এ বর্বরতাকে রুখে দাঁড়াতেই হবে

8

দেশে প্রতিদিনই মারাত্মক সব সহিংসতা ঘটছে। সরকারের কঠোর হুঁশিয়ারি, আইনের প্রয়োগ ও অনেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মধ্যে মানুষের নৃশংসতা ও সামাজিক সহিংসতার রূপ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিই যে নির্মম বাস্তবতা তা সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলোর শিরোনাম ও ছবি দেখলেই বোঝা যায়। প্রকাশ্য দিবালোকে রাজপথে কুপিয়ে হত্যা, ঘুমের মধ্যে শিশুহত্যা, সন্তানের হাতে মা ও বাবা খুন কিংবা জন্মদাত্রী মায়ের হাতে সন্তান খুন কিছুই আর অবিশ্বাস্য মনে হয় না এখন! স্ত্রী খুন করছে স্বামীকে, স্বামী পুড়িয়ে মারছে স্ত্রীকে, ভাই খুন করছে ভাইকে। প্রতিনিয়ত এ ধরনের খুনের ঘটনা ঘটছে। আর ঘটনাপ্রবাহে একসময় জানা যাচ্ছে, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক দ্ব›দ্ব অথবা দলীয় অন্তঃকোন্দল, অথবা আধিপত্য ও চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি কিংবা সম্পত্তির বিরোধ এমন বেশিরভাগ হত্যাকাÐের কারণ। সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে ছাত্রলীগের বিবাদমান দুই গ্রæপের মধ্যে কথা কাটাকাটির জের ধরে ভযাবহ সংঘাত সৃষ্টি হয়, এতে মেডিক্যালের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জানড়ে অবশেষে জীবন ফিরে পায়। এ ঘটনার আগে সিলেট এবং বরগুনার দুই মহিলার স্বামীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা দেশব্যাপী চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। সবচেয়ে বড় কথা, এসব ঘটনা ঘটার পর গণমাধ্যমে দুস্কৃতিকারী হিসাবে ছাত্রলীগের নেতা বা কর্মী হিসাবে পরিচয় আসে। এ পরিচয় এদেশের কোটি মানুষকে আহত করে, অন্তত যারা ছাত্রলীগের মত একটি ঐতিহ্যগত ও গৌরবময় ছাত্র সংগঠনকে ভালোবাসে, যারা এদেশকে ভালোবাসে, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সুযোগ্য কন্যাকে ভালোবাসে। বাস্তবে এসব অপরাধীর পেছনের পরিচয় তাদের অনেকেই কখনো কোন সাংগঠনিক কর্মী বা নেতা হিসাবে দায়িত্বশীল ছিল না, বরং সংগঠনের নাম ব্যবহার করে মাত্রাতিরক্ত অপরাধে জড়িয়ে সংগঠনের ভাবমুর্তিকে ধ্বংস করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে। গত শনিবার নগরীর পাঁচলাইশস্থ মির্জাপুলের কাছে প্রকাশ্যে দিবালোকে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা প্রচেষ্টার সাথে জড়িত দুস্কৃতিকারীর পরিচয় ও কর্মকাÐের ফিরিস্তিও তাই বলে। শনিবারের এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে নগরবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। প্রত্যেকে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। আমরাও এ বর্বর ঘটনার নিন্দা জানাই। অপরাধির দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দাবি করছি। আশার কথা ঘটনার পরই পুলিশ আসামিকে সহযোগিসহ গ্রেফতার করেছে। দৈনিক পূর্বদেশসহ সহযোগি সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ করা হয়, পাঁচলাইশ থানা থেকে মাত্র কয়েকশ’ গজ দূরে মির্জাপুলে গত ১৭ নভেম্বর বিকাল পৌনে চারটার দিকে সংঘটিত ধারালো দা হাতে বিভীষিকাময় রক্তারক্তির ঘটনা ঘটে। হামলাকারী হিসেবে অভিযুক্ত কথিত ছাত্রলীগ নেতা ওয়াহিদুল আলম এবং গুরুতর আহত ব্যক্তির নাম আরিফ। ঘটনার পর পাঁচলাইশ থানায় মামলা হলে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওয়াহিদকে তার দুই সহযোগিসহ গ্রেপ্তার করে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠিয়েছে। ঘটনায় প্রকাশ যে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের এলাকাভিত্তিক প্রভাবশালী নেতা ও পুলিশের প্রশ্রয় এবং তাদেরকে দৈনিক নির্ধারিত হারে চাঁদা দিয়েই মির্জাপুলের মত সারা শহরজুড়েই ফুটপাত ও সড়কের পাশ দখল করে বিকাল থেকে মধ্যরাত অবধি ব্যবসা করেন ভাসমান হকাররা। রাজনৈতিক দলের পদধারী নেতাদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত এলাকাভিত্তিক নামধারী নেতা বা কর্মী, হকার নেতা ও পুলিশের নামে প্রতিদিন টাকা তোলা হয় প্রত্যেক হকারের কাছ থেকে। এমনকি হকার নেতাদের কেউ কেউ আবার মাল্টিপারপাস সোসাইটি খুলে হকারদের বড় অংশকে ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদে ফেলার অভিযোগও রয়েছে।
ঘটনার দিন গত ১৭ নভেম্বর বিকালে ব্যস্ত সড়কে জনসম্মুখে পৈশাচিক কায়দায় আরিফ হোসেনের ওপর হামলার দৃশ্য ঘটনাস্থলের পাশে একটি বেসরকারি ব্যাংকের দেয়ালে লাগানো ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায় ধরা পড়ে। দূরের আরও দুয়েকটি ক্যামেরায়ও হামলার দৃশ্য রেকর্ড হয়। দু’টি ক্যামেরায় রেকর্ডকৃত কয়েক মিনিটের একটি ভিডিওচিত্র দু’দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে ফিরছে। তাতে দেখা গেছে, দিনের আলোয় সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত এক ব্যক্তি নিজের ডান হাতে থাকা ধারালো দা দিয়ে আরিফ হোসেনকে উপর্যুপরি কুপিয়ে চলেছেন। কোপানোর পরও তিনি নিবৃত্ত হননি। এরপর তিনি ঘটনাস্থলে নির্মাণকাজের জন্য ফুটপাত ঘেঁষে জমিয়ে রাখা ইটের স্তূপ থেকে একের পর এক ইট হাতে নিয়ে সড়কের প্রান্তে লুটিয়ে পড়া আরিফের ওপর ছুড়ে মারছেন আর অনর্গল বকছেন। ঘটনার শিকার আরিফ ধারালো দায়ের কোপের মত অস্ত্র ইটের আঘাতগুলোও নিজের সাধ্যমত হাতওপা ছুঁড়ে ঠেকানোর কিংবা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। আহত আরিফ ও হামলায় নেতৃত্ব দেয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত ওয়াহিদ দু’জনই শুলকবহর এলাকার বাসিন্দা। তবে, রাজনীতি একই আদর্শের হলেও নেতার আনুগত্যে দুজন দুই মেরুর । যার খেসারত দিতে হয়েছে আরিফকে। ভিকটিম সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও তার জীবন এখনও সংকটে রয়েছে। ঘটনা যাই হোক, বাস্তবতা হচ্ছে, প্রকাম্য দিবালোকে ধারালো অস্ত্র দিযে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা সমাজের চরম নিষ্ঠুরতার প্রকাশ। ঘটনার ভাইরাল হওয়া ছবি যে কাউকে আহত করবে। আমরা আশা করি, আইনশৃঙ্খরা বাহিনী যেহেতু দ্রæত আসামিকে গ্রেফতা করতে সক্ষম হয়েছে, সেহেতু দ্রæত বিচারও নিশ্চিত করা হবে। এ ছাড়া রাজনৈতিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির যে নির্মম উৎসব চলছে তা থেকে রেহাই পেতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জনগণের মধ্যেও সচেতনতা ও অপরাধ প্রতিরোধের মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে।