করোনার জোয়ারভাটা ও জনসচেতনতা

5

এ.এফ.এম. আখতারুজ্জামান কায়সার

করোনা-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বড় সংকটের নাম। এ ভাইরাস রীতিমত এক আতংকের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৯ সালের শেষ দিকে চীনের উহান প্রদেশে প্রথম দেখা দিলেও বর্তমানে সারা বিশ্বের চলমান কার্যাবলীর স্বাভাবিক ধারা পরিবর্তন করে বিশ্বব্যবাসীর চিন্তা চেতনাকে এক জায়গায় এনে দিয়েছে এ করোনা ভাইরাস। ১১ মার্চ, ২০২০ তারিখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট এ রোগ কোভিড-১৯ কে বৈশ্বিক মহামারি (Pandemic) হিসেবে ঘোষণা করে।
যদিও ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাস হাজারবার জিন পরিবর্তন করেছে, মূলতঃ কোভিড-১৯ এর সাধারণ লক্ষণসমূহ হচ্ছে প্রথমে জ্বর, এছাড়া শুকনো কাঁশি/গলাব্যথা হতে পারে, শ্বাসকষ্ট/ নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। তাছাড়া অন্যান্য অসুস্থতা (ডায়বেটিস/ উচ্চ রক্তচাপ/ শ্বাসকষ্ট/ হৃদরোগ/ কিডনী সমস্যা/ ক্যান্সার ইত্যাদি থাকলে অরগ্যান ফেইলিউর হতে পারে। আমরা জেনে আসছি, এ করোনা ভাইরাস সাধারণতঃ শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে (হাঁচি/ কাঁশি/ কফ/ সর্দি/ থুথু), অনেক সময় মুখের কথার মাধ্যমে যে ড্রপলেট বের হয় এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসলে একজন থেকে আরেকজনের দেহে ছড়ায়। এটি মূলতঃ আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে ১ মিটার বা ৩ ফুটের কম দূরত্বে অবস্থান করলে সংক্রমিত হতে পারে।
যেহেতু এটা বৈশ্বিক সমস্যা, তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রস্তুতকৃত বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রচারিত কোভিড-১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধের বিভিন্ন নির্দেশনার মধ্যে নিম্নোক্ত অতিগুরুত্বপূর্ণ উপায়গুলো অনুসরণ করা দরকারÑ
১. হাত ধোয়া – সাবানপানি দিয়ে অন্ততঃ ২০ সেকেন্ড হাতধোয়া, প্রয়োজনে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা য়েতে পারে। ২. কাশি শিষ্টাচার মেনে চলা- মুখ ঢেকে হাঁচি কাশি দিতে হবে। হাঁচি কাশির সময় টিস্যু পেপার/ মেডিক্যাল মাস্ক/ কাপড়ের মাস্ক/ রুমাল/ বাহুর ভাঁজে নাক ও মুখ ঢেকে রাখতে হবে এবং সাথে সাথে হাত পরিষ্কার করতে হবে। টিস্যু পেপার ও মেডিক্যাল মাস্ক ব্যবহারের পর ঢাকনাযুক্ত ময়লা পাত্রে ফেলতে হবে। কাপড় বা রুমাল ব্যবহার করলে হাঁচি কাশি দেবার পর সাথে সাথেই সাবান পানি দিয়ে হাত ধুয়ে ভালভাবে শুকিয়ে ব্যবহার করতে হবে। ৩. জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। জনসমাগম হয় এমন স্থানে যাওয়া পরিহার করতে হবে।
বাংলাদেশে ৮মার্চ, ২০২০ তারিখে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরপর থেকে বাংলাদেশ সরকার দফায় দফায় সাধারণ ছুটি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি, বিভিন্ন সাময়িক বিধি নিষেধ আরোপ, লকডাউন সহ বিভিন্ন কর্মসূচি চলিয়ে আসছে। সংক্রমণ কমিয়ে রাখার সরকারি এ প্রচেষ্টা সফল করতে গিয়ে নাগরিক সমাজকেও স্ব স্ব অবস্থান থেকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে।
তবে আশার কথা, অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে খুবই কম সময়ের মধ্যে করোনার টিকা আবিস্কৃত হয়েছে। বিশ্বের কিছু দেশ ইতোমধ্যে টিকা প্রদান শুরু করেছে। বাংলাদেশ সরকারের দূরদর্শী, সময়োপযোগী ও সাহসী সিদ্ধান্তে যে অল্প কয়েকটি দেশ দ্রুত করোনা টিকা পেয়েছে, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। আমাদের দেশে ফ্রন্টলাইনাররা এবং ৪০+ যে কোন নাগরিক অ্যাপস এ রেজিস্ট্রেশন করে টিকা গ্রহণ করতে পারছে। উল্লেখ্য, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে এখনো ৬০+ বয়সীদের টিকা প্রদান করছে। তবে আমরা গণমাধ্যমে বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল থেকে জেনে আসছি টিকা কোন অবস্থাতেই ১০০% সুরক্ষা দিতে পারবে না। তাছাড়া মোট জনসংখ্যার ৭০% এর অধিক মানুষকে টিকা প্রদান সম্ভব হলে তারপর মোটামুটি ইমিউনিটি হয়েছে বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। চলমান এ টিকা কার্যক্রমে ৭০% মানুষকে টিকার আওতায় আনা সময়সাপেক্ষ। সর্বোপরি, টিকা গ্রহণের পরেও অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলা হচ্ছে। সুতরাং করোনা থেকে বাঁচার প্রধানতম উপায় হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। স্বাস্থ্যবিধিসমূহের মধ্যে মূখ্য হলো মাস্ক পরিধান করা। যদি প্রত্যেকে যথাযথভাবে মাস্ক পরিধান করা, ঘনঘন সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও সমাজিক দূরত্ব মেনে চলা এ তিনটি বিষয় সঠিকভাবে মেনে চলে তবে করোনা ভাইরাসের এ মহামারি নিয়ন্ত্রণ অনেকটা সহজ হবে।
সর্বোপরি, জনসাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে টিকাদান, হাসপাতাল বেড বাড়ানো, আইসিইউবেড বাড়ানো, লকডাউন, বিধিনিষেধ আরোপ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, কর্মহীনদের ত্রাণ বা আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ করোনা মোকাবেলায় সরকারি কর্মসূচি ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে ।
সবমিলিয়ে দেখা যায়, টিকা আবিষ্কার ও প্রদান শুরু হলেও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের চেয়ে বড় কোন বিকল্প এখন পর্যন্ত বিশ্ববাসীর কাছে নাই। এছাড়া মে ২০২০ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন ২০১৮ অনুযায়ী মাস্ক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি না মানলে কারাদন্ড ও জরিমানা করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এ ঘোষণায় এ আইন সতর্কভাবে কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। গত জুলাই ২১, ২০২০ তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ১১ টি ক্ষেত্রে মাস্ক ব্যবহারের ব্যাপারে একটি পরিপত্র জারি করেছে। উক্ত পরিপত্রে স্থানীয় প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট পরিচালনা কমিটি, মার্কেট ব্যবস্থাপনা কমিটি, হাট বাজার কমিটি, শিল্প মালিকগণ, অইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মাস্ক ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য বলা হয়েছে। পরবর্তীতে সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ সকল ক্ষেত্রে সকল সেবা গ্রহীতাকে বাধ্যতমূলক মাস্ক পরার জন্য ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ নীতি বাস্তবায়ন করার জন্য সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে এসবই কাগুজে বাঘ হয়ে আছে।
অনেকক্ষেত্রে মাস্ক পরলেও সেটি নাকের নিচে, থুতনীর নিচে, কথা বলার সময় নামিয়ে কথা বলা ইত্যাদি কারণে কাক্সিক্ষত ফল আসছে না। অনেকেরই মাস্ক ও স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে আগ্রহ নেই, কেউকেউ এসব ক্ষেত্রে বিভিন্ন কুসংস্কার ও ধর্মের দোহাই দিচ্ছেন। কেউ মনে করছেন এটি বড়লোকদের হয়, কেউ বলছেন আল্লাহর রহমতে আমাদের হবে না। পক্ষান্তরে সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, এ অভিযোগও কওে আসছে। আমাদের বুঝতে হবে, আত্মরক্ষার প্রচেষ্টা তাকদ্বিরের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। পবিত্র কোরান ও হাদীসে অনেকবার আত্মরক্ষার কথা বলা হয়েছে। ‘তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না’ (সূরা বাকারাঃ ১৯৫)। আল্লাহতাআলা কোন জাতির অবস্থা বদলান না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা বদলানোর চেষ্টা করে (সূরাঃ রা’দঃ ১১)। তোমরা যদি কোন দেশে মহামারি দেখা দেওয়ার সংবাদ পাও তাহলে সেখানে প্রবেশ করোনা। যদি কোন দেশে মহামারি শুরু হয়ে যায় আর তোমরা সেখানে অবস্থান কর তাহলে সেখান থেকে বাইর হইওনা (বুখারী মুসলিম)।
এছাড়া, মাস্ক পরা, ব্যবহার করা, খুলে ফেলা এবং নিষ্পত্তি/ ধ্বংস করার পদ্ধতি সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র উল্লেখযোগ্য নির্দেশনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র মতে, মাস্ক পরার পূর্বে এলকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার অথবা সাবান-পানি দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে, মাস্ক দিয়ে মুখ ও নাক ভালভাবে ঢেকে ফেলতে হবে এবং মাস্ক ও মুখের মধ্যে যেন কোন ফাঁক না থাকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে, মাস্ক পরার সময় হাতল ছাড়া মাস্কটি স্পর্শ করা যাবেনা, যদি স্পর্শ লেগে যায় তবে এলকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা সাবান-পানি দিয়ে হাত পরিস্কার করতে হবে, মাস্ক ব্যবহারের অযোগ্য হওয়ার সাথে সাথে পরিবর্তন করতে হবে, মাস্ক খোলার সময় হাতল ধরে খুলতে হবে (মাস্কের সামনের অংশে হাত লাগানো যাবেনা) এবং ব্যবহার করা মাস্কটি দ্রুত আবর্জনা ফেলার ঢাকনাযুক্ত পাত্রে ফেলতে হবে, ঘন ঘন হ্যান্ড স্যানিটাইজার অথবা সাবান-পানি দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র পরামর্শক অধ্যাপক হেইমান সিরিই বলেন, ‘এই ভাইরাস থেকে বাঁচতে মাস্ক পরা নিরাপদ দূরত্ব রাখার চেয়েও বেশী কার্যকর।’
সূতরাং মাস্ক ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে করোনা ভাইরাস অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব। এজন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি ও অন্যান্য বিধিনিষেধসমূহ অনুসরণের জন্য সকলের সচেতনতার বিকল্প নেই। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সরকারের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, জনপ্রতিনিধি, মিডিয়া, মসজিদ, মন্দির, গীর্জাসহ সকল ধর্মীয় উপাসনালয়ে এ সংক্রান্ত প্রচারণা জোরদার করতে হবে। যারা টিকার আওতায় আসছে, তাদেরকে দ্রুত টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারকে কঠোরভাবে আইন ও বিধিমসমূহ যথাযথ প্রয়োগ (হয়রানি ব্যতীত) নিশ্চিত করতে হবে। আমরা এখনো দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করতে চাই, যদি বাঙালি জাতি ধৈর্য ও সচেতনতার পরিচয় দেয় এবং সরকারি বিধিনিষেধ মেনে সরকারকে সহায়তা করে, তাহলে বাংলাদেশ এ মহামারির বিরুদ্ধে দ্রুত বিজয় লাভ করবে। আমরা জনসচেতনতার মাধ্যমে সকলে সেই সুন্দর সময়ের অপেক্ষায় রইলাম।

লেখক: রেজিস্ট্রার
বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ