এক কিলোমিটার খালেই ৯০ ট্রাক পলিথিন বর্জ্য

58

 

চকবাজার ধুনিরপুল থেকে চন্দনপুরা ব্রিজ। এ পর্যন্ত চাক্তাই খালের প্রায় এক কিলোমিটার পরিষ্কার করা হচ্ছে। দৈনিক ২০ থেকে ৫০ জন শ্রমিক গত পনেরো দিনে কাজ করে ওইটুকু খাল পরিষ্কার করেছেন। শ্রমিকদের হিসেবে উত্তোলন করা হয়েছে প্রায় ৯০ ট্রাক বর্জ্য। প্রতি ট্রাকে এক থেকে দেড় টন বর্জ্য বহন করা হয়। এসব বর্জ্যে ৭০ থেকে ৮০ ভাগই পলিথিন। বাজারের পলিথিন, চিপস থেকে ওরাল স্যালাইনের প্যাকেট কোনো ধরনের পলিথিনই অবশিষ্ট নেই।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অধীনে শ্রমিকদের তদারকি করছেন হানিফ মিয়া। গতকাল বেলা ১২টার দিকে চন্দনপুরা ব্রিজের উপর তার সাথে কথা হয়। তিনি জানান, ধনিরপুল থেকে চন্দনপুরা ব্রিজ পর্যন্ত ১৫ দিন পরিষ্কারের কাজ চলছে। আরও তিন-চার দিন পানিতে ভাসমান বর্জ্যগুলো সংগ্রহের কাজ করতে হবে। খালের বর্জ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় পলিথিন থাকায় পরিষ্কার কাজ বিলম্বিত হচ্ছে বলে জানান হানিফ।
গতকাল সরেজমিনের দেখা যায়, ব্রিজের উপর স্তূপ করা হয়েছে খাল থেকে সংগৃহীত বর্জ্য। ট্রাকে ট্রাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। খালি চোখে দেখলে বোঝা মুশকিল মাটির সাথে পলিথিন মিশে আছে, নাকি পলিথিনের সাথে মাটি মিশে আছে। পরিষ্কারের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের ভাষায় ৭০ থেকে ৮০ ভাগই পলিথিন।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ধনিরপুল থেকে মিয়াবাপের মসজিদ পর্যন্ত খালের পূর্ব পাশে ৪ ফিট হাঁটার রাস্তা ছিল। পশ্চিম পাশে সহসায় চলত এস্কেভেটরসহ অন্যান্য গাড়ি। এখন দুইপাশে এক ফুট জায়গা রাখেনি খালের গা ঘেষে গড়ে উঠা ভবনগুলো। ফলে বাসাবাড়ি থেকে সরাসরি পলিথিন বর্জ্য খালে পতিত হচ্ছে। এদিকে চাক্তাই খালের একাংশে পরিষ্কার করা হলেও খালের মিয়াখান নগর, বাদুরতলা, ফুলতলা, ঘাইস্যা পাড়া, ভাঙারপুল থেকে চালপট্টি, চালপট্টি থেকে মিয়াখান নগর ব্রিজ, মাস্টারপুল থেকে সিঅ্যান্ডবি ব্রিজ, ধনিরপুল থেকে ফুলতলা পর্যন্ত অংশও ভরাট দেখা গেছে। সেখানে বাসা-বাড়ির গৃহস্থালী বর্জ্য, ঝুট কাপড়, পলিথিন ও মাটির স্ত‚প রয়েছে। এছাড়া খালের যে অংশটি কর্ণফুলীর সাথে মিশে গেছে, সেই অংশ এখনও পরিষ্কার করা হয়নি। ফলে অল্প বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় বাকলিয়া এলাকার বেশিরভাগ অংশ।
এ নিয়ে স্থানীয় কাউন্সিলর শহিদুল আলম পূর্বদেশকে জানান, অল্প বৃষ্টিতে পুরো বাকলিয়া এলাকা তলিয়ে যায়। খালের একাংশ পরিষ্কার করলে সুবিধা পাওয়া যাবে না। খালের পানি যখন রাস্তায় উঠে আসে, জলাবদ্ধতা হয়, তখন সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় জনগণ। তাই নিজেদের দুর্ভোগ থেকে বাঁচাতে প্লাস্টিকবর্জ্য খালে না ফেলার কোনো বিকল্প নেই। মানুষকে অভ্যাস বদলাতে হবে। এমনটা মন্তব্য করেন ১৭নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শহিদুল।
জানা গেছে, এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী মেয়র থাকাকালীন ২০০৩-০৪ সালে সাড়ে ৯ থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত গভীরতা রেখে চাক্তাই খালের বেশির ভাগ অংশের তলদেশ পাকা করা হয়। কিন্তু দুই-তিন বছর পর পাহাড়ি বালু, মাটি ও আবর্জনা জমে খালটি আবার ভরাট হয়ে যায়। এরপর খনন করা হয়নি। একপর্যায়ে খালের গভীরতা দাঁড়ায় ৩ থেকে ৪ ফুটে। একেতো খালের প্রবাহ নেই। তারপর ছোট নৌকা চলতে অন্তত ১০ ফুট গভীরতা প্রয়োজন। ফলে চাক্তাই খাতুনগঞ্জের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে আসছে খালটির এমন দুরাবস্থা।
১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী, নগরের চকবাজার, দেওয়ান বাজার, জামালখান, স্টেডিয়াম এলাকা, চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে চাক্তাই খাল গুরুত্বপ‚র্ণ। তাই এলাকাগুলোকে জলাবদ্ধতামুক্ত রাখতে প্রয়োজন চাক্তাই খাল পরিষ্কার রাখা।
প্রসঙ্গতঃ চাক্তাই খালের গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৮৮ সালে পরিবেশ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৫ কোটি ১১ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ে চাক্তাই খাল খনন করা হয়। ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে দ্বিতীয় দফায় চাক্তাই খালের সংস্কার কাজ শুরু হয়। ওই সময় ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে ৫ কোটি ৪৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হয় ভ‚মি অধিগ্রহণ কাজে এবং তিন কোটি ৭৫ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা খালের দেয়াল নির্মাণ ও খনন কাজে ব্যয় হয়। পরে ২০০৩ সালে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে তৃতীয় দফায় খালের তলা ও পাশ পাকা করা হয়। এরপর থেকে প্রতি অর্থবছরে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে সিটি কর্পোরেশন খনন কাজ করত। ২০১৭ সালেও চসিক খনন করে। ২০১৮ সাল থেকে জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্পের আওতায় সেনাবাহিনীর তত্ত¡াবধানে রয়েছে খালটি। জলাবদ্ধতা নিরসনে নগরে ৫ হাজার ৬শ ১৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকায় সিডিএর প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্পটির আওতায় চাক্তাই খাল খনন করার কথা।