এক ভাষা সৈনিকের গল্প

12

১৯৫২ সাল। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর রোষানল পড়েছে বাঙালি জনতার প্রাণের ভাষা বাংলার উপর। চিরকালই বাঙালিদের উপর অত্যাচারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার জন্যই পাক হানাদার গোষ্ঠী এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে নেমেছে। বাঙালি জাতি শোষিত হতে হতে পুড়ে খাঁটি মানুষে পরিণত হয়েছে। এবার বাঙালি জাতি মাথা তুলে দাঁড়াবে। এই প্রত্যয় নিয়ে বাঙালি জাতি গঠন করে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।
দিপু, গ্রামের এক সাধারণ ঘরের ছেলে। বাবা কৃষক আর মা গৃহিণী। তবুও বাবা মায়ের ইচ্ছে ছেলে পড়ালেখা করে মানুষের মতো মানুষ হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে দিপু বাবার সম্মতিতে ভর্তি হলো ঢাকার একটি কলেজে। দিপুর বয়স তখন সতেরো কিংবা আঠারো বছর হবে। একজন তরুণ যুবক। অন্যায়ে প্রতিবাদ করা ছিলো দিপুর রক্তে মেশা এক স্বভাব। ঢাকা শহরের কিছু ছেলের সাথে দিপুর ভালো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। রোমান, শুভ, রিংকু, সুমন ও শরীফ নামে তার পাঁচজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো। যারা বিভিন্ন সময়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক সাথে কাজ করেছে।
সবগুলো যুবকই ছিলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী। দেশে চলছে আন্দোলন। কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পাকিস্তানি সরকার বাঙালি জাতির ভাষার উপর যে আঘাত আনে এই আঘাতের প্রতিবাদী আন্দোলনে দিপু আর তার বন্ধুরাও অংশগ্রহণ করে। রাতে দিপু ও তার বন্ধুরা কাগজ, রঙ, লাঠি ও ময়দা দিয়ে বিভিন্ন ধরণের প্লেকার্ড, ফেস্টুন বানায়। শত শত প্লেকার্ড ও ফেস্টুন তারা তুলে দেয় আন্দোলনকারী ছাত্রদের হাতে। বিক্ষুদ্ধ আন্দোলনে তারাও অংশগ্রহণ করে। রাজপথে নেমে এসে সেøাগান দিতে থাকে “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”। আন্দোলনের চাপে পড়ে পাকিস্তান সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। রাজপথে দুইয়ের অধিক কোনো ব্যক্তি চলাচল সম্পুর্ণ নিষেধ করা হয়।
দিপুর বাড়ি থেকে তখন একটি চিঠি আসছিলো। সেখানে তার বাবা লিখেছিলেন “বাবা দিপু, শুনছি ঢাকা শহরে গন্ডগোল হচ্ছে। তুই গ্রামে চলে আয় বাবা। আন্দোলন বন্ধ হলে আবার চলে যাইস”।
বাবার দেয়া চিঠি পড়ে দিপু ভাবে, দেশের একজন মানুষ হিসেবে আমি আমার বাংলা মায়ের এ দুর্দিনে পাশে না থাকলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না। তাই বাবার দেয়া চিঠিটা পকেটে ভরে রাখলো। এদিকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বাঙালি সূর্য সন্তানেরা তাদের মাতৃভাষা রক্ষার যুদ্ধে রাজপথে নেমে আসে। সেই আন্দোলনে যুক্ত হয় দিপু ও তার বন্ধুরা। দিপু তার বন্ধুদের নিয়ে রাজপথে সবার সাথে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে তুলেছে রাজপথ। পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে রাস্তায় নেমে আসে পুলিশ ও দাঙ্গা বাহিনী। হাতে বন্দুক ও লাঠি নিয়ে হঠাৎ আক্রমণ করে ছাত্রদের উপর। শুরু করে গুলিবর্ষণ ও লাঠিচার্জ। তবুও আন্দোলন থেমে নেই। মায়ের ভাষা আদায়ের জন্য প্রাণের তোয়াক্কা না করে পুলিশের আক্রমণেও ভয়ভীত হয় নি দিপুরা। শুরু হয় পুলিশের সাথে দিপুদের সংঘর্ষ।
হঠাৎ! পুলিশের ছোড়া গুলি এসে পড়ে দিপুর বুকের মধ্যিখানে। ভাষার দাবিতে স্লোগানে স্লোগানে আকাশে উত্তোলিত আন্দোলনকারী দিপুর হাত হঠাতই নিচের দিকে নুয়ে পড়ছে। রক্তে লাল হয়ে গেছে দিপুর গায়ে থাকা টি-শার্ট।
পকেটে থাকা বাবার পাঠানো চিঠিটাও রক্তে ভিজে গেছে। বাবার কথা শুনলে হয়তো দিপুকে আজ লাশ হয়ে রাজপথে পড়ে থাকতে হতো না। কিন্তু দিপু দেশপ্রেমে উজ্জীবিত টগবগে এক তরুণ। দেশের দুঃসময়ে সে নিজেকে ঘরের চার দেয়ালে বন্দি করে রাখতে পারি নি। নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে রাজপথে। ভাষা আন্দোলনে এমন আরো অনেক দিপু এভাবেই দিয়েছে আত্মবলিদান। এই আত্মদানের ফল স্বরুপ বাঙালি জাতি পেয়েছে তাদের প্রাণের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলাকে। এই বাংলার বুকে চির অম্লান হয়ে থাকবে তাদের এই ত্যাগ এবং দেশপ্রেম।