ওয়েবসাইটে ভিজিটর আনার কৌশল

সাফ্ফাত আহম্মদ খান

38

ইদানিং এসইও শিখার ব্যাপারে অনেকের মধ্যে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। অনলাইনে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এসইও করে টাকা আয়ের অনেক সুযোগ আছে। তাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এসইও শিখার জন্য কোর্স অফার করছে কিন্তু আপনি যদি কিছু বেসিক জানেন তাহলে এসইও শিখার শুরুটা আপনি ঘরে বসেই করতে পারবেন। আজ আমি এসইও নিয়ে কিছু বেসিক জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করব যাতে করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউনের এই অবসর সময়টিতে ঘরে বসে শিখতে পারেন।
এসইও-এর পুরো অর্থ হলো সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন। এখন প্রশ্ন আসতে পারে সার্চ ইঞ্জিন কী? ইন্টারনেট আমাদের মস্তিস্ককে অনেকটা অলস করে দিয়েছে। এখন আমরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোনো তথ্য পেতে হলে গুগল-এর ব্যবহার করি। গুগল খুব জনপ্রিয় একটি সার্চ ইঞ্জিন। গুগল ছাড়াও আরও অনেক সার্চ ইঞ্জিন আছে। গুগলে আমাদের কাক্সিক্ষত তথ্যের সম্পর্কযুক্ত কোনো একটি শব্দ দিলেই একগাদা তথ্যের একটি লিস্ট চলে আসে। এই ব্যাপারটাই হচ্ছে সার্চ ইঞ্জিন। এটি তার কিছু নিজস্ব এলগরিদম ব্যবহার করে ওয়েবসাইট গুলোকে ইনডেক্সিং করে যাতে সার্চ করলে স্বল্প সময়ে দ্রæত রেজাল্ট দেখাতে পারে কিন্তু এখানে একটা ব্যাপার লক্ষ্যণীয়। আপনি কোনো একটা কিছু লিখে গুগলে সার্চ করলেন তার ফলে হাজার হাজার রেজাল্ট আসল। তার মধ্যে প্রথম পেজে আসল ১০টি। এই ১০টি বা প্রথম সারিতে নিজের ওয়েবসাইটকে দেখানোর জন্য যে কৌশল অবলম্বন করতে হয় তাই হচ্ছে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন কারণ প্রথম সারির ওয়েবসাইটগুলিই বেশি ট্রাফিক পায়।
একটি ওয়েবসাইটের ভিজিটর বা ট্রাফিক হচ্ছে এটির মূল উপাদান। আপনি একটি ওয়েবসাইট তৈরি করলেন কিন্তু তাতে কোনো ভিজিটর নাই। তাহলে আপনার ওয়েবসাইটটিই বৃথা। যেমন: আমার একটি
ব্লগ সাইট আছে যেখানে আমি বিভিন্ন কোর্স সম্পর্কে অফার দিয়ে থাকি। আমি আমার সাইটটি এসইও করেছি। এখন আপনি যদি গুগল-এ সার্চ করেন Best IT course in Chittagong তাহলে আমার সাইটটি দেখাবে এবং দেখা গেল ভিজিটরের মধ্য থেকে আমি কয়েকজন শিক্ষার্থীও পেয়ে গেলাম। ভিজিটর বাড়ার কারণে আমি সাইটটির বিভিন্ন অংশে অন্য পণ্যের বিজ্ঞাপন দিতে পারলাম। তাতে আমার আয় অনেকগুণে বেড়ে গেল। আর এটাই হচ্ছে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের ফজিলত। তাই ওয়েবসাইটকে র‌্যাঙ্ক করানো বা সার্চ ইঞ্জিনের প্রথম সারিতে আনার জন্য সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন কৌশল ব্যবহার করতে হয়।
এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৮০%-৮৫% লোক সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে কোনো ওয়েবসাইটে আসে। ভবিষ্যতে এটি আরও বাড়বে। অনলাইন মার্কেট প্লেসে এ ধরনের কাজ প্রচুর রয়েছে কারণ অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের ওয়েবসাইট র‌্যাঙ্ক করানোর জন্য চুক্তিতে লোক নিয়োগ করে থাকে। এসইও দুই ধরনের হয়-পেইড সার্চ ও অরগ্যানিক সার্চ। পেইড এসইও হলো টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করা। টিভি বা অন্য কোনো মিডিয়াতে যেমন বিভিন্ন কোম্পানির বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয় তেমনি সার্চ ইঞ্জিনগুলোতে রিলেটেড কি-ওয়ার্ডে আপনার ওয়েবসাইটের লিংক প্রচার করা হয়। তবে এর জন্য আপনাকে শর্ত অনুযায়ী সার্চ ইঞ্জিনগুলোকে টাকা দিতে হবে। আর অরগ্যানিক এসইও হলো ফ্রি এসইও পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে এসইও করলে আপনাকে সার্চ ইঞ্জিনগুলোর কাছে কোনো টাকা দিতে হবে না। অরগ্যানিক এসইও খুবই কার্যকরী পদ্ধতি। একটু বুদ্ধি খাটালেই ভালো ফল পাওয়া যায়।
এবার দেখি সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের জন্য কী কী ব্যাপার জানতে হবে।
কি-ওয়ার্ড: কি-ওয়ার্ড হচ্ছে আমরা যখন কোনো সার্চ ইঞ্জিনে সার্চ বারে যা টাইপ করি। যেমন আমি টাইপ করলাম Best food in Chittagong। এটাই কি-ওয়ার্ড।
ব্যাকলিংক: ব্যাকলিংক হলো অন্য কোনো ওয়েবসাইটে আপনার ওয়েবসাইটের লিংক থাকা। ধরুন, আপনার ওয়েবসাইটের নাম কম্পিউটার ট্রেনিংডটকম। এখন কম্পিউটারশপডটকম নামক ওয়েবসাইটে যদি আপনার কমম্পিউটার ট্রেনিংডটকম-এর লিংক থাকে তাহলে ঐ লিংকটাই হলো আপনার ওয়েবসাইটের ব্যাকলিংক।
পেজ র‌্যাঙ্ক: পেজ র‌্যাঙ্ক বা সংক্ষেপে পিআর হচ্ছে একটি ওয়েবসাইট গুগলের কাছে কতটা প্রিয় তা নির্ধারণের একটা পদ্ধতি। গুগল একটা ওয়েবসাইটকে কিছু শর্তানুসারে নাম্বারিং করে থাকে। আপনার ওয়েবসাইটের পেজ র‌্যাঙ্ক জানতে আলেক্সাডটকম-এ গিয়ে দেখতে পারেন।
মেটা ট্যাগ: আমরা যখন গুগলে কোনো কিছু লিখে সার্চ দেই তখন প্রতিটি সার্চ রেজাল্টের নিচে ২-৩ লাইনে কিছু কথাবার্তা লেখা থাকে। এগুলো ঐসব ওয়েবসাইটের এইচটিএমএল কোডের মধ্যে মেটা ট্যাগ-এর মাধ্যমে লেখা আছে। গুগল লেখাগুলোকেই আপনার সামনে প্রদর্শন করছে। মেটা ট্যাগ অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
টাইটেল ট্যাগ: এর মানে হচ্ছে শিরোনাম। এটির মাধ্যমে ব্রাউজারের ট্যাবে আপনার ওয়েবসাইটের টাইটেল কী হবে সেটা নির্ধারণ করা হয় এবং সেই সাথে গুগলের সার্চ রেজাল্টে লিংকের শিরোনামে কী লেখা থাকবে সেটাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হয়ে যায়। অ্যাংকর টেক্সট/ ট্যাগ: কোনো লেখার উপর লিংক যুক্ত করতে অ্যাংকর ট্যাগ ব্যবহার করা হয়। যে লেখার উপর অ্যাংকর ট্যাগ ব্যবহার করা হলো সেই লেখাটিকে অ্যাংকর টেক্সট বলা হয়। আর সহজভাবে বললে, যখন আমরা এক বা একাধিক শব্দকে অন্য একটি পেজের লিংকের মাধ্যমে ক্লিকএ্যাবল করি এবং ঐ পেজের সাথে একটি বন্ধন তৈরি করি, এটিই অ্যাংকর টেক্সট।
হেডিং ট্যাগ: হেডিং ট্যাগ একটি ওয়েবসাইটের HTML কোডিং-এর অংশ। হেডিং ট্যাগ মোট ৬টি, H1 থেকে H৬ পর্যন্ত। সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের ক্ষেত্রে H1 ট্যাগের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশী। হেডিং ট্যাগের লেখা যেহেতু পৃষ্ঠার অন্যান্য লেখার থেকে বড় তাই এটা সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে ও গুগলকে লেখার বিষয়বস্তু ইনডেক্স করতে সাহায্য করে।
অন পেজ অপটিমাইজেশন: এর মানে হলো গুগলের কিছু শর্ত মেনে আপনার ওয়েবসাইটকে সম্পাদনা বা অপটিমাইজ করা। যেমন: আপনার ওয়েবসাইট যেন আরও কম সময়ে লোড নেয় সেই ব্যবস্থা করা, অপ্রয়োজনীয় ছবি ব্যবহার না করা, ছবিগুলোর মাঝে অল্টার টেক্সট ব্যবহার করা যাতে সার্চ ইঞ্জিন বুঝতে পারে ছবিটা কিসের, টাইটেল ও মেটা ট্যাগে কি-ওয়ার্ড ব্যবহার করা ইত্যাদি।
অফ পেজ অপটিমাইজেশন: নিজের ওয়েবসাইটের বাইরে অন্য ওয়েবসাইটে নিজের সাইটের জন্য লিংক তৈরির কৌশলকে অফপেজ অপটিমাইজেশন বলা হয়। যেমন: আপনার ওয়েবসাইটের বাইরে অন্যান্য ওয়েবসাইট, ব্লগ, ফোরাম, সোশ্যাল বুকমার্কিং সাইট, সোশ্যাল মিডিয়াতে আপনার ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপন প্রচার করা বা সোজা কথায় মার্কেটিং করে আপনার ওয়েবসাইটে ভিজিটর নিয়ে আসা।
সাইট ম্যাপ: আমরা যেমন কোনো স্থান ভিজিট করার পূর্বে ম্যাপ দেখে সেটি সম্পর্কে ধারণা নেই ঠিক তেমনই সার্চ ইঞ্জিন আপনার ওয়েবসাইটের কোথায় কী আছে তা যেন সহজে খুঁজে পায় সেজন্য আপনাকে একটি XML ফরম্যাটের Site Map তৈরি করে আপনার ওয়েবসাইটে রাখতে হবে। আরও যে দু’টি বিষয় সম্পর্কে জানা দরকার তা হলো হোয়াইট হ্যাট এসইও ও ব্ল্যাক হ্যাট এসইও। প্রত্যেকটি কাজের যেমন ভালো মন্দ ২টি দিক থাকে তেমনি এসইও’রও ভালো-মন্দ ২টি দিক আছে। ব্ল্যাক হ্যাট এসইও মূলত এসইও’র খারাপ দিক। এটি অনৈতিক এবং সার্চ রেজাল্টকে ম্যানিপুলেট করতে সহায়তা করে। সার্চ ইঞ্জিন যদি ধরতে পারে যে আপনি ব্ল্যাক হ্যাট এসইও করেছেন তাহলে আপনি কখনই পেজ র‌্যাঙ্ক পাবেন না। সাথে সার্চ ইঞ্জিন থেকে আপনার সাইটটাই গায়েব হয়ে যাবে। তাই সবসময় এর থেকে দূরে থাকাই ভালো। নিয়ম মেনে হোয়াইট হ্যাট এসইও করাই উত্তম।
উপরে আমি যতগুলো বিষয় সম্পর্কে বললাম তার প্রত্যেকটি সম্পর্কে গুগল বা ইউটিউবে বিস্তারিত পেয়ে যাবেন। তাই অবসর সময়ে বসে না থেকে কাজে লাগান। একটু চেষ্টা করলেই নিজেই হতে পারবেন নিজের শিক্ষক।
লেখক: কম্পিউটার হ্যাকিং ফরেনসিক ইনভেস্টিগেটর