কধুরখীল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় বোয়ালখালীতে নারীশিক্ষা প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে

121

মানুষ মহৎ এবং সুখী হতে পারে যদি সে নৈতিক অন্ধত্ব থেকে অব্যাহিত পাবার লক্ষে উন্নত আদর্শ অনুসরণ করে। কারণ আদর্শ মানুষের চিন্তাকে আলোকিত করে,জ্ঞানকে করে প্রসারিত, দৃষ্টিকে করে বিস্তৃত, ব্যক্তিত্বকে অচিন্ত্যনীয় মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে এবং প্রাণকে আধ্যাত্মিক মুক্তির অন্বেষনে করে সমর্পিত। আর্দশ অনুশীলনের ফলে মানবাত্মা বঞ্চনা, লাঞ্চনা,ঈর্ষা, হিংসা, লোভ-মোহ, অন্যায়-অবিচার, বিদ্বেষ বিরোধ প্রভৃতি অসুস্ত বিকারের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড শক্তিতে জাগ্রত হয়ে উঠে। এই উন্নত আদর্শ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে ১৯০৮ সালে এলাকার শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা উদ্যোগ গ্রহণ করেন বিদ্যালয় প্রতিষ্টার। সর্বাগ্রে শিক্ষানুরাগীরা নারী শিক্ষার প্রসার এবং সমৃদ্ধ করার চিন্তা করেন। সমাজ ও রাষ্ট্রকে উন্নত ও সমৃদ্ধময় করে তুলতে চাইলে সর্বোপরি সকল কু-সংস্কারের বিরুদ্ধে মানবাত্মা যেন প্রচণ্ড শক্তিতে জাগ্রত হয়ে উঠে তার জন্য নারী শিক্ষার কোন বিকল্প নাই। শিক্ষিত মা মানে শিক্ষিত জাতি। সেই চিন্তা প্রসূত ফসল কধুরখীল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি সীতা সুন্দরী বালিকা বিদ্যালয়, কধুরখীল এম.ই.র্গালস স্কুল এবং সর্বশেষে কধুরখীল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় রূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
১৯০৮ সালে বিদ্যালয়ের সূচনা হলেও মাঝপথে এই বিদ্যালয় বিভিন্ন সংকটে পড়ে ১৯১৯ সালে পুনরায় বিদ্যালয়টি এম.ই.র্গালস স্কুল রুপে আত্মপ্রকাশ করে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে চলতে বিদ্যালয়টি পরিপূর্ণরুপে ১৯৬০ সালে তার কার্যক্রম শুরু করে অধ্যাবধি এলাকায় নারী শিক্ষা বিস্তারে অনন্য ভূমিকা পলন করে যাচ্ছে। শতবর্ষী এই বিদ্যালয় স্থাপনে যাদের মেধা, শ্রম,অর্থ অনস্বীকার্য সে সকল মহৎ প্রাণ ব্যাক্তিরা হলেন-সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রফুল্ল রঞ্জন চৌধুরী, মহেন্দ্র লাল বিশ্বাস, মনিন্দ্র লাল চৌধুরী, হেমচন্দ্র চৌধুরী, বিনয় ভূষণ চৌধুরী,ললিত চন্দ্র চৌধুরী, শুধাংশু বিমল দাশগুপ্ত ও বিধুভূষণ চৌধুরী। পরবর্তীতে বিদ্যালয়টিকে আরো সমৃদ্ধ করার জন্য কাজ করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রধান শিক্ষক চিত্তরঞ্জন চৌধুরী, বাদল দত্তগুপ্ত, ননী গোপাল চৌধুরী এবং প্রধান শিক্ষিকা অমিয়া দাশগুপ্তা।
দূর্ভাগ্যের বিষয় ১৯৭১ সালে বিদ্যালয়টি পাক-হানাদার বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। তৎকালীন সময়ের এলাকার দানশীল ব্যাক্তি ও শুভানুধ্যায়ীরা বিদ্যালয় পূর্নগঠনে মনোনিবেশ করেন। তৎপরবর্তী সময়ে বিদ্যালয় বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এলাকার শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের অদম্য সাহসিকতায় বিদ্যালয়টি রক্ষা পায়।
বর্তমানে বিদ্যালয়টি অত্র এলাকায় নারী শিক্ষা বিস্তারে অগ্রনী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। ১৯৯৮ সাল থেকে পরবর্তী সময়ে বিদ্যালয়ে অভূতপূর্ব কাজ সম্পাদিত হয়। তৎকালিন সময়ে বিদ্যালয় পরিচালনার দায়িতে যারা ছিলেন তাদের অবদান অনস্বীকার্য। ঐ সময়ে বিদ্যালয়ের মাঠ তৈরি,নিজস্ব রাস্তা তৈরি, বিদ্যুতায়ন,অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আসবাবপত্র তৈরি, বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণের যোগান দিয়ে বিদ্যালয়কে আধুনিকায়নে ভূূমিকা রাখে। ২০১০ সাল থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি, শিক্ষার মানোন্নয়ন, সহ-পাঠক্রমিক কার্যাবলির বিস্তার ও প্রসারে বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদ যথাযথ ভূমিকা পালন করায় বর্তমানে কধুরখীল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি স¦-মহিমায় সমুজ্জল। বর্তমান স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ১নং কধুরখীল ইউনিয়ন পরিষদের নব নির্বাচিত চেয়ারম্যান আলহাজ্ব শফিউল আজম শেফুর দক্ষ পরিচালনায় এবং সদস্যদের সর্বাত্মক সহযোগিতায় বিদ্যালয় এখন অনেক আধুনিক,গতিশীল। শিক্ষার গুনগত মান বৃদ্ধিতে সভাপতির ঐকান্তিক প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়।
শান্ত, ¯স্নিগ্ধ, প্রকৃতির মনোরম পরিবেশে অবস্থিত বিদ্যালয়টি আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর। রয়েছে দক্ষ-অভিজ্ঞ শিক্ষক। যাদের আধুনিক ও প্রগতিশীল চেতনায় শিক্ষার্থীরা মান সম্পন্ন শিক্ষা গ্রহণে প্রয়াস পাচ্ছে। বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতা এবং প্রযুক্তির অপ্রতুলতা অনেকাংশে বেগ পেতে হয় পাঠদানে। এতদঞ্চলে দানশীল, শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গ এগিয়ে আসলে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমৃদ্ধ হবে। অত্র এলাকা হবে শিক্ষায় উন্নত। বিত্তের বিস্তৃতি আমাদের লক্ষ্য নয় চিত্তের গভীরতায় শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে দেশ প্রেমিক নাগরিক সৃষ্টির লক্ষ্যে ত্যাগ আর সেবার মহিমায় ভাস্কর হয়ে নিজ নিজ অবদান যেন রাখতে পারে তার দিকেই আমাদের সুগভীর লক্ষ্য। বিবিধ প্রতিকুলতা ও সীমাবদ্ধতার মাঝে ও বিদ্যালয়ের নিরলস প্রচেষ্টায় ২০১৫,২০১৬ ও ২০১৭ সালে শতভাগ ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হয়। এই বিদ্যালয় বিভিন্ন সময়ে পেয়েছে উপজেলা,জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগীতায় পুরষ্কার।
বিদ্যালয়ের কৃতি শিক্ষার্থী ড. কাঞ্চন চৌধুরী জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। এছাড়া আমেরিকা লন্ডন ও দেশের বিভিন্ন দপ্তরে অত্র বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন।বিদ্যালয়ে বর্তমান ১০ জন শিক্ষক ও চারজন কর্মচারী রয়েছে। বর্তমানে এ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তিন শতাধিক। বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের অপ্রতুলতা পাঠদানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এলাকার শিক্ষানুরাগী ও দানশীল ব্যক্তি এগিয়ে আসলে বিদ্যালয় আরো বেশি সমৃদ্ধ হবে। সরকারিভাবে বিদ্যালয় ভবন তৈরির জন্য আবেদন থাকলো।
বিদ্যালয়ে বিভিন্ন সহপাঠ ক্রমিক কার্যাবলীর যথাযথ বাস্তবায়ন হয়ে থাকে। জাতীয় দিবসসহ, রবীন্দ্র নজরুল-সুকান্ত জন্ম জয়ন্তী, আন্তশ্রেণি বিতর্ক, আন্তশ্রেণি ক্রিকেট, বাংলা নববর্ষ, বিভিন্ন সাহিত্যিক দার্শনিক, বিজ্ঞানীদের স্মরণানুষ্ঠান যথাযথভাবে পালন/উদ্যাপন হয়ে থাকে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তিন মাস অন্তর অন্তর প্রকাশ করে দেওয়ালিকা অরুনোদয়। রয়েছে বার্ষিক ম্যাগাজিন উৎসর্জ্জনা। শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিয়মিত খেলাধুলা সহ শিক্ষা সাহিত্য চর্চা হয়ে থাকে। বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে তারা এসকল কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে থাকে। পুরোপুরি শান্ত ¯স্নিগ্ধ মনোরম প্রাকিৃতিক ও শিক্ষা বান্ধব পরিবেশে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাঠ গ্রহণ করে থাকে। বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক পরিষদ উপজেলা সহ মহানগরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। বিদ্যালয়ে গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন মেধা বৃত্তি প্রদান করা হয়।
বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসে বিদ্যালয়কে সমৃদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম অপরাজেয় বাংলার শ্রষ্ঠা প্রফেসর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ভৌত বিজ্ঞানী প্রফেসর ড.জামাল নজরুল ইসলাম, প্রফেসর ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়য়া, একুশে পদক প্রাপ্ত ভাষা বিজ্ঞানী মাহবুবুল হক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য ড. শিরিন আক্তার, কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন, ডা. বি.বি. চৌধূরী, ড. জিনব্যোধি ভিক্ষু, জাপানের অনরারী কনসুলার নূরুল ইসলাম, প্রফেসর ড. সেকান্দর হোসেন, ভারতের বিশিষ্ট কবি শক্তিময় দাশ, ভারতীয় মহাকাশ বিজ্ঞানী ড. আশীষ দাশগুপ্ত, হাসিনা মন্নান এমপি, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদ, ড. গাজী সালেহ উদ্দিন,চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আহমদ খলিল খাঁন, শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা অধিদপ্তরের উর্দ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ। অথর্ মন্ত্রণালয়ের বর্তমান অতিরিক্ত সচিব অরিজিৎ চৌধূরীর সহযোগীতা এবং শিক্ষাবৃত্তি প্রদানে আমাদেরকে অনুপ্রানিত করে।
বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন বাবুল কান্তি দাশ। সহকারি প্রধান শিক্ষক উবাইদুল হক, সহকারি শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন অমরনাথ চক্রবর্তী, দেবী দত্ত, তনুশ্রী বিশ্বাস, শুভাশীষ নাথ, লিপি রানী শীল, মো. মিজানুর রহমান, দীল আফরোজ হীরা, প্রকাশ কুমার ঘোষ।
প্রাচ্য ও প্রতীচ্য শিক্ষার মিলন- আধ্যত্ম ও বিজ্ঞান সাধনার সমন¦য়ে বিদ্যালয়কে এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্ঠায় কর্মরত বিদ্যালয়ের একদল দক্ষ ও যোগ্য নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক। বর্তমান পরিচালনা পরিষদের সভাপতি সহ তাঁর পরিষদের আন্তরিক প্রচেষ্ঠা, কার্যকরি নির্দেশনা বিদ্যালয়ের মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদানে যোগ্য ও আদর্শ দেশ প্রেমিক নাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
নিত্য প্রসারণশীল সদা সক্রিয় সু-কেন্দ্রিক অনুরাগ্নি যারা অনির্বান উর্দ্ব শিখা বিস্তার করে জ্বলতে থাকে আর যে জ্বলন নিয়ত সার্থকতা লাভ করে প্রেষ্ঠানুগ অব্যর্থ মনোজ্ঞ চলনে, অন্তর ও বাহিরের যা যা কিছুর সুসংগত সাত্বত বিন্যাস বিনায়না ও সেবা সম্পোষনাকে সলীল করে সেখানেই ভেসে উঠে ঐশ্বর্য্য ও মাধুর্য্য মন্ডিত মহৎ চরিএ। এই লক্ষ্যই হচ্ছে কধুরখীল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নারীদেরকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারলে দেশ সমৃদ্ধ ও সুশৃঙ্খল হবে।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের এবং অভিভাবকদের আবেদন বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা হলে এতদঞ্চলের নারী শিক্ষা প্রসারে কধুরখীল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। যা বর্তমানে সময়ের দাবি মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। নারী শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা জরুরী।

লেখক : প্রাবন্ধিক