কবি শাহিদ আনোয়ার স্মারক সংখ্যা স্বৈরাচারী সময়ের খতিয়ান

8

মোস্তফা হায়দার

একটি ছোটো কাগজ সাহিত্যের অনেক ঘরের খবর যেমন দেয় তেমনি অনেক বিরহের সংসার যাপন দেখায়। শিল্পের শোকেসও বলা যায়। কিন্তু যখন ছোটো কাগজটি হয়ে উঠে একটি স্মারক সারথী তখন বয়ে বেড়ায় বিশাল শক্তি। স্মারকটিতে একটি জীবনের কথা বললেও অনেকগুলো প্রাণের সংমিশ্রণ থাকে বলে ভেতরাত্মায় সুখ যাপন বাড়ে। আর সাহিত্যের কুশিলবদের দৌড়ের গতি মাপতেও সুবিধা হয় স্মারকপাতায়। তেমনি একটি স্মারক গ্রন্থের পাঠউন্মোচন প্রক্রিয়ার কল্যাণে দ্রæত পেয়ে যাই ‘মধ্যাহ্ন’ ছোটোকাগজটি। মধ্যাহ্নের এবারের আয়োজন ছিল সময়ের চেয়ে বহুগুন এগিয়ে থাকা মেধবী কবি শাহিদ আনোয়ার সংখ্যা। কবি শাহিদ আনোয়ার কবিতায় সামাজিক পরিবর্তনের রূপরেখা আঁকতে চেয়েছিলেন। শব্দ আর বাক্যের সংসারে কবি শাহিদ আনোয়ার ছিলেন মেধায় নুয়ে থাকা এক সাধকপুরুষ। এ কবিকে ভালোবাসতে গিয়ে তাঁর সময়ের সতীর্থরা বাক্যের পরতে পরতে তাদের মূল্যায়ন বাড়াতে সচেষ্ট ছিলেন।
সম্পাদক নিজস্ব নীতিতে থেকে তার সময়ের একান্ত বন্ধুকে নিয়ে আয়োজনটি করে যে হৃদ্যতা দেখিয়েছেন সেটাও কম কিসে। কে করে কার জন্য! আর সাহিত্যের এ জায়গাটি বড়ই মসৃণ। কেউ কাউকে স্বীকৃতি দিতে চায় না, কেউ নিজের খেয়ে অন্যের মোষ দৌড়াতেও চায় না। কবি ও সম্পাদক মধ্যাহ্নের এবারের আয়োজনটি তথা কবি শাহিদ আনোয়ার স্মারক সংখ্যাটি করে বিশ্বদূর্যোগ করোনাকালীন পরবর্তী সময়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় দিলেন যেন। বহুদিন হাসতে পারে নি, বহুদিন গায় তে পারে নি, বহদিন কাঁধে কাঁধ রেখে মানুষ বসতে পারে নি। সেটা থেকে কিছুটা বের হওয়ার উপক্রম হয়েছিল মধ্যাহ্নের কল্যাণে।
মধ্যাহ্ন কাগজটি কবি শাহিদ আনোয়ারের সৃষ্টিশীলতাকে তুলে ধরবার যে প্রয়াস দেখিয়েছে সেটি হয়ত আরো দীর্ঘায়িত হতে পারতো, তবে কবির জন্মদিনে যথাযথ সময়ে পাঠকদের হাতে পৌঁছে দিতে পারায়ও সম্পাদকের একটা কমিটমেন্ট বলা যায়। কবি শাহিদ আনোয়ারকে সবাই মোটামুটি রাজনৈতিক বিপ্লবী পুরুষ দেখানোর চেষ্টা করলেও আমার কাছে মনে হয়েছে একজন মেধাবী কবিকে ছোটো করার চেষ্টাটাই ফোটেছে। একজন শাহিদ আনোয়ারের মত হাজারো যুবক তখন এখন রাজনৈতিক তথা সামাজিক পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও কে কোথায় বসে করছে সেটাই দেখবার বিষয়। কোন্ সময়ে করছে সেটাও বুঝবার বিষয়। কোন্ পাত্রে বসে করছে সেটাও ভাববার বিষয়! আসলে কবিতার ভেতর যন্ত্রণা অনেক গভীর। একটি কবিতার জন্য কারো কারো সন্তান বিয়োনোর মত নয় থেকে দশ মাস অপেক্ষা যেমন করতে হয়েছে তেমনি কারো কারো সারা জীবন অপেক্ষা করতে হয়েছে। কবিতাও সে রকম। কবি শাহিদ আনোয়ার প্রতিনিয়ত একটি সুন্দর সময় যাপন করার জন্য একটি সুন্দর কবিতার জন্য যে ধ্যানটুকু করেছেন সেটাই তার কবিতায় ধরা পড়েছে। তা না হলে শুঁড়িখানার নুড়ির মধ্যে একটি গোলাপ ফোটানোর উদ্যতা কিভাবে দেখতে পায়?এ শক্তিময়তার ধারণশক্তি কবিকে বারবার পীড়িত করতো বলে আমার বিশ্বাস।
তবে মধ্যাহ্ন স্মারক সংখ্যাটি শুধু একজন কবির পরিচয় বহন করেনি। মনে হয়েছে স্বাধীনতা পরবর্তী স্বৈরাচারি সময়ের একটি খতিয়ান। যেখানে জমা হয়েছে অনেক কিছুর ইতিহাস। একজন স্বৈরশাসকের সময় যাপন কিভাবে হয়েছে তার ইতিহাস ফুটে ওঠেছে তার কবিতায়। খুলনা জেল ’ কবিতাটি ছড়ার আদলে লেখা একটি শক্তিশালী কবিতা।
‘সৈন্য ঘেরা গোরস্থানে/অমন থাকার হুমকী মানে ’ এ বাক্যগুলো তার শক্তিময়তার প্রকাশ।
কবি শাহিদ আনোয়ারকে সময়ের অযাচিত ঘটনা খুব বেশী তাড়িত করেছে বলে বিপ্লবী বলা যাবে না। কারণ সে প্রথমত ছিল কবিতা পুরুষ। কবিতা পুরুষেরা দ্রোহের কিস্তিতে চড়ে আজীবন সময়ের বিপরীতে ও মানুষের পক্ষে কলম চালিয়েছেন। তবে এটা ঠিক স্বৈরাচারি সময়ে কিছু ব্যতিক্রমের উদয় হয় মুক্তমনাদের। সে জায়গা থেকে কবি শাহিদ আনোয়ার কে রাজনৈতিক দ্রষ্টাতেও দেখতে পেয়েছেন তার সময়ের বন্ধুরা। তার হাত ধরে অনেকেই বাম রাজনীতির বায়াত নিয়েছেন এমনটার তথ্য এ স্মারকে পাই। এটা কবির বিশাল শক্তিময়তাও বটে। কবি শাহিদ আনোয়ার স্মারক সংখ্যার কল্যাণে এবারের মধ্যাহ্নে পুরো চট্টগ্রামের অনেক তথ্যের সন্নিবেশন ঘটেছে। উত্তাল চট্টগ্রামের তথ্যের সাথে বাঁচতে শেখার লড়াইয়ের সূত্রাবলি উপস্থাপনের তথ্যও এ কবি সহ চট্টলার অনেকের তথ্য পাঠক হিসেবে দেখতে পাই।
একজন কবির দূদান্ত প্রতাপে গদ্যশব্দরা গীতল বাক্য যখন রচনার অংশ হয়ে ওঠে তখন কবি রাজনৈতিক বিষয়ক রচনা লিখে আমেরিকাকে সন্তুষ্ট করতে পেরে সে দেশ ভ্রমণের সুযোগ পেয়ে ধন্য হলেও এক ধরণের ভীতসন্ত্রস্ততা তাঁকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়ে শেষ যাপনে করেছে বিশ্বাসী চতুর! সবাইকে এটাকে সিজোফ্রেনিয়ায় দেখালেও পাঠক ভিন্নতাও পেয়েছে তার কবিতায়।
কবির কবিতার শক্তির ভেতর এ সংখ্যার সব লেখক প্রবেশ করতে পারেননি। দূর্বলতা নয়, হয়ত এড়িয়ে যাওয়া। তা না হলে লেখতে পারা কবি ও লেখকগণ কবিকে মূল্যায়ন করেছেন ক্ষীণকায়। দু একজন নিজেদের সর্বোচ্চ দেয়ার চেষ্টা করেছেন। কবি হাফিজ রশীদ খান হাত খুলে কবিকে নিয়ে লিখেছেন। অনেকটা নিরপেক্ষ কেতাদুরস্তে কবিকে নিয়ে লিখতে গিয়ে তার প্রবন্ধের শেষ করেন ঠিক এভাবে- দদআমার বিশ্বাস, কবিকে পন্ডিতের আসনে বসানোর কোনো আয়োজন অতিরেক প্রত্যাশার আতশবাজি বই নয়। কবি তো অতিসাধারণ এক মানবীয় সত্তার লোকায়তে বিস্তৃত এক উদগ্রীব আগ্রহমাত্র। তার মেধা বা বৃদ্ধিবৃত্তি সম্পূর্ণত অপার সংবেদনার অধীন। যে সংবেদনা তাকে নিভৃতে কবিতা লেখায়, সৌরলোকের স্বচ্ছ বিয়াবানে নিয়ে যায়।”
কবি শাহিদ আনোয়ার বিশ্বাসের জায়গা থেকে বেড়ে ওঠা এক উত্তরপন্থী। যাপনক্রিয়ায় সাম্য আর মানবতার কাজে ব্রত হতে হতে কখন যে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বিশ্বাসের চরাচরে পা দিলেন তা যেন নিজেও জানতেন না- মনে করছেন তা সতীর্থরা। আসলে বিশ্বাসের ঔরসের ঐশ্বর্যের মানুষগুলো কখনো না কখনো নিজের বৃত্ত ভাঙবেনই। কবি শাহিদ আনোয়ার তার শেষ সময়ে যে কবিতাগুলো জন্ম দিয়েছেন সে গুলো তার অসুস্থতার দায় কবিতা বললে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। কবিতা গুলো তার বিশ্বাসের ঔরসের। এটাকে এড়িয়ে গিয়ে যারা ভিন্ন স্বাদে রূপান্তর দিয়েছেন তারা কবির বিশ্বাসে আঘাত করার চেষ্টা করেছেন। যেমনটি কবি আল মাহমুদের ক্ষেত্রে করা হয়েছে। বিশ্বাসের তরীতে পা রাখলেই চেতনারা ক্ষেপে ওঠে লকলকি রশি বেয়ে।
কবিতা পুরুষদের মধ্যে রেজোয়ান মাহমুদ, খালেদ হামিদী কবি শাহিদ আনোয়ারকে যথাযথ জায়গায় নিতে চেষ্টা করেছেন। মধ্যাহ্নের আয়োজনে কবিপত্নীর লেখাটিতে যথার্থই কবি শাহিদ আনোয়ারকে পাওয়া গেছে। কবিতার কারিগরই কবিকে যথাযথভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন কবিপত্নী কবি বলেই।
অনেকেই চমৎকার লিখেছেন কবি শাহিদ আনোয়ারকে নিয়ে। উপজীব্য যাই হোক না কেন কৃপণ এ সময়ে কে কাকে নিয়ে লিখে! তবে তাঁর সময়ের প্রায় সতীর্থরাই তাঁকে ভালোবাসতে করেনি কোনো কসুর। এটাকে বলে যে কোনো সতীর্থের দায়বদ্ধতা।
পাঠকের কৌতুহলের অবসানকল্পে এ সংখ্যার লেখিয়েদের তালিকা তুলে ধরছি। তারা হলেন- অজয় দাশগুপ্ত, আবু মুছা চৌধুরী, আলমগীর ফরিদুল হক, আহমেদ মুনির, ইউসুফ মুহম্মদ, উত্তম সেন,ওমর কায়সার, খন্দকার সাখাওয়াত আলী, জিললুর রহমান, নীলাঞ্জন বিদ্যুত, বাদল সৈয়দ, মনিরুল মনির, মাইনুল হাসান চৌধুরী, শোয়েব নাঈম, সনতোষ বড়ুয়া।