করোনা বদলে দিয়েছে জীবনধারা

17

মানুষের চলার পথ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে করোনাভাইরাস। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পেয়েছে বলেই এই ভাইরাসের কাছে আজ অসহায় মানবক‚ল। উপেক্ষা করে চলারও উপায় নেই। প্রতিরোধ করার ক্ষমতা না থাকলে মৃত্যুকে করতে হবে আলিঙ্গন।
২০১৯ সালে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়ে একপর্যায়ে তা মহামারি আকারে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাস থেকে সৃষ্ট রোগের নামকরণ করে ‘কোভিড-১৯’। বাংলাদেশে প্রথম রোগী শনাক্তের ঘোষণা আসে ৮ মার্চ। দেশে এখন করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। আর আক্রান্ত হয়েছেন ৭ লাখেরও বেশি মানুষ।
সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি এবং জনবলের অভাবে সৃষ্ট দেশের স্বাস্থ্যখাতের দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। দেখিয়েছে স্বাস্থ্যখাতের প্রতিষ্ঠানগুলো জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় কতটা নাজুক।
গবেষকরা বলছেন, এই ভাইরাস সহজে নির্মূল হবে না। ভবিষ্যতে করোনার সঙ্গেই বসবাস করতে হবে আমাদের। এ অবস্থায় বারবার করোনার ধরন পরিবর্তন সৃষ্টি করেছে নতুন সমস্যার। দেশে পিসিআর পরীক্ষায় এই নতুন ধরন শনাক্ত হচ্ছে না।গ্লোবাল এলায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনে ইবোলা টিকা বিষয়ক কর্মসূচির সমন্বয়ক গার্ট ভ্যানডেন বোশে বলেছেন, ‘অধিক সংক্রমণযুক্ত বহু ভাইরাল ভ্যারিয়েন্টের উদ্ভব হচ্ছে। এরা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম। চলমান টিকাদান কর্মসূচিতে উচ্চমাত্রায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এড়িয়ে যাবে এসব ভ্যারিয়েন্ট। এ ঘটনায় নতুন ভ্যারিয়েন্টকে প্রতিরোধ করতে পারবে না বর্তমানের কোন টিকাই’।
করোনার প্রাদুর্ভাবের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের অর্থনীতিতে। এরই মধ্যে অন্তত ১৪টি খাতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমদানি-রফতানি সংকুচিত হওয়ায় কয়েকটি খাতে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে কাঁচামালের অভাবে দেশের বিভিন্ন শিল্প-কারখানার উৎপাদন সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একইভাবে কমে আসছে আমদানিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ। তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পোশাক খাতের অ্যাক্সেসরিজ, প্রসাধন, বৈদ্যুতিক পণ্য, পাট সুতা, মুদ্রণ শিল্প, চিকিৎসা সরঞ্জাম, চশমা, কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক পণ্য এবং প্লাস্টিক শিল্পখাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে করোনা মহামারিকালে যেখানে সাধারণ মানুষের আয় কমে গেছে, সেখানে দেশে নতুন করে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন। গত এক বছরে ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯০ হাজার। পক্ষান্তরে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ এর সমীক্ষা বলছে, করোনার কারণে আয় কমেছে শতকরা ৭২ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারের।
লকডাউনের কারণে অনেকে এখন পুরো সময়টা ব্যয় করছেন অনলাইনে। শিশুরাও ঘরবন্দি। দোকানপাট বন্ধ থাকায় অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা এগিয়ে যাচ্ছে দ্রæতগতিতে, অর্থনীতির একটা অংশ এখন অনলাইনের আয়ের পথ। তবে করোনা বারোটা বাজিয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থাপনার। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসতে না পারায় স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব শিক্ষার্থী সংকটে পড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় শুরু থেকেই চেষ্টা করছে শিক্ষার ধারা সচল রাখতে। কিছু বিকল্প সিদ্ধান্তও দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে- স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য টেলিভিশনে, রেডিওতে ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা ও শিক্ষার সর্বস্তরে ভার্চুয়াল ক্লাস নেওয়ার পদ্ধতি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এসব সুবিধা খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থীই গ্রহণ করতে পেরেছে। একটি গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীই ভার্চুয়াল মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের সুবিধা নিতে পারেনি। পরীক্ষা ছাড়াই জেএসসি ও এসএসসি এবং সমমানের পরীক্ষার গড় ফলের ভিত্তিতে এইচএসসির ফল মূল্যায়ন করা হয়েছে। এবার মোট ১৩ লাখ ৬৭ হাজার ৩৭৭ জন পরীক্ষার্থীর সবাই অটোপাস করেছেন।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, পরীক্ষামূলকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার একটি চেষ্টা করা যেতে পারে। আমাদের দেশের বাস্তবতায় এমন দীর্ঘমেয়াদি ছুটির বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে। পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীদের অনেকেই। নিম্ন আয়ের পরিবারের অনেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফেরার। ঝরে পড়ার শঙ্কা অনেক বেড়েছে। এ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন হবে। শহরের কিছু নামি-দামি কলেজ ছাড়া বেশিরভাগ কলেজ প্রশাসন এমনিতেই নড়বড়ে। স্বাভাবিক সময়েও অনেক কলেজে শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার খুব কম থাকে। কোভিডের সময় অনলাইন ক্লাসের পরিসংখ্যান সাধারণ কলেজগুলোতে নিম্নমুখী। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামনে সেশনজট প্রায় অবধারিত। হাজার হাজার বন্ধ হয়ে যাওয়া কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি স্কুলের অসংখ্য শিক্ষক বেতনের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভাড়া দিতে না পেরে কিছু স্কুল বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এই ঘাটতি মেটাতে সামনের নির্ধারিত ছুটি বাতিল করে অথবা কমিয়ে দিয়ে ক্লাসের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে। শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষার্থীদের আলাদা আলাদা দিনে ক্লাসে আসতে হবে। এক্ষেত্রে পরীক্ষা পদ্ধতিতেও কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। ক্লাস চালু রাখলে শিক্ষকদের জন্য আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হবে যৌক্তিক।
জ্যোৎস্না আগের মতোই তার সৌন্দর্য বিলিয়ে যাবে, কিন্তু আমরা দল বেঁধে তা উপভোগ করতে পারবো না, কারও সঙ্গে দেখা হলে দূরত্ব মেপেই কথা বলতে হবে, মেলানো যাবে না হাত, মুখে বাধ্যতামূলক থাকবে মাস্ক। বাঁচতে হলে এমন জীবনেই আমাদের অভ্যস্ত হতে হবে, এখন সেই অনুশীলনই চলছে। ভাইরাসের সঙ্গেই হয়তো আমাদের বসবাস করতে হবে। পরিস্থিতি মানুষকে বদলে দেয়। আমরাও বদলে যাচ্ছি, বদলে যাচ্ছে জীবনধারা।