কবে শান্ত হবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস

13

অর্ধশত বছরের অধিক সময় ধরে বিশাল ঐতিহ্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ত্যাগ অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মাঝে গড়ে উঠা এ বিশ্ববিদ্যালয় সৃজনে মননে অনন্য বিদ্যাপীঠ হিসেবে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু আশির দশকে স্বাধীনতা বিরোধী ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর আধিপত্যবাদী মনোভাব ও সন্ত্রাসবাদের অনুপ্রবেশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একপ্রকার বিতাড়ির হয়েছিল সুষ্ঠু রাজনীতি, সংস্কৃতি, মুক্তচিন্তা ও স্বাধীনতার চেতনা। নব্বই দশকে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত চাকসু নির্বাচন স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে বিদায় জানায়। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বাধীনতার পক্ষের অসাম্প্রাদায়িক ও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনসমূহ নেতৃত্বে আসে। এরপরও সংঘাত যে একেবারে ছিল না তা নয়, তবে একটি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ মোটামুটি ফিরে এসেছিল। কিন্তু চাকসুর মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর নির্বাচন না হওয়া, চাকসু নেতৃবৃন্দের কর্মজীবনে চলে যাওয়াসহ নানা কারণে ক্যাম্পাস আবারও অশান্ত হয়ে ওঠে। সর্বশেষ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একক নেতৃত্বে চলে আসে। সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা মনে করেছিল ক্যাম্পাস এবার শান্ত হয়ে উঠবে। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উল্টো। বর্তমান সরকারের শুরুতেই চবি’র উপাচার্য হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছিলেন প্রয়াত প্রফেসর ড. আবু ইউসুফ ও প্রফেসর ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। ভিসি আবু ইউসুফের অসুস্থতার কয়দিন আগে ছাত্রলীগের বিবাদমান গ্রুপ ভয়াবহ সংঘাতে লিপ্ত হয়েছিল। মুখোমুখি সংঘাতের মধ্যখানে গিয়ে প্রফেসর আবু ইউসুফ ছাত্রলীগের বিবাদমান গ্রুপকে শান্ত করেছিলেন। এরপর কিছুদিন শান্ত থাকলেও আবারও বিবাদ বিসম্বাদে জড়িয়ে পড়েছে এ ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটির নেতা কর্মীরা। প্রফেসর ইফতেখার দক্ষতার সাথে তাদের শান্ত করার প্রয়াস অব্যাহত রাখেন। এরপরও তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাস হয়ে ওঠে রক্তাক্ত। বর্তমান অবস্থা এমন যে, নিয়ন্ত্রণহীন ছাত্রলীগকে কোনোভাবেই যেন শৃঙ্খলায় আনা যাচ্ছে না। সবচেয়ে বড় কথা এসব রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়াচ্ছে সংগঠনটির মূল দলের চট্টগ্রাম মহানগরের নেতৃত্ব ভিত্তিক বিভিন্ন দলীয় গ্রুপ। গ্রুপগুলো শাটেল ট্রেন ও হলভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারসহ টেন্ডারবাজীর ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে এমন অভিযোগ শিক্ষক নেতাদের। সুতারং গোড়ায় গরদ রেখে চবি ছাত্রলীগকে শান্ত করার কোন উদ্যোগই সফল হবে না বলে মনে করেন শিক্ষকরা। এক্ষেত্রে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামীলীগের নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এক কথায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া সংঘাত কমানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। চবি প্রক্টরও তাই মনে করেন।
শুক্রবার দৈনিক পূর্বদেশসহ স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত সচিত্র প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বৃহস্পতিবার বিকালে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে অন্তত ৫জন আহত হয়। গ্রুপ দুটি সিক্সটি নাইন ও সিএফসি। সিক্সটি নাইন গ্রুপটি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু ও সিএফসি (চুজ ফ্রেন্ডস উইথ কেয়ার) গ্রুপের নেতা সহ সভাপতি মির্জা খবির সাদাফের অনুসারী। সিক্সটি নাইন গ্রুপটি সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী ও সিএফসি গ্রুপটি শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যরিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী। আমরা লক্ষ্য করে আসছি, গত প্রায় ১৫ বছরে বিশ্ব বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শৃঙ্খলাভঙ্গ ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকায় ছাত্রলীগের অন্তত ১৯০ জনকে বহিষ্কার করেছে। যাদের ছাত্র জীবন প্রায় বিপন্ন। এরপরও সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের কোন অনুশোচনা হয়নি, তারা কোনভাবেই শান্ত হচ্ছে না। সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ছাত্রলীগ যেমন তোয়াক্কা করে না, তেমনি সংগঠনের নেতাদেরও মানে না। সর্বশেষ গত ২৪ ফেব্রæয়ারি সন্ধ্যায় একটি হলের কক্ষ দখলকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়। কিন্তু এসব সংঘর্ষ বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বড় ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা করলেও হিতে বিপরীত হয়। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রশাসন অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চত না করে সমঝোতাকেই সমস্যা সমাধানের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে। ফলে শাস্তি না পাওয়ায় অপরাধীরা বার বার পার পেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে আছে। বহিষ্কৃত হওয়ার পরও নেতা-কর্মীদের দাপট কমেনি। তারা ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ান। হলে থাকেন। এমনকি সংঘর্ষেও জড়ান। কিন্তু প্রশাসন নিরব থাকে।
আমরা মনে করি, ছাত্রলীগকে শৃঙ্খলায় আনতে হলে রাজনৈতিক লেজুড় বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে মূল দলের রাজনৈতিক নেতাদের দায় রয়েছে। আমরা নব্বই দশকে দেখেছি, ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল ভিন্ন আদর্শের পৃথক দুটি সংগঠন। একদিকে সাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠনের আধিপত্য অপরদিকে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের সংঘাত। অবস্থা যখন খারাপের দিকে তখন চট্টগ্রাম মহানগরের দুই নেতা প্রয়াত মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং বর্তমান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আর নোমান একসাথে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গিয়ে ছাত্র সংগঠনদ্বয়ের মধ্যে বিবাদ মিমাংসা করে দেন। পরে তারা একসাথে জোটবদ্ধ হয়ে চাকসু নির্বাচন করে বিজয় ছিনিয়ে আনেন। এখন পৃথক দুটি দল নয়, মাত্র একটি দলের আভ্যন্তরীণ সংঘাতে ক্যাম্পাস রক্তাক্ত হবে, শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হবে-তা মেনে নেয়া যায় না। এজন্য মহানগর আওয়ামীলীগের নেতৃত্ব, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বসহ চবি প্রশাসনকে ভূমিকা রাখতে হবে।