কবি ও কবিতা : সংগ্রামের নাম

12

আমাদের অনেক আন্দোলন সংগ্রামের কথা মনে আছে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত এই সঙ্কটময় সময়ে অবিভক্ত অঞ্চলে অনেক সংগ্রামের স্রোত চলেছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন,ঊনসত্তরের গণ আন্দোলন। এ সকল আন্দোলন ছিলো নিজেদের মুক্তি, নিজেদের অধিকার সুরক্ষা, দাবি আদায় এবং বিভিন্ন যৌক্তিক ইস্যুর বিরুদ্ধে আন্দোলন। রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক ইস্যু ছিলো উপজীব্য। একজন কবিও তাঁর কবি জীবনে পুরো লাইফটা মূলতঃ এরকমই একটা সংগ্রাম ও আন্দোলনের সমষ্টি। এখানে এই বিষয়টিকেই প্রমাণ করতে চেয়েছি।
জনৈক মিঃ এক্স রহমান। বয়স তের বা চৌদ্দ বৎসর। ক্লাস সেভেন কি এইটে পড়েন। একদিন মনের খেয়ালে একটা ছন্দ লিখে ফেল্লেন। শব্দের পরে শব্দ মিলিয়ে একটা ভাঙ্গাচোরা ছড়া টাইপের একটা কিছু লিখলেন। মিঃ এক্স রহমান খুব খুশি হলেন। ক্লাসের আরও দুই চারজনকে দেখালেন এবং তারাও প্রশংসা করলেন। জনাব এক্স রহমান আরও পঞ্চমুখ হলেন। এরপর আরও লিখলেন। দুই একদিন পর এরকম ছড়া টাইপের ছয় বা আট লাইলের একটা কিছু লেখেন। স্কুলে বেশ সুনাম বইতে শুরু করলো। ছড়া লেখেন, মধ্যে মিশেলে গানও লিখতে লাগলেন। স্কুলের শিক্ষকবৃন্দ তাঁকে যতœবান হবার পরামর্শ দিলেন। আরও চেষ্টা করলে ফিউচার ভালো করতে পারবে। এক্স রহমান বেশ মনযোগী হলেন। ছড়া ও কবিতা লিখতে লাগলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি লেখালেখিও করেন। তবে আগে পড়াশোনাতে তেমন গা না করলেও এখন একটা নেশার ছলে পড়ার টেবিলেও ভালো সময় দেন। ভেতরে ভেতরে নেশার গ্রোত বইতে শুরু করেছে। একদিন স্কুলে যে পত্রিকা আসে নিয়মিত-সেখানে চোখ রাখলেন। দেখলেন অনেক ছড়া কবিতার পসরা। দেখে বিস্মিত হলেন মিঃ এক্স রহমান । পত্রিকায় নামসহ লেখা ছাপলে কেমন লাগবে এমন অনুভূতি তার মনের ভেতরে ভাসতে লাগলো। জনাব এক্স রহমান পত্রিকার ঠিকানা এবং জিমেইল এড্রেসটাও লিখে নিলেন। কিছুদিন পর থেকে ওই ঠিকানায় ছড়া কবিতা পোস্ট করতে লাগলেন। কিন্ত লেখা আসেনা পত্রিকায়। ছাপা হয়না। তবুও লেখেন এবং পোষ্ট অফিসে গিয়ে চিঠি পোষ্টান । অধৈর্য হননা। মন খারাপ করেননা। বিচলিত হননা। হঠাৎ একদিন একটা ছড়া পত্রিকায় আসলো। নিচে নামসহ। এক্স রহমান আনন্দে উদ্বেলিত হলেন। স্কুলের শিক্ষক, ছাত্র – ছাত্রী খুশি হলেন। এরপর থেকে সবাই তাকে কবি ডাকতে লাগলেন। কবি ডাকলে মিঃ এক্স রহমান খুব খুশি হোন। এটা নিয়ে গ্রামেও বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে বেশ আলোড়ন পড়ে। এক্স রহমান আগের মত আর নেই। আগে বিকেলে আড্ডা দিতেন, খেলতেন। এখন সেরকম করে সময় দেননা বন্ধুদের। তার ব্যক্তিগত কাজ মানে সাহিত্য নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। এমন কি গোঁফ দাঁড়ি কাাঁর সময় পাননা। সব সময় চিন্তিত ও মমূর্ষ চেহারায় থাকেন। তাই অল্প বয়সেই দাঁড়ি ঝুলতে লাগলো থুতনীর নিচে। এ নিয়ে তার বন্ধুবর্গ গোস্যা করে। কিন্ত মিঃ এক্স রহমানের মাথায় একটাই চিন্তা-তাকে একটা কিছু করতে হবে।
মিঃ এক্স রহমান এখন কবিদের জীবনী বেশি পড়েন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রসহ আরও অনেক কবি সাহিত্যিকদের জীবনী পড়েন এবং নিজের আত্নার ভেতরে এক রকম বীজ বপনের চেষ্টা করেন। জনাব এক্স রহমান টিউশনী বাবদ এবং পরীক্ষার ফিস বাবদ বিভিন্নভাবে পিতার নিকট থেকে একটু বেশি মাসোহারা নিতে শুরু করলেন এবং এই অতিরিক্ত অর্জিত অর্থ দিয়ে অনেকগুলো বই কিনলেন। বঙ্কিম থেকে শুরু করে কবি শামসুর রাহমান এবং তৎপরবর্তী সময়ের এবং বর্তমান প্রজন্মের কিছু আধুুনিক লিখিয়েদের বই সংগ্রহ করলেন। তাতে একটা ব্যাক্তিগত লাইব্রেরীর মত দাঁড় হলো। তবে এটা একদিনেই হয়নি। দিনকে দিন, মাসকে মাস টিফিন না খেয়ে, পান বিড়ি সিগারেট না খেয়ে, অন্যান্য নেশা না করে, ভালো দামী কাপড়ের প্যান্ট কার্ঁ না পড়ে যে অর্থ সাশ্র্রয় হয় সেখান থেকে একত্র করে তার এই প্রচেষ্টার ফসল। তাতে তাঁর পিতা মাতা বেশি খুশি নন। সাহিত্য করে কে ধনী হয়েছে। কে কি করতে পেরেছে। এমন গালমন্দ মাঝে মধ্যেই শুনতে হয় তার।
এক্স রহমানের রাত জাগার অভ্যাস ছিলোনা। এখন রাত বারোটা, একটা পর্যন্ত পড়েন, সাহিত্য স্টাডি করেন, গবেষণা করেন, লেখেন। পত্র পত্রিকা দেখেন নিয়মিত। জাতীয়, লোকাল সকল দৈনিক ছাড়াও সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রিকায় লেখেন এবং পড়েন। কিন্ত দু চারটা পত্রিকায় কেবল লেখা বেরোয়। বাঁকি পত্রিকা গুলো ছাপেনা। এ নিয়ে এক্স রহমানের ভেতরে ক্ষোভগুলো পীড়া দিতে লাগলো। এক সন্ধ্যায় বড় এক পত্রিকা অফিসে গেলেন কিছু লেখা নিয়ে। সাহিত্য সম্পাদক সাহেব তাঁর লেখা নিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে দেয়ালে ছুঁড়ে মেরে বললেন “এগুলো কি লিখেছেন? আরও ভালো লেখা নিয়ে আসবেন”।
জনাব এক্স রহমান গোপনে চোখ মুছে অফিস ত্যাগ করলেন। ভাবতে থাকলেন এতদিন লিখেও কবিতা হয়নি। আজব কথা! আসলে আজব কথা নয়- সেটা বুঝতে পারলেন এইসব বড় পত্রিকার লেখকদের লেখা পড়ে। বুঝলেন আগে পাঠক হতে হবে তারপর লেখক। এভাবে শুরু হলো কবিতা ভাঙচুর অভিযান। শতবার কবিতা ভেঙে নতুন ধাঁচে লিখতে লাগলেন। প্রতিনিয়তই কবিতায় আলাদা আঙ্গিক দিতে চেষ্টা করেন। মনে হচ্ছে একটু উন্নতি হয়েছে। তারপরও প্রচুর পড়তে লাগলেন। বিশেষ করে বর্তমান সময়ের কবি লেখকদের লেখা। পড়ার যে বিকল্প নেই সেটা মনে প্রাণে গেঁথে নিলেন। এবার বড় পত্র পত্রিকায়ও লেখা আসতে লাগলো। সপ্তাহে বা মাসে একটা হলেও আসে। বিভিন্ন সংকলন, লিটেল ম্যাগেও লেখা আসে । তার ভালো লাগে। কিন্ত অর্থনৈতিক দৈন্যতা কাটেনা। ছাত্র মানুষ। আর কতো এভাবে পিতা মাতার নিকট অতিরিক্ত মাসোহারা খোলা যায়। কিছুদিন পর এক্স রহমান লেখকদের সংগঠনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। এটা একটা শেখার ভালো জায়গা। কিন্ত এখানেও মাঝে মধ্যে চাঁদা দিতে হয়। ওদের সাথে সময় দিতে হয়। বিভিন্ন আড্ডা, অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হয়। এ জন্য নাম সুনাম হচ্ছে ঠিকই কিন্ত রাতে বিরাতে বাসায় ফিরতে হয় জন্য পিতা মহোদয় বেঁকে বসলেন। আর এগুলো করা যাবেনা। সংসার বড় নয়Ñ অল্প আয়ের সংসার । এই ভেবে তাকে বিয়ে দিবেন বলেও মনস্থির করলেন। স্ত্রী সন্তানের টানে যদি এগুলো ছেড়ে দেয় তাও ভালো। কথা মতো মিঃ এক্স রহমানকে সুন্দর কনে দেখে বিয়ে দিয়ে দিলেন। নতুন দাম্পত্য জীবন। বউঠান তাকে বাইরে বেরোতে নিষেধ করেন। “ওগুলো বাদ দিয়ে পয়সা রোজগার করো” বলে প্রতিনিয়ত এমন নসিহত শুনতে হয়। কিন্ত এক্স রহমান অনেক বাধা বিপত্তি, গালমন্দ উপেক্ষা করে সাহিত্য করতেই থাকলেন। যত বিদ্রæপ করুক বেকার বা অকর্মন্য বলে এর ফাঁকে পত্রিকায় লেখা বেরোলে সব দুঃখ ঘুচে যায় তার । একদিন রাত তিনটা পর্যন্ত লেগে গেলো একটা আর্টিকেল লিখতে। জীবনান্দ নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা। বৌঠান উঠে এসে বেশ বিপত্তি শুরু করলেন। আমি তোমার ভাত খাবোনা। মানে এ ই সংসার করবেননা। মিঃ এক্স রহমান উদভ্রান্ত চেহারায়, নির্ঘুম চোখ নিয়ে এটা সহ্য করতে পারলেননা। বললেন। তোমার ভালো না লাগলে “-এজ ইউ উইশ’’ যা খুশি করতে পারো। বৌঠান সকালে কাউকে না বলে পিতাগৃহে ফিরে গেলেন। এক্স রহমান কিছুই বললেননা। মনে মনে ভাবলেন আপদমুক্ত হলাম। এসবের প্রয়োজন নাই। মিঃ এক্স রহমান ওর লিখিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে ঢাকায় আশ্রয় নিলেন। পিতামাতার অবাধ্য হলেননা বরং তাদেরকে বুঝালেন পয়সা রোজগাড় করার জন্য বাড়ি ত্যাগ করলেন। ঢাকায় এসে কিছুদিন কোন কাজ পেলেননা। তারপর এক ঘনিষ্ট বন্ধুর যোগাযোগে একটা পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পেলেন। এরপর মিঃ এক্স রহমানের জীবনের মোড়টা একটা অভিষ্ট লক্ষ্যে এগোতে লাগলো। তার নাম সবাই জেনে গেলেন। দেশের বড় বড় কবি সাহিত্যিকদের সাথে তার পরিচয় হতে লাগলো। এখন সকল পত্রিকায় লেখা আসে এমনকি তার নিকট থেকে লেখা চেয়েও নেন। একটা প্রকাশনী তার কবিতার বই করার প্রস্তাব দিলেন। এক্স রহমান সম্মত হলেন এবং প্রকাশক বই করলেন। একুশে বই মেলায় তার প্রথম কবিতার বই বের হলো। এটা একটা নতুন অনুভূতি। নিজের নামে সুন্দর প্রচ্ছদে প্রথম বইয়ের ঘ্রাণ একটা কবির জীবনের বড় অর্জন। তার বউ এর ঠিকানায় দুটি বই কুরিয়ার করলেন। তার সাথে ওর পিতা, দুইজন বন্ধু, প্রথম জীবনের স্কুলের ঠিকানায় দুই কপি করে বই কুরিয়ার করলেন। একই বৎসরে দুটি সংগঠন থেকে তাঁকে পদক দেয়া হয় কবিতার বইয়ের ওপর। মিঃ এক্স রহমান এখন অনেক বড় কবি, সম্পাদক। অনেক বিজি মানুষ। এভাবে বৌহীন থাকলেন দুই বৎসর। এর মধ্যে গ্রামের বাড়িতে যান শুধু ঈদে চাঁন্দে। পিতা মাতার সাথে ঈদ করেন। পিতা তার এখন অনেক খুশি। তার ছেলে বড় কবি এখন। তার জন্য এলাকার মানুষ এখন চিন্তা করে, ভাবে, গবেষণা করে। কিন্ত অভিমাণে শ্বশুড় বাড়ি যাননা। বৌঠানও আসেননা। এই বই বের হওয়ার পর এবং পদক পাওয়ার পর বৌঠান একদিন তার পিতাকে নিয়ে ঢাকায় আসলেন। এক্স রহমান সাহেব কিছুই বললেননা। তবে সাংবাদিকরা নাছোড়বান্দা। তার বৌবিমুখ নিয়ে জাতীয় দৈনিকে ফটো প্রতিবেদন আসে বিনোদন পাতায়।
মিঃ এক্স রহমান মূলতঃ একটা চরিত্র। যে চরিত্রে তার সারা জীবনের সংগ্রাম, আন্দোলনকে চরিতার্থ করা হয়েছে। একজন কবির জীবন একটা সংগ্রাম এবং একটা আন্দোলনের সন্নিবেশ। এটা রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, নয় রাষ্ট্রীয়। একেবারেই জীবন মেরুকরণের তাগিদে, একটা চিন্তাকে প্রতিষ্ঠিত করার তাগিদে সংগ্রাম। রিপুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম। সহস্র রিপু থেকে বেড়িয়ে এসে একটা আদলে জীবন প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম। জীবনের সহগ্র চাহিদা, রুচিশীলতার বিরুদ্ধে নিতান্তই বেড়ে ওঠা একটা জীবনের নাম। এরই সম্পুরক নাম কবি এবং সংগ্রামের মাঠে যা ফলে তা কবিতা এবং সাহিত্য। মিঃ এক্স রহমানের স্থলে সকল কবিকে প্রতিস্থাপন করলে একই রকম মনে হবে। অথবা জীবনযুদ্ধের বিভিন্ন স্তরের সাথে মিলে যেতে পারে । মনে হবে সকল কবিদের জীবন সংগ্রাম কতোটা বিপর্যয়মুখর ও সংগ্রামবহুল।