ঐশী প্রেমের জ্যোতিতে প্রজ্বলিত হযরত শাহ্ জাহান শাহ (রা.) দরবার

16

মোহাম্মদ শাহ্ নেওয়াজ হোসেন চৌধুরী

বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি খ্যাত চট্টগ্রাম। সূফী সাধকদের আধ্যাত্মিক সাধনার অভয়ারণ্য হিসেবে সুপরিচিত চট্টগ্রাম। এহেন নান্দনিক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত চট্টগ্রামের এক প্রাচীনতম আধ্যাত্মিক কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিকৃতি ঐতিহাসিক ‘ধলই শাহী দরবার শরীফ’। ইতিহাসখ্যাত আধ্যাত্মিক সূফী সাধক আলোকময় মহাপুরুষ হযরত শাহজাহান শাহ্’র (রা.) পুণ্য স্মৃতিকেন্দ্র। দিবারাত্রি ভক্ত সাধারণের পদচারণায় কোলাহলে মুখরিত এই দরবার শরীফ। চট্টগ্রামের ব্যতিক্রমধর্মী ভৌগলিক পরিবেশ পারিপার্শ্বিকতা, নৈসর্গিক সৌন্দর্যের সাথে আধ্যাত্মিক ভাবগম্ভীর্যের অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে, ‘আসমান-জমিনের মধুর মিলন’ হয়েছে এই চট্টগ্রামে। সুদীর্ঘকাল ধরে চট্টগ্রাম সূফী-দরবেশ ও পীর-আউলিয়াদের বিচরণ ও পদধূলিতে পবিত্র। বাংলাদেশের মধ্যে গাউস-কুতুব, পীর-মুর্শিদ, অলি- আউলিয়া, সূফী-দরবেশের জন্য চট্টগ্রাম হচ্ছে উৎকৃষ্ট অঞ্চল। এখানে সূফী-সাধকদের প্রভাব যে কতখানি তা এ অঞ্চলের মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক জীবন ধারণ, ধর্মীয় আচার-আচরণ ও তাদের সংস্কৃতিতে পরিস্ফুটিত। চট্টগ্রামের মানুষের প্রাত্যহিক কাজ-কর্মে, মানসিক-ভাবনায়, গানে-কবিতায়, শিক্ষা- সংস্কৃতিতে, চিন্তা-চেতনায়, ধর্মীয় বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক সব দিক দিয়ে সূফী-সাধকদের শিক্ষা, অভিজ্ঞান ও সজ্ঞার প্রভাব বিদ্যমান। সূফীদের আধ্যাত্মিক প্রভাব এখানে ধর্মপ্রাণ মানুষকে আলোর পথের সন্ধান দিয়েছে। চট্টগ্রামে চলমান বিভিন্ন খানকার মাঝে হযরত শাহজাহান শাহ্ (রা.) দরবার শরীফ ইসলামী ঐতিহ্যের এক অনন্য ধারক ও বাহক হিসেবে দৃশ্যমান। আধ্যাত্মিকতার জগতে ও সূফী তরিকার অন্তর্ভুক্ত এক প্রসিদ্ধ দরবার শরীফ হিসেবে এই দরবার ইতোমধ্যে বেশ খ্যাতিলাভ করেছে। খ্রিষ্টীয় ১৫ শতকের গোড়ারদিকে আরাকান রাজ কর্তৃক চট্টগ্রাম দখলের সময়- কালের সাথে হযরত শাহজাহান শাহ্’র চট্টগ্রাম আগমনের সময়কালটি অনেকটাই সমসাময়িক বলে মনে করা হয়। এই মহান সূফীসাধকের মাজার শরীফটি সংস্কারের সময় সেখানে যে শিলালিপিটি পাওয়া যায় তাতে মগীভাষায় সন-তারিখ লিখা ছিল। মাজারে যে ইট পাওয়া যায় তা ১৪২০ অথবা ১৪২৫ খ্রিষ্টাব্দের তৈরী বলে জানা যায়। এই দরবার শরীফে প্রতি বছর বার্ষিক ওরশ উপলক্ষে অগণিত ভক্ত-অনুরাগীর সমাগম ঘটে। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তগণ ছুটে আসে অলির দরগাহে তাদের মনের আকুতি জানাতে। খোদাপ্রেমে মত্ত এসব মানুষ অলির দরবারে হাজির হয়ে তাদের মন-প্রাণ উজাড় করে দেয় স্রষ্টার নৈকট্যলাভে। কিন্তু কেন? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর মিলান কঠিন কাজ। কেননা আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে মানুষের মনোবাঞ্ছনা ও বিশ্বাসকেই মূল চাবিকাঠি হিসেবে গণ্য করা হয়। জাগতিকতার মাপকাঠিতে এর বিচার-বিশ্লেষণ করা যাবে না। এটা সত্য যে, হযরত শাহজাহান শাহ্’র (র.) মাজার শরীফে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের সমাগম ঘটে। এখানে সবাই নিজ নিজ মনোবাসনা নিবেদন করেন এবং অশেষ কল্যাণ ও সন্তুষ্টি নিয়ে কৃতজ্ঞচিত্তে ফিরে যান। বলা যেতে পারে, এই মাজার শরীফে সৃষ্টিকর্তার অসীম দয়া ও রহমতের ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হতেই থাকে।
হযরত শাহজাহান শাহ্ (রা.) মানুষকে সকল মোহান্ধতার জাল ছিন্ন করে খোদা-প্রেমে এগিয়ে আসার জন্য তাঁর রূহানী শক্তি দ্বারা আকর্ষণ করেছেন। যে কোন ভক্ত তাঁর মাজার শরীফে একবার এসেছেন, তিনি দুনিয়ার মোহ পরিত্যাগ করে তাঁর মাজার শরীফের খেদমতে বারবার আসার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মাজার শরীফে একবার আসার সাথে সাথে ভক্তের হৃদয়ের সাথে তাঁর হৃদয়ের এক অভিনব সংযোগ স্থাপিত হয়ে যায় এবং ভক্ত সমস্যার সমাধান পায়। বলা বাহুল্য, ভালবাসাপূর্ণ হৃদয় নিয়ে যে কোন ভক্ত হযরত শাহজাহান শাহ্ (রা.) এর সাথে রূহানী সংযোগ স্থাপনে সক্ষম হবেন। খোদার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য মানুষের প্রয়োজন শুধু ভালবাসা ও একাগ্রতার।
আধ্যাত্মিকতার জগতে হযরত শাহজাহান শাহ্’র বিচরণ ধর্মীয় চিন্তা-চেতনাকে নিঃসন্দেহে শাণিত ও সমৃদ্ধ করেছে। ওফাতের পাঁচশত আঠার বছর অতিক্রমের পর আজো এই মহান অলির আলোকময় সাধনার কেন্দ্রস্থল ধলই শাহী দরবার জনমানুষের আত্মা ও আধ্যাত্ম খোরাকের পরিপূর্ণ ভান্ডার হিসেবে উত্তর চট্টলায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।” অগণিত আশেকান- ভক্তক‚লের সমাগমে আজো তিনি জিন্দাপীরে সমাদৃত। তিনি যখন ধলইতে বসতি স্থাপন করেন তখন এই স্থান জঙ্গলাকীর্ণ, শ্বাপদ সংকুল ছিল। তিনি এখানকার মানুষকেই কেবল নয়, হিংস্র পশু-প্রাণীকেও শান্তির চেতনায় আধ্যাত্বিক শক্তিতে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হন। তাঁর কাছে এসে মানুষ, বাঘ, সর্প, সবাই হিংস্রতা ভুলে যেতো এবং এক কল্যাণময় চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠতো। এই কথা সত্য যে, অলি-আল্লাহ্-দরবেশরা কল্যাণময়তার প্রতীক। জাতি- ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কেবল মানুষ নয়, সকল প্রকার সৃষ্ট জীবের কল্যাণ করাই তাঁদের জীবন-ধর্ম। তাঁদের জীবন, সকল সাধনা, সকল অর্জন, সকল শক্তি হক্কুল্লাহ্র পাশাপাশি হক্কুল এবাদের অর্থাৎ আল্লাহ্র সৃষ্টির সেবায় নিয়োজিত। হযরত শাহজাহান শাহ্ (রা.) দরবার শরীফ এই হক্কুল এবাদ আদায়ে এক মহান দৃষ্টান্ত হিসেবে উদ্ভাসিত। এই দরবারে আগত দীন- দুঃখী-নির্যাতিত মজলুম ও পীড়িতরা একদিকে যেমন তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাবজাত কল্যাণ লাভ করেছেন, অন্যদিকে এই দরবার শরীফকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে হক্কুল এবাদ আদায়ের জাহেরী প্রতিষ্ঠানাদি। এখানে গড়ে উঠেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বহুবিধ কল্যাণকামী ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এই সেবা প্রকল্প দিন দিন স¤প্রসারিত হচ্ছে এবং মুসলিম আধ্যাত্ম সাধকদের জীবন ও সকল সাধনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য কল্যাণকামিতার মাহাত্ম্য ঘোষণা করছে। অলি আল্লাহদের মাজার শরীফ যে মানুষের ঐহিক-পারলৌকিক-জাহেরী-বাতেনী, আধ্যাত্মিক ও জাগতিক উভয় প্রকার কল্যাণের সমন্বিত অন্ত হীন ফোয়ারা, হযরত শাহজাহান শাহ্ (রা.) দরবার শরীফ তার এক উজ্জল দৃষ্টান্ত। মহান এই অলিআল্লাহ্ সম্পর্কে ইতোমধ্যে বেশ লেখালেখি হয়েছে। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায় দেশের প্রতিতযশা অনেক ইতিহাসবিদ, কবি-সাহিত্যিক, দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, চিকিৎসক, সাংবাদিক এই সম্পর্কে গবেষণা ও অনুসন্ধান করেছেন। এই পর্যায়ে যাঁদের নাম উল্লেখ করা যায় তাঁরা হলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও মরমী সূফী গবেষক প্রফেসর ডক্টর মুহম্মদ আবদুল মান্নান চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত সাবেক উপাচার্য বিশিষ্ট সমাজ বিজ্ঞানী প্রফেসর ডক্টর ইফেতেখার উদ্দিন চৌধুরী, প্রফেসর ডক্টর আবদুল করিম, প্রফেসর ডক্টর মনিরুজ্জামান, প্রফেসর ডক্টর আনিসুজ্জামান, প্রফেসর ড. মঈন উদ্দিন আহম্মদ খান, ডক্টর সেলিম জাহাঙ্গীর, প্রফেসর ডক্টর বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া, ডা. কিউ এম অহিদুল আলম, এ এন এম এ মোমিন, প্রফেসর ডক্টর তৌহিদ হোসেন চৌধুরী, প্রফেসর ড. বদিউর রহমান, প্রফেসর ড. মোজাফ্ফর হোসেন, প্রফেসর ড. হেলাল উদ্দিন, প্রফেসর ড. আবদুর রশিদ, প্রফেসর ড. আবু বকর, প্রফেসর ড. এম. শফিকুল আলম, প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জাফর উল্লাহ, ড. হাসনে আয়মুন, ড. নূর-এ আলম, ড. নিজাম উদ্দিন জামি, ড. মোরশেদুল আলম, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ, মওলানা আবুল হোসেন, মওলানা গোলাম মোহাম্মদ খান সিরাজি, মওলানা আবদুল আলীম রেজবী, মওলানা শিব্বির আহম্মদ ওসমানীসহ অনেক পন্ডিত ও বিদগ্ধজন। তাঁদের লেখায় হযরত শাহজাহান শাহ্ (রাঃ) এর দার্শনিক চিন্তাধারা বিকশিত হতে চলেছে। বিশেষ করে হুজুরের মাজার শরীফের মুখপত্র তোহফায়ে শাহজাহান শাহ্ শীর্ষক প্রবন্ধ সংকলন নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। এতে সর্বসাধারণের মধ্যে সূফী দর্শনের প্রচার ও প্রসার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রকাশনা তোহফায়ে শাহজাহান শাহ সম্পর্কে ড. মুহম্মদ আবদুল মান্নান চৌধুরী লিখেছেন, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে এই মহান দরবার ও আধ্যাত্ম কেন্দ্র হতে উৎসারিত আদর্শের বার্তা যেভাবে সকলকে একই সূত্রে গ্রথিত করে মহান আল্লাহ্র সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানব ও মানবতার কল্যাণে নিয়োজিত থাকার অবকাশ সৃষ্টি করে দিয়েছে, তদ্রæপ এ প্রকাশনা বর্তমান দ্ব›দ্ব-সংঘাতপূর্ণ বৈরী পরিবেশকে অতিক্রম করে সকল শ্রেণীর পাঠককে পারস্পরিক নৈকট্যপূর্ণ অবস্থানে আনতে সক্ষম হয়েছে।
ইতিহাসখ্যাত আধ্যাত্মিক সূফীসাধক জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ হযরত শাহজাহান শাহ্ (রা.) এর পুণ্য স্মৃতিকেন্দ্র ‘ধলই শাহী দরবার শরীফ’ বর্তমানে অসাধারণ মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে। ভক্ত সাধারণের পদচারণায় এই দরবার সদা মুখরিত। জাগতিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়সমূহকে বিবেচনাপূর্বক ডক্টর সেলিম জাহাঙ্গীর এই দরবার শরীফ সম্পর্কে কয়েকটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য টেনেছেন।
হযরত শাহজাহান শাহ্ (রা.) এর দর্শন ও চিন্তা-চেতনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তাঁর সমগ্র জীবন ছিল একদিকে ইহজাগতিক ও অন্যদিকে পারলৌকিক জীবন ঘনিষ্ঠ। তিনি এমন একজন আউলিয়া যাঁর কর্ম ও চেতনায় ইসলামের রবুবিয়াত বা পালন-বাদী কর্মসূচীর সার্থক বহি:প্রকাশ ঘটেছে।” অসহায়ের সহায়, ন্যায় বিচার প্রার্থীর যথার্থ বিচারক, মজলুমের ত্রাণকর্তা, দুরারোগ্য ব্যাধির সুচিকিৎসক ইত্যাদি গণমানুষের একান্ত জীবনঘনিষ্ঠ একাধিক অভিধায় তাঁকে অভিষিক্ত করা যায় অবলীলাক্রমে। তাঁর বহু কেরামত (অলৌকিক ক্ষমতা) সম্বন্ধে লোকমুখে অনেক কথা শুনা যায় এবং বেশ কিছু কেরামত এর মধ্যে প্রবন্ধ আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এইসব লেখালেখির গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাঁর সরল জীবন যাপন ও কারামতের অপূর্ব গৌরবগাথা এই অঞ্চলের মানুষকে বিভিন্নভাবে প্রভাবান্বিত করে আসছে। কাজেই তাঁর দর্শনকে ইহজাগতিক ও পারলৌকিক জীবন সমৃদ্ধ বলা যায়। হযরত শাহজাহান শাহ্’র (রা.) আধ্যাত্মিক পরশে অতিন্দ্রীয় ও অদৃশ্য সাহায্য সহযোগিতার পাশাপাশি তাঁকে কেন্দ্র করে ফোরকানিয়া ও এবতেদায়ী মাদ্রাসা, হেফজখানা, এতিমখানা, স্যাটেলাইট প্রাইমারী স্কুল, ইসলামী পাঠাগার প্রকল্প, দাতব্য চিকিৎসালয়, যাত্রী ছাউনী, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বহুমুখী কারিগরী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ইত্যাদি একান্ত জীবনঘনিষ্ঠ স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান সমূহের নিরবচ্ছিন্ন বহুমাত্রিক কর্মকান্ড সমাজ জীবনে প্রত্যক্ষ ও দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে চলেছে প্রতিনিয়ত। এর পাশাপাশি পরিকল্পিত বনায়ন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচীর মতো একান্ত যুগোপযোগী সৃজনশীল কর্মপরিকল্পনাসমূহ এই দরবারকে করে তুলেছে আরো বেশী আধুনিক ও জীবনঘনিষ্ঠ।
জাগতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার দৃষ্টি আকর্ষণীয় অপূর্ব মেলবন্ধনে হযরত শাহজাহান শাহ্ র (রা.) দরবার এতদঞ্চলের সমাজ। জীবনে এক অনুসরণীয় তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তাঁর মত একজন মহান সাধকের পবিত্র সৃজনশীল পরশ এই অঞ্চলকে ধন্য করেছে, যাঁর আগমন ও উপস্থিতিতে এই এলাকার মাটি পুনঃপ্রাণ পেয়েছে। মজলুম পেয়েছে সঠিক আলোর দিশা, দুর্বল পেয়েছে প্রতিবাদের ভাষা, পীড়িত পেয়েছে রোগমুক্তি, ক্ষুধার্ত পেয়েছে অন্নের সংস্থান। তাঁর এই করুণাধারা শুধু তাঁর জীবদ্দশাতেই নয় বরং তাঁর ওফাতের বহু বছর পরও সমভাবে বহমান। অনন্তকাল পর্যন্ত তা প্রবাহিত হতে থাকবে। কারণ, আল্লাহ্র অলিরা কখনো মৃত হতে পারেন। না। এই ঘোষণা স্বয়ং আল্লাহ্ তায়ালাই দিয়েছেন। হযরত শাহজাহান শাহ্ (রা.) এভাবেই এক বিশাল শান্তিপ্রদায়ী ছত্রছায়ার মত বিরাজ করছেন এবং ভক্তদের আশা, সাহস ও আস্থার অনির্বান প্রদীপ হয়ে বিরাজ করছেন।
হযরত শাহজাহান শাহ্’র দর্শন মানেই এক জ্যোতিময় সূফী সাধনা। মনে রাখা প্রয়োজন যে, সূফী বলব তাঁকে, যিনি ইসলামের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীন উভয় দিককে স্বীকার করেন। গোঁড়া মুসলিম তিনি, যিনি ইসলামের কেবল বাহ্যিক দিককে একমাত্র সঠিক রূপ মনে করেন এবং কোরআন-হাদিসের অভ্যন্তরীন অর্থ গ্রহণ না করে শুধুমাত্র আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করেন। একজন সূফীর হৃদয় পবিত্র আত্মায় পরিপূর্ণ। সূফী তাঁর প্রতিটি কাজে পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করার চেষ্টা করেন। সূফীর হৃদয়, আচার-ব্যবহার, কার্যাবিধি আল্লাহ্র প্রতি আন্তরিক ও অকপট। সূফী নিজেকে প্রেমিক এবং স্রষ্টাকে প্রেমময় মনে করেন এবং সেভাবে রূপকের ব্যবহারিক স্বরূপে তা অভিব্যক্ত করেন। বিশ্ব মানবতায় সূফী আদর্শ এক অনন্য দর্শন। জড় জগত ও আধ্যাত্মিক জগতের মধ্যে সূফী দর্শন এক যোগসূত্র রচনা করেছে। আমাদের এ জীবন যেমন মূল্যবান, তেমনিভাবে পরকালের জীবনও অর্থপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দর্শন বিভাগের প্রথিতযশা প্রফেসর ড. আনিসুজ্জান এর উক্তি ‘সত্যিকারের কামিল তিনি যাঁর মধ্যে শরীয়ত ও রূহানীয়াত আছে’ নিঃসন্দেহে প্রণিধানযোগ্য। কোরআন মানবে, হাদিস মানবে না- তা হয় না। মানলে দুটো মানতে হবে। শরীয়ত ও তরীকতের পরিচর্যা সমানভাবে করতে হবে। আত্মার ও সত্তার বিকাশ এবং সমন্বয় প্রয়োজন। তবেই ইসলামের মূল লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
পরিশেষে হেদায়েতের ধ্রæব নক্ষত্র (কুতুবুল এরশাদ) হযরত শাহজাহান শাহ্’র (র.) পবিত্র খোশরোজ শরীফ দিবসের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে আহবান জানাই, আসুন- ‘ধলই শাহী দরবার শরীফ’ এর পতাকা তলে সমবেত হই। সূফী আদর্শকে বাস্তবায়ন করি। তাতে মানবতা উজ্জীবিত হবে। মানব জীবন সৌন্দর্য্যের, সুখের ও শান্তির হবে। বর্তমান সংঘাতময় জগতে একমাত্র সূফী দর্শনই বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষণা দিতে পারে অপার শান্তির। সমগ্র জগতকে বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও প্রেমের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করতে পারে কেবল সূফীজ্ঞান। সব হানাহানি স্তিমিত হবে যদি সূফী আদর্শকে বাস্তবায়ন করা যায়। একমাত্র নির্লোভ, নির্মোহ, ন্যায়পরায়ন মানুষ ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে বদলিয়ে দিতে পারে। অন্ধকারাচ্ছন্ন মানব জাতির জন্য সূফী হতে পারেন আলোর দিশারী। মহা সংকটের সন্ধিক্ষণে আজ আমরা সবাই সেই আলোর দিশারীর প্রত্যাশী। মহান রাব্বুল আলআমীন আমাদেরকে ব্যক্তিগত, ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সর্বক্ষেত্রে সূফী আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে সকল সমস্যার উত্তরণে তৌফিক দান করুন।
লেখক : যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, মাজার শরীফ পরিচালনা পরিষদ