করোনা বদলে দিয়েছে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাত

46

করোনা এক আতঙ্কের নাম। এক অদৃশ্য শত্রূর বিরুদ্ধে সারাবিশ্ব আজ যুদ্ধরত। প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। মৃত্যুর মিছিলে শামিল হচ্ছেন হাজারো মানুষ। থমকে গেছে বিশ্ব, বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আয়োজন। নতুন এ সংকটের মুখোমুখি মানবজাতি। এ মুহূর্তে বড় প্রয়োজন মানুষের জীবন বাঁচানো।
এদিকে করোনার প্রাদুর্ভাবে আজ বদলে যাচ্ছে পৃথিবী, মানুষের জীবনযাপন, রাজনীতি, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, এমনকি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আজ সময় এসেছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাবার। করোনা মহামারিতে সব দেশই তাদের নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রকৃত রূপ দেখতে পেয়েছে। একইভাবে এ সময়ে সারাদেশের মত চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য খাতের দূরবস্থার চিত্রও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম করোনার হটস্পটে পরিণত হয়। প্রতিদিন এখানে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। শ্বাসকষ্ট ও করোনা উপসর্গের রোগীদের হাহাকার অবস্থা। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ছিল রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। কিন্ত সেই সময়ে বেসরকারি হাসপাতালে মিলেনি রোগীদের সেবা ও ভর্তি। পর্যাপ্ত ছিল না আইসিইউ ও অক্সিজেন সাপোর্ট। এ কারণে প্রতিদিনই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন শ্বাসকষ্টের অনেক রোগী।
ইতোমধ্যে সংকটে অনেকটা সময় কেটে গেছে। তখনও করোনা চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত হতে পারেনি চট্টগ্রাম। থেমে নেই মানুষের আহাজারী। প্রতিদিনই নিত্য-নতুন সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। দিন যতই গড়িয়ে যাচ্ছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কপালে চিন্তার ভাঁজ ততই বেড়ে চলছিল। অবশেষে সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে আশার আলো দেখতে শুরু করে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাত।
আলো ছড়ায় জেনারেল হাসপাতাল : চট্টগ্রামের দ্বিতীয় বৃহত্তম সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান জেনারেল হাসপাতাল। ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালটিতে দীর্ঘদিন ধরে জনবল ও চিকিৎসা উপকরণের সংকট ছিল। এতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের পোহাতে হত নানা ভোগান্তি। অথচ করোনাকে পুঁজি করে নতুন রূপ পেয়েছে এই হাসপাতাল। যার কারণে করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের চিকিৎসায় দেখাচ্ছে আশার আলো। আক্রান্তদের চিকিৎসায় এ হাসপাতালে যুক্ত হয় ১০০ শয্যা। নতুন করে স্থাপন করা হয় ১০ শয্যার আইসিইউ। করোনা রোগীদের চিকিৎসায় এ হাসপাতালে স্থাপন করা হয় যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাই লাইন। আক্রান্ত রোগীদের শ্বাসকষ্ট নিরসনে এখানে আনা হয় ১০টি উন্নতমানের হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা। এসব শয্যা ও যন্ত্রপাতি যুক্ত হওয়ার ফলে ক্রমে রোগীদের আস্থা তৈরি হয়েছে এ হাসপাতালের ওপর।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১৯ মার্চ জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা শুরু হয়। এখানে সেবা দেওয়ার জন্য চিকিৎসকদের নিয়ে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছিল। সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও মেডিকেল অফিসারের সমন্বয়ে নয়জনের তিনটি বিশেষ টিম গঠন করেছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। প্রতিটি টিম টানা ১০ দিন দায়িত্ব পালন করে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে থাকার ব্যবস্থা করেছিল। একইভাবে ছয় সদস্য বিশিষ্ট নার্সের তিনটি টিম গঠন করা হয়েছে। তারাও ১০ দিন কাজ করে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকছেন।
কোভিড রোগীর ডায়ালোসিস চমেক হাসপাতালে : সবদিকে যখন মানুষের কান্না আর আহাজারির রোল ঠিক তখনই এগিয়ে এলো বিভাগের সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। গত বছরের ১৫ মে মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ চমেক হাসপাতালের একাংশকে কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে চালুর অনুমোদন দেয়।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পর করোনা বøক তৈরির কাজ শুরু হয়। হাসপাতালের নিচতলায় জরুরি বিভাগের পাশের ক্যাজুয়াল্টি, ফিজিক্যাল মেডিসিন এবং চর্ম ও যৌন রোগ- এই তিনটি ওয়ার্ড অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। হাসপাতালের মূল প্রবেশপথের বাম পাশের পুরো বøকটি ‘করোনা বøক’ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১০০ শয্যা যুক্ত হয়। ১৩ মে নতুন ১৬৬ জন নার্স পেয়েছে হাসপাতাল। যারা করোনা রোগীদের সেবায় যুক্ত হয়েছেন। এর বাইরে অতিরিক্ত ১০০ চিকিৎসক ও ২০ জন টেকনোলজিস্ট চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে ৫টি ডায়ারোসিস মেশিন অনুমোদন পায়। করোনা আক্রান্তদের মধ্যে যাদের ডায়াবেটিস রোগ রয়েছে তাদের এখানে কম খরচে ডায়ালোসিস করার সুযোগ মিলছে। চট্টগ্রামের আর কোনও হাসপাতালে এই সুবিধা নেই। আর করোনা চিকিৎসায় যুক্ত হয়েছে ১০ আইসিইউ শয্যা এবং ১০টি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা।
করোনা চিকিৎসায় অনন্য বিআইটিআইডি : প্রতিষ্ঠানটির নাম বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস বা বিআইটিআইডি। সংক্রামক রোগ নিয়ে প্রধানত গবেষণা ও চিকিৎসা দেওয়ার জন্যই চট্টগ্রামে এই প্রতিষ্ঠানটি করা হয়েছিল। কিন্তু শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটি অবহেলার শিকার। তবে করোনায় মানুষের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটিকে। করোনার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানটি করোনা শনাক্তে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে।
প্রাণ ফিরে পেয়েছে রেলওয়ে হাসপাতাল : নগরীর সিআরবি এলাকার রেলওয়ে হাসপাতাল। একসময় এখানে মেঝেতেও রোগী থাকত। দুই যুগ ধরে কমতে কমতে বর্তমানে প্রায় রোগীশূন্য। অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে প্রায় মৃত রেলওয়ে হাসপাতাল। বৈশ্বিক মহামারির সময়ে রেলপথ মন্ত্রণালয় জনগণের সেবায় এগিয়ে এসেছে। এ হাসপাতালে করোনা আক্রান্তদের জন্য চালু করা হয়েছে ১০০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার। পর্যাপ্ত জনবল ও যন্ত্রপাতি পেলে নতুন করে পূর্ণাঙ্গরূপে তৈরি হবে এ হাসপাতাল।
জনবল পেয়েছে বন্দর হাসপাতাল : করোনা মহামারিতে চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিশেষায়িত করোনা ইউনিট চালু করেছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দর হাসপাতালের নবনির্মিত ভবনেই করোনা আক্রান্তদের জন্য ৫০ শয্যার আইসোলেশন ইউনিট ছাড়াও ৫০ জনের হাইফ্লো অক্সিজেন সুবিধা যুক্ত করা হয়। কার্ডিওলজি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞসহ ১৪ জন ডাক্তার, নার্স, টেকনোলজিস্ট এবং আয়াসহ মোট ১২৩ জন নিয়োগ পান।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, আইসোলেশনে ৫০ রোগীর থাকা-খাওয়া এবং ওষুধ বন্দরের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়। আইসোলেশনের পাশে রাখা হয়েছে হাইফ্লো অক্সিজেন শাখা। যেখানে ৫০ জন রোগীর হাইফ্লো অক্সিজেন সুবিধা রয়েছে। এই শাখার জন্য ৪টি অক্সিজেন কনসেনট্রেটর, ৬টি ক্যানোলাসহ যাবতীয় চিকিৎসা সামগ্রী যুক্ত হয়। এছাড়া করোনা ইউনিটে বন্দর কর্মীদের চিকিৎসার জন্য ৪টি অক্সিজেন কনসেনট্রেটর, চারটি ভেন্টিলেটর, নেবুলাইজারসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়েছে বন্দরের একজন টার্মিনাল অপারেটর।
সেবাদানে চট্টগ্রামে মা ও শিশু হাসপাতালের অনন্য ভ‚মিকা: করোনা মোকাবেলায় বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল। আগ্রাবাদ এলাকার এ হাসপাতালটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরেই কোভিড রোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। চিকিৎসা সেবাদানে চট্টগ্রামে মা ও শিশু হাসপাতালের অবদান অগ্রগণ্য। মহামারির সময়ে বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত এ হাসপাতালের নবনির্মিত ভবনে ১০টি ভেন্টিলেটরযুক্ত আইসিইউ ও সেন্ট্রাল অক্সিজেন সুবিধাসহ ১০০ বেড নিয়ে করোনা চিকিৎসা কার্যক্রম চালু করেছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রোগীদের সেবায় হাসপাতালে যুক্ত করা হয় সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮৫০ শয্যার ১৪ তলা বিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণের কাজ শেষ করেছে শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পুরাতন ভবন থেকে স¤প্রতি নতুন এ ভবনে হাসপাতাল স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রকোপের এ সময়ে হাসপাতালের কার্যনির্বাহী কমিটি এখানে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার উদ্যোগ নেয়।
পরিত্যক্ত থেকে স্বাস্থ্যসেবায় হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতাল : করোনা মহামারিতে চট্টগ্রামে সংকট শুরুর পর থেকে নগরীর বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে যখন করোনারোগীদের চিকিৎসার জন্য রাজি করানো যায়নি তখন বিকল্প হিসেবে পরিত্যক্ত হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালকে সংস্কার করে চালু করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। নানা শঙ্কা ও জটিলতার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে চট্টগ্রামে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য খুলশীর হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতাল চালু করা হয়েছিল। সরকারি ব্যবস্থাপনায় ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সার্বিক তত্ত¡াবধানে চালু হওয়া এ হাসপাতালে আইসিইউ ও সেন্ট্রাল অক্সিজেনসহ করোনা রোগীর চিকিৎসার জন্য আনুষঙ্গিক সব সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হয়েছে। এ হাসপাতালে ১০টি আইসিইউসহ ১০০টি শয্যার ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন ব্যবস্থা। এছাড়া করোনা রোগীদের সেবায় রয়েছে ১০টি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা।
করোনাযুদ্ধে ৬৫ চিকিৎসক পেল চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম মহানগর এবং জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা চিকিৎসায় নতুন করে যুক্ত হয়েছেন ৬৫ জন তরুণ চিকিৎসক। ৩৯তম বিশেষ বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া মোট দুই হাজার চিকিৎসকের মধ্যে ৬৫ জনকে চট্টগ্রামে পদায়ন করা হয়েছে। এসব চিকিৎসক গত বছরের ১২ মে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন দপ্তরে যোগ দিয়েছেন। ইতোমধ্যেই তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে দায়িত্ব বণ্টন করে দিয়েছেন সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য পরিচালক।
মহানগর ও জেলায় ২৬ হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন : কোভিড ১৯ শ্বাসতন্ত্রের রোগ। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন নিতে পারেন না। রোগীর অবস্থা জটিল হলে অক্সিজেন দিতে হয়। তখনই অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হয়। কেন্দ্রীয়ভাবে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা আছে এমন হাসপাতাল মহানগর ও জেলায় অপ্রতুল। তবে করোনা মহামারির সময়ে চাহিদার প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলায় ২৬টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে যুক্ত হয়েছে সেন্ট্রাল অক্সিজেন। এর মধ্যে মহানগরে ১৭টি এবং জেলায় ৯টি হাসপাতালে।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, বৈশ্বিক মহামারি করোনার সময়ে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। অনেক হাসপাতালে রোগীদের সেবায় নতুন নতুন যন্ত্রপাতি যুক্ত হয়েছে। সংকট নিরসনে নিয়োগ পেয়েছে অনেক চিকিৎসক। আগামী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আমাদের ভাবতে হবে।