করোনাকালীন কুরবানি ও আমাদের দায়িত্ব

10

 

কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়- “মনের পশুর কর জবাই/ পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই/ কশাই-এর আবার কোরবানি!/ আমাদের নয় তাদের ঈদ/ বীর-সুত যারা হল শহীদ/ অমর যাদের বীরবাণী” (শহীদী ঈদ)। খোদার রাহে জান-মাল সহ সবকিছুই উৎসর্গ করার নাম হলো কুরবানি। প্রতিবছর জিলহজ্জ মাসে হালাল নিখুঁত পশু কুরবানির মাধ্যমে এই শিক্ষাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। মহান আল্লাহর শর্তহীন আনুগত্য, তাকওয়া অর্জন, আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা এবং আল্লাহর জন্য ত্যাগ স্বীকার করা তথা কুরবানির আসল শিক্ষা-দর্শন উপলব্ধি করতে পারলেই আমাদের সমাজ হতে জুলুম-অন্যায়-দুর্নীতি-হানাহানি সহ সব অনাচার-অবিচার দূর হবে এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।
পবিত্র কুরআনে এসেছে, “আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্যে কুরবানিকে ইবাদতের অংশ করেছি। যাতে জীবনোপকরণ হিসেবে যে গবাদি পশু তাদেরকে দেয়া হয়েছে, তা জবাই করার সময় তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে আর (সব সময় যেন মনে রাখে) একমাত্র আল্লাহই তাদের উপাস্য। অতএব তাঁর কাছেই পুরোপুরি সমর্পিত হও। আর সুসংবাদ দিন সমর্পিত বিনয়াবনতদের”-(সূরা আল হজ্জ, আয়াত: ৩৪)। ১০ হতে ১২ জিলহজ্জ যে কুরবানি মুসলমানগণ প্রতিবছর পালন করে, তা মূলত হযরত ইব্রাহিম ও হযরত ইসমাঈল (আ.) এর স্মরণে। যেমন হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (দ.)’কে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) প্রশ্ন করেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (দ.)! এ কুরবানি গুলো কী ? তিনি উত্তর দিলেন, “তোমাদের পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর সুন্নাত”- (ইবন্ মাজাহ)।
নিজের ভিতরের পশুত্বকে কুরবানি দেওয়াও কুরবানির অন্যতম উদ্দেশ্য। সুফিগণ নিজের ইচ্ছা শক্তি, আমিত্ব, চাহিদা-কামনা ইত্যাদি সব কিছুকে মহান আল্লাহর ইচ্ছার কাছে বিসর্জন দিয়ে ‘ফানা’ ও ‘বাকা’র মাকাম বা স্তর লাভ করেন, ঠিক এই শিক্ষা কুরবানিও আমাদের দিয়ে থাকে যে, মহান আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্দেশের কাছে সবকিছু বিসর্জন দেওয়াই হলো কুরবানি।
মহান আল্লাহ হযরত ইব্রাহিম ও হযরত ইসমাঈল (আ.) হতে পরীক্ষা গ্রহণ করেন, যা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। হযরত ইব্রাহিম (আ.)কে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিলেন তাঁর প্রিয় বস্তু কুরবানি করার জন্য। সাথে সাথে বিনাবাক্যে তিনি তাঁর বৃদ্ধ বয়সের আদরের শিশু পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)কে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি দিতে রাজি হয়ে যান। অন্যদিকে যখন হযরত ইসমাঈল (আ.)’কে কুরবানির কথা বলা হয়, তখন তিনিও পিতার মতই সাথে সাথে আল্লাহর হুকুম মান্য করতে বিনা দ্বিধায় রাজি হয়ে যান। যা পবিত্র কুরআনের সূরা সাফফাত এর ১০২-১০৬ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। এটাই হলো কুরবানির দর্শন ও শিক্ষা যে, জীবনের যে কোন মুহূর্তে, যে কোন সময় মহান আল্লাহর আদেশ-নির্দেশ-নিষেধ মান্য করতে পিছপা না হওয়া। এদিকে ইঙ্গিত করে পবিত্র কুরআনে এসেছে, “নিশ্চই আমার নামায, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ সবকিছুই মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, যিনি নিখিল জাহানের প্রতিপালক”- (সূরা আল আনআম, আয়াত: ১৬২)। মহান আল্লাহ তাঁর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি করতে নির্দেশ দিয়ে উল্লেখ করেন, “আপনার প্রতিপালকের জন্য নামায আদায় ও কুরবানি করুন”- (সূরা আল কাওসার, আয়াত:২)।
কুরবানির অন্য একটি দিক হলো, সামর্থ্যবান মুসলিমগণ ১০ জিলহজ্জ হালাল পশু কুরবানি করে থাকেন এবং এসব পশুর গোস্ত তাদের অসচ্ছল দ্বীনি ভাইদের কাছে বিতরণ-বন্টন করে থাকেন। যার ফলে ধনী-গরীব সব মুসলমানদের মধ্যে একটি আত্মিক সম্পর্ক, ভালবাসা সৃষ্টি হয়। এটা অসচ্ছলদের হক স্বচ্ছলদের উপর। তাই মনে আল্লাহ্র ভয় নিয়ে এবং তাঁর সন্তুষ্টির আশায় অন্য মুসলিম ভাইয়ের হক আদায় করতে হয়। আবার কুরবানিকৃত পশুর চামড়া বা চামড়ার বিক্রিতমূল্যও গরিব-মিসকিনের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়াও ইবাদত। মহান আল্লাহ বলেন, “কুরবানির পশুর রক্ত-গোস্ত কোনটাই আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, শুধু পৌঁছায় তোমাদের খোদাভীতি ও আন্তরিকতা”-(সূরা হজ্জ, আয়াত: ৩৭)।
বৈশ্বিক মহামারি করোনার (কোভিড ১৯) ২য় ও ৩য় ঢেউ এর এই দুর্যোগকালে এবারের কুরবানি আমাদের কাছে উপস্থিত হয়েছে ভিন্ন মাত্রা নিয়ে। গত বছর পর্যন্ত আমাদের যে সব আত্মিয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী অত্যন্ত আনন্দের সাথে পশু কুরবানি দিতো এবছর হয়তো তাদের অনেকে তা করতে সক্ষম হবে না আর্থিক ও পারিপার্শ্বিক কারণে।
আবার অনেকে অসুস্থ এবং অনেকে স্বজন হারানোর শোকে মুহ্যমান। সবাই কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ও হচ্ছে এই দূর্যোগে। তাই আমাদের যাদেরকে মহান আল্লাহ এইবার কুরবানি করার সামর্থ দিবেন তাদের সেই সব আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশীর কথা বেশি স্মরণ রাখতে হবে। প্রতিবারের তুলনায় অধিক পরিমান মাংস আত্মিয়-স্বজনের মধ্যে বন্টন করতে হবে। হয়তো তারা চক্ষু লজ্জায় কিছু প্রকাশ করবে না, তারপরও তাদের খবর নিয়ে তাদের ঘরে কুরবানির উপহারের গোস্ত পৌঁছে দেওয়া আমাদের একান্ত দায়িত্ব। সব মিলিয়ে এই কুরবানি আমাদের জন্য নিয়ে আসবে নিজের খুশি ও আনন্দ স্বজনদের সাথে বন্টনের শিক্ষা নিয়ে। আর আমাদের ঈদের নামায শেষে দোয়া করতে হবে- হে রাব্বে কায়েনাত! আমাদের কুরবানি আপনি কবুল করুন। এই মহান ত্যাগের উসিলায় আমাদের ও আমাদের দেশবাসীকে কোভিড-১৯ এর এই আজাব থেকে রক্ষা করুন। আমাদের এই কঠিন পরিস্থিতি উত্তরণের তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: প্রাবন্ধিক