এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম

সাধন সরকার

18

ট্রেন স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ছুঁয়ে দাঁড়াতেই শুরু হয়ে গেল হুড়োহুড়ি। যাত্রী নামার আগেই আরেক দল ট্রেনে ওঠার জন্য ব্যস্ত। এত ভিড় ঠেলে নামাটাই ঝক্কি। কিন্তু উপায় নেই। নামতেই হবে। শক্ত হাতে ট্রলি ব্যাগটা ধরে রেখে কোনো রকমে নেমে এলো নীরা। আজই রাতুলের বাবা-মার সাথে দেখা করার কথা নীরার। কিন্তু ট্রেন থেকে নামতেই শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। যদিও আকাশ আগে থেকেই মেঘলা ছিল! বৃষ্টি নীরা আর রাতুলের খুবই পছন্দের। বৃষ্টির দিনে ক্যাম্পাসে দু’জন একসাথে হাতে হাত ধরে এক ছাতার নিচে পিচঢালা পথে কতবার যে ঘুরে বেরিয়েছে তার শেষ নেই! কিন্তু ট্রেন থেকে নামা মাত্রই আজকের এ বৃষ্টি যেন অনাকাক্সিক্ষত। তাছাড়া অজানা এক রেল স্টেশনে পা রেখেছে নীরা! চারদিকে মানুষ গিজগিজ করছে। স্টেশনে রাতুলের দাঁড়িয়ে থাকার কথা। কিন্তু রাস্তায় জ্যাম থাকার কারণে স্টেশনে সঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারেনি রাতুল। এরই মধ্যে বৃষ্টি হানা দেওয়ায় সব এলোমেলো হয়ে গেল! ভিড় ঠেলে তাড়াহুড়ো করে স্টেশনে পৌঁছাতেই নিজের মুঠোফোনটিও যে কোন ফাঁকে ছিনতাই হয়ে গেছে তা টেরই পায়নি রাতুল! বৃষ্টি থেকে বাঁচতে স্টেশনের জনাকীর্ণ এক কোণে আশ্রয় নিয়েছে নীরা। বার বার ফোন দিয়েও নীরা রাতুলকে পাচ্ছে না। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে নীরা। এদিকে রাতুলও নীরার দেখা পেতে হন্যে হয়ে পুরো রেল স্টেশন চষে বেরিয়েছে। কিন্তু কোথাও নীরার দেখা নেই!
হঠাৎ করে নীরার মুঠোফোনে একটি ফোনকল আসে। ফোনটি বেজে ওঠতেই নীরা যেন প্রাণ ফিরে পায়। মুঠোফোনের স্ক্রিন না দেখেই হন্তদন্ত হয়ে ফোনকল রিসিভ করে নীরা।
‘হ্যালো, নীরা। তোর না আজকে রাতুলদের বাসায় যাওয়ার কথা।’
‘বাবা, সেজন্যই তো রেল স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি। প্রচুর বৃষ্টি। কিন্তু রাতুলের দেখা এখনো পাচ্ছি না।’
এসব শুনে নীরার পরিবারও খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে। এক পৃথিবী টেনশন যেন ভর করে নীরার ওপর। বৃষ্টিও কমার কোনো নামগন্ধ নেই। এদিকে রাতুলও নীরাকে খুঁজতে খুঁজতে বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। ফোনটি ছিনতাই হয়ে যাওয়ায় যেন সব সমস্যার মূল! খানিক পর বৃষ্টির তেজ কিছুটা হলেও কমে আসে। নীরার চোখেমুখে তখনো অন্ধকার! নীরা মনে মনে ভাবে, ‘রাতুল কেন যে এমন করলো ঠিক বুঝতে পারছি না!’
রেল স্টেশনে এমনসব কান্ড হয়ে যাওয়ায় রাতুলও নিজেকে ক্ষমা করতে পারছে না! হঠাৎ রাতুলের মাথায় একটি বুদ্ধি এলো। রাতুল নীরাকে খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে স্টেশন কর্তৃপক্ষের সহায়তা চায়। অতঃপর স্টেশনের সাউন্ড সিস্টেমে রাতুল নিজেই ঘোষণা দেয়, ‘নীরা, আমি রাতুল। তুমি যেখানেই থাক না কেন এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে চলে আসো। আমি এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে তোমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি।’ এ রকম ঘোষণা পরপর দু’বার দেওয়া হয়। নীরার কাছে এই ঘোষণা পৌঁছানো মাত্রই নীরা খুশিতে আত্মহারা হয়ে ওঠে। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জল মুছে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসে পৌঁছায় নীরা। স্টেশনের আশপাশের অন্যরা সবাই চেয়ে থাকে। অবশেষে দেখা মিলে নীরা আর রাতুলের। এ যেন এক মিলনমেলা! স্টেশন কর্তৃপক্ষও বেশ খুশি। দু’জন বৃষ্টিতে যেন আধভেজা! হাতে হাত রাখতেই দু’জন আনন্দে কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। এবার বাসায় ফেরার পালা। দু’জন বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে রাতুলদের বাসার দিকে পা বাড়ায়। রাতুলের মা-বাবাও সব শোনার পর চমকে যায়। নীরাকে দেখেই তাঁরা পছন্দ করে ফেলে।