করোনাকাল : সংকটের আবর্তে মধ্যবিত্ত

13

লালন কান্তি দাশ

বিগত এক বছরের বেশি সময় ধরে করোনার ভয়াল থাবায় বিপর্যস্ত সারাবিশ্ব। সারা পৃথিবীর মানুষ লড়াই করে যাচ্ছে এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে,সংক্রমণ কমাতে নেয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। কিন্তু টিকা, ঔষধ, সচেতনতা কোন কিছুই যেন এর বিস্তার রোধ করতে পারছেনা। মানুষকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরছে অনিশ্চয়তা আর মৃত্যু ভয়। করোনার কারণে সব শ্রেণি পেশার মানুষ কম বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ও সার্বিক দিক বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন মধ্যবিত্ত শ্রেণি। সাধারণত যে কোন বিপর্যয় মোকাবেলায় মধ্যবিত্তরা একেবারেই অপ্রস্তুত থাকে। করোনা ভাইরাসের আবির্ভাবের পর সৃষ্ট নানামুখী সমস্যায় মধ্যবিত্তরা আজ দিশেহারা।
মধ্যবিত্ত কারা, এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। তবে আয়ের দিক থেকে বিশ্বের মানুষকে সাধারণত পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন: দরিদ্র, স্বল্প আয়ের মানুষ, মধ্য আয়ের মানুষ, উচ্চ মধ্য আয়ের মানুষ ও উচ্চ আয়ের মানুষ। যারা দিনে ২ ডলারের কম আয় করে, তারাই দরিদ্র বলে সারা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। দিনে ২ দশমিক শূন্য ১ ডলার থেকে ১০ ডলার পর্যন্ত আয় করে তারা নিম্ন আয়ের মানুষ, ১০ দশমিক শূন্য ১ ডলার থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত আয়ের মানুষরাই মধ্যম আয়ের, ২০ দশমিক শূন্য ১ থেকে ৫০ ডলার আয় হলে উচ্চ মধ্যম আয়ের ও দিনে ৫০ ডলারের বেশি আয় হলে তারা উচ্চ আয়ের শ্রেণিতে পড়বে। এই আয় ক্রয়ক্ষমতার সমতার (পিপিপি) ভিত্তিতে। তবে দেশ ভেদে এই সংজ্ঞা বদলে যায়।
আমাদের দেশের পেক্ষাপটে সাধারণত যাদের আয় নির্ধারিত এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মাসিক বেতনের ভিত্তিতে কাজ করে থাকে তারাই মধ্যবিত্ত হিসেবে বিবেচিত। মধ্যবিত্ত শ্রেণির সাধারণত বাড়তি কোন আয় থাকে না।
বিআইডিএস-এর গবেষণা মতে, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের হার ছিল ৯ শতাংশ। বর্তমানে এই হার ২০ শতাংশ। ২০২৫ সালে মধ্যবিত্তের হার হবে ২৫ শতাংশ এবং ২০৩০ সালে এই হার হবে ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ মধ্যবিত্তের হার ক্রমবর্ধমান।করোনা মহামারির কারণে মানুষের জীবন-জীবিকা দুটোই ঝুঁকির মধ্যে। করোনা মহামারিতে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন, অনেকে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে আছেন কিংবা প্রতিষ্ঠানের আয় কমে যাওয়ায় অনেকে অর্ধ বেতন বা কম বেতনে চাকরি করে জীবনের চাকা সচল রেখেছেন। এ শ্রেণির একটি বিপুল অংশ মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি। বেশি ভাগ মধ্যবিত্ত পরিবার এখন বলতে গেলে সঞ্চিত অর্থ ভেংগে কিংবা ধার-দেনা করে সংসার চালাচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত উচ্চবিত্ত শ্রেণি বিভিন্ন প্যাকেজ প্রণোদনা, দরিদ্র শ্রেণি সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থা থেকে সাহায্যে সহযোগিতা পেলেও এমন সংকটকালে মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য সরকারের কোন প্রণোদনা ছিল না। ফলে বর্তমানে চলমান লকডাউনের মধ্যে মহাসংকটে পড়েছেন বাংলাদেশে কয়েক কোটি মধ্যবিত্ত। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এইসব পরিবারের অনেকেই এখন নিম্নবিত্তের স্তরে নেমে এসেছেন।
মধ্যবিত্ত শ্রেণির সাধারণত কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। এরা সাধারণত রুচিশীল, শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা ও রাজনৈতিক সচেতন হয়ে থাকে। এদের আতœসম্মানবোধ অত্যন্ত প্রবল। এরা চরম অর্থ কষ্টে দিনাতিপাত করলে ও কারো কাছে হাত পাততে রাজি নন। মধ্যবিত্তরা ত্রাণের লাইনে দাঁড়াতে পারেন না, অভাবের কথা মুখ ফুটে কাউকে বলতেও পারেন না। মধ্যবিত্তের অবস্থান মাঝখানে। তাই না পারে উপরে উঠতে না পারে নিচে নামতে। এই করোনাকালে তাই হাঁসফাঁস করছে মধ্যবিত্ত।
মত্তবিত্তের সহ্য ক্ষমতা অসীম। তাই এ দুঃসহ পরিস্থিতিতে তারা নিজেদের মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। বলাবাহুল্য মধ্যবিত্তের এই সংকট দিন দিন আরো গভীরে নিমজ্জিত হচ্ছে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে। সাধারণ অবস্থায় যেখানে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেলে তাদের আয়ের সাথে সমন্বয় করে চলতে সীমাহীন বেগ পেতে হয়, সেখানে এ দুঃসহ পরিস্থিতিতে তাদের অবস্থা সহজে অনুমেয়। বাইরে থেকে বোঝা না গেলে ও বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত পরিবারে বিরাজ করছে চাপা কষ্ট আর নীরব কান্না। সীমাহীন মানসিক দুশ্চিন্তায় মধ্যবিত্ত শ্রেণি এ কঠিন সময় থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিছু পণ্যের দাম যৌক্তিক কারণে বৃদ্ধি পেলেও বেশি ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়,অসাধু ব্যবসায়ীদের মজুদদারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মুনাফা লাভের অসৎ প্রবণতাই এর জন্য দায়ী। সরকারের কঠোর নজরদারি ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম যাতে সহনশীল থাকে, সে ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ মধ্যবিত্ত সহ সকল শ্রেণি পেশার মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে সহায়ক হতে পারে। তাছাড়া মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সাময়িক সময়ের জন্য হলে ও সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের আওতায় নিয়ে আসা, এককালীন আর্থিক প্রণোদনা প্রদান, সহজ শর্তে লোন দান, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এ সংকট উত্তরণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। পরিশেষে বলা যায়, করোনা পরিস্থিতি যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, মধ্যবিত্তের সংকট ও আরো ঘনীভূত হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

লেখক: কলেজ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক