একটি সংগ্রামী জনপদের হাই পাওয়ার চশমার মেধাবী যুবকের গল্প

18

 

(গত সংখ্যার পর)
রাতে সাম্পানে হৈ-হুল্লোড় করেছি, আনন্দ করেছি। এরকম করে আমরা শহরের বড় বড় জনসভায় আসতাম। তখন নদীপথ ছাড়া কোনো পথ ছিল না। খুব কষ্ট হতো কিন্তু রাজনীতির নেশার কাছে কষ্টকে কষ্ট মনে হতো না। সভা শেষ হলে ঐ সাম্পানে আবার ফিরে যেতাম। একাত্তরের ১৩ ফেব্রæয়ারি ঘোষণা করা হয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ৩ মার্চ ঢাকায় শুরু হবে। এটা ক্রমেই পরিষ্কার হয়ে আসছিল যে, শেখ মুজিব ৬ দফার ব্যাপারে কোনো আপোস করবেন না। ১ মার্চ বেলা ১ টায় রেডিওতে ঘোষণা দিয়ে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়। ১ মার্চ বিকেলে ছাত্রলীগের একক নেতৃত্বে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এর চারজন প্রধান নেতার মধ্যে ছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আ.স.ম আব্দুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন। ৩ মার্চ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জনসভা ছিল। খোলা জিপে শেখ মুজিব এলেন। শাহজাহান সিরাজ আগের তৈরি করা ইশতেহারটি পাঠ করলেন। এটাই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রথম আনুষ্ঠানিক দলিল। শেখ মুজিবের ভাষণ ছিল সংক্ষিপ্ত। তিনি অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যেতে বললেন। আরো বললেন, অনেক কথা বলার ছিল, তবে ৭ তারিখেই আমি বললো।
৭ মার্চের রেসকোর্সের স্মরণকালের জনসভায় শেখ মুজিব এলেন বেলা তিনটায়। তার ১৯ মিনিটের ভাষণটি ছিল নানা দিক দিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি, তবে ঘরে ঘরে দুর্গ দুর্গ গড়ে তোলার আহব্বান জানান এবং যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। জনসভায় তিনি কী বলেছেন, তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, তিনি কী বলেননি। ইয়াহিয়া ঢাকায় এলেন ১৫ মার্চ। ২২ মার্চ পর্যন্ত ইয়াহিয়াÑমুজিব সংলাপ চলতে থাকে। ২৪ মার্চ ৬ টায় আওয়ামী লীগের আলোচক দল ইয়াহিয়ার উপদেষ্টাদের সাথে আবার বৈঠক করেন। ঐ বৈঠকে সর্বশেষ যে সংশোধনী প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল তা হলো, দেশের নাম হবে কনফেডারেশন অব পাকিস্তান। ইয়াহিয়া ২৪ মার্চ টিক্কা খান ও রাও ফরমান আলীকে ডেকে অপারেশন সার্চলাইট বাস্তবায়ন করার নির্দেশ দেন। ইয়াহিয়ার বক্তব্য ছিল, দেশকে অখন্ড রাখার জন্য কয়েক হাজার মানুষ মারতে হলেও এটা খুব একটা মূল্য নয়। ইয়াহিয়া ২৫ মার্চ সন্ধ্যার ৭টায় গোপনে ঢাকা ছেড়ে যান। ২৫ ও ২৬ মার্চের মধ্যরাতে সামরিক অভিযান শুরু হয়। রাত ৯ টার পর থেকে সামরিক হামলার লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে আসছিল। তবে এটা কত যে ভয়ানক হতে পারে তা নেতারা আঁচ করতে পারেননি। শেখ মুজিব তার সহযোগী আওয়ামী লীগ নেতা ও ছাত্রনেতাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলেন। শেখ মুজিব শেষ কথা বলেন সিরাজুল আলম খান, আ. স. ম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজের সঙ্গে রাত ১১টার দিকে।
শেখ মুজিব গ্রেফতার হয়েছেন, এটা নিশ্চিত ২৫ মার্চ। ২৬ মার্চ ঢাকার পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ হেড কোয়ার্টার আক্রমণ হওয়ার সংবাদে বরমা বরকলের মত দুর্গম এলাকার সাধারণ মানুষ ভীত হয়ে পড়ে। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে সকলে। কিন্তু আমরা যারা রাজনৈতিক কর্মী ছিলাম, আমরা ৭ মার্চের ভাষণ থেকে আঁচ করতে পেরেছিলাম একটা মারাত্মক কিছু ঘটতে যাচ্ছে। সে কারণেই আমরা ৮ মার্চ থেকে বরকল স্কুলের মাঠে গাছের ডাল দিয়ে ডামি রাইফেল বানিয়ে ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করি। ট্রেনিং-এ এলাকার ছাত্র-যুবকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে ডাক্তার গোলাম মাওলাকে সার্বিক দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
চট্টগ্রাম শহরে ক্যাপ্টেন রফিকের নেতৃত্বে ইপিআর বাহিনী চট্টগাম শহরে পাকসেনাদের আক্রমণ প্রতিরোধ করছে এবং সোয়াত জাহাজ থেকে পাকিস্তানিদের অস্ত্র খালাস করার প্রক্রিয়া জনগণ প্রতিরোধ করতে গিয়ে ঈশান আলী মিস্ত্রির হাটে পাকিস্তানিদের গোলাবর্ষণে অনেক শ্রমিক নিহত হন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে উত্তাল অবস্থা বিরাজ করছিল। আমরা তখন গ্রামে অঘ্রানের উন্মুক্ত বিল-পাথারী আলপথ ধরে শাহাজাহান ইসলামাবাদীসহ যাচ্ছিলাম, সাথে রেডিও ছিল। আকস্মিক এম. এ. হান্নানের কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা শুনি। এটি বেতার থেকে বার বার প্রচারও করা হয়। পরবর্তীতে এ বেতার কেন্দ্রটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নাম দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্প্রস্তুতির একটি ঐতিহাসিক ভ‚মিকা পালন করেছিল। আরো পরে বেতার কেন্দ্রটি কলকাতায় স্থাপন করা হয়। যুদ্ধকালীন ৯ মাস মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ী করার সাহস জোগায় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরি করে।
“অকস্মাৎ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। অকস্মাৎ বঙ্গোপসাগরে সুনামীর মতো
ঢেউ ওঠে গেল টান টান করে দাঁড়িয়ে গেল সমগ্র বাংলাদেশ।
নিখিল বাংলাদেশ।
শহর থেকে সকল তরুণÑযুবারা শঙ্খ পাড়ের গ্রামে জড়ো হলো।
বরকল স্কুল মাঠে প্যারেড শুরু হয়ে গেল। হঠাৎ রাইফেল এসে গেল হাতে।
শুরু হয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধ। বরমা বরকলকে কেন্দ্র করে
দক্ষিণÑপূর্ব জনপদ ধরে টেকনাফ মায়ানমার পর্যন্ত অজানা এক সেক্টর
যে সেক্টরের নম্বর এখনও চিহ্নিত হয়নি,
যে সেক্টরের কথা এখনও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়নি।
পটিয়া, আনোয়ারা, চাঁদপুর গোডাউন, বসরত নগরে সম্মুখ সমর
অনেক অনেক সাকসেসফুল অপারেশন।
(হাই পাওয়ার চশমার মেধাবী যুবকের গল্প।)
মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর সুযোগ্য সন্তান শাহাজাহান ইসলামাবাদী গোপনে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার কাজে লেগে গেলেন। সাথে নিলেন বিমান বাহিনী থেকে ছুটে আসা হাবিবুর রহমান, হাবিলদার আবু, গোলাম মওলাকে। সার্জেন্ট মাহি আলম নামে একজন সৈনিক আমাদের বাড়ির পাশে ইউনাইটেড ব্যাংকের কর্মচারী ইউনিয়নের নেতা আবু তাহের চৌধুরীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁর সম্পর্কে খবর নিয়ে শাহজাহান সার্জেন্ট আলমকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার কাজ পুরোদমে শুরু করেন। আনোয়ারা, বোয়ালখালী, বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চকরিয়া হয়ে সুদূর টেকনাফ পর্যন্ত এলাকাকে তারা একটি সেক্টর বা অঞ্চল হিসেবে তৈরি করেছিলেন। অস্ত্র জোগাড়ের জন্য শাহজাহান সাহেব, পরবর্তীকালের সার্জেন্ট মাহি আলম আগরতলা গিয়েছিলেন। সেখানে রাজনৈতিক নেতাদের সাথে যোগাযোগ করে যতটুকু সম্ভব অস্ত্র জোগাড় করেছিলেন। শাহজাহান ইসলামাবাদীর সাথে ছিলেন স্থানীয়দের মধ্যে ফেরদৌস খান, আবুল বশর, ছবুর খান, আহাম্মদুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম দিলীপ, হাবিলদার আবু, গোলাম মাওলা, গাউছ মোহাম্মদ, আবু তৈয়ব চৌধুরী, আলমগীর আলম, আবুল খায়ের, আবুল কাসেম, মোজাহেরুল ইসলাম, রফিকুল আলম, ইলিয়াছুর রহমান চৌধুরী, ইব্রাহিম চৌধুরী, ওসমান চৌধুরী, কালাম চৌধুরী, নুরুজ্জমান চৌধুরী, সোলায়মান খান, নওশা মিয়া, আবুল কাসেম বক্কর, মাহমুদুর রহমান, আবুল মঞ্জুর, দেলোয়ার হোসেন, সৈয়দ আলমগীর, আবুল মঞ্জুর শেবন্দী, সৈয়দ আলমগীর, নুরুল হুদা, আনোয়ারার কমান্ডার ইদ্রিস, কমান্ডার লতিফ, বাঁশখালীর সুলতানুল কবির চৌধুরী, ডা. ইউসুফ, মোক্তার আহম্মদ, পটিয়ার নাসির চৌধুরী, আলমাস, আসলাম, রফিক, আহম্মদ নবী, মাহফুজুর রহমান, জিরির বাদশ মিয়া, রুহুল আমিন, আবু তাহের, এমদাদ, মহসিন খান, সেলিম চৌধুরী, অজিত দাস, বোয়ালখালীর ক্যাপ্টেন করিম-সহ অনেকেই যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। (চলবে)

 

শাহজাহান ইসলামাবাদী দক্ষিণ চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করলেও ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে যারা দেশে প্রবেশ করেছেন তারা অনেকেই ছাত্রলীগ কর্মী ও নেতা ছিলেন। তারা সকলেই এস.এম ইউসুফের মাধ্যমে যুদ্ধে ট্রেনিং নিয়েছিলেন বিধায় এস.এম ইউসুফের পরামর্শেই যেখানে যার সেখানে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার দরকার সেখানেই অংশ নিয়েছিলেন। আমরা বয়সে কিশোর ছিলাম বলে ওসমান, ইলিয়াস ও আমাকে দায়িত্ব দেয়া হতো অপারেশনপূর্ব রেকি করে আসার জন্য। স্মরণে আসছে রাওলীবাগের বরমা ইউনিয়নের একজন রাজাকারের বাড়ি রেকি করে আসি। পরবর্তীতে এখানে অপারেশন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় কেন্দ্রীয় কমান্ডের সাথে দায়িত্বে ছিলেন আতাউর রহমান খান কায়সার এম.এন.এ, আবু সালেহ এম.এন.এ, আকতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু এমপিএ এবং মুরিদুল আলম (যুদ্ধে শহিদ)।
দক্ষিণ চট্টগ্রামে উল্লেখযোগ্য অপারেশনের মধ্যে বশরত নগর মাদ্রাসা, জিরি মাদ্রাসা, রাজাকার আব্দুল হাকিমের ঘর, পটিয়া থানা, আনোয়ারা থানা ও ইন্দ্রপোল অপারেশন ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি অপারেশনেই কয়েকজন করে মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হয়েছেন। বশরত নগর মাদ্রাসা অপারেশনে সবুর খান গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান। দক্ষিণ চট্টগ্রাম অঞ্চলটি ছিল মুক্ত অঞ্চল। কিন্তু মাঝে মাঝে পাকিস্তানি আর্মি ঝটিকা আক্রমণ করত। এই মুক্তিযুদ্ধে আমাদের চৌধুরী বাড়ির তিনটি পাড়ার প্রতিটি ঘরের সদস্যদের ভ‚মিকা ছিল গৌরবের। বশরত নগর অপারেশনে সবুর খান গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেলে তার সাথে আরো কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছিলেন। সেই আহতদের রিক্শায় করে নিয়ে আসা হয়েছিল আমাদের দক্ষিণ বাড়িতে, অর্থাৎ ছোট মিয়ার মায়ের ঘরে। চিকিৎসার জন্য ডা. গোলাম মাওলা-সহ আরো কয়েকজন ডাক্তার প্রাণপণ আহতদের বাঁচানোর চেষ্টা করেন যা ছিল সেই সময়ে একটি মস্তবড় ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ। শুধু তা নয়, শাহজাহান ইসলামাবাদীর স্ত্রী সে সময় সন্তানসম্ভবা ছিল। নভেম্বর মাসের শেষ দিকে বর্ষার কাদামাটি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে হানাদার বাহিনী প্রতিদিন ঝটিকা আক্রমণ চালাত। এলাকার মানুষ সাংঘাতিকভাবে ভীত থাকত। সেই কারণে শাহজাহানের স্ত্রীকে সন্তান প্রসবের জন্য আশ্রয় দিতে চাচ্ছিল না কেউ। যে কারণে একটি সাম্পান ভাড়া করে একজন ধাত্রীকে সাথে দিয়ে সন্তান প্রসবের ব্যবস্থা করা হয়। ছোট মিয়ার মা অর্থাৎ আমাদের চাচি শাহাজাহানের স্ত্রীকে সাম্পান থেকে নামিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তান আর্মি আমাকে মেরে ফেলুক, কিন্তু এই মেয়েটির সন্তান আমার ঘরে প্রসব করাব। যতদিন সে সুস্থ না হয় সে আমার কাছে থাকবে। এই মহিলার স্বামী ছিল বার্মায়। তিনি ছেলেপুলে নিয়ে কষ্টে সংসার চালাতেন। সেই অক্ষমতাকে উপেক্ষা করে শাহজাহানের স্ত্রীর সেবা করেছিলেন। যে সন্তান সেদিন ভ‚মিষ্ঠ হয়েছিলো শাহজাহান ইসলামাবাদী সেই সন্তানের নাম রেখেছিল গাজী। আমাদের ঘরে একটা নৌকা ছিল। আর্মি আসার খবর পেলে আমি আর ওসমান নৌকাতে করে মুক্তিযোদ্ধাদের ভরাট চরে নিয়ে যেতাম। আমরা দিনের বেলায় চরের ক্ষেতের খামারে গিয়ে সময় কাটাতাম। আর রাত হলে মুক্তিযুদ্ধের কাজে লেগে যেতাম। একটি কথা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২৫ মার্চের কালো রাত্রির পর এপ্রিলের ১ম সপ্তাহে আমি এবং ওসমান ভারতে চলে যাওয়ার জন্য শহরে এসেছিলাম। ওসমানের পরনে একটি থান কাপড়ের লুঙ্গি, গায়ে পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি। একই ধরনের আমারও, গায়ে পাঞ্জাবি, লুঙ্গি, মাথায় টুপি। আমরা কালারপুলে সাম্পানে উঠব চাক্তাই আসার জন্য, অনেক লোক তখন অপেক্ষায় ছিল। সবাই আত্মীয়স্বজনের খোঁজে শহরে যাবার চেষ্টায়। সেখানে একজন হিন্দু ভদ্রলোক ছিল। সাম্পানের যাত্রীরা তাকে সাম্পানে উঠতে দিচ্ছিল না। সবাই বলল, তুমি হিন্দু মানুষ তুমি উঠলে তোমার কারণে আমাদেরও মৃত্যু হবে। একথা শুনে হিন্দু ভদ্রলোক কালারপুল ব্রিজের উপর কান্নায় ভেঙে পড়ে। আমাদের সাম্পান কর্তফুলী নদীতে ঢুকতেই দেখলাম, সারি সারি লাশ। লাশের কারণে সমস্ত এলাকা দুর্গন্ধ হয়ে গেছে। সাম্পানে কেউ কেউ বমি করছিল। আমি আর ওসমান চাক্তাই ঘাট দিয়ে উপরে উঠতেই পাকিস্তান আর্মি আমাদের নাম জিজ্ঞেস করল এবং কলমা জানি কিনা জিজ্ঞেস করল? আমরা বললাম আমরা সাচ্চা মুসলমান। আমরা দুজনে বিড় বিড় করে কলমা পড়ে ফেললাম। ওসমানের সাদা লুঙ্গিতে জয় বাংলা লেখা ছিল কলমের কালি দিয়ে। আর্মির লোক জিজ্ঞেস করল, ইয়া ক্যাহা লেখা হে? আমি চটপট উত্তর দিলাম পাকিস্তান জিন্দাবাদ লেখা হ্যাঁ। হাম পাকিস্তান কা মোহাব্বত কারে। আর্মির লোকজন খুশি হয়ে আমাদের ছেড়ে দিল। ওসমান কে আর কি বলব! শুধু বলেছিলাম, আসার সময় লুঙ্গিটা পাল্টিয়ে আসতে পারলি না ভাই। সে বলল, বাড়িতে কাউকে না বলে পালিয়ে আসছি, লুঙ্গি পাল্টাবার সুযোগ কোথায়? আমরা একরাত মিয়াখান নগরে আমাদের গ্রামের বাড়ির কাজের ছেলের দোকানে মাচার উপর রাত কাটিয়েছিলাম। শুভপুর বাস স্টেশনে এসেও মিরসরাই এর করেরহাট দিয়ে রামগড় বর্ডার পার হওয়ার চিন্তা থাকলেও পথখরচের অভাবে গাড়ি থেকে নেমে যেতে বাধ্য হই। বাধ্য হয়ে আবার গ্রামের পথে যাত্রা শুরু করি। অকৃত্রিম দেশপ্রেম ছাড়া আত্মসর্বস্ব চিন্তা কি মানুষের মাঝে মৃত্যুঞ্জয়ী প্রেরণা ও অসাধারণ বীরত্ব জাগাতে পারে? মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছিলেন তারা কেউ ডাক্তার, কেউ প্রকৌশলী, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ্য শিক্ষক, কেউ দেহাতি মজুর, কৃষাণ সকলেই একসঙ্গে যেকোনো পরিবেশে এক সাথে বসে খাদ্যগ্রহণ করেছেন। কতই না দুঃখ কষ্ট ভোগ করেছেন তারা। আবার একসঙ্গে যুদ্ধযাত্রার পরিকল্পনা করেছেন। একে অন্যের দুঃখের যন্ত্রণার সাথী হয়েছেন। এমন ঘটনাও ঘটেছে, যার বয়স কম ছিল বা নবীন কিশোর-রিক্রুট হতে না পারে ডাক্তারকে ঘুষ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সৈনিক হতে চেয়েছে। মৃত্যুকে বরণ করার জন্য ঘুষ দেওয়ার নজির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে মূর্ত করেছে। এমনও কথা শোনা গেছে, নব পরিণীতা স্ত্রী তার স্বামীকে বলেছেন, দেশ স্বাধীন না করে ফিরে না আসার জন্য। পিতা সন্তানকে যুদ্ধে যেতে অনুপ্রাণিত করে মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে পাঠিয়েছেন। এরা কেউ বনেদী পরিবারের নন। এরা বুদ্ধিজীবীদের মতো হিসাবি নন। এরা মাতৃমুক্তিপন উজ্জীবিত গ্রামবাংলার দামাল সন্তান। সেই বারুদগন্ধী দিনে বিকৃত মানসিকতার কিছু বুদ্ধিজীবী যাই করুন না কেন, আমাদের আপামর দেশবাসী কিন্তু বিকৃত চিন্তাকে ধারণ করেননি। তারা যেকোনো মূল্যে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যকে ছিনিয়ে আনার জন্য নিজের দেশপ্রেমকে উজ্জ্বল করেছিলেন। নতুন সৃষ্টি এবং দেশ গড়তে তারা কঠিন ব্রত নিয়েছিলেন। যুদ্ধোত্তর পোড়া মাটিতে শস্যের বীজ বুনেছিলেন। যারা শ্রম বিক্রি করেন, যারা কিছু তৈরি বা উৎপাদন করেন তারাই সমাজ ও সভ্যতার শ্রেষ্ঠ কারিগর। তারা বুঝতে পেরেছিলেন কিন্তু যারা তাদের নিয়ামক তারা সঠিক হাল ধরতে পারেননি।
১৯৭৪ সালে একদলীয় শাসন প্রবর্তনের সময় আমি এবং ওসমান চট্টগ্রাম কলেজের ডিগ্রিতে অধ্যয়নরত। সে সময় আমরা বিবর্তন নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুলে তার মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মকাÐ পরিচালনা করতাম। চট্টগ্রাম কলেজে বিবর্তন হাজার বছরের বাংলা গান এবং একটি নাটক মঞ্চস্থ করার উদ্যোগ নিলে ওসমানকেই নাটক রচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওসমান আমাদের ঘাটফরহাদবেগের বাসায় বসে নাটক লিখলেন তিরোহিত সুন্দর আমার। ’৭৬ সালের ২ জুলাই চট্টগ্রাম মুসলিম ইনিস্টিটিউট হলে জাঁকজমকপূর্ণভাবে নাটক এবং হাজার বছরের বাংলা গান পরিবেশন করা হয়। এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক জগতে আমরা আলোচিত হয়ে পড়ি।
উত্তাল টালমাটাল ঢেউয়ের উপর একটি নৌকার মতো তখন দুলছে বাংলাদেশ। সে কোনদিকে যাবে? ঠাÐা পৃথিবী তখন স্পষ্ট ভাগ হয়ে আছে। পুঁজিবাদ আর সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে। সমস্ত ভ‚খÐে চলছে এই দড়ি টানাটানি। কে কাকে কোন্ শিবিরে টানবেন। ছোট এই বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশ-নৌকার মাঝি হতবিহŸল শেখ মুজিব, নানা দোদুল্যমানতার শেষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পালে লাগাবেন সমাজতন্ত্রের হাওয়া। কিন্তু তার সমাজতন্ত্রের হাওয়ার রক্তাক্ত দেহ নদীতে ছুড়ে ফেলে নৌকাকে পুঁজিবাদি স্রোতে টেনে নিতে উদ্যত হয়েছিলেন খন্দকার মোশতাক। দৃশ্যপটের মাঝে আবিভর্‚ত হয়েছিলেন খালেদ মোশাররফ। নৌকা সমাজতন্ত্রের দিকে যাবে নাকি পুঁজিবাদের দিকে যাবে তা নিয়ে মাথা ব্যাথা ছিল না তার। তিনি চেয়েছিলেন সেনাবাহিনীর ছোটো একটি দ্বীপের শৃঙ্খলা আর একটি পদ। দৃশ্যপট থেকে সরে গেছেন তিনি। আবির্ভাব হলেন স্বপ্নরাজ কর্নেলের। হাল ঘুরিয়ে তিনি নিতে চেয়েছিলেন সমাজতন্ত্রের দিকে। ধোঁয়াচ্ছন্ন কোনো সমাজতন্ত্র নয়, কায়েম করতে চেয়েছিলেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। ফলে এই কর্নেলকে মোকাবিলা করার জন্য এবার দেশের বাইরের-ভিতরের যাবতীয় সব শক্তি একত্রিত হয়েছিলেন। যারা চিরতরে সমাজতন্ত্রের নাম বাংলাদেশ থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল সেই সব শক্তি তখন বিপরীতমুখী স্রোতের অনিশ্চিত সাঁতারু জেনারেল জিয়ার ওপর। যার কোনো বিশেষ স্রোতের উপর পক্ষপাতিত্ব নেই। যিনি যখন ফলাফল অস্পষ্ট তখন খানিকটা নিরাপদ দূরত্ব থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আজ্ঞা পালন করলেও চ‚ড়ান্ত করে তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন বাঙালির দিকে। কারণ তিনি টের পেয়েছিলেন ভবিষ্যৎ এদিকেই। তেমনি দীর্ঘকাল নিরন্তর তাহেরের দিকে দরজা খুলে রাখলেও শেষ মুহূর্তে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সে দরজায় তাকে তখন ঘিরে রেখেছে আরও পরাক্রমশালী নানা শক্তি এবং তিনি টের পেয়েছিলেন ভবিষ্যৎ সেদিকে। জিয়া তখন একক শক্তি নয়, একটি সম্মিলিত শক্তির প্রতিভ‚। কারাগারে যখন তাহেরের বিচার চলছে তখন তিনি সেরে নিয়েছিলেন সব বোঝাপড়া। জিয়া ইতিহাসকে হাতের মুঠোয় নিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তার পরিসমাপ্তির জন্য তৈরি ছিলেন না।
সুদীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে আমরা স্থান পেয়েছি। কিন্তু যে বিরাট প্রত্যাশা নিয়ে এদেশের মানুষ অপরিমেয় ত্যাগ স্বীকার করেছে, সে প্রত্যাশা আজও অপূর্ণ থেকে গেছে। সামরিক স্বৈরশাসনের কারণে অপরাজনীতি ও অপশাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের বেপরোয়া লুণ্ঠন হয়েছে। এজন্য হতাশ হবার কোনো কারণ নেই। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের প্রায় ১৮ কোটি মানুষ নিয়ে আমাদের দেশটাকে গণতান্ত্রিক ধারায় উন্নয়নের একটি নতুন মডেল দাঁড় করাতে হবে। সেই উন্নয়নের পদক্ষেপে সুষম বণ্টনের ব্যবস্থা নিতে হবে। নইলে সে উন্নয়ন টিকে থাকবে না। পৃথিবীর বহু দেশ উন্নয়নের শীর্ষে পৌঁছাবার পর তাতে ধস নেমেছে। বহু সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অতীতের বিশাল বিশাল সাম্রাজ্য দুনিয়ায় সুদীর্ঘকাল দাপটের সাথে রাজত্ব করবার পর বিলীন হয়ে গেছে। আজকের পৃথিবী তার ব্যতিক্রম হবে না।
সতীর্থ অভীক ওসমান সংগ্রামী জনপদের সন্তান হিসেবে সকল গৌরবের অংশীদার হবে।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা-রাজনীতিবিদ, লেখক ও পিআরও, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন