কবি শাহীন রেজা ও তাঁর সমকালীন কবিতা

16

 

মানুষ স্বভাবত আবেগপ্রবণ। প্রত্যেক মানুষের আলাদা একটি জগৎ থাকে। সে জগতে কিছু কিছু গোপন উপলব্ধি ও অনুভূতি থাকে যা প্রকাশ করতে মুখ ও মুখের স্বর মিলে কলমের আগায় কালি আঁকতে হয়। তা বিভিন্ন অনুষঙ্গের আদলে, বিচিত্র ছন্দে ও নানান রকম রূপান্তরে শব্দের পর পর শব্দ দিয়েই একটি তৈরি হয়। যার নাম অনেকেই বলেন – কবিতা। তবে আমি বলি – অনুভূতি প্রকাশ। যা একান্ত আমার। যা আমার একান্ত পৃথিবী জুড়ে উন্মুখ উপস্থিতি।এই উপস্থিতি কালে কালে মানুষ থেকে মানুষের আবেগ ছুঁয়ে – কল্পউপাদান থেকে বাস্তব কলাকৌশলে লিখেন ভিন্ন ভিন্ন কাব্যিক প্রয়াস। যা লেখকের অন্তর – গহনে অঙ্গীকার। এটি একটি শিল্পের কারুকাজ। এখানে যিনি এটি সাজান তিনি শিল্পী, তিনি কবি। এই কবি মানুষ পড়তে পারেন, চোখ বুঝতে পারেন আবার শব্দ পর শব্দ দিয়ে ঝিনুকের পেট থেকে মুক্তো বের করতে পারেন। যে হাতুড়ি গান গাই, ধর্মের গীত করে সে রকম করে গভীর জল থেকে শাসুক খেলাও উদ্ধার করতে পারেন। এমন উদ্ধার ও মনোবৃত্তির অসাধারণ নির্মাণ বা শব্দমিনার বানান তেমন মানুষের প্রেমে না পড়ে তো বাঁচার স্বাদ খুঁজবো কিভাবে? আমি বাঁচার জন্য, জীবন উপভোগের জন্য, কারো প্রেমিকা হওয়ার জন্য সেই কিশোর বয়সে হাসান হাফিজের প্রেমের কবিতায় ডুবেছিলাম। ঠিক তেমনি আমার পূর্ণবতী বয়সে এই রকম আরও অনেক প্রেমে পড়েছি। যেমন আল মাহমুদ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, বিনয় মজুমদার অনেকেরই। তাঁদের পরের পর পরের প্রজন্মের অনেকেরই কবিতা আমি পড়ি, চর্চা করি। তাঁর মধ্যে আমি যাকে সবকিছু বেশি চর্চা করি বা পড়ি তিনি হলেন কবি শাহীন রেজা। যাঁর ভেতর অসাধারণ সারল্য ও সাবলীলতা প্রশংসনীয়। দেখতেও বেশ সুন্দর ও মার্জিত মানুষ। তাঁকে দেখলে শিল্প গুণের বহু ভুবন আশা জাগায়। বলা যায় – তাঁর অন্তর – আত্মায় কবিতার গুণাঞ্চলের শীতলধারা বয়ে চলে।যেকোনো পাঠক তাঁকে কবিসত্তার ভেতর পরিভ্রমণ করে। সেজন্যই আমিও তাঁকে ভ্রমণ করি। তাঁকে আমি বাংলাদেশ সাহিত্যের উজ্জ্বল ও সার্থক কবি নাম দিয়েছি। তাঁকে আমি পড়ার আগেও তিনি সাহিত্য জগতে বীরদর্পে জায়গা করে নিয়েছে। তবে যা বলেছি তা আমার একান্ত প্রকাশ। কারণ তাঁর কবিতা গাঁথুনি শক্ত, আবার নরম জলের মতোও। মাছ উলটে -পাল্টে যেভাবে দুইদিকে চেটে খাওয়ার মত। কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি ; কবি – কেননা হৃদয়ের কল্পনার এবং কল্পনার ভেতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতা সারবত্তা রয়েছে এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্য বিকীরণ তাদের সাহায্য করেছে। সাহায্য করছে ; কিন্ত সকলকে সাহায্য করতে পারে না ; যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভেতর অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবস্তু রয়েছে তারাই সাহায্য প্রাপ্ত হয়; নানা রকম চরাচরের সম্পর্কে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়।”
কবিতাকে বিভিন্নজনে বিভিন্ন ভাবে সৃষ্টি করে। কবিতা একটি রূপান্তর ও ভাব প্রকাশের মাধ্যম। যা মনের চিত্রপটের অসাধারণ বয়ান। এই বয়ানগুলো হৃদয় ছুঁয়ে যায়, শরীরের প্রতিটির কোষের রক্ত সঞ্চার করে। প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করে, সুখ দুঃখের ভেতর বিস্ময়ের আদলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। স¤প্রীতি অনেক কবির কবিতা পাঠ করেছি তবে কেন যেনো আশির দশকের কবি শাহীন রেজার কবিতা এক্ষেত্রে অন্যতম ও অসাধারণ বুনন। যেমন আগুনে পুড়ে যেতে যেতে সোনা খুঁজে পাওয়ার মতো। এখন সময় ই কর্মাস যুগ। এই যুগে তাঁকে বাংলাদেশ ছাড়িয়েছে অনলাইনে মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ বা কবিতা পাঠ, আলোচনা বা বৈশ্বিক সাহিত্যের সাথে চমৎকার মধুর মেলবন্ধন পরিলক্ষ করা যায়।ভার্চুয়ালিও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তরুণের সরব। তবে আজ আমি সমকালীন কবিতাগুলো নিয়ে বলবো। সেগুলো পাঠ করে – আমি রীতিমতো নিজেকে ভাঙছি ও শিখছি। যেমন –
“ঘুমের ভেতর শিউরে উঠছে রাত / আজ জোছনা নেই / অন্ধ কাপালিক জেগে জেগে পাথরে আঁকছে ক্রোধ / আহা পাতা ঝরছে টুপটাপ শিশিরের মতো (বিষন্ন হলুদ/ ১/১২/২০)
এই কবিতায় কিভাবে যে প্রকৃতি বদলায়, মানুষের জীবনেও কিভাবে দুঃখের পর সুখের জন্য মানুষ/ পাখি অপেক্ষা করে তার ভেতর মানব রহস্যময়ের জাগতিক দর্পণে মুখভাসে তার প্রতিচ্ছবি।এই রকম আরও নিত্য-নতুন পড়ার সুযোগ হচ্ছে ফেইসবুকের বদৌলতে। যেমন – ভুলে যাই, যাদুকর এবং কবি, কুয়াশার ডাক, সমতা বৃশ্চিক, অস্তরাগ, থামোশ, সে, উনুন, ধারাপাত, অন্ধকারের গল্প, যাও পাখি বলো তারে, শিউলির কান্না শুষে জমেছে শিশির আরও অনেক কবিতা তাঁর টাইমলাইন পড়ার সুযোগ হলো। তিনি অন্ত্যমিলের কবিতা লিখেন। যেমন – চাইলেই পাখি হও / চাইলেই নদী / এর নাম স্বাধীনতা / মনে করো যদি। আবার এতো অসাধারণ হাইকু লিখেন যা অনেকেই লিখতে পারবে কিনা আমার সন্দেহ হয়। হাইকু একধরনের ছোট কবিতা। যা ৫+৭+৫ অক্ষরের হয়ে থাকে। কবি শাহীন রেজার ব্যক্তিত্ব অসাধারণ ও উদার। এই উদারতায় কতো যে নবীন ও প্রবীণ লেখককে তাঁর একশত কবির পছন্দের তালিকা করে বই বের করার আগ্রহ করে তিনি সবার কাছে অনন্য হলেন। সেখানে নবীন লেখক হিসেবে আমিও লিপিবদ্ধ হলাম। এটি বড় পাওয়া আমার জন্য। উনার মতো একজন লেখক আমার কবিতা পছন্দ করা মানেই সমৃদ্ধ হওয়া।
শাহীন রেজা বাংলাদেশের আশির দশকের একজন প্রতিনিধিত্বশীল কবি। জন্মেছেন ১৯৬২ সালের ২৯ মে পিরোজপুর জেলার পুখরিয়া গ্রামে। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ২৯। কবিতা ছাড়াও ছড়া, প্রবন্ধ, গল্প মিলিয়ে তার অন্যান্য প্রকাশনার সংখ্যা ৭। প্রথম কবিতার বই বের হয় ১৯৮২ সালে, বইয়ের নাম অগ্নির গ্রোতে জল। লেখালেখির শুরু ছড়া দিয়ে সেই স্কুল জীবনে। এরপর কবিতায় স্থিত হন। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ, হরিণ আলোয় কাচ চোখ, দ্বিতীয় দরোজা, শরতেও মেঘ নামে, নারী কাব্য, পাখি চলে গেলে কবি বড় একা, প্রজাপতি ও বালিকারা, অসতর্ক জোছনায়, নির্বাচিত কবিতা, এসেছ কি ভুল চাঁদ পৌষের ঘরে, ংবষবপঃবফ ঢ়ড়বসং ইত্যাদি। কবিতায় বিশেষ অবদানের জন্য লাভ করেছেন, বন্দেআলী মিয়া স্মৃতি পুরস্কার, সুকান্ত স্মারক সম্মাননা, ঢাকা পোস্ট স্বর্ণপদক, কীর্তনখোলা পদক, সাহিত্য দিগন্ত স্মারক সম্মাননা, ইউকে বেসড পত্রিকা হোয়াটসঅন প্রবর্তিত রাইটার অব দ্য ইয়ার সম্মাননা, ক্যামব্রিয়ান কালচারাল একাডেমি এওয়ার্ড প্রভৃতি। পেশাগত জীবনে সাংবাদিকতা ও মিডিয়ার সাথে জড়িত কবি শাহীন রেজা সম্পাদনা করছেন দৈনিক মুক্ততথ্য নামক একটি জাতীয় দৈনিক। তিনি কবিতা বিষয়ক পত্রিকা কবি এবং কবিতার সম্পাদক। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হৃদয় মিডিয়াভিশনের চেয়ারম্যান শাহীন রেজা, বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান ফেয়ার এন্ড ফেয়ার এরও কর্তধার।বরণ্য এই কবির জন্মদিনে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানাচ্ছি। তাঁর আগামী আরও মঙ্গলময় হোক।