একজন পিতার কথা বলছি

33

সিরাজুল মুস্তফা

আঁধার রাতেও যিনি আলোর দিশা দেখিয়েছেন তিনি বাবা। গায়ের রঙ দেখে তাঁর মনের রঙকে চেনা মুশকিল। কয়লার খনিতে হীরকের সন্ধানের মতোই যেন তিনি আলোর একখন্ড হীরকখন্ড। স্বাধীনতার কয়েক বছর পূর্বে হাজারো জ্ঞান তাপসের সূতিকাগার পটিয়ার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নে তাঁর জন্ম। আব্দুল করীম সাহিত্যবিশারদের পূর্বপুরুষ হাবিলাসমল্লার নামে এ ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়।
১৯৭১ সাল। দেশময় ঘোর যুদ্ধের দামামা বাজছিল। হায়নাদের থাবায় রক্তাক্ত মাতৃভূমি। এরই মাঝে শমন দেবের হানা দাদামশায়ের বদ্ধঘরে। তাঁর মৃত্যুতে সংসারে নেমে আসে চরম দুর্দিন। দাদা বিট্রিশ সরকারের নেভী অফিসার ছিলেন। অর্থবিত্ত ভালোই ছিল। কথিত আছে, আমাদের থালা-বাসন সবই পিতলের ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর এসব একেএকে খদ্দরের ঘরে চলে যায়। রেখে যায় কিছু দুঃসহ স্মৃতি। যা মাঝেমাঝে কাঁদায় আবার সুখের বৃষ্টিতে ধুয়েমুছে এক পসলা হাসির রেখা নিয়ে আসে হৃদয়ে। দাদিমা বড় ঘরের মেয়ে ছিলেন। তবে কারো কাছে হাতপাতা তাঁর ধাতে নেই। পাঁচ সন্তান-সন্ততির তৃতীয় বাবা। ছোটবেলা থেকে দুঃখের সাথে তাঁর উঠাবসা, খোশগল্প। সততা, একনিষ্ঠ পরিশ্রম ধীরলয়ে তাকে সাফল্যের চরম শিখরে নিয়ে আসে। নয়াহাট বাজারে ভাড়া নিয়ে চায়ের দোকান দেন। পরিচিতি পান ‘জাফর সওদাগর নামে’। কথিত আছে, এ গ্রামে সর্বপ্রম টেলিভিশন তো আমার বাবা। সাদাকালো টেলিভিশনটা আজও আছে বহাল তবিয়তে। আশপাশের গাঁয়ের লোকেরাও নাকি ছুটে আসত ম্যারাডোনার খেলা দেখতে। বাবা নিজেও ম্যারাডোনা ভক্ত এখনো তাঁর সাথে বোনটাও আছে। মা আর আমরা তিন ভাই ব্রাজিল। জমে যায় আনন্দ। আমার বাবা। ধৈর্যের হিমালয়সম উচ্চতায় তাঁর স্থান। তিনি কখনো ভেঙ্গে পরেন না। শত প্রতিকূলতায়ও তিনি নির্ভীক চিত্তাধিকারী। সৌম্য চিন্তন শক্তি কাজে লাগিয়ে এগোতে থাকেন দুর্বার গতিতে।
১৯৯৪ সাল। বাবার মনের ডায়েরিতে আমার মায়ের আগমন। মা নিরেট খাঁটি সাংসারিক। বিনয়ী, সহনশীলতার অথই সাগর। বাবার কাছে মায়ের প্রশংসার ফুলঝুরি ছাড়া কিছুই শুনিনি। মাকে বাবার সাথে
কখনো রাগতে দেখি নি। বাবাকেও না।
ভাগ্যদেবতার প্রশংসাই করতে হয়, এ বয়স অবধি বাবা কখনো আমাদের চোখ রাঙিয়ে কথা বলেন নি। বাকী জীবনের গল্প তোলা রইল সাজঘরে। আমার বাবা একজন আদর্শ বাবা। সাংসারিক, পরিশ্রমী, ন্যায়পাল। সততার জিয়নকাঠি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়চেতা মনের অধিকারী।
পথেরধারে ভবঘুরে জীবন যাপিত পথিকদের সাথে তাঁর অদ্ভুত সখ্যতা। ক্ষুধান্বিত পথিকের সন্ধান পেলেই বাসার ঠিকানা ধরিয়ে দেন। প্রমদিকে মা আমরা সবাই তাতে বিরক্তবোধ করতাম সন্দেহ নেই। তবে সময়ের সাথে ধাতস্থ হয়ে উঠি। এখন মা যেন বাবার চেয়ে এগিয়ে। আমরাও তাঁর আদর্শকে লালন করা শুরু করি।
ছোটবেলায় পিতৃবিয়োগের ফলশ্রুতিতে বাবার পড়াশোনার তেমন বিস্তৃত সুযোগ ঘটেনি। বই নিয়ে স্কুল যেতেই বড় ভাই বইপত্র সব ছিঁড়ে ছুঁড়ে মারে পাশের খালে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার ইতি সেখানেই। তবে সমাজের শিক্ষিত সৎজনদের সাথে তাঁর সখ্যতা ছিল দৃঢ়। এখনো যা অব্যাহত। ফলে তাঁর মনের জগতে তা যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। বাবা বুঝতে সক্ষম হন, আগামীর পৃথিবী শুধুই জ্ঞানীদের পৃথিবী হবে। তাই তিনি আমাদের পড়াশোনার ব্যাপারে খুব সতর্ক। সে ছোটকাল থেকেই শহরের সবকটা নামীদামী স্কুলে আমাদের পড়ার সুযোগ করিয়েছেন। তাঁর জীবনের কষ্টের ছিটেফোঁটা দেখার সুযোগ হয়নি আমাদের। সপ্তাহান্তে একবার হলেও স্কুলে গিয়ে খোঁজ নিয়েছেন আমাদের পড়াশোনার। মা তো আমাদের প্রতিদিনেরই নিত্যসহচর ছিলেন।
বাসায় মা-ই আমাদের শিক্ষক ছিলেন। বাবা একনিষ্ঠ শ্রোতা হয়ে শুনতেন। মাঝেমাঝে মায়ের সংসার কাজে হাত লাগাতেন। সারাদিন অফিস শেষে বাড়ী ফিরে তাঁর তাতে কোন আফসোস ঝরত না। ’৯৫ সালের ঘূর্ণিঝড়ে লÐভÐ হয় তাঁর জীবনের। বিঘায় বিঘায় ফসলী জমি তলিয়ে যায়। পরে এলাকার এক পরিচিতজনের হাত ধরে তাঁর মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডে চাকুরী । সে সূত্রে চায়ের দেশ খ্যাত শ্রীমঙ্গলে আমাদের বেড়ে উঠা। বাবা অবসরে তাঁর অতীত জীবনের গল্প শোনান। আমাকে লিখে রাখার তাড়া দিতে থাকেন। সবসময় তিনি তিনটে কথা বলেন। সৎ হও, ধৈর্যশীল হও, কাজের প্রতি একনিষ্ঠ হও। সফলতার জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না। সে আপনি এসে তোমার দুয়ারে কড়া নাড়বে। তোমাকে আজ কে কী বলে অবজ্ঞা করল তা যত তাড়াতাড়ি পার ভুলে যাও। এসব হৃদয়ে কখনো জিয়ে রেখো না। আবর্জনা জিয়ে রাখা ঠিক না এতে দুর্গন্ধ ছড়ায়, পরিবেশ দূষণ হয়। কীট-প্রতক্সেগর বাসা বাঁধে। যা হৃদয়ের মনুষ্যত্বকে ঘুণে ধরায়। ক্ষমাশীল হও, ক্ষমাশীলতার মাঝে তোমার মহাত্মতার পরিচয় মেলে। মহান স্রষ্টার দিকে তাকাও, তিনি ক্ষমাশীল বলেই পুরো পৃথিবী তাঁর ধরাশায়ী। সেজদায় তাঁর কাছে মাতা নত করে। বাবার কাছে পৃথিবী পালাবদলের গল্প। চাঁদ আর সূর্য দেবের পালা করে আসা যাওয়ার ন্যায় আমরাও যেন পাল্টে যায়। এ নাকি জীবনেরই বৈচিত্র্য। গাঢ় অন্ধকারে জোনাকীরা যেমন কবিতার খাতা লুট্ েনেয়, আমার বাবার কথাগুলোও অন্ধকার হৃদয়ে আলোর রোশনাই জ¦ালায়। আমার বইয়ের প্রম কপি যখন বাবার হাতে তুলে দিলাম কী আনন্দ! বাবা তুমি লিখতে বলতেনা সবসময়, এই যে লিখলাম! তখন বাবা আমাকে ঝরিয়ে ধরে কপালে ভালোবাসার স্মারক আঁকেন। কানের কাছে মন্ত্র ফুঁকেন, ‘অনেক বড় হও বাবা, যেমনটা বড় বিশাল এ পৃথিবী।’
বাবাকে প্রশ্ন করি তোমার প্রিয় জিনিস কী? বাবা বলেন, তোমাদের মুখে বাবা ডাকটাই আমার সবচেয়ে প্রিয়। বেঁচে থাকো বাবা আমাদের মাঝে অনেকদিন।