একুশের ছড়া

2312

অমর একুশে 
শচীন্দ্র নাথ গাইন
গানের পাখিরা সুর ভুলে যায়, ফোটে না ঠোঁটের গান
স্রোতস্বিনী নদী গতিটা হারায়, নেই কুলুকুলু তান।
সূর্যের তেজ ম্লান হয়ে আসে,আলো তার খুবই ক্ষীণ
উদার আকাশ ক্ষোভ বুকে পুষে ছায়া দিয়ে ঢাকে দিন।

ঝলমল করা সেই রূপ নেই, শোকাতুর বোবা চাঁদ
রাতের তারার আলোর গতিতে কে যেন দিয়েছে বাঁধ।
গাছের পাতারা নিশ্চুপ থাকে, খেলে না হাওয়ায় দোল
রাখালের বাঁশি বাজে না মোটেই,তোলে না নতুন বোল।

দেশ-জনপদ, মা-মাটি-মানুষ সকলের ভেজা চোখ
হৃদয়ে সবার কষ্ট জমাট, চারিদিকে শুধু শোক।
মা’র ভাষাটাকে দূরে ঠেলে দিয়ে কথা কে বলতে পারি?
অথচ তাকেই দমাতে শাসক আদেশ করেছে জারি।

রক্তচক্ষু দেখেছে ওদের তবুও থামেনি কেউ
গর্জে উঠেছে হুংকার ছেড়ে মিছিলে তুলেছে ঢেউ।
তরতাজা প্রাণ বিলানোর পরে মায়ের ভাষাকে রাখা
অমর একুশে জ্বলজ্বলে দিন সোনা রং দিয়ে আঁকা।

একুশে
আমানউদ্দীন আবদুল্লাহ
চলনে বলনে বাঙালি বাবু
মুখে ইংরেজি বোলচাল
আটই ফাল্গুনে শীতে বড়ো কাবু
মাথার ভিতরে গোলমাল।

‘একুশে’ ফ্যাকাশে মুখখানা হায়
বাংলায় নেই মন তার
দেশি ভাষা কবে পড়েছিল যেন
সানকিতে পানি ভাত দিন।

শহীদ মিনারে ফুল দিতে গিয়ে
কেঁপে উঠে যেন বুক তার
‘একুশে’ বানান কারতে দিলেই
লজ্জাতে করে মুখ ভার।

স্বর্ণের মতো বর্ণমালা
সাইফুদ্দিন সাকিব
ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ দুপুর বেলা হলে
সালাম-রফিক জীবন দিলো বন্দুকেরই নলে।
কৃঞ্চচূড়ার ডাল হয়েছে সেই লোহিতইে লাল
বীর ছেলেরা হৃদয়পটে রবে চিরকাল।

বর্ণমালার বর্ণগুলো স্বর্ণের মতো লাগে
ভাষার জন্য তাদের মনে কেমন মায়া জাগে!
উড়ছে ‘অ-আ’ উড়ছে ‘ক-খ’ উড়ছে দেখো ্ওই
তাদের পায়ের শেকলগুলো কই হারালো কই?

আমরা যে এই ভাষা পেলাম কাদের অবদান?
কবি লিখেন কবিতা আর গীতিকারের গান।
কেমন করে শোধবো বলো সেই ছেলেদের ঋণ
বাংলা ভাষার সুর তুললো কেমন অগ্নি বীণ!

একুশ তুমি
জসীম মেহবুব
নগ্ন পায়ে প্রভাতফেরি
হলুদ গাঁদা ফুলে
ছেয়ে আছে শহিদ মিনার
ইশকুলে-ইশকুলে।

খোকনসোনা কন্ঠে তোলে
বাংলা ভাষার গান
সে গান শুনে খাড়া থাকে
দোয়েল-শ্যামার কান।

জুঁই-চামেলি-চম্পা-বকুল
উঠছে দুলে ওই
একুশমেলায় কইছে কথা
বর্ণমালার বই।

বইয়ের গন্ধ শুঁকে পাঠক
তাকায় ডানে-বামে
কাব্য-ছড়া পড়ে কবি
মঞ্চ থেকে নামে।

একুশ তুমি শহিদ ভায়ের
আত্মত্যাগের ফল
তাইতো মায়ের ভাষায় কথা
কইছি অনর্গল।

ফাগুন এলে
রহমান হাবীব
ফাগুন এলে পলাশ শিমুল
কৃষ্ণচূড়ার ডাল
আমার ভায়ের রক্ত রঙে
রাঙিয়ে হয় লাল।

বর্ণমালা স্বর্ণালি রূপ
ঝিলিক দিয়ে ওঠে
পাখপাখালির ঠোঁটে যেন
শোকের মাতম ফোটে।

ফাগুন এলে দেশে দেশে
জাগে প্রাণের আশা,
তোমার জন্য গর্বিত আজ
বিশ্ব মাতৃভাষা।

আমার ভাষা
ফারুক হাসান
আমার ভাষা আমার কাছে
মায়ের সেরা দান
এই ভাষাতে রাখাল ছেলে
কন্ঠে তোলে গান।

এই ভাষাতে ডেকে ওঠে
হয়তো কোনো পাখি
মুগ্ধ করা সেই ছবিটি
কোথায় তুলে রাখি।

আমার ভাষা-বাংলা ভাষা
মায়ের উপহার
স্বর্গ থেকে মর্ত্যে আসা
একটি মণিহার।

ভাষা জয়ের
শেলীনা আকতার খানম

এই খোকারা মরেও অমর
একটি ভাষার নামে
ফিরে পাওয়া সেই ভাষাটি
পেলাম রক্ত-দামে।

ভাষা জয়ের সবুজ খামে
খোকার লেখা চিঠি
‘আসবো আমি জোৎস্না রাতে
হাসবো মিটি মিটি।’

স্বাধীন দেশের স্বচ্ছ নীলে
পায়রা মেলে পাখা
লাল সবুজের সুখ আঁচলে
খোকার ছবি আঁকা।

আমাদের ভাষা
অপু চৌধুরী
আমাদের ভাষাটাই বড় বেশি ভালো
বায়ান্নে সায়াহ্নে জ্বেলে ছিল আলো।
কী মধুর শ্রুতি সুর মুগ্ধতা তার
শুনেছে যে একবার শোনে বারবার।

মার্জিত প্রাণ আছে এ ভাষার মাঝে
তানপুরা ঢাক ঢোল এ ভাষায় বাজে।
পাখিরাও এ ভাষায় কলরব করে
আমরাও মাকে ডাকি খুব মন ভরে।

রক্তের দাগ আছে এ ভাষার গায়ে
বলে গেছে রাজপথে শহীদের মায়ে।
এ ভাষায় জাগরিত বাঙালির আশা
মানে-গুণে এই ভাষা সবচেয়ে খাসা।

একুশ আমার
ইদ্রিস মন্ডল
একুশ আমার প্রিয় একুশ
মাথায় একুশ রাখি
একুশ নিয়ে গর্ব করি
খাতায় ছবি আঁকি।

বর্ণমালা শহীদ মিনার
আঁকি আমি দেশ
রঙের ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তুলি
মধুর পরিবেশ।

অনেক কিছু নানান কিছু
আঁকতে আমি চাই
রঙ তুলিতে আঁকতে আমি
আনন্দ সুখ পাই।

উৎসবে
আবুল খায়ের
কার্তিক অগ্রহায়ণে
পাকা ধানের শীষে
বাতাস ঢেউ খেলে
ঐ সুরের আবেশে।

কৃষক কাটে পাকা ধান
আনন্দেতে নাচে প্রাণ
নতুন চালের পিঠায়
সকলের মন ভরায়।

আখের গুড়ের মিঠাই
আসবে নতুন জামাই
ছেলে বুড়ো মাতবে
নবান্নের উৎসবে।