে গবেষকদের জন্য তা তুলে রাখা হলো;
তথ্যসূত্র :
১. বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী (প্রথমখন্ড)। ড. মো: আলী রেজা খান। প্রকাশক বাংলা একাডেমী, প্রথম প্রকাশ, জানুয়ারি ১৯৮৭ খ্রি. ২. প্রাগুড়, তৃতীয় খÐ, প্রথম প্রকাশ, মার্চ ১৯৯৬ খ্রি. ৩. বন্যপ্রাণী পরিচিতি, সম্পাদনায়; মুহাম্মদ সাঈদ আলী, ওয়াইল্ড লাইফ ম্যানেজমেন্ট ও নেচার কনজারভেশন ডিভিশন, হবিগঞ্জ। প্রথম প্রকাশ ২০১৫ খ্রি. ৪. খসরু চৌধুরী, প্রথম আলো, ০৪ অক্টোবর ২০১৮ খ্রি. ৫. ইন্টারনেট
লেখক : কবি ও ব্যাংক নির্বাহী (অব.) এবং গবেষক