করোনার পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ করণীয়

18

 

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণে বিগত সময়ের জনজীবনের বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে দেশের জনগণ বর্তমানে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ পেতে শুরু করেছে। বর্তমানে এই সংক্রমণ অনেকটা নিম্নগামী হলেও কে কখন আক্রান্ত হচ্ছে এই আতংকে দিন কাটছে সবার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানব জাতি এই রকম সংকটের মুখোমুখি সম্ভবত আর হয়নি। করোনার ডেল্টা ভাইরাস যখন ভারতের দ্বিতীয় ঢেউয়ে তাÐাব চালাচ্ছিল তখন আমি ‘ভারতের করোনা পরিস্থিতি ও আমাদের সতর্কতা’ নিয়ে পত্রিকার একটি কলামে বারবার ভারতের করোনার ভয়াবহতার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশের জনগণের স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে কিছু মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছিলাম।কিন্তু তখন কার কথা কে শোনে? কেন বিগত দিনে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে আমরা এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হলাম তা যদি গভীর দৃষ্টিতে চিন্তা করি তবে এক শ্রেণির জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি সম্পর্কে উদাসীনতার কারণেই আমাদেরকে এই করুণ পরিণতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এই পর্যালোচনায় প্রথমে মাস্ক পরিধান ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। ঐ সময় একটি বিষয় লক্ষ্য করলে আমরা দেখি, মফস্বল এলাকায় গ্রামের জনগণের একটি বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে, গ্রামে করোনা কোন অবস্থায় ছোবল দিতে পারবে না।আর এ কারণে আমাদের দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে ডেল্টা ভাইরাস তাÐব চলাকালীন সময়ে গ্রামের অধিকাংশ জনগণের নাকেমুখে কোন মাক্স পরিলক্ষিত হয় নি। দৈবাৎ ক্রমে কাউকে মাস্ক পরিধানরত অবস্থায় রাস্তায় দেখা গেলে ও বাকীরা তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতেন যেন তিনি ভিন্ন গ্রহ থেকে এসেছেন। এমনকি দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর আগে তাঁরা যেভাবে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতেন সংক্রমণের পরও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে আশানুরূপ কোন পরিবর্তন দেখা যায় নি। একাধিক লোক একত্রে বসে যখন গল্পগুজব করতেন তখন সেখানে তিন ফুট শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার যে স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিয়ম কানুন ছিল সেটিও যথাযথভাবে পালিত হয় নি।
তখন সরকারি বিধি নিষেধের কারণে বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টারগুলো বন্ধ থাকলেও সামাজিক অনুষ্ঠানসমূহ সীমিত পরিসরে গ্রামে পালন করতে গিয়ে এক এক অনুষ্ঠানে কমপক্ষে একশ কিংবা ততোধিক মানুষের জনসমাগম ঘটিয়ে এক শ্রেণির জনগণ তখন গ্রামকে করোনার হট স্পটে পরিণত করেছিল।অন্যদিকে আরেকটি বিষয়ে যদি নজর দিই তবে দেখি যে, সরকার করোনা নিয়ন্ত্রণে গত ৭ ফেব্রæয়ারি থেকে দেশব্যাপী ভ্যাকসিনেশন কর্মসূচি হাতে নিলে ঐ সময় দেখা যায় যে, যেখানে মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে প্রতিটি ভ্যাকসিন প্রদান কেন্দ্রে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দীর্ঘ লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে মানুষকে ভ্যাকসিন নিতে দেখা গেছে সেখানে উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে তার চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। অর্থাৎ মেট্রোপলিটন কেন্দ্রগুলোতে যেখানে প্রতিদিন গড়ে আনুমানিক দুই হাজার লোক এই সেবা গ্রহণ করেছিল সেখানে উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে এসংখ্যা আনুমানিক দুইশ হবে কিনা তা সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। এই বাস্তব চিত্রের দৃশ্য থেকে এটিই স্পষ্ট যে, গ্রামের লোকেরা তখন এই টিকা গ্রহণ কর্মসূচিকে আন্তরিক ভাবে গ্রহণ করেনি বিধায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে গ্রামেগঞ্জেও করোনার ভয়াবহ দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়েছিল। এছাড়াও অনেকের ভ্যাকসিন সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাবের কারনে গ্রামে তখন এই টিকাদান কর্মসূচি স¤প্রসারণে স্থবিরতা বিরাজ করেছিল। ছোট কালে দেখতাম গৃহপালিত গরু যখন কোনো রোগে আক্রান্ত হতো তখন তাকে ঔষধ খাওয়ানোর জন্য গরুর বৈদ্য সহ তিন চারজন মিলে দড়ি দিয়ে বেঁধে কেউ পা ধরত কেউ মাথা ধরত আর সবশেষে গরুর বৈদ্য দুই চোয়াল ফাঁক করে মুখের ভিতর ঔষধ ঢেলে দিত। কিন্তু এত চেষ্টার পরও দেরিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অভাবে গরু যখন শেষ অবস্থায় এসে জিহবা বের করে দিয়ে মৃত্যুবরণ করত তখন কেমনজানি ছোট অবস্থায় আমার মনে হতো হয়তো বা ঔষধ খাওয়ার জন্য গরুটি মৃত্যুর সময় জিহবা বের করে দিয়েছিল।তাই বিগত দিনে দেশব্যাপী যখন গ্রামেগঞ্জেও করোনার তীব্র ছোবল শুরু হয় তখন মনে হয় আমরাও ঐ গরুর মত শেষ অবস্থায় এসে পৌঁছেছি।
এখন সব টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপচেপড়া ভিড় যেটি কর্তৃপক্ষকেও যথেষ্ট হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে এটিকে আমি বিগত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ইতিবাচক হিসেবে মনে করছি। তবে আগে থেকে যদি গ্রামের জনগণও মেট্রোপলিটন শহরের মত সমানুপাতিক হারে টিকা গ্রহণ করত তবে বিগত সময়ে আমাদের করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে হয়তো বা এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতো না। যাক আগের কথা আর বেশী বলে লাভ নেই। আমাদের এখন ভবিষ্যতের কথা ভাবতে গিয়ে সরকার বর্তমানে আঠারোর্ধ্ব শিক্ষার্থীসহ দেশের সকল নাগরিকদের জাতীয় পরিচয় পত্র নিবন্ধনের মাধ্যমে টিকাদানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন যা করোনা নিয়ন্ত্রণে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে আমি দেখতে পাই। তবে এই কর্মসূচিকে শতভাগ সাফল্যে আনার লক্ষ্যে বিকল্প হিসেবে জন্মনিবন্ধন সনদ কিংবা হাসপাতালের বার্থ সাটিফিকেটের মাধ্যমে নিবন্ধন সাপেক্ষে যদি এই টিকাদান কর্মসূচি হাতে নেয়া যায় তবে তা আরো বেশি বেগবান হবে বলে আমি বিশ্বাস রাখি।
অতএব সবার কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময় আমরা করোনা নিয়ন্ত্রণে নষ্ট করেছি। এখন সবার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে আর একবিন্দু সময় নষ্ট না করে করোনা নিয়ন্ত্রণে সবাই একযোগে এগিয়ে এসে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে করোনা মুক্ত করি। আর পরিশেষে শুধু এটুকুই বলব, যদি আমার এই প্রত্যাশা পূরণ হয় তবে অচিরেই করোনা নিয়ন্ত্রণ হবেই হবে।
লেখক : শিক্ষাক ও কলামিস্ট