এয়াকুব আলী চৌধুরী

27

 

প্র্রসিদ্ধ সাধক হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) এর পূণ্যভূমি এবং চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা উপজেলার অন্তর্গত বটতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আলহাজ্ব এয়াকুব আলী চৌধুরী। যিনি এয়াকুব মিয়া হিসেবে সমাধিক পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতা মরহুম আছদ আলী চৌধুরী দোভাষী একজন স্বনামধন্য ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন। জনাব আছদ আলী চৌধুরী দোভাষী ২২ জুলাই ১৯০৭ সাল হতে আমরণ বটতলী ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট পদে দায়িত্বে ছিলেন এবং চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতের তৎকালিন জুরী বোর্ডের জুরার (বিচারক) ছিলেন। বংশ পরম্পরায় আছদ আলী চৌধুরীর মৃত্যুতে তার জ্যৈষ্ঠপুত্র আবদুল আজিজ চৌধুরী ১৯২৪ সালে বটতলী ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট পদে ও জুরি বোর্ডের সদস্য পদে আসীন হন। শিক্ষায় এলাকাকে আলোকিত করার লক্ষ্যে মরহুম আবদুল আজিজ চৌধুরী নিজ অর্থায়নে ও জমিতে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ১৯১৬ সালে বটতলী শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) এম.ই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৯৪৫ সালের ২১ জানুয়ারি পরলোক গমন করেন। পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় মরহুম আবদুল আজিজ চৌধুরীর অনুজ মেধাবী ও তীক্ষ্ন বুদ্ধি সম্পন্ন আলহাজ্ব এয়াকুব আলী চৌধুরী ১৯৪৫ সালে বটতলী ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সাথে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট এবং পরবর্তীতে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৬ বৎসর কাল বটতলী ইউ, পি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। জনপ্রিয় এ নেতা ১৯৫৪ সালে প্রত্যক্ষ নির্বাচনে তৎকালিন মুসলিম লীগ নেতা নুরুল আনোয়ার চৌধুরীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি একজন দক্ষ বিচারক ছিলেন। জনাব চৌধুরী অত্যন্ত ন্যায় ও নিষ্ঠার সাথে চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতের তৎকালিন জুরি বোর্ডের জুরার (বিচারক) এর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পশ্চিমচাল সিনিয়র মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং আনোয়ারা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের অন্যতম দাতা সদস্য ছিলেন। শিক্ষায় আলোকিত করার মহৎ লক্ষ্যে এয়াকুব আলী চৌধুরী তার অগ্রজ আবদুল আজিজ চৌধুরী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বটতলী শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) এম,ই বিদ্যালয়কে নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে ও সকল প্রতিকূলের মাঝে একক প্রচেষ্ঠায় ১৯৪৮ সালে নিম্ন মাধ্যমিক ও ১৯৫৪ সালে উচ্চ বিদ্যালয়ে পরিণত করেন। জনাব চৌধুরী অত্র এলাকার সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষার অভাব অনুভব করায় তিনি ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) এয়াকুবিয়া দাখিল মাদরাসা। উক্ত মাদ্রাসার জন্য জমি দান করেন তার স্নেহভাজন একমাত্র ভ্রাতুষ্পুত্র বিশিষ্ট দানবীর মরহুম আলহাজ্ব ছালেহ আহমদ চৌধুরী। উক্ত ছালেহ আহমদ চৌধুরী শৈশবকালে পিতৃহারা হওয়ায় তিনি তাঁকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অনন্য অবদান রাখেন। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত ও বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন। তৎকারণে রাজাকাররা তাঁর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া মাজারের পার্শ্ববর্তী বাড়ি হওয়ায় রাজকাররা পিছু হটে। এয়াকুব আলী চৌধুরী সর্বজন শ্রদ্ধেয় জননেতা ছিলেন। দলমত নির্বিশেষে সকলের কাছে তিনি শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে ছিলেন। চট্টগ্রাম সহ বিভিন্ন জেলায় তার সুনাম খ্যাতি ছিল। সাংগঠনিক দক্ষতা এবং যুগোপযোগী ও সময়োচিত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দূরদর্শিতার জন্য তিনি সর্বমহলে সমাদৃত ছিলেন। সকল রাজনৈতিক নেতা থেকে সকল শ্রেণীর লোক তার কাছে বুদ্ধি পরামর্শের জন্য আসতেন। তিনি ছিলেন মিষ্টভাষী, সদালাপী। তিনি বিশাল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। এয়াকুব আলী চৌধুরী ২০০১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর পরলোক গমন করেন। এয়াকুব আলী চৌধুরী শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি নয়, তিনি একটি আদর্শ ও প্রতিষ্ঠান। একটি উন্নত ও আলোকিত সমাজ গঠনই ছিল তার মূল লক্ষ্য। কখনো তিনি তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। নির্লোভী ও পরোপকারি জনাব চৌধুরী গরীব, দুঃখী ও অবহেলিত মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন। মরহুম আমৃত্য মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। তার অবদান চির অম্লান এ পৃথিবীর লোকালয়ে।