কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার কাব্যভাষা

52

ড. শ্যামল কান্তি দত্ত

বিশ শতকের ষাটের দশকে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উত্তাল তরঙ্গে আবির্ভূত বাঙালি কবিগণের অন্যতম কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা (জন্ম: ১৯৪৯)। ‘সমকাল’ (ত্রৈমাসিক সাহিত্য-পত্রিকা, প্র.প্র. ১৯৫৭) সম্পাদক সিকান্দার আবুজাফর (১৯১৮-১৯৭৫) এর ‘সিরাজউদ্দৌলা’ (১৯৬৫) নাটক এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫) এর ‘আমাদের বাঁচার দাবী: ৬-দফা কর্মসূচী’ (১৯৬৬) পুস্তিকা প্রভৃতি প্রকাশের মধ্য দিয়ে ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে পূর্ব-পকিস্তানের জনগণ যখন স্বতন্ত্র জাতিসত্তা নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র লাভের সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ, সেই সময়ে ষাটের বৈশিষ্ট্যে স্নাত হয়ে কবি বাংলা ভাষার কাব্যাঙ্গনকে আবাদে উর্বর করতে অগ্রসর হন। বাংলা কবিতার ইতিহাসে: ‘স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টির চেষ্টা ষাটের দশকে লক্ষণীয়’(স্বপন, ১৯১৭:১১)। তবে ষাটের সংগ্রামী স্রোতে কবি নিজেকে গড্ডলিকা প্রবাহে ভাসিয়ে না দিয়ে তাঁর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছেন স্বকীয় কাব্যকৌশলে ও ভাষাশৈলীতে। কাব্য-সমালোচকের ভাষায়Ñষাটের দশকে যে কয়জন কৃতী কবি বাংলাদেশে বিশেষত বাংলা সাহিত্যে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বৈচিত্র্য নিয়ে হাজির হয়েছিলেন তাঁদের ভেতর মুহম্মদ নূরুল হুদা অন্যতম (আশরাফ, ২০১৬)। অথচ, উইকিপিডিয়ায় আছে: ‘মুহম্মদ নুরুল হুদা সত্তর দশকের একজন বাংলাদেশী প্রথিতযশা কবি’।
বিশ শতকের আশির দশকে বাংলাদেশে গহীন পরানের কবি সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) বাঙালির প্রাণ-স্পন্দন অনুভব করেই যেনো উচ্চারণ করেন তাঁর অমর পঙক্তিমালা: ‘আমারে যেদিন তুমি ডাক দিলা তোমার ভাষায়/ …ভাষাই আপন করে আর সেই ভাষা করে পর’ (পরানের গহীন ভিতর ২৩)। বাংলাদেশের আঞ্চলিক ও লৌকিক ভাষারীতির মিশেল এক মায়াময়-কাব্যিক ভাষাশৈলীতে লেখা তাঁর ‘পরানের গহীন ভিতর’ (১৯৮০) কাব্যগ্রন্থটি তাঁর রচিত অন্যান্য কাব্যগ্রন্থগুলোর চেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। সৈয়দ শামসুল হক সে-ভাষাশৈলীর চর্চা অব্যাহত রাখেননি বটে। তবে সে-সময় থেকেই যেনো বাঙালি কবিকুল আরও গভীরভাবে অনুধাবন করেন: ‘আসলে ভাষাই হইল একমাত্র ভাবের পালক’(ঐ)। বাংলাদেশের কবিগণ নিজেদের আঞ্চলিক ভাষা ও লোকভাষা প্রয়োগে স্বতন্ত্র কাব্যভাষা বিনির্মাণে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। এপ্রসঙ্গে উল্লেখ্য বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষাগুলোর মধ্যে বোধগম্যতার দিক দিয়ে চট্টগ্রাম-নোয়াখালি-সিলেটের উপভাষা সবচেয়ে দূরবর্তী আঞ্চলিক ভাষা (শ্যামল, ২০১৮: ৮৮)। এমনকি এইসব অঞ্চলের ভাষাপ্রেমে আবেগতাড়িত মানুষ নিজেদের মুখের ভাষাকে পৃথক ভাষা বলেও ভাবেন (অবশ্য এ ভাবনা ভাষাবৈজ্ঞানিক নয় মোটেই)। সাধারণ বাঙালির কাছে এমন দূরবর্তী-দুরূহ ভাষায় কাব্য রচনার পরীক্ষায় একুশ শতকের শুরুতে এগিয়ে আসেন কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। নিজের জন্মভূমি কক্সবাজারকে দরিয়া নগর অভিধা দিয়ে তিনি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলে বেড়ে ওঠা বাঙালির লোকবুলিতে ব্যবহৃত শব্দভান্ডারকে প্রথম আধুনিক কবিতায় স্থান দিয়ে প্রণয়ন করেন তাঁর ‘দরিয়ানগর কাব্য’ (২০০১)। দুর্বোধ্যতার কথা মাথায় রেখে তিনি কিছু কবিতায় বেশ কিছু পুর্ণ বাক্যও ব্যবহার করেছেন পুরোটা আঞ্চলিক ভাষায়। তবে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে একটু কি দ্বিধা ছিল! তাই কি আওড়ান: ‘আল্লারসুল ছাড়া আঁআর আর ভরসা নাই’। পরক্ষণেই আবার: ‘তবে কাব্য শুরু জগৎগুরু চরণে প্রণাম/ কলম হাতে নিলাম বিষ্ণু ব্রহ্মা নাম/ জয় জগৎগুরু’ (কলম হাতে ধরি)। আবার এ বিষয়টাকে তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ সমন্বয়বাদী মনোভাবের প্রকাশও বলা যায়। তাইতো তিনি বলতে পারেন: ‘জল বলো পানি বলো মানি সব মানি/ জোয়ারে উথলে ওঠে,/ ভাটায় ধপাস ভাঙে এই বুকখানি’ (ইজারা ঘাটের গল্প)। এখানে কবিতার একটি বাক্যে জল-পানিকে মানার কথা বলে তিনি হিন্দু-মুসলিম দুধর্মে বিশ্বাসী মানুষকেই যেনো মেনে নেনÑমনে ঠাঁই দেন। জল-পনির বিভেদ স্মরণ রেখেও একই পঙক্তিতে বসিয়ে প্রমাণ করেনÑতিনি বিভেদের নয় বরং ঐক্যের ভাষাকে মানেন এবং বাস্তবে তাঁর কাব্যভাষাতে ব্যবহার করেন। প্রমিত বাংলা ভাষার সাথে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগও এক অর্থে ভাষার ঐক্য প্রয়াসের প্রমাণ আবার কবির স্বতন্ত্র শৈলীরও নিদর্শন।
মধ্যযুগের বাঙালি কবি আবদুল হাকিম (সন্দ্বীপে জন্মনিলেও তাঁর রচিত ‘নূরনামা’ কাব্যে ‘ন জানি’, ‘ন যায়’ ইত্যাদি চট্টগ্রামের ভাষার প্রয়োগ পাওয়া যায়) (১৬২০-১৬৯০) থেকে শুরু করে আরও অনেকের কবিতায় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার শব্দ প্রয়োগের প্রমাণ পাওয়া গেলেও কবি মুহম্মদ নূরুল হদাই প্রথম চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার পূর্ণাঙ্গ বাক্য আধুনিক বাংলা কবিতায় প্রয়োগের নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন। এমনটা সম্ভব হয়েছে কারণ তিনি সমুদ্র-সন্তান; তাঁর কবিতার ভাষায়: ‘দইজ্জার কুলত সিনা গরি বার/ আমি দইজ্জার মানুষ’ (কলম হাতে ধরি)। আর এই দইজ্জার পারের দিলদরিয়া মানুষের বৈশিষ্ট্য তুলে আনতে দক্ষিণ চট্টগ্রাম বা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কবি লেখেন:
‘এই নগরত থাইক্কুম বাঁচি হাজার বছর। …
ফণার উয়র ফেণা ধরি দইজ্জার নাচানাচি
হেই দইজ্জার নুন-বিষ খাই আঁইও আছি বাঁচি।
দইজ্জা আঁআর রাইতর ডাকাইত, দউজ্জা দিনর ভাত
দইজ্জার লগে কবুল আঁআর জনম বরাত।’ (দইজ্জার মানুষ; দরিয়ানগর কাব্য)। ‘দরিয়ানগর কাব্য’ রচনার পরে আর কোনো কাব্যে কবি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগ না করলেও তাঁর প্রদর্শিত পথে পরবর্তী প্রজন্মের কবিগণ {দ্র: সিরাজুল হক সিরাজ, বোআঁড়ি (২০১১); কমরুদ্দিন আহমদ, গন্ধরাজের ঘ্রাণ (২০১৭); নিলয় রফিক, নোনা মানুষের মুখ (২০১৭)} নিষ্ঠার সাথে নিয়োজিত থেকে সাফল্য পেয়েছেন এবং এই ধারাকে বেগবান ও জনপ্রিয় করে তুলছেন। মাতৃবুলির সাথে মাতৃভ‚মির সংস্কৃতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য; আর তাই সেই সংস্কৃতির কথাও কবিতায় আসা অবধারিত। নিজের জন্মভ‚মিকে তিনি অভিহিত করেন, ‘কক্সসাহেবের বাজার এখন দরিয়া নগর’ (দইজ্জার মানুষ)। আর এই দরিয়া নগরেরর সংস্কৃতি যে সমুদ্রসংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত তাও অজানা নয় সমুদ্রপাড়ের মানুষের; কবি লিখেন, ‘ফেননিভ হে সমুদ্র, এইমতো শ্রমে ঘামে তোমার সংস্কৃতি’ (সমুদ্র সংস্কৃতি)। এতে যেনো অতি অকস্মাৎ কবি জসীমউদদীনের মতো কবি মুহম্মদ নূরুল হুদাকেও তাঁর জন্মজনপদ ডেকে বলে, ‘তুমি যাবে ভাই, যাবে মোর সাথে’ আমাদের সেই দরিয়ায়। সমুদ্রের ডাকে সাড়া দিয়ে কবি ধন্য হন; কেন্দ্রের ‘জাতিসত্তার কবি’ অভিধার সাথে যুক্ত হয় প্রান্তের ‘দরিয়ানগরের কবি’। আর তাইতো তাঁর অমিত উচ্চারণ: ‘আমি দরিয়ার বুকে এসে পেয়ে যাই অন্য অভিজ্ঞান’ (সমুদ্রনিদান)। কবি দরিয়া নগরের ঐতিহ্যের সাথে প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন জনপদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সমিল সবিস্তারে বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেন, ‘দরিয়া কুমারিকা, কাঁখে তার মাঙ্গলিক ঘট/ জয় পুন্ড্র হরিকেল জয় সমতট’ (বয়া)। এই সংস্কৃতির অবিনাশিতায় অনুপ্রাণিত কবি ঘোষণা করেন, ‘জয় হোক, আত্মসংস্কৃতির জয়’। এই আত্মসংস্কৃতির সাথে ইতিহাস-ঐতিহ্যকেও তুলে আনেন কবি তাঁর কাব্যভাষায়। তিনি বিশ্বাস করেন, ‘মানুষ পাখি ও মাছ যুগলাঙ্গ গড়ে তোলে দরিয়া নগর’। প্রেমজ-কামজ দরিয়ানগরের জনজীবনের চমৎকার চিত্রকল্প কবি তুলে আনেন তাঁর নিপুণ কাব্যভাষায়:
‘ঘরে ঘরে চাঁদের কামিজ গায়ে দরিয়ামানবী
নিশীথ বন্ধন চেয়ে প্রিয় পুরুষের
শরীরের ভাঁজ খুলে ডুব দেয় নহরের জলে,
তারপর নাড়ার আগুনে রাঁধে ভাত,
কুঁচো চিংড়ির সাথে লাউঝোল, ধনেপাতা,
দরিয়া মানব আসে, আঙিনায় পিঁড়ি তার পাতা।’ (দরিয়াশিশু; দরিয়ানগর কাব্য)।
লোক-সংস্কৃতির সাথে লোকখাদ্যের বর্ণনা কবিতার পাঠককে নতুন স্বাদের সন্ধান দেয়। শুধু জনজীবন নয়, যেনো প্রকৃতির জীবনও কবি কল্পনায় তুলে আনেন তাঁর কৌশলী কাব্যভাষায়: ‘পুরুষ ঝিনুক যায় রমণীর খোঁজে/ রমণী পুরুষ পেলে সুখে চোখ বোঁজে’ (ঝিনুকসুন্দরী)। এমন ছন্দময় ভাষা আর চিত্রকল্প নির্মাণ নূরুল হদার পাঠকপ্রিয়তার অন্যতম উপাদান। কেননা, চিত্রকল্পকে কবির অনন্য বোধ ও কল্পনার অভিব্যক্তি বা ভাবমূর্তি বলেও অভিহিত করা যায় (সরকার আমিন, ২০০৬: ০১)। আর এই অনন্য বোধের বিমানে চড়ে কবি তোলে আনেন তাঁর জন্মভ‚মির কিংবদন্তি: ‘মনে পড়ে কিংবদন্তী আদম-হাওয়ার।/ দরিয়া নগরে ওড়ে মানুষের সব স্বপ্ন সব পতাকার’ (বাতিঘর)। দরিয়ানগরের মানুষের মাঝেও বিভেদের দ্ব›দ্ব দূর করতে কবি নিজের আত্মপরিচয় তুলে ধরেন এভাবে, ‘আমি না চাটিগাঁই না রোঁয়াই/ না ধনমাণিক্য মহারাজের গোঁয়াই’ (নোনা পদ্য)। এভাবে কবি তাঁর পাঠককে স্মরণ করিয়ে দেন বাঙালি সঙ্কর জাতি, আমাদের বিদ্বেষমূলক জাত্যাভিমান মানায় না। তিনি বাঙালিকে মিলিয়ে দিতে গিয়েই লিখেন, ‘ইতিহাস তর্ক করে কবি দেয় মিল/ ¤্রােহঙ জন্মের ভাই, হাবিল-কাবিল’ (রোঁয়াই)। এমন সমন্বয়বাদী ভাবনা আর ভাষার কারণে ইতিহাস-ঐতিহ্য-কিংবদন্তি মিলে-মিশে একাকার হয়ে গড়ে ওঠে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার স্বতন্ত্র কাব্যভাষার শৈলী। ‘পদ্মাপারের ঢেউসোয়ার’ (২০০৪) কাব্যেও কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার সমন্বয়বাদী ভাষা-ভাবনার পরিচয় লক্ষ করা যায়। তবে এবার নাফ-কর্ণফুলীর পাড় ছেড়ে তিনি ফিরে যান কেন্দ্রেÑপদ্মাপারে। তাঁর কাব্যভাষার পরিবর্তন সম্পর্কেও যেনো পাই কবির স্বগতোক্তি: ‘আমার কথাগুলো কেবল হিজরত করে’ (সাতরঙা কথাগুলো)। সেখানে পৌঁছেই কবি আবার সকলের, এবার তিনি পদ্মাপাড়ের ভাষায় লেখেন, ‘আমি হগ্গলেরে বর্গা দিয়েছি চরের জমি’ (পদ্মারাজ)। তবু তাঁর বার বার মনে পড়ে যায় আমাদের অতীত জীবন, ইতিহাস, নৃতত্ত¡ আর জাতিসত্তার স্বরূপ। কেননা তিনি ভুলতে পারেন নাÑ তাঁর বেড়ে ওঠার সাথে অন্তরে ঠাঁই নেওয়া-‘মৈশখালি দরিয়ার নোনাজলে লেখা আছে সেই ইতিহাস’। আমাদের জাতিসত্তার কবি সে-ইতিহাস কাব্যিক ভাষায় বর্ণনা করেন এভাবে:
‘পিতামহের পিতামহ ছিলেন উত্তরের রাঢ়বাংলায়, তাঁর ছিল গিরিমাটির ঘর
আমার পিতা বাঁশের ঘর বানিয়েছিলেন দক্ষিণবাংলার নদীপাড়ে, তার পাশে রেতবালুর চর। তরজা বেড়ার ফাঁক গলিয়ে সকালের সূর্য আসে রশ্মিসড়কে,
উড়ন্ত ঘুরন্ত মায়ের লালপেড়ে শাড়ির বুড়ো সূতো, খয়েরি পোকামাকড়, খড় ঝকঝকে; আমি মাকড়শার জাল গুণতে গুণতে সেই আলোর সড়কেই ভাসাতাম মন; সেই মনভাসানে জড়ো হতো মুন্ডাভেড্ডি, আর্য-অনার্য আর
চিরায়ত বাংলার ঘটি ও বঙ্গালগণ।’ (বাংলায় আমার পিতার বুকের জংলায়; পদ্মাপারের ঢেউসোয়ার )।
এই নৃতাত্ত্বিক-সামাজিক ইতিহাস বর্ণনায় কবি আমাদের আর্যত্বের অহংকার অবদমন করে ঐক্যের পথে অগ্রসর হবার আহব্বান জানান। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসও উঠে আসে তাঁর বর্ণনামূলক কাব্যভাষায় ‘বজ্রবাঁশির গল্প’ হয়ে। রূপসী বাংলার দিকে তাকিয়ে কবি দেখেন: বঙ প্রজাতির লোকমানুষ থেকে/ সার্বভৌম বাংলার স্বাধীন বাঙালি,/ পাঠান শাসক ইলিয়াস শাহ থেকে বাংলার বাঘ এ. কে. ফজলুল হক,/ কিংবদন্তীর বিজয় সিংহ থেকে পল্টন মাঠের মৌলানা ভাসানী,/ রাখালরাজ গোপাল থেকে জাতির জনক শেখ মুজিবুর’। বাংলার ইতিহাসের মহানায়কগণ ঠাঁই পান তাঁর কবিতার ভাষায়। তাঁর এই ইতিহাস সচেতনতা আর ঐক্যচিন্তার সমন্বয়ী ভাষাশৈলী কাব্যপাঠকের অন্তরে মুগ্ধতা ছড়ায়। কিন্তু যে কবি ইতোমধ্যে ‘যিসাস মুজিব’ (১৯৮৫) ও ‘মুজিববাড়ি’ (১৯৯৬) শীর্ষক কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন এবং পরবর্তীতে ‘জাতিপিতা ও অন্যান্য কবিতা’ (২০১৬), ‘অনন্ত মুজিব জন্ম’ (২০২১) ও ‘শেখ হাসিনার মানবসময়’ (২০২১) শীর্ষক কাব্যগ্রন্থ লিখবেন, তিনি বইয়ের উৎসর্গে যখন লিখেন, ‘বাংলার চিরকালের স্বাধীন সত্তা/ মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী’ তখন পাঠকের কপালে ভাঁজ পড়ে। কবি নূরুল হুদার কবিতার পঙক্তিতে যখন পাওয়া যায়: ‘তোমার সামনে চির শ্রদ্ধানত বাংলার আবালবণিতা, মুক্তিজাগানিয়া/ জনযোদ্ধা, মুক্তির চ‚ড়ান্ত ঘোষক জিয়া’ (নজরুলসুন্দর)। তখন কবির ভাবনায়-ভাষায় পাঠক বিভ্রান্ত হতে বাধ্য। সমাজ-ইতিহাস বিষয়ে সচেতন পাঠকের প্রশ্ন-ভ্রুকুটির জবাব দিতে বা তাঁর বক্তব্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে কবি কুণ্ঠিত নয় মোটেইÑসমকালের সময়ের স্রোতে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রাজনীতির জোয়ারে কবির মানবিক অস্তিত্বতো আগলে রাখতে হয়। কেননা-‘এখন ক্ষমতা মানে অস্ত্র হাতে পারঙ্গম দখল নায়ক,/ এখন নেতৃত্ব মানে কনুইয়ের গুঁতাগুতি, বুটের ঠমক,-/ সপক্ষ বিপক্ষ বলো সব পক্ষ আউড়ায় অভিন্ন সবক-’ (দরিয়ানগরে জন্ম)। তবু কবি যখন লেখেন, ‘ইতিহাসের সত্য চাই/ জাতির ঐক্যমন্ত্র চাই।/ জিয়া মুজিব ভাসানী/ বাংলাদেশ আমানি’ (বাংলাদেশের আমানি)। তখন নিশ্চিত করে বলা যায় না এটি তাঁর স্বচিন্তিত ঐক্যের ভাবনা, না কি সেই রক্তচক্ষুর রাঙানি! পাঠক কিছুটা হলেও আস্থা ফিরে পান যখন কবির স্বীকারোক্তি পান: ‘আমরা সবকিছু খাই,/ তবে খাই না সামরিক গণতন্ত্রের হালুয়ারুটি, দুধকলা, কলাপাতা কিংবা কচি ঘাস’(পারমাণবিক ডিমে তা)। আবার, কবিতায় ব্যবহৃত ‘আমানি’ শব্দটি আরবি ‘আমান’ শব্দের সাথে -ই প্রত্যয় যোগে গঠিত। আমান শব্দের আভিধানিক অর্থ: নিরাপত্তা, আশ্রয়; আস্ত, অখন্ড ইত্যাদি। এভাবে ভাবলে-তিনি তিনব্যক্তিত্বকে এক পঙক্তিতে ঠাঁই দিয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিধান করতে চেয়েছেন কিংবা বাংলাদেশের অখন্ডতা অক্ষুণ্ণ রাখবার প্রত্যাশা করেছেন। আবার একই কাব্যে কবি যখন লেখেন, ‘তখন সর্বত্র পুণ্যাহের মহরৎ আর আমানির ধুম (বজ্রবাঁশির গল্প)। তখন ‘আমানি’ খাঁটি বাংলা শব্দ-তার আভিধানিক অর্থ: কাঞ্জি, কাঁজি, পান্তা ভাতের পানি। এতে করে ‘আমানি’ শব্দ একদিকে নিরাপত্তা বিধানকারী আবার লোকজ বাঙালির প্রিয় খাদ্য অনুষঙ্গ মিলে আভিধানিক অর্থকে অতিক্রম করে ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। শব্দের আভিধানিক অর্থকে মুক্তি দিয়ে ব্যঞ্জনা সৃষ্টিই কবির সৃষ্টিশীলতা। এখানেই কবির সার্থকতা। এমন সার্থক কবিই কেবল বলতে পারেন: ‘তোমার স্তানাগ্র-চ‚ড়া এটম বোমার চেয়ে ঢের বিস্ফোরক/ তোমাকে দেখার স্বাদ আমার দৃষ্টির গর্ভে আজন্ম কোরক’ (তোমাকে দেখবো বলে)। এই ভালোবাসার শক্তিতে বলীয়ান হয়েই কবি লেখেন, ‘ভালোবাসা শ্রেষ্ঠ মুদ্রা, কিনে নেয় জগতের ধন’। এ ভালোবাসা যে কেবল নিছক ব্যক্তিগত ভালোবাসা নয় তাও পাঠক বুঝেনেন যখন কবি বলেন, ‘একাত্তরকে ভুলে যাওয়া মানে লালসবুজের বাংলাদেশকে ভুলে যাওয়া (পারমাণবিক ডিমে তা)। এমনি তাঁর দৃঢ় বিশ্বাসের কাব্যিক রূপায়ণ। তাই কবির অমিয় আশাবাদ ফুটে ওঠে কবিতার সুরেলা-সরল ভাষায়: “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’
মৃত্যু পেরিয়ে জন্ম, পয়লা বৈশাখ পেরিয়ে পঁচিশে; রবীন্দ্রনাথ, বাঙালি আলোকজাতি, বাঙালির মৃত্যু নেই আততায়ী গোখরের বিষে’’ (বজ্রবাঁশির গল্প)। আশায় বসতি বলেই কবি ঘোর সংকটকালেও নিরাশ হন না বরং সরল কাব্যভাষায় প্রত্যাশা করেন, ‘তামাটে জাতির পথ তাহলে মিলুক এসে মানব মেলায়’ (মানবকল)। কেননা কবি মানেন এবং বিশ্বাস করেন, ‘মানুষ সংকটে জাগে, ঐক্য গড়ে ঘোর অবেলায়’ (মানবকল)। তাই এই গভীর সংকট কালে অবেলায়ও অবলীলায় বলা যায় নূরুল হুদা ঐক্যের কবি। এই ঐক্য কেবল ভাবনার নয় ভাষারও। তাইতো তিনি বাংলা ভাষার দূরবর্তী উপভাষা বা প্রান্তীয় আঞ্চলিক ভাষাকে অনায়াসে ঠাঁই দেন বাংলা ভাষার কবিতায়। প্রমিত বা মান বাংলার সাথে আঞ্চলিক ভাষার ঐক্য প্রতিষ্ঠার এই সফল প্রয়োগ প্রশংসার দাবি রাখে। বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা থেকেই কবি নতুন কাব্যভাষা নির্মাণে অগ্রসর হয়েছেন।
চলমান পৃথিবীতে সংস্কৃতির প্রতিটি উপাদানের মতো ভাষার পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। এরই ধারাবাহিকতায় কাব্যভাষা পাল্টেছে। আধুনিক বাংলা কবিতার জনক মাইকেল মধুসূদন দত্ত ধ্রæপদী ভাষা-আঙ্গিক ব্যবহার করেন। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈষ্ণব-পদাবলী ও সুফি-সন্তদের ভাষায় গীতিকবিতার কাছে ফিরে ফিরে গেছেন আর নজরুল কাব্যভাষায় ছড়ালেন দ্রোহের দীপ্তি। ত্রিশের কবিরা ভাষার বহিরঙ্গকে পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন কাব্যভাষা নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছেন। বাংলা কবিতার এই ক্রমবিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আধুনিক কালের দক্ষ কাব্যশিল্পী কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার অসাধারণ কাব্যশৈলী বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করেÑবাংলা ভাষা ও বাঙালির প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ করে। ভাষার প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা থেকেই তাঁর কিছু কবিতার ভাষা স্লোগানধর্মী আবার কিছু কবিতার ভাষা আবেগময় সুরেলা সব মিলেয়ে এক স্বতন্ত্র কাব্যভাষার কবি তিনি। আধুনিক যুগের বংলা কবিতায় চট্টগ্রামের ভাষা প্রয়োগের শুধু পথপ্রদর্শক নন এই ধারা প্রবহমান রাখতেও কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার অবদান অবিস্মরণীয়।