কবি অরুণ দাশগুপ্ত : মানস চিন্তার মগ্ন দৌবারিক

35

রিজোয়ান মাহমুদ

অরুণ দাশগুপ্ত, স্মৃতির চেয়ে ভারী। ঘটনার চেয়েও মজবুত এক অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব। গত শতকের ত্রিশের দশকে তাঁর জন্ম দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়ার ধলঘাট গ্রামের এক জমিদার পরিবারে। দক্ষিণ চট্টগ্রাম সে – সময় থেকে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনপদ হওয়া সত্তে¡ও শিক্ষা – দীক্ষায় – রুচি ও মনন সংস্কৃতিতে এগিয়ে থাকা উজ্জ্বল উজ্জীবিত জনপদ। এর বড় একটি অংশ বৃহত্তর পটিয়া ও তদ্ব্যতীত অঞ্চল। তিনি যোগ্য উত্তরসূরি সে সব জ্ঞানতাপস সূর্যসারথি বিদগ্ধ পন্ডিত জনের যাঁদের ভাবনা সঞ্জাত জীবন বৈদগ্ধ এ-ই অঞ্চলের দীপ্ত জাগরণ। যেমন নবীচন্দ্র সেন, রাউজান থানার অন্তর্গত নোয়াপাড়া গ্রামে জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণকারী উৎকৃষ্ট মানবিক মানুষ। নবীনচন্দ্র সেন ঊনবিংশ শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া এমন একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ যার জ্ঞানের গভীর সৌন্দর্য ও ভাবাদর্শ আশা – আকাক্সক্ষা পূরণের মানবিক অস্ত্র। তিনি ছিলেন কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, ধর্মীয় আচার পন্থীদের প্রতিরোধে এক অভূতপূর্ব লেখনিশক্তি সম্পন্ন মানুষ।
পুঁথি সাহিত্যে প্রত্নতাত্ত্বিক আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ যাঁর অনন্য প্রতিভা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বির্নিমাণে স্পর্শ করেছিল অনন্য উচ্চতা। তাঁর গভীর অনুসন্ধিৎসা সর্বোপরি অসাম্প্রদায়িক সাহিত্য প্রীতি হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বিরচিত পুঁথি সংগ্রহ ও সংকলন উদার চিত্তের-ই বহিঃপ্রকাশ।
শশাঙ্ক মোহন, ১৮৭২ সালে ধলঘাটে জন্মগ্রহণকারী বোধিপ্রাপ্ত কবি অধ্যাপক ও চিন্তক। তাঁর বিশাল পান্ডিত্য বিদগ্ধ আলোচনা সর্বমহলে স্বীকৃত। তিনি বিশ্ব সাহিত্যের আদর্শে স্নিগ্ধ ঋষিতুল্য পুরুষ। আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ যথার্থই লিখেছিলেন, শশাঙ্ক মোহন এর গৃহের দ্বার ছোট বড় সব সাহিত্য জিজ্ঞাসুর জন্য সর্বদাই উন্মুক্ত থাকত। অনেক বড় পন্ডিত মনীষা লেখক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে বিন্দুমাত্র পান্ডিত্যাভিমান ছিল না। তিনি ছিলেন শিশুর মতো সরল ও সুন্দর। এ- ভাবে কবি আলী রজা ওরফে কানু ফকির, ড, আহমদ শরীফ, সাহিত্যিক মাহবুবুল আলম, আবুল ফজল, ড. মুহম্মদ এনামুল হক সহ আরও অনেক কৃত্তিমান পুরুষের মিলনমেলা এ-ই দক্ষিণ ও উত্তর চট্টগ্রাম। যাঁদের নাম শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত হলো, যাঁদের নিয়ে দুদন্ড কথা হলো তাঁরা সব্বাই সাগর বিধৌত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলা-লাস্যেময় চট্টগ্রামের গর্ব। কবি অরুণ দাশগুপ্ত, উল্লিখিত মহিরুহ মনীষীদের ধারাবাহিকতার ফসল, যোগ্য উত্তরাধিকার।
কবি অরুণ দাশগুপ্ত ছিলেন নিমগ্ন সন্ত জ্ঞানী, ঊনবিংশ শতাব্দীর উজ্জীবিত উজ্জ্বল নব জাগরণের দূত। উদারচিন্তার বুদ্ধিজীবী মানব মনীষা। তিনি অভ্যাসবশত ধীরে টেনে কথা বলতেন। ভাবতেন বেশি। লিখতেন একেবারেই কম। চিন্তাশীল প্রবন্ধ সমালোচনা সাহিত্য এবং বিবিধ বিষয়ে অনুবাদ করতেন। যখনই লিখতেন মনন ঋদ্ধ তথ্যবহুল। প্রবন্ধের কাঠামো ভাষা ও বিষয় বৈচিত্র্যে ভরপুর এবং অনেকাংশে ঝর ঝরে। সাধু ভাষায় কবিতা লেখা রীতি নিজের মতো করে লিখেছেন অনেক পত্র – পত্রিকায়, লিটল ম্যাগাজিনে। ইয়াছ ইয়াছি’র বাংলা ব্যাকরণের ক্রিয়া পদ অবলীলায় সাবলীল সাধুপ্রয়োগের ভেতর দিয়ে দুর্দান্ত কিছু কবিতা সৃষ্টি করেছেন। মাঝেমধ্যে অলংকার যুক্ত চিত্রকল্প ব্যবহারে তৎসম শব্দ প্রয়োগে ওজস্বিতা দেখিয়েছেন। তাঁর কবিতার বিষয়ের গভীরতা ছিল বেশি। বোঝার চেয়ে অনুভূতিময় ম্যাজিক ছিল দৃঢ়।অভ্যস্ত পাঠক মাত্রই স্বাধীন বিবেচনায় অনুভূতির রঞ্জিত খেলা উপভোগ করতেন। শব্দ দিয়ে হাততালিও বাজাতে পারতেন অনায়াসে। তিনি প্রায়শই বলতেন কবিতা শব্দে শব্দে বিয়ে দিয়ে জরাগ্রস্ত অনুভূতিকে সাজিয়ে দেয়া। কবিতার শব্দগুলো একে অন্যকে জ্বালিয়ে তোলে যেন বহুমূল্য পাথরের ওপর ঝলক ; স্তেফান মালার্মের কবিতা বিষয়ক এ-ই আপ্ত্য বাক্যটি অরুণ দাশ গুপ্তের কবিতার আকাশ। এ – ভাবে একটি স্বতন্ত্র ধারার কবিতা প্রাত্যহিক লিখে প্রশ্নের সম্মুখীন সহ প্রসংশীত হয়েছেন। মধ্য যুগের সাহিত্যের বিবর্তন মূলক ধারা বিশেষ করে ১২ ১৪ সাল গৌড়ে তুর্কি আক্রমণের সময় থেকে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত তাঁর নখদর্পনে ছিল। মধ্য যুগের একজন শূদ্রকুলের সন্ত কবি তুখারাম এর ভজন ও ভক্তিগীতি অসীম সৌন্দর্যে তিনি অনুবাদ করেন। অথচ তিনি অনুবাদ করার পূর্বে তুখারাম এর নাম-ই অনেকেই জানতো না। কবিতাটি শিল্প সাহিত্যে অনুবাদ সংখ্যা কালধারা ‘য় ছাপা হয়েছিল। অরুণ দাশগুপ্ত’র মনীষায় ওঠে আসে কবি নবীন চন্দ্রসেন। তিনি লিখেন যুগ পথিক কবি নবীনচন্দ্র সেন। বিস্মৃত এ-ই কবিকে মেধা ও মননে ঢেলে সাজিয়ে পুনরায় পাঠকের মানস কক্ষে নিয়ে আসেন ভক্তি আর শক্তি দিয়ে। কবি নবীনচন্দ্র সেন উদ্ভাসিত হয়েছে ভিন্নমাত্রিক ব্যবচ্ছেদে। এ – গ্রন্থের ভাষা ও দর্শন ছিল ভীষণ অন্তর্গত এক কবির জীবনের মূল্যবান দলিল। সকল বাংলাভাষী কবি ও সাহিত্যেকদের জন্যে নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি। শুধু লেখালেখি নয়, তাঁর বক্তৃতাও ছিল ভীষণ আড়ম্বরপূর্ণ। ধীরে রাশভারি তৎসম উচ্চারণে সমাজ ইতিহাসের দায়ী মুছতেন গুছিয়ে ও সাজিয়ে কথা বলে। তিনি পূর্ব বঙ্গীয় উচ্চারণে কথা বলতে পারতেন না। তাঁর কথায় কলকাতার প্রমিত বাংলা উচ্চারণের এক্সেন্ট ছিল। এটিই তাঁর অভ্যস্ত বলার ভঙ্গি লেখাপড়ার সূত্রে দীর্ঘদিন কলকাতা বাসের কারণে। শুধু প্রাচীন বাংলা সাহিত্য নয় তাঁর আলোচনায় থাকত আধুনিক বাংলা সাহিত্য এবং বিশ্বসাহিত্য – বিশ্ব সংস্কৃতিসহ ঘটে যাওয়া শিল্প আন্দোলনের বিবিধ ঘাত-প্রতিঘাত। শামসুর রাহমান আল মাহমুদ সৈয়দ হক থেকে শুরু করে আজকের উঠতি তরুণ কবিতায় কী কাজ করছে সে সবের ঠাটও জানা ছিল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন গভীরভাবে। বিশ্বসাহিত্যের প্রসঙ্গ এলে টি এস এলিয়ট, ওয়ার্ডস ওয়ার্থ, হিমেনিথ, অডেন, এজরা পাউন্ড, রবার্ট ফ্রস্ট আরও অনেকেই ঘুরেফিরে আসত। এ-ই পেনিনস্যুলার সাহিত্য বাতচিত হলে অকাতরে সমর্পিত হতেন রবীন্দ্র কাব্যের গুণমুগ্ধ সরলতায়। তিনি মনেপ্রাণে ছিলেন রবীন্দ্র পূজারী, সংগীতের এক নিষ্ঠ ভক্ত। রবীন্দ্রনাথের ছয় ঋতুর গান ও অন্যান্য এ – নামে একটি গ্রন্থও প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথের গানের কথা ও সুরে যে অপরূপ রাগের ব্যবহার তা স্পষ্ট হয়ে উঠে তাঁর রচনায়। প্রেম ও পূজা পর্বের গান এবং আধ্যাত্ম চেতনা সর্বোপরি ঋতুভিত্তিক গানে রবীন্দ্রনাথ পুরো বাঙালি মানস সরোবরের দেবতা। একটি আকর গ্রন্থও বলা যায়।
অরুণ দাশগুপ্ত, ছিলেন আড্ডা প্রিয় মানুষ। বাংলা দেশ ও পশ্চিম বঙ্গের তাবড়-তাবড় কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী অরুণালয়ের আড্ডায় হাজির হতেন। সন্ধ্যে সাতটা থেকে মধ্যরাত অবধি আড্ডা চলত। তিনি তরুণ কবিদের কবিতা শুনতেন। কবিতা সম্পর্কে নানাবিধ পরামর্শ দিয়ে আজাদী সাহিত্য পাতায় তা ছেপে তরুণ কবিদের উৎসাহ ও আন্তরিক প্রশ্রয় দিতেন। কেবলমাত্র শিল্প সাহিত্য নয় সমসাময়িক ক্ষমতা কেন্দ্রিক রাজনীতি। ক্ষমতার বাইরের রাজনীতি বিশ্বরাজনীতি, ভারত উপমহাদেশের সামাজিক ন্যায়নীতি নিয়ে কথা বলতেন আপসহীন যৌক্তিক ও ভাবনাজাত। খুব প্রচ্ছন্নভাবে মনে পড়ছে ১৯ ৮৮ সালের কোন এক রবিবার সন্ধ্যা ছয়টায় এক কঠিন জটিল আলোচনার চাক্ষুস করেছিলাম আমিও ছোট কাগজ “সত্তা” সম্পাদক কবি হোসেন শহীদসহ আরও দু’জন। রাজনীতি প্রসঙ্গে আলাপ চলছে। কবি অরুণ দাশগুপ্ত, ভীষণ বুদ্ধিদীপ্ত ধারালো যুক্তি দিয়ে ধীরেধীরে কথা বলছেন, সাহিত্য নয়, বিশ্বরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক ও দর্শন নিয়ে। আমরা মুগ্ধ শ্রোতা। দু’একটা শব্দ উচ্চারণ করে কিছুক্ষণ দম নিয়ে আবার বলতেন। এটিই সাহিত্য আড্ডায় স্বভাবসুলভ বলার ভঙ্গি তাঁর। কালমাক্সের এর এশিয়াটিক উৎপাদন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা। ১৮৫৩ সালের আগে এশিয়ান সমাজের জড়তা স্থবিরতা ও অপরিবর্তনীয়তা নিয়ে মার্ক্সসের বিশ্লেষণ; পৃথিবীতে মানবজাতি যদি কোথাও কোন রক্তপাত ছাড়া, সংগ্রাম ছাড়া এবং মৌলিক বিপব ছাড়া নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন সাধন করে থাকে তবে তা এশিয়া সমাজ ব্যবস্থায়। মার্ক্স বলেছেন, ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশ দুমুখো উদ্দেশ্য নিয়ে এসছিল। প্রথমটি ছিল ধ্বংসাত্মক। দ্বিতীয়টি ছিল পুনরুজ্জীবন মুখী”। পুরনো সমাজকে ধ্বংস করা এবং এশিয়ায় পশ্চিমা সমাজের বস্তুগত ভিত্তি স্থাপন করা অর্থাৎ সমাজের অন্তঃপ্রবাহে একটি যুৎসই উপনিবেশ ; ৩০ বছর আগে শোনা কথা ৪০বছরে এসে কার্লমার্ক্সের Asian Mode of Production, মরিস গোদলিয়ারের পর্যবেক্ষণ পড়ে জেনেছি। এ – কথাটি বলা সঙ্গত হবে যে অরুণ দাশগুপ্ত কট্টর মার্ক্সবাদী ছিলেন না কখনো। কিন্তু মার্ক্সবাদ জানাশোনা থেকে বিচ্ছিন্নও ছিলেন না। তাঁর জ্ঞানের পরিধি ছিল বহুদূর বিস্তৃত।
তিনি সময়ের চেয়েও আধুনিক অগ্রগামী জ্ঞান চর্চার ধারণায় যুক্তিবাদ মনস্ক পুরুষ। তাঁর কৌতূহল ছিল পাশ্চাত্যের ভাঙাগড়া এবং নব জাগরণের উৎসে প্রাচ্য জ্ঞানের ব্যবহার। ধ্যানে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ দেশমুখী। আড্ডায় তাঁর মুখে শুনতাম সত্যপীরের পাঁচালী, গাজী কালু চম্পাবতী, বেহুলা চাঁদ সওদাগরের গল্পগাথা, হরিসাধনের গাজন গীত। তিনি এশিয়া ও ইউরোপের আধুনিক জ্ঞানতত্তে¡র মিশ্রণে এবং চিন্তা – দর্শনে এক অসম্ভব প্রত্যয়দর্শী “ইউরোশিয়ান”। মিশ্র অর্থনৈতিক সামাজিক আচার ব্যবস্থাপনায় শংকর মানবগোষ্ঠীকে তিনি শংকরজাত বৈষম্যহীন মিক্সড ফিলসফিক্যাল এট্যাচমেন্ট দিতে চেয়েছিলেন। ঊনিশ শতকের বুদ্ধিজীবীরা নয়া ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের প্রতি জোর দিতেন। তাঁরা ছিলেন জীবন জগৎ থেকে নিঃসঙ্গ স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সমাজের প্রাত্যহিক অভ্যাসের সঙ্গে তাঁদের কোনো সখ্য ছিল না।
অরুণ দাশগুপ্ত ছিলেন জীবন ঘনিষ্ঠ সমাজ বাস্তবতার অচ্ছেদ্য অংশ। অকৃতদার হলেও অকৃতজ্ঞ উন্নাসিক ছিলেন না। সমাজকে শুদ্ধরূপে পরিমাপ ও বিবেচনা করার এই খন্ডাংশ মানবিক অনুভূতি ব্যতিরেকে অন্যসব অনুষঙ্গে তিনি ভরপুর এক সামাজিক সত্তা। তিনি দর্শনানুগামী প্রাণপুরুষ। আড্ডামুখী সরল স্বপ্রাণ স্বাপ্নিক মানুষ। তরুণ কবিদের বাতিঘর। এতই গুণাকর তিনি,সর্বদা ছিলেন নিবেদিত প্রতিষ্ঠানমুখী। আজাদী পত্রিকায় লগ্ন হয়েছিলেন প্রায় পয়ত্রিশ বছরের ওপরে। শুনেছি, যাবার সুযোগ থাকা সত্তে¡ও তিনি অন্যকোনো পত্রিকা কিংবা রাজধানীবাসী হন নি কখনো। শেকড় গজিয়ে যাওয়া প্রাচীন বৃক্ষের মতো একটি জায়গায় আটকে ছিলেন, তবে নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে। প্রতিষ্ঠানের প্রতি তিনি ভীষণ দায়বদ্ধ ছিলেন। মালিকের প্রতি সদাশয় বিনয়াবনত, সজ্জন। তিনি প্রগতিশীল চিন্তক কিন্তু নিজেকে ছড়িয়ে দেবার মানসিক সাহস ছিলনা যথেষ্ট পান্ডিত্য জ্ঞানবুদ্ধিমত্তা থাকা সত্ত্বেও। ফলে, তিনি স্থানিক বুদ্ধিজীবীর তকমা নিয়ে রয়ে গেলেন জীবনের অন্তিমসময় পর্যন্ত। রাসেল জেকবি একজন বামপন্থী আমেরিকান বুদ্ধিজীবী। তাঁর একটি গ্রন্থের নাম The last intellectual ব্যপক আলোচনার ঝড় তোলেন চিন্তার বাজারে। বামপন্থী সমালোচকদের মতে তিনি একটি নিন্দনীয় তত্ত¡ উপস্থাপন করেন। তাঁর বক্তব্যের নির্যাস হলো; আমেরিকায় অপ্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিজীবী সম্পূর্ণ বিলীন হযে গেছে। তাঁদের প্রতি সমাজের কোনো শ্রেণিই মনোযোগ দেন নি। অথচ প্রতিষ্ঠানের স্বপক্ষে থেকেও অরুণ দাশগুপ্ত ছিলেন মানব মনীষার মনোযোগ ও মগ্নতার নৃপতি। নবীন কবিদের মহুরি। তিনি চলনে – বলনে কেতাদুরস্ত সৌখিন। সামন্ত আভিজাত্যের মোড়কে অন্তহীন ঐশ্বর্যময় চিন্তার মুগ্ধ মানব সন্তান। তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের তরুণ কবিদের অভিভাবক। কবিতার শিক্ষক এভাবেও বলা যায়। তরুণদের প্রতি তার অস্বাভাবিক মনোযোগ এবং উদারতা চট্টগ্রামের কবিদের কবিতা লেখায় উৎকর্ষ দিয়েছে।
যেখানে অনেকের সাথে সাহিত্য কবিতা দূরে থাক আলাপ -ই করা যেতনা বা এখনও যায় না সেখানে তিনি ছিলেন বেশ সুগম্য। তিনি অতিমানব ছিলেন না। তাঁকে স্পর্শ করা যেতো অনুভবের কাছে থেকে। চিন্তার কঠিন ব্যমো থেকে বেরিয়ে তিনি ভীষণ সহজে সাবলীলভাবে মিশে যেতে পারতেন ছোট – বড়ো সবার-ই সাথে। এ-ই সক্ষমতা তাঁর ছিল। নিজেকে তরুণদের সান্নিধ্যে নেবার অকুণ্ঠ উদারতার মেলে দিয়েছিলেন তাঁর পথ ও মত। তাঁর দর্শন ছিল জ্ঞান আহরণ, সামাজিক সৌহার্দ্য ও শান্তিপূর্ণ অবস্থান।
অরুণ দাশগুপ্ত প্রিয় দা’মণি মানব পক্ষের লোক। প্রসন্ন কবি। দেহান্তরিত হলেও তিনি সবারই অনুভূতি মায়া ও শ্রদ্ধায় বেঁচে থাকবেন। হয়তো আজ আকাশের ঠিকানায়। কিন্তু তিনি সদা বিরাজমান থাকবেন সামাজিক সাহিত্যিক বাস্তবতায়। নানাবিধ কল্পনায়। তিনি আসলেই সমাজ মানস চিন্তার মগ্ন দৌবারিক।