করোনাভাইরাসকে বৈশ্বিক মহামারী ঘোষণা জরুরি মানুষের সতর্কতা ও সচেতনতা

50

একবিংশ শতকের বড় কোন ঘটনা সারা বিশ্বকে একসাথে আতঙ্কগ্রস্ত করে থাকলে সম্ভবত তা করোনা ভাইরাসই করেছে। এর আগে জঙ্গিবাদ আমাদের উপর একবার ছেপে বসেছিল। তা অবশ্যই বৈশ্বিক সঙকট হিসাবে বিবেচিত হলেও করোনার মত এতো প্রকট ছিল বলে মনে হয়না। বলা যায়, চীন থেকে বিকশিত এ করোনার জের এখন সারা দুনিয়া রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। আকাশপথে স্থবির নেমে এসেছে। এমনকি এ ভাইরাসের অতি সতর্কতায় মানুষ পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে নিজেদের সৌজন্যতাবোধ ও শিষ্টচার আচরণে। চারহাজারের অধিক মানুষের জীবন সংহার ঘটেছে, সোয়া লাখের অধিক মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। এ অবস্থায় ব্যাপক পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার পর সর্বশেষ করোনাভাইরাসকে বৈশ্বিক মহামারী ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। করোনাভাইরাস যেভাবে দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বহু লোকের মৃত্যুর কারণ হয়েছে, তাতে একে মহামারী ঘোষণা করাটাই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এ বছর ৩০ জানুয়ারি ডবিøউএইচও করোনাভাইরাস নিয়ে একটি সতর্কতা জারি করেছিল। গোটা বিশ্বকে তারা সতর্ক করে দিয়েছিল ভাইরাসবাহিত এ রোগ সম্পর্কে। এর দেড় মাস না যেতেই রোগটি মহামারীর রূপ নিল, এ তথ্য উদ্বেগজনকই বটে। তবে আমরা মনে করি এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। এর চেয়ে অনেক গুরুতর রোগ বিভিন্ন সময় পৃথিবীতে মহামারীর রূপ নিয়েছে এবং অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। সে তুলনায় করোনাভাইরাসের মৃত্যুর হার নগণ্য।
উল্লেখ্য, যখন কোনো রোগ একটি ছোট জায়গায় আটকে না থেকে বহু জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এবং তা অনেক লোকের মৃত্যুর কারণ হয় তখন তাকে মহামারী বলা হয়। তবে যেসব দেশে এ রোগ বেশি ছড়িয়ে পড়েছে এবং মৃত্যুহার বেশি, সেসব দেশকে অবশ্যই বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ইতিমধ্যে তারা সে ব্যবস্থা নিয়েছেও। বস্তুত সতর্ক ব্যবস্থা নেয়া দরকার সব দেশেরই। আশার কথা, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় এ রোগের বিস্তার এখনও তুলনামূলক কম। তা সত্তে¡ও করোনাভাইরাস মোকাবেলার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে হবে আমাদেরও।
যে বিষয়টি উদ্বেগের তা হল, করোনাভাইরাসের বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি, শিক্ষা, পর্যটন ইত্যাদি খাতে, যা থেকে আমরাও মুক্ত নই। বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশে একটি নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তার প্রভাব অন্যান্য দেশেও পড়ে। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটেছে।
এ পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবেলা করা হবে, তা নিয়েও সবাইকে ভাবতে হবে। আমরা জানি না বিশ্বে এ রোগের ব্যাপকতা আর কতদিন থাকবে, কবে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। করোনাভাইরাসের মহামারী রূপ দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নামবে। মানুষ জরুরি প্রয়োজনেও বিদেশ যেতে পারবে না। বিশ্বে রাষ্ট্রগুলোর দুয়ার রুদ্ধ হয়ে পড়বে। বর্তমান যুগে এমন পরিস্থিতি কল্পনা করতেও ভয় হয়। আশার কথা আমাদের দেশে করোনাভাইরাসের রোগী হিসাবে ইতালি ফেরত দুই ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের একসদস্য শনাক্ত হওয়ায় পর তাদের নিবিড় পরিচর্য ও চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলা হয়। দুইজনকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়, একজনকে আইসলিশনে রাখা হয়। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, ইতালি ফেরত তিনজনের মধ্যে করোনা ভাইরাস পাওয়া গেছে-এমন খবরে মানুষের মধ্যে এ নিয়ে একধরনের আতঙ্ক বা ভীতি কাজ করছে। এ ভীতি আরো বেশি ছড়িয়ে পড়ে যখন সরকার মুজিববর্ষের কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করে পুনবিন্যাস করল। আমরা মনে করি, সরকার যথাসময়ে সঠিক কাজটিই করেছেন, সরকারের প্রধান কাজ নগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সরকার নাগরিকদের সচেতন করছেন, এখন মানুষ সচেতন ও সতর্ক থাকলে আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কিছু নেই। বরং মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আমরা আশা করব, বিশ্বে দ্রুত এ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটবে। সর্বত্র স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে। যেহেতু রোগটি প্রাণঘাতী হয়ে দেখা দিয়েছে, সেহেতু এ ব্যাপারে আমাদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে অবশ্যই। তবে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করা হলে এ নিয়ে জনমনে উৎকণ্ঠার কোনো কারণ ঘটবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস। বিশ্ব যত দ্রুত এ রোগের ভয়াবহতা থেকে মুক্ত হয় ততই মঙ্গল।