এক শিক্ষককে জুতার মালা পরানোর পর আরেকজনকে পিটিয়ে হত্যা

14

 

পূর্বদেশ ডেস্ক

নড়াইলের কলেজ অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসসহ বাংলাদেশের সংখ্যালঘু শিক্ষকদের নির্যাতনের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তপূর্বক দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে। গতকাল সোমবার বিকালে শাহবাগে ধর্ম অবমাননার নামে মিথ্যা অজুহাতে শিক্ষকদের নির্যাতন-নিপীড়ন, অপমানের শাস্তি দাবি করে নাগরিক সমাবেশ ও মানববন্ধন করে বিভিন্ন সংগঠন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক এবং সাবেক চেয়ারম্যান কাবেরী গায়েন, শাহবাগের সংগঠক, প্রকাশক ও লেখক রবিন হাসান, মাইনরিটি রাইটস ফোরাম বাংলাদেশের নেতা অমূল্য কুমার বৌদ্ধ, ছাত্র ঐক্য পরিষদের নেতা কাজল দাস, নাগরিক আন্দোলনের নেতা শরিফুজ্জামান শরীফ, ঢাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক, রোবায়েত ফেরদৌস, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নাট্যকার কামাল উদ্দিন কবিরসহ বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষক ও সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। নাগরিক সমাবেশে কাবেরী গায়েন বলেন, এ নিয়ে অনেকবার আমরা এখানে দাঁড়িয়েছি, আজ প্রথম না। আমরা ২০১৩ সালে দেখেছি পাবনায় একজন ছাত্র তথাকথিত অভিযোগে শিক্ষককে দুই হাতে ইট দিয়ে মাঠের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। সেটা কিন্তু মিডিয়াতে আসেনি। তারপর আমরা ক্রমাগত শ্যামল কান্তির ঘটনা দেখেছি, আমরা সবাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কান ধরে ‘দুঃখিত স্যার, দুঃখিত স্যার’ বলেছি। কিন্তু যে সংসদ সদস্য শিক্ষার্থীদের সামনে তাকে চড় মেরেছিলেন, তাকে কি জবাবদিহিতায় আনা হয়েছিল? হয়নি।
তিনি বলেন, তারপর আমরা দেখেছি শিক্ষক হৃদয় মন্ডলকে। তাকে মারধর করা হয়েছে, জেলে নেওয়া হয়েছে। সেই ঘটনার মধ্যেই দেখলাম আশালতা নামের আরেকজন শিক্ষিকাকে। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হলো, ছাত্রীরা বোরখা পরেছে বলে তিনি তাদের পিটিয়েছেন। কিন্তু পরে ছাত্রীরাই বলেছেন, আমরা স্কুল ড্রেস পরিনি বলে তিনি বকাঝকা করেছেন। অথচ, সেটিকে সা¤প্রদায়িকরণ করা হয়েছে। কারণ, তার একটা বাংলা (হিন্দু) নাম আছে সেজন্য। এরপর আমরা দেখলাম একজন শিক্ষককে জুতার মালা পরানো হলো! ওই শিক্ষক যখন নিজের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ডাকলেন। তখন সেই পুলিশের সামনেই এই ঘটনা ঘটানো হলো।
কাবেরী আরও বলেন, আমরা শিক্ষকরা যদি না মনে করি, আমাদের জুতার মালা পরানো হয়েছে। তাহলে আমি মনে করি এই দেশের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমি পড়ে এসেছি, সেগুলোকে আমি ধারণ করি না। আমি একজন শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা রাখি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষক সমিতিগুলো এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিবাদ জানায়নি।
তাহলে আমাদের শিক্ষক সমিতির কাজ কী? আমাদের শিক্ষক ফেডারেশনের কাজ কী? আমাদের স্কুল এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির কাজ কী? আমাদের শিক্ষা মন্ত্রীর কাজ কী? শিক্ষা উপমন্ত্রীর কাজ কী? এরকম করে কি শিক্ষকদের এক এক করে অপমান করতেই থাকবে?
ঢাবির এ শিক্ষক আরও বলেন, শিক্ষক লাঞ্ছনা এখন শিক্ষক হত্যায় উপনীত হয়েছে। ছাত্রীদের বখাটে উত্যক্ত করার প্রতিবাদ করলে সাভারে একজন শিক্ষককে সকলের সামনে পিটিয়ে মারা হয়েছে। আজ এই প্রতিবাদ সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ থাকার কথা ছিল, আমরা মাত্র তিনজন শিক্ষক (বিশ্ববিদ্যালয়ের) এখানে এসেছি। আরও শিক্ষকও এসেছেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকদের একটা গরিমা আছে- আমরা স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের সম্মানের দিক থেকে আমাদের নিজেদের সমপর্যায়ে মনে করি না। কিন্তু খুব বেশিদিন নেই, আপনার গলাও জুতার মালা পরবে। আসুন আমরা রুখে দাঁড়াই।
শিক্ষক হত্যার জন্য ১৯৭১ সালে এই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। একজন শিক্ষক হিসেবে আমাকে কথা বলতে হয়, আমাকে পরিবর্তনের কথা বলতে হয়। সেই কথাটি যদি আমরা খোলাখুলি বলতে না পারি, সেজন্য যদি আমাদের গ্রেপ্তার করা হয়, তাহলে কি আমরা পড়ানো বাদ দিয়ে দেবো? মুক্ত চিন্তার মানুষগুলো কি আর এই পথে হাঁটতে পারবো না? আর আমি আমার জীবন নিয়ে বিচলিত না। কিন্তু আমি ভয় করি- এই সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষকরা কিন্তু আর বেশি দিন থাকবেন না। ১০/২০ বছর পর তাদের সংখ্যা এমনিতেই কমে যাবে। কিন্তু এই কোমলমতী শিক্ষার্থীরা, যে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা এই কাজগুলো করছে, শিক্ষকদের মারছে, গলায় জুতোর মালা পরিয়ে দিচ্ছে, তাদের হাতেই কিন্তু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। সেটা কোন দেশ হবে, আমরা কী ভাববো?
ঢাবির অপর শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, বাংলাদেশকে একটি ধর্মতাত্তি¡ক রাষ্ট্র বানানো হচ্ছে। যেখানে কেবল এক ধর্মের মানুষ বাস করবে। এর আগে দুর্গা পূজার সময় আমরা দেখেছি পুরো বাংলাদেশ জুড়ে অসংখ্য পূজা মন্ডপ ও মন্দিরে ভাংচুর-নাশকতা। এবং আমরা দেখলাম পররাষ্ট্রমন্ত্রী নির্লজ্জের মতো ভারতবর্ষে গিয়ে সেটিকে অস্বীকার করলেন। এই যে অস্বীকৃতির রাজনীতি, এটা বরং আমাদের দেশে যারা সনাতন ধর্মের মানুষ, অন্য ধর্মের মানুষ, তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকিকে অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়। আমাদের ঘটনার সত্যতা স্বীকার করতে হবে, দোষীকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। অথচ একটি বিচারও আমরা দেখছি না। মানুষ ধর্মান্ধ হয়ে যাচ্ছে, রাষ্ট্র চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িক হয়ে যাচ্ছে। খবর বাংলানিউজের
তিনি আরও বলেন, শিক্ষককে জুতার মালা পরানোর বিষয় নিয়ে অনেকে পুলিশের কথা বলছেন। কিন্তু যে পুলিশ দাঁড়িয়েছিল পোশাকের ভেতর দিয়ে সেও একজন ধর্মান্ধ। ওই পুলিশের পোশাক না থাকলে সে হয়তো জুতার মালা নিজেই পরিয়ে দিতো। কাজেই পুলিশের প্রতি কোনো আস্থা কিন্তু আমাদের থাকছে না। যে যার জায়গা থেকে, ছাত্র-শিক্ষক-সাংবাদিক, আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের জায়গা থেকে এগিয়ে আসা। নইলে এমন একদিন আসবে যখন তারা আপনাকেও জুতোর মালা পরাতে আসবে এবং তখন আপনি প্রতিবাদের কাউকে পাবেন না।
বক্তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীসহ আমি-আপনি যে শিক্ষকের কাছে লেখাপড়া করেছি, মন্ত্রী-আমলারা যে শিক্ষকের কাছে লেখাপড়া করেছেন, পুলিশের আইজিপি যে শিক্ষকের কাছে লেখাপড়া করেছেন, সেই শিক্ষকের গলায় জুতার মালা উঠেছে। কিন্তু আপনারা এখনো চুপ কেন? পুলিশ পাহারায় একজন শিক্ষককে গলায় জুতার মালা দেওয়া হয়, এই হলো আজকের বাংলাদেশ। এটা শিক্ষকের গলায় জুতার মালা নয়, ৫০ বছরে বাংলাদেশের মানচিত্রে জুতার মালা পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু করে উন্নয়ন করা হচ্ছে, কিন্তু মানুষের মননের কোনো উন্নয়ন নেই।
বক্তারা এ সময় শিক্ষকদের নির্যাতন-নিপীড়ন, অপমান করাসহ বিভিন্ন অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্তপূর্বক দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
উল্লেখ্য, স¤প্রতি ফেসবুকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নূপুর শর্মার সমর্থনে মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের এক শিক্ষার্থীর পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে গত ১৮ জুন বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। এরপর গুজব ছড়িয়ে পড়ে পোস্ট দেওয়া ওই শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়েছেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস। এ ঘটনার পর পুলিশ পাহারায় তাকে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় তাকে দাঁড় করিয়ে পুলিশের সামনেই গলায় জুতার মালা পরিয়ে হেনস্তা করা হয়। পরে তাকে পুলিশি হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয়।