একটি সাদা এপ্রোন আর একটি স্টেথোর হাহাকার

4

ডা. হাসান শহীদুল আলম

(১ম পর্ব)
চিকিৎসক হওয়ার পর যখন নারী চিকিৎসকের বিবাহ হয় তখন নুতন সংসারে গিয়ে তাকে পরিবর্তিত এক পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করতে হয়। একদিকে লেখাপড়া, ক্যারিয়ার অন্যদিকে সংসার ও সন্তান এই উভয় দিক এর সাথে খাপ খেয়ে চলতে হয়। পথটি হয়ে পড়ে কঠিন। তার চলার পথে যদি তার সংগীটি এবং তার পরিবারের মানুষগুলি একাত্ম হয়ে তার প্রতি সহানুভূতিশীল থাকে এবং তাকে সাহায্য করে তাহলে তার পথ চলাটা সুন্দর হয়। কিন্তু যখন পরিস্থিতিটা বিপরীত হয় তখন তার এই পথ চলাটা বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন নারী চিকিৎসক বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে নারী চিকিৎসককে কেন বাধার সম্মুখীন হতে হয়-
১. পারিবারিক সহযোগীতা না পাওয়া : পরিবার কর্তৃক উচ্চশিক্ষা গ্রহণকে অবমূল্যায়ন করা হয়। নারী চিকিৎসককে নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হবার জন্য এমবিবিএস এর পরেও প্রতিনিয়ত লেখাপড়া করতে হয়।সব পরিবারের সবাই এই বিষয়টা মানতে পারেন না।
২. এমনও দেখা গিয়েছে যে, ‘পুত্রবধূ ডাক্তার’ এ কথা বলে তাকে শোপিচ হিসাবে সাজিয়ে রাখার বাহবা নেবার মতো সামাজিক বিকৃত আচার প্রতিষ্ঠিত করতে না পেরে পরিবার কর্তৃক উচ্চশিক্ষা গ্রহনকে অবমূল্যায়ন করা হয় এবং বৌ এফসিপিএস করায় পুত্রকে দিয়ে ডিভোর্স দেওয়ানো হয়। এ ব্যাপারে নি¤েœর ফেসবুক স্ট্যাটাসটি উল্লেখযোগ্য-
‘ইঞ্জিনিয়ার ছেলের পরিবার কেবল বাচ্চার মা চেয়েছিল, ঘরের কাজ করা বউ চেয়েছিল। বলতো সংসার করো, পড়তে হবে না। বউ শ্বাশুড়ী যুদ্ধ হয়েছিল পোস্ট গ্রেজুয়েশন করা নিয়ে। ডিগ্রী কমপ্লিট হয়ে গেলো। শ্বাশুড়ী-মা তার বউ সাজিয়ে ঘরে আনা পরের মেয়েকেও ঘরহীন করে দিলো। …একটি সাদা এপ্রন আর একটি স্টেথোস্কোপ এর হাহাকার চার দেয়ালের বদ্ধ রুমে দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে শেলফের তাকে পড়ে থাকে (ভূক্তভোগী জনৈকা নারী চিকিৎসক, ডাক্তার প্রতিদিন ডট কম, ১৫-১১-১৬)।’
সব থেকে কষ্টদায়ক এদের দুঃখ বুঝবার জন্য সরকার জনগণ যতোটাই বিমুখ তার চেয়েও বেশী বিমুখ কখনও কখনও পরিবারের সদস্যরাও। ছেলের প্রফেশন যাই হোক আজকাল ঘরে একটা ডাক্তার বউ না থাকলে যেন স্ট্যাটাস বজায় থাকে না। তাই বেনারসী গয়নায় মুড়ে বউ করে অনেকেই ডাক্তার বউ ঘরে আনে। কিন্তু এই বউটি যে সমাজের আর দশটি মেয়েদের মতো না, সে যে বাঁধা পড়ে আছে তার রুগীদের কাছে সেটা ভুলে যায়। আজকাল অনেক মেয়ে ডাক্তারই চাকুরীর বেতনে অর্থকষ্টে জীবন যাপনটাকে মেনে নেয়। প্রেকটিস করছেন না কেন এমনি প্রশ্নে চাপা হাসির উত্তর জোটে।কেবলমাত্র সংসারে এতটুকু বেশী সময়, সন্তানকে একটু আশ্রয় দিতেই স্বচ্ছলতার হাতছানি অনায়াসেই উপেক্ষা করতে হয়।
৩. শ্বাশুড়ীর কাছে আর দশটা বৌএর মতোই ডাক্তার বৌটিও অনারারী কাজের মেয়ে হিসাবেই গণ্য হওয়া: পেশাগত ব্যস্ততার জন্য ডাক্তার বৌ হয়তো বেশী সময় সংসারে দিতে পারছে না। কিন্তু শ্বাশুড়ীর কাছে আর দশটা বৌএর মতোই ডাক্তার বৌটিও অনারারী কাজের মেয়ে হিসাবেই গন্য হচ্ছে। আমাদের দেশে এখনও ঘরের কাজগুলোতে নারী পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়নি।এ কারণে নারী চিকিৎসকেরা পেশাজীবী হিসাবে পুরুষ চিকিৎসকদের চেয়ে এখনও অনেক পিছিয়ে আছে।
৪. পেশাগত দায়িত্ব পালনের পর কর্মক্লান্ত নারী চিকিৎসককে ঘরের কাজ সেরে তবেই লেখাপড়ায় বসতে হয়: কিন্তু হাসপাতালের ডিাউটি,পারিবারিক কাজের পর একজন নারী চিকিৎসক লেখাপড়া করার সঠিক সময় বা মানসিক শক্তি পাচ্ছেন না।
৫. পেশাজীবী নারী হিসাবে পারিবারিক প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ হয়ে হতাশায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় অনেকে যা নিম্নের সংবাদচিত্রসমূহে ফুটে উঠেছে:
(ক) ‘বিগত ২২-০১-২৪ ইং সোমবার ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলি এলাকায় ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে ৫২ বছরের এক নারী চক্ষু চিকিৎসক আত্মহত্যা করেছেন। তিনি ফরিদপুরের ডা. জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতালের জনৈক শিশু বিশেষজ্ঞের স্ত্রী (জনকন্ঠ, ২২-০১-২৪)।’
(খ) ‘বিগত ১৪-০৬-২২ ইং গাজীপুর টংগীর নিজ বাসায় সিলিংফ্যানে ঝুলন্ত নারী চিকিৎসকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।মৃত চিকিৎসক একটি পোষাক কারখানায় চিকিৎসক হিসাবে কর্মরত ছিলেন।স্বামীর সংগে ঝগড়ার জের ধরে উক্ত নারী চিকিৎসক আত্মহত্যা করেন (ডক্টর টিভি ডট নেট, ১৫-০৬-২২)।’
(গ) ‘মানিকগঞ্জে সাত বছরের শিশুকে বিষ খাইয়ে হত্যার পর তা পান করে বেসরকারী হাসপাতালের এক নারী চিকিৎসক আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। সম্প্রতি উক্ত নারী চিকিৎসকের বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়েছিল চিকিৎসক স্বামী থেকে ( দি ডেইলী ষ্টার, ৩০-০৯-২৩)।’
(ঘ) ‘বিগত ২৯-০৬-২২ ইং রাজধানীর ওয়ারী হেয়ার স্ট্রিট এলাকায় মিটফোর্ড হাসপাতালের এক নারী চিকিৎসক নিজ বাসায় আগুনে দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গিয়েছেন।উক্ত চিকিৎসকের প্রকৌশলী স্বামীর দাবী চিকিৎসক নিজেই নিজের গায়ে আগুন দিয়েছিলেন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাদানুবাদ হয়েছিল বলে জানা যায়।
(ঙ) বিগত ৯ জুলাই ২০২২ দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলায় কে এইচ হাসপাতালের ফ্যামিলি কোয়ার্টারে ২৭ বছরের এক নারী চিকিৎসক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তাঁর চিকিৎসক স্বামী শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার দিন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছিল (সারাবেলা, ১০-০৮-২২)।’ অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে যে, নারী চিকিৎসকদের আত্মহত্যার পেছনে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই পারিবারিক মনোমালিন্যজনিত হতাশা কাজ করে।
৬. সন্তানের সাহচর্য্য ত্যাগ করে উচ্চশিক্ষার ট্রেনিং নিতে গিয়ে সন্তানের স্পর্শের অভাবে মা চিকিৎসককে অশ্রু বিসর্জন করতে হয়। বহু জুনিয়র ডাক্তার সন্তানদের মায়ের কাছে রেখে পোস্ট গ্রেজুয়েট ট্রেনিং করে। (চলবে)
লেখক : ডায়াবেটিস ও চর্ম যৌনরোগে
স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত চিকিৎসক, চট্টগ্রাম