কবর কাহন

8

জুয়েল আশরাফ

ছোট ভাবী মারা যাওয়ার পর থেকে সেজ ভাবীর মধ্যে একটা অদ্ভূত পরিবর্তন লক্ষ্য করছে বাড়ির সবাই। আমূল পরিবর্তন, অপার্থিব হাসি, কেমন উদাসীন। কথা বলা কমিয়ে দিয়েছেন। খেতে বসলে শুধু খাবার নাড়াচাড়া করেই উঠে যায়। সারাক্ষণই ছোট ভাবীর কবরের দিকে তাকিয়ে থাকবে। আমাদের বাড়ির পাশেই পারিবারিক কবরস্থান। ঘরের জানালা দিয়ে তাকালেই পূর্বপুরুষদের পুরানো কবরগুলো দেখা যায়। সেজ ভাবী বউ হয়ে এই বাড়িতে এসেছে সাত বছর। কোনোদিন তাকে কবরস্থানের দিকে তাকাতে দেখিনি। ছোট ভাবী মারা যাওয়ার পরের দিন থেকেই লক্ষ্য করলাম সুযোগ পেলেই সেজভাবী জানালার কাছে এসে দাঁড়ায়। আর অপলক কবরস্থানের দিকে তাকাবে।
সেজ ভাবীর সঙ্গে ছোট ভাবীর সম্পর্ক ভালো ছিল না বললেই চলে। কোনো কোনো সংসারে এমন হয় জা-এর মধ্যে অমিল পাওয়া যায়। আমি তাদের ননদ। দুজনের বনিবনার খবর আমার চেয়ে বেশি আর কেউ জানে না। ছোট ভাবীর মৃত্যুর পর থেকেই সেজ ভাবী পুরোপুরিভাবে পাল্টে গেছে। কাল বিকেলে বাবা মৃতের কাপড়গুলো সদকা করে দেওয়ার জন্য ছোট ভাইকে দিয়ে আলমারী থেকে সমস্ত কাপড় বের করালেন। সেজ ভাবী সেখানে এসে উপস্থিত হয়ে বলল, বাবা আমাকে কাপড়গুলো দিন। আমি ওর কাপড়গুলো স্মৃতি হিসেবে পরব।
বেঁচে থাকতে যার প্রতি মানুষের বিদ্বেষ থাকে মৃত্যুর পর সেই মানুষের প্রতিই এক ধরনের মায়া তৈরি হয়। সেজ ভাবীরও সেরকম কিছু হয়েছে। নিজের আমল আখলাক দিয়ে অপরাধবোধ দূর করার চেষ্টা করছেন।
আজ ফজরের নামাজের পর থেকেই সেজ ভাবী জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি কাছে যেতেই বললেন, ফারজানা, মৃত্যুর তিনদিন পর মৃত ব্যক্তির রুহ আল্লাহকে কি বলে জানো? হে আমার আল্লাহ! আমাকে আমার ছেড়ে আসা শরীর এবং ঘরবাড়ি দেখে আসার অনুমতি দিন। অনুমতি পেয়ে রুহ কবরের দিকে এগোতে থাকে আর দূর থেকে দেখতে পায়- চোখ, মুখ, নাক দিয়ে গলিত স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। এ অবস্থা দেখে কাঁদতে কাঁদতে বলে- ওরে আমার সাধের শরীর! অতীত জীবনের কথা কি তোর মনে পড়ছে! এ কবর কতইনা দুঃখ বেদনা, বিপদাপদ এবং নির্জন নিবাস। এ কথা বলে রুহ চলে যায়।
আমি অবাক আর ব্যথিত মন নিয়ে সেজ ভাবীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। ঠিক এই কথাগুলোই ছোট ভাবী মাঝে মাঝে আমাকে পড়ে শোনাতেন। এছাড়া সেজ ভাবীর পরকাল সম্বন্ধীয় জ্ঞান একেবারেই অল্প এবং অনাগ্রহ। সেজ ভাবী বললেন, মৃত্যুর পাঁচ দিন পর রুহ আল্লাহর কাছে অনুমতি পেয়ে রুহ দেখতে পায়- রক্ত, পুঁজে সমস্ত শরীর একাকার হয়ে আছে। রুহ তখন বিলাপ করে বলে- ওরে আমার অসহায় দেহ! অতীত জীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের কথা কি তোর মনে পড়ছে? আহ! কবরের জায়গা কতই না দুঃখদায়ক আর ভয়ের। পোকা মাকড় তোর শরীর তো ক্ষত বিক্ষত করে দিয়েছে। বিলাপ করে সেদিন রুহ চলে যায়।
আমি বললাম, ভাবী চলো ঘরে যাই।
ভাবীর মানসিক পরিবর্তনগুলো বাইরের কেউ জানে না। আমরা বাড়ির সবাই মিলে তাকে লক্ষ্য করে যাচ্ছি। সেজ ভাই সারাদিন বাইরে থাকেন কাজের মধ্যে। রাতে বাড়িতে ফিরে খেয়ে দেয়ে স্ত্রী সন্তানের সঙ্গে যেটুকু সময় পান, ক্লান্ত শরীরে আবার ঘুম। তাদের একমাত্র মেয়ে মহুয়ার সঙ্গে সময় দেওয়ার সময় নেই। সেজ ভাবীর মানসিক অবস্থাও অতোাঁ গুরুতর নয়, এজন্য ভাই ডাক্তার দেখানো নিয়ে এখনই কিছু ভাবছেন না। আমরা দেখে যেতে থাকি সেজ ভাবীর অস্বাভাবিক আচরণজনিত ব্যাপারগুলো কতদূর গড়ায়।
সন্ধ্যাবেলার ঘটনা। বিকালের মধ্যেই শুকনো কাপড়গুলো আমি নিজে ছাদে উঠে নিয়ে এসেছি। মা বললেন তার লাল রঙের ব্লাউজ পাচ্ছেন না। সব কাপড় ঘেটে দেখলাম আসলেই লাল ব্লাউজ নেই। কাপড় তো সেজ ভাবীরও ছাদ থেকে নামিয়েছি, সেখানে চলে গেল কি না দেখার জন্য ভাবীর ঘরে ঢুকতেই ভয়ে বুক আমার কেঁপে উঠল। শরীরের সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে গেল। আমাদের এগারো বছরের মহুয়া আতঙ্কে দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল ‘ফুফু!’
সেজ ভাবী কাফনের কাপড় নিজের শরীরে জড়িয়ে বিছানার এক কোণায় বসে নির্নিমেষ জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন। আমি আস্তে করে ডাকলাম, ভাবী!
সেজভাবী খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, যখন মানুষের লাশ কবরে রাখা হয়, তখন তার নামাজ তার ডানদিকে এসে দাঁড়িয়ে যায়। রোযা বামদিকে দাঁড়িয়ে যায়। কোরআন পাকের তেলাওয়াত ও আল্লাহর যিকির মাথার দিকে দাঁড়িয়ে যায়। আর জামাতে নামাজ পড়ার জন্য যে কদম চলেছে, তা পায়ের দিকে দাঁড়িয়ে যায় এবং মুসীবতের উপর ও গোনাহের ব্যাপারে ধৈর্য কবরের এক পাশে দাঁড়িয়ে যায়। তারপর আযাব কবরের মধ্যে নিজের ঘাড় বের করে এবং মুর্দা পর্যন্ত পৌঁছাতে চেষ্টা করে…।
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, ভাবী, তুমি কাফনের কাপড় পেলে কোথায়?
জবাব না দিয়ে আগের মতই ভাবী বলে চলছেন, দুইজন ফেরেশতা মুর্দার কবরে আসে। ফেরেশতা দুজনের চোখগুলো বিজলীর মতো চমকাতে থাকে আর আওয়াজ মেঘের প্রচন্ড গর্জনের মতো। তাদের দাঁতের সামনের অংশ গরুর শিংয়ের মতো। তাদের মুখ থেকে নিঃশ্বাসের সঙ্গে আগুনের শিখা বের হতে থাকে। চুল এত লম্বা যে, পা পর্যন্ত ঝুলে থাকে। তাদের এক কাঁধ থেকে আরেক কাঁধ পর্যন্ত এই পরিমাণ দূরত্ব যে, কয়েক দিন চললে তা শেষ হবে। ফেরেশতারা মুর্দাকে বলে, ‘বসে যাও’। মুর্দা সঙ্গে সঙ্গে বসে যায় আর কাফন তার মাথা থেকে কোমড় পর্যন্ত খুলে যায়…।
এই সমস্ত জ্ঞানগর্ভ কথা সেজভাবীর মুখ থেকে কিভাবে বের হচ্ছে জানি না। আর সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য লাগছে তিনি কাফনের কাপড় পেলেন কীভাবে?
মাকে ডাকতে এসে দেখি মা ঘুমাচ্ছেন। মাগরিবের নামাজ আর এশার নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে চিরকাল আমার মায়ের ঘুমানো অভ্যাস। মহুয়া এতক্ষণে মুখ খুলল। সে বলল, ফুফু, আমি জানি মা কাফনের কাপড় কোথায় থেকে এনেছে।
কী জানিস?
স্কুল থেকে মা আমাকে নিয়ে আসার সময় দোকান থেকে কাফনের কাপড় কিনল। আমি জিজ্ঞেস করলাম মা এই কাপড় দিয়ে কী করবা তুমি? মা বলল তোর ছোট চাচি এই কাপড় পড়ে আছে। আমারও এই কাপড়ই পড়তে হবে। নাহলে সে রাগ করবে।
পরের দিন ভোরে আমি খেয়াল করলাম, আজ বেলা হয়ে গেছে, কিন্তু সেজভাবীর উঠান ঝাড়ু দেওয়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। কে জানে জ্বরজারি হল কি না, বিছানা ছেড়ে ওঠার ক্ষমতা নেই হয়তো। এমন পোড়াকপাল মেয়েটার, জায়ের শোকে পাগলপ্রায় হয়ে গেছে।
দরজা খুলে বাইরে তাকাতেই চমকে উঠলাম। উঠানে কবরের মতোন গর্ত করে পা ছড়িয়ে ও কে বসে রয়েছে। সেজভাবীই তো, কিন্তু এ কোন সেজভাবী! কেমন করে তার বিশাল এক ঢাল চুল শ্রাবণের বাদুলে মেঘের মতো ফুলেফেঁপে উঠল! চোখদুটি যেন পাকা করমচা। চোখের তারা বনবন ঘুরছে। বুকের কাফনের কাপড়ে মাটি লেগে আছে। ডাকাডাকি করে বাড়ির সবাইকে একত্র করে ফেললাম, সেজভাবী উঠানে কবর খুড়ে কাফনের কাপড় পরে শুয়ে আছে!
খিলখিল করে সেজভাবী হেসে উঠতেই এই প্রথম আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, ভাবীর সামনের দাঁতগুলো অসম্ভব ধারালো। এখন সে যে কোনো জিনিস টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলতে পারে রাতের ধান চুরি-করা ইঁদুরের মতো। রাতে কখন সে ঘর থেকে বেরিয়ে গর্ত করেছে সেজভাই বলতেই পারছেন না, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। আমাদের শরীর শিরশির করে উঠল। সেজভাবী এ বার দুটি হাত মাথার ওপরে তুলে করতলের এমন মুদ্রা করল, স্পষ্টই বোঝা যায় সাপের ফুা। তারপর সে দুলতে শুরু করল। মাঝে মাঝে মুখ দিয়ে ফোঁসফোঁস শব্দ করে, আর মাথা ঝুঁকিয়ে অদৃশ্য শত্রুকে ছোবল মারতে থাকে। মহুয়া আর আমি নিরাপদ দূরত্বে সরে গেলাম।
এ পর্যন্ত তাও মানা যায়, কিন্তু এরপর সেজভাবী যে সব শব্দ উচ্চারণ করতে শুরু করল, সেগুলো কেউ কোনোদিন বলতে পারবে না, বুঝতেও পারবে না। সহ্য করতে না পেরে ঘরে ঢুকে পড়লেন সেজভাই। বাবা বললেন, বউকে মাটি থেকে উঠাও জলদি। সেজভাবীর চোখ দিয়ে যেন আগুনের হলকা বেরোচ্ছিল। আর ফোঁসফোঁসানি দিয়ে সে কী যেন বোঝাতে চাচ্ছে।
এক সময় ক্লান্ত হয়ে সেজভাবী মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ফুাসহ। যেন ক্লান্তিতে ঘুমিয়েই পড়ল। জ্যান্ত নাগিনীর মতো যে ভাবে সে ফুা দুলিয়েছে, তাতে ক্লান্ত হয়ে পড়ারই কথা। বাড়ির সবার হতচকিত ভাব তখনও কাটেনি।
সেই ফোঁসফোঁসানি কি সত্যি সেজভাবী করছিল, না কি খালের পানি থেকে কোনো সাপ আমাদের উঠানে উঠে আড়াল থেকে শব্দ করছিল, আমরা ঠিক নিশ্চিত হতে পারছি না। তবে আমি আর মা গিয়ে ভাবীকে বানানো কবর থেকে উঠালাম।
একটু পরই সেজভাবীর ঘুম ভাঙল। সে ভদ্র সভ্য হয়ে বসল। তারপর হাতের নখ দিয়ে উঠানের মাটি খামচে কাফনের কাপড়ের ওপর কী যেন লিখতে শুরু করল। চিঠি না কি! আমি একটু সামনে গিয়ে দেখলাম কোনো অপার্থিব ছবি আঁকছে সেজভাবী। আঁকছে আর হাত দিয়ে মুছে দিচ্ছে। কিছুতেই যেন সন্তুষ্ট হচ্ছে না।