করোনার ভয়ঙ্কর রূপ চট্টগ্রামেও সর্বোচ্চ সতর্কতার বিকল্প নেই

9

 

করোনার তৃতীয় ঢেউ! সরকারের নানা উদ্যোগেও থামানো যাচ্ছে না। ভারতের মত শক্তিধর দেশটি যে ভ্যারিয়েন্টের কাছে পাত্তাই পায়নি, বাংলাদেশে সেই ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট অধিকতর শক্তি অর্জন করে পাগলা ঘোড়ার মত জেলায় জেলায় বিস্তার করেছে। গ্রাম থেকে শহর প্রত্যেক জনপদে করোনা টেস্টে এ ভ্যারিয়েন্ট চিহ্নিত হচ্ছে। ফলে নতুনভাবে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে দেশব্যাপী। মধ্যখানে কয়েকদিন করোনা সংক্রমণ নি¤œমুখী মনে হয়েছিল। কিন্তু সোমবার ও মঙ্গলবারের সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। এতে দেখা যাচ্ছে গত কয়েকদিনে রাজধানী ঢাকার পর চট্টগ্রামেও বেড়েই চলছে করোনা সংক্রমণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, রবি ও সোমবার ২৪ ঘন্টায় সারা বাংলাদেশে একদিনে মৃত্যু হয়েছে ২৪৭ জনের। গতকাল সোমবার-মঙ্গলবার ২৪ ঘন্টায় মৃত্যু হয়েছে ২৫৮ জনের আর শনাক্ত হয়েছে ১৫ হাজার। অপরদিকে চট্টগ্রামে একদিনে মৃত্যু হয়েছে ১২ জন আর শনাক্ত হয়েছে ৮৪৮ জন। মৃত্যু ও আক্রান্তের হার ভূমি ও মানুষের সংখ্যা অনুপাতে ভারতের চেয়ে বেশি বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের ধারণা, স্বাস্থ্যবিধি না মানা, মাক্স না পরা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখার যে অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করছেন সাধারণ মানুষ, তাতে -এর বড় খেসারত দিতে হচ্ছে দেশ ও জাতিকে। সরকার কঠোর-শিথিল লকডাউন ঘোষণা করেই চলছে আর মানুষ লকডাউন ভেঙেই চলছে, এতে মানুষের কাছে লকডাউন নামটি ঢিলেঢালা হরতালের মতই বিবেচিত হচ্ছে মাত্র। বাস্তবে এধরনের লকডাউন করোনা ভাইরাস সংক্রমণের পথ খুঁজে পেয়েছে। সুতরাং সরকারের উচিৎ করেনা সংক্রমণের -এ ঢেউ রুখতে কার্যকর লকডাউন অথবা সাটডাউনের মত আরো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
তবে একেবারে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সরকারের নানা পদক্ষেপ স¤প্রতি দেশে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। মানুষ কিছুটা হলেও সচেতন হয়েছে। করোনা নিয়ে গত বছর এমন সময়ে যে ভয় ও আতঙ্ক ছিল এখন মানুষের মাঝে ভয় ও আতঙ্ক নেই। কিন্তু বেশি নির্ভয় হতে গিয়ে স্বাস্থ্যবিধির ন্যূনতম বিধি না মানাটা দুঃখজনক। জনগণের উদাসীনতার কারণে পরিস্থিতির আবারও অবনতি হচ্ছে। দেশে করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হওয়ার পর সরকারি ও বেসরকারিভাবে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা লক্ষ করা যাচ্ছে না। সরকার গত এপ্রিল মাসের শুরু থেকে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ক্রমান্বয়ে কঠোর লকডাউন দিয়ে করোনা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে আসছে, কিন্তু মানুষের অবাধ যাতায়াত ও মেলামেশা সংক্রমণ বরং বৃদ্ধিই পাচ্ছে। এরপর দেশব্যাপী দুই সপ্তাহ যাবৎ কঠোর লকডাউন দেয়া হয়। ঈদুল আজহা ও পশুর বাজারকে কেন্দ্র করে কয়েকদিন বিধিনিষেধ শিথিল করার পর পূর্বের ঘোষণা অনুযায়ী সরকার ঈদুল আজহার দুই দিন পর ২৩ জুলাই শুক্রবার সকাল থেকে কঠোর বিধিনিষেধ ঘোষণা করেছে। যা ৫ আগস্ট পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এবারের লকডাউনে দূরপাল্লার কোনো বাস-ট্রেন-লঞ্চসহ শহরে, গ্রামে-গঞ্জে কোথাও যেকোন ধরনের গাড়ি চলাচলে বিধিনিষেধের পাশাপাশি সকল সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, কলকারখানাও বন্ধ রাখা হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে বিধিনিষেধ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।
বস্তুত কিছু মানুষের বেপরোয়া মনোভাবের ফল পুরো দেশবাসীকে ভোগ করতে হচ্ছে কঠোর বিধিনিষেধ। কিছুদিন আগে লকডাউনের নিয়ম লঙ্ঘন করে অনেকে নগরীর বাইরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে করোনা পরিস্থিতির অবনতির জন্য এই বেপরোয়া মানুষগুলো অনেকাংশে দায়ী। কিছু মানুষের বেপরোয়া আচরণের ফল পুরো দেশবাসী ভোগ করবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। বর্তমানে যে বিধিনিষেধ চলছে, তা যেন কেউ অমান্য করতে না পারে এ ব্যাপারে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। কেউ কৌশলে বিধিনিষেধ অমান্য করলে তাদের বিরুদ্ধে দ্রæত আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। গত দেড় বছরে বিশ্বে করোনাভাইরাসের হাজার হাজার মিউটেশনের খবর পাওয়া গেছে। টিকা নেওয়ার পরও করোনা থেকে পুরোপুরি সুরক্ষার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অনুমোদিত টিকাগুলো বেশ কার্যকর হলেও করোনার বিরুদ্ধে সেসব শতভাগ সুরক্ষা দিতে পারবে না বলে বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন। কাজেই করোনার সংক্রমণ রোধে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে জনগণকে বাধ্য করতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। সর্বশেষ আশার কথা সরকার আগামী ৭ আগস্ট থেকে গণটিকা প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছায় এবার প্রতিটি ইউনিয়নে টিকাকেন্দ্র স্থাপনসহ জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে টিকাদানের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। টিকার পরিধি বাড়লে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসবে এমনটি প্রত্যাশা আমাদের।