করোনা সচেতনতায় দেশের বিশিষ্ট ধর্মীয় ব্যক্তিদের দায়িত্ব পালন করা জরুরি

15

রতন কুমার তুরী

দেশের এমন সঙ্কটকালীন সময়ে করোনা সচেতনতায় সব ধর্মের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার মাধ্যমে সমাজে অনুদান রাখার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। পৃথিবীব্যাপী লাগামহীনভাবে সংক্রমণ ঘটিয়ে চলা করোনা ভাইরাসটি ইতিমধ্যে ২০২ টি দেশের অর্ধলক্ষাধিক মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। এই মুহূর্তে উক্ত দেশ সমূহে প্রায় ১১ লাখেরও বেশি মানুষ এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে আছে, এরপরও প্রায় প্রতিদিনই এর সংক্রমণের হার বেড়ে চলেছে তার সাথে সাথে বেড়ে চলেছে মৃত্যুর পরিসংখ্যান।
ইউরোপ এবং আমেরিকা মহাদেশের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে এই ভাইরাসটি ইতিমধ্যে ভুতরে নগরীতে পরিণত করেছে। তাদের উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতিও ইতিমধ্যে এই ভাইরাসটির কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে। অতঃপর তারাও এই ভাইরাসকে রুখতে মানুষকে কিছু স্বাস্থ্যবিধি পালন ও ঘরে আবদ্ধ থেকে সব কাজকর্ম করার জন্য এক প্রকার বাধ্য করছে। আমাদের দেশেও করোনা ভাইরাসটি তার ছোবল বসিয়েছে। ইতিমধ্যে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৮ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে, প্রায় ৭০ জনের মত মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আছে। অবশ্যই এর মধ্যে বেশকিছু মানুষ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। দৃশ্যতঃ এই সংক্রমণ দিনদিন বাড়ছে বলে প্রতীয়মান হওয়ায় সরকার, সচেতন মানুষ, বিভিন্ন মিডিয়া আমাদের জনগণদের করোনা থেকে বাঁচাতে বিভিন্ন বিষয়ে রাতদিন সচেতন করে চলেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এতো প্রচার এত হাঁকডাকের পরও এদেশের অনেক মানুষই এসমস্ত সাবধানবাণীকে পাত্তা দিচ্ছেননা তারা নিত্যদিনই বাইরে বেরুচ্ছে, আড্ডা দিচ্ছে। কোনো ধরনের সুরক্ষা ছাড়াই ব্যবসা করছে।
আইন শৃঙ্খলা বাহিনির চোখে ফাঁকি দিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিষয়গুলো শহরের চাইতে গ্রামীণ জনপদে বেশিই চোখে পড়ছে। মূলতঃ আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করে বিধায় করোনা সচেতনতায় তাদের সর্বাধিক অংশগ্রহণ ছাড়া এই মহামারী ঠেকানো বেশ কষ্টকর হবে। তাছাড়া আইন শৃঙ্খলা বাহিনী একেবারে দিনে রাতে তাদের পাহাড়া দিয়ে সতর্ক করা কিংবা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য করানো এক প্রকার দুঃসাধ্যই বলা যায়, কারণ এতো বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমাদের নেই। তবে সচেতনতার দায়িত্বে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সফলতা আসবে যেমন, বাংলাদেশে অসংখ্য মসজিদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিশিষ্ট ধর্মীয় ব্যক্তিদের করোনা বিষয়ে সাধারণ মানুষদের বোঝানোর জন্য দায়িত্ব দিতে হবে। একমাত্র তারা সাধারণ জনগণকে বোঝালেই কেনো এই মুহূর্তে ঘরে বসে ধর্মীয় আচার আচরণগুলো কিংবা অবশ্যই করণীয়গুলো সম্পাদন করতে হবে তাহলে তারা সহজেই তা মেনে নেবে। বিষয়টি যেহেতু ধর্মীয় সেহেতু সমাজের এসব বিশিষ্ট ধর্মীয় ব্যক্তিরা তাদের ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হলে ভালো ফল দেবে।
আমরা দেশের এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ধর্মের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের তাদের নিজ নিজ অবস্থানে থেকে জনগণকে করোনা ভাইরাস বিষয়ে সতর্ক করা এবং ক্ষেত্র বিশেষ এ ধর্মীয় পালনীয় বিষয়গুলো কীভাবে এসময়ে সমাগম ছাড়া পালন করা যায় তা জনগণকে বুঝিয়ে বলা যায় সে বিষয়ে খুব দ্রæতই সরকারকে চিন্তাভাবনা করার জন্য অনুরোধ করছি। আমাদের সবার মাথায় রাখা দরকার যে বাংলাদেশ একটি ধর্মীয় স¤প্রীতির দেশ এখানে সব মানুষেই ধর্মচর্চা এবং তা আবশ্যকীয়ভাবে পালনও করে, ফলে এমন পরিস্থিতিতে ধর্মীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাজে লাগাতে পারলে সবচেয়ে বেশি ফলাফল পাওয়া যাবে। তাছাড়া পুরো বাংলাদেশে আড়াই লাখেরও অধিক মসজিদ রয়েছে এসব মসজিদে আড়াই লাখ ইমাম কাজ করে তারা সবাই সমাজের মানুষের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র এই আড়াই লাখ ইমামকে যদি করোনা সচেতনতায় কাজে লাগানো যায় তাহলে আমার মনে হয় দেশের ধর্মভিরু মানুষরা এদের দ্বারা উপকৃত হবে। প্রকৃতপক্ষে কোনো দেশে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সে দেশের আত্মসামাজিক অবস্থার কথা মাথায় রাখতে হয়। আমাদের দেশে যেহেতু প্রায় ৯৫% মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে মর্যাদা দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যেতে হবে। এসব ধর্মীয় ক্ষেত্রে কিছু গোঁড়াপন্থি সবসময় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সে জন্য কাজ ফেলে রাখা যাবেনা। তাদেরকে যেভাবে হোক বুঝিয়ে শুনিয়ে ধর্মের মৌলিক বিষয়ে এক হতে হবে। এমন দুর্যোগপূর্ণ সময়েও যে ঘরের ভেতর অবস্থান করে ধর্মের সব করণীয় পালন করা যায় তা তাদের বোঝাতে পারলেই তাদের সাথে সাথে আরো অনেকেই তা পালন করবে ফলে সমাজে কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলা করা সহজ হবে। আমাদের সবাইকে বোঝতে হবে করোনা ভাইরাস এখন কোনো একটি দেশের সমস্যা নয় এটি পুরো পৃথিবীর সমস্যা হওয়ায় এটি বৈশ্বিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে, ফলে সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এসমস্যা থেকে উত্তরণ অনেকটাই দুঃসাধ্য। তাই এই মুহূর্তে সকল ধর্মের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উচিত ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে করোনা ভাইরাস বিষয়ে সমাজের সকল মানুষকে বোঝানো এবং করোনা বিষয়ে কোনো রকম ধর্মীয় গোঁড়ামী প্রশ্রয় না দিয়ে জনগণকে বাঁচাতে সাহায্য করা।

লেখক : কলেজ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক