উপকারে লাঠির গুঁতা

7

 

 

উপকারীকে বাঘে খায়- অতি বাস্তব কথা। উপকার করেছেন তো মরেছেন। কারণ সে আপনাকে দেখলে সবসময় হীনমন্যতায় ভোগে, তাই সুযোগ পেলেই সে আপনার ক্ষতি করতে চাইবে। আর তা নিয়ে সেই বিখ্যাত ‘মুনি ও মূষিক’ কাহিনী তো আমাদের অজানা নয়। তবু সংক্ষেপে একটু শুনি: ‘এক মুনি একটি ইঁদুর পোষতেন। ইঁদুরটি একদিন একটি বিড়াল দেখে ভয় পেল। মুনি তাকে বিড়াল বানিয়ে দিলেন। বিড়ালটি একদিন কুকুর দেখে ভয় পেল। মুনি তাকে কুকুর বানিয়ে দিলেন। কুকুরটি বাঘ দেখে ভয় পেল, মুনি তাকে বাঘ বানিয়ে দিলেন। লোকে বলা-বলি করছে বাঘটি এক সময় ইঁদুর ছিল, মুনি তাকে বাঘ বানিয়েছে। ফলে বাঘের প্রেস্টিজ পাঙ্কচার হতে লাগল। এ মুনিকে মেরে না ফেললে তো দেখছি ইজ্জত আর থাকে না, ভাবছে বাঘ মনে মনে। এদিকে মুনি তো তার মনের কথা বুঝে গেছেন। ফলে তিনি, ‘পামরÑ তুই পুনর্মূষিকো-ভব!’ বলে বাঘটিকে পুনরায় ইঁদুর বানিয়ে দিলেন, হাহাহা। ফলে উপকার করতে গিয়ে লাঠির গুঁতো খেতে হয় বিষয়টি নতুন নয়। একদম মহাভারতের যুগ থেকে এ রীতি চলে আসছে। এক ব্রাহ্মণ রাজবাড়ি যাচ্ছেন ভোজ আস্বাদনে। পথে খাঁচার ভেতর একটি বাঘ বন্দি হয়ে আছে। ব্রাহ্মণকে বাঘ অনুনয় করে বলল, ‘ব্রাহ্মণ মশায় দয়াকরে খাঁচার দরজাটা খুলে দিননা, আমি একটু বের হব।’ ব্রাহ্মণ; ‘না বাপু তোমায় বের করলে, আমাকে তুমি খেয়েই ফেলবে।’ বাঘ; ‘না মশায়, শপথ করে বলছি আপনাকে ছুঁয়েও দেখব না আমি। দয়া করে খাঁচার দরজাটা খুলে দিননা একটু।’ বাঘের কাকুতিমিনতিতে ব্রাহ্মণের মন গলে গেল, তিনি খাঁচার দরজা খুলে দিলেন। বাহিরে বের হয়ে বাঘ ব্রাহ্মণকে খেতে চাইল। ব্রাহ্মণ তো পড়লেন মহাফ্যাসাদে। শেষে এক শিয়ালের বুদ্ধিতে সে যাত্রায় তিনি রক্ষা পেলেন। অতএব বুঝা গেল, উপকারীকে বাঘে খায়। এতো গেল আমাদের ভারতীয় কাহিনী। চলুন এবার দেখে আসি উপকারী সম্পর্কে আমার শ্রদ্ধেয় ভাবগুরু মহামতি ঈশপ মহোদয় কি বলেন?
একদিন এক বাঘ মাংস খেতে গিয়ে গলায় হাড় বিঁধে গেল। হায় খোদা, সে কি যন্ত্রণা! অনেক চেষ্টা করেও বাঘ হাড় ছুটাতে পারল না। পথে এক শিয়ালকে বলল হাড়টি ছুটিয়ে দিতে। শিয়াল ভয় পেয়ে, কাজ আছে বলে চলে গেল। হরিণকে বলল। সেও ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল। অবশেষে এক বক দেখে বাঘ তাকে বলল, ‘তোমাকে অনেক মাছ দেব, দয়া করে আমার গলার হাড়টি ছাড়িয়ে দাও।’ মাছের কথা শুনেই বক খুশী হয়ে হাড়টি ছুটিয়ে দিল। বাঘ রক্ষা পেল। বক এবার তার মাছ চাইল বাঘের কাছে। বাঘ হুঙ্কার দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিল। বক তখন দুঃখ করে বলল, ‘দুষ্ট লোকের উপকার করতে নেই।’ ঈশপের এমন নীতিগল্প আরো আছে। তেমন আরেকটি হল: ‘এক বৃদ্ধ মুমূর্ষ এক সাপকে দয়া পরবশ হয়ে বাড়ি নিয়ে এলেন। তারপর সেবাশুশ্রƒষা করে দুধকলা খা’য়ে সাপটিকে সুস্থ করে তুললেন। অবশেষে যখন ফণা তুলতে সক্ষম হল, ছোবলটা বসাল বৃদ্ধের পায়ে! সাঙ্গ হল তার ভবলীলা।’ এখানে এসে বারবার মনে পড়ছে ঢাকার ৭ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক বেগম মোছা. কামরুন্নাহারের কথা।
ভেবে দেখুন তো একবার কি মহৎ চিন্তা তিনি করেছেন? দস্তুরমতো আদালতের সময় বাঁচানোর কথা তিনি ভেবেছেন! সময়Ñ যার কোন তুল্য নেই, কোন মূল্য নেই। অমূল্য সে সময়। একমাত্র ফাঁসির আসামিই বুঝতে পারে সময় কত অনন্য। আগামীকাল যার ফাঁসি কেবল সে’ই জানে আজকের দিনটি কত মূল্যবান তার কাছে। আজকের দিন যেন কোনদিন শেষ না হয়, আগামীকাল যেন কোনদিন না আসে। আহা স্কুলে কত লিখেছি, Time and tide wait for none সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না।‘সময়ের মূল্য’ শিখতে শিখতে কত রাত কত দিন অতিবাহিত করেছি, তার কোন ইয়ত্তা নাই। সময় অমূল্য সম্পদ, তার মূল্য যে বুঝে না সে মানুষ নয় পশু। পড়তে পড়তে মুখে ফেনা তুলেছি। কামরুন্নাহারও নিশ্চয় তার বাইরে নন, তিনি এই রচনা অনেক মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন। সে জন্যে তো তিনি সময়ের মূল্যকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। আর তাই আদালতের সময়কে তিনি অহেতুক নষ্ট হতে দিতে চান না। এবং চান না বলেই তিনি ৭২ ঘণ্টা পর ধর্ষণের মামলা নিতে বারণ করেছেন। এতে আদালতের সময় বাঁচবে, কারণ ৭২ ঘণ্টা পর মেডিকেল টেস্টে ধর্ষণের প্রমাণ মিলে না। কত বড় এক উপকার তিনি দেশ ও জনগণের করতে চেয়েছেন?
দুঃখের বিষয় তাঁর উপকারের কথাটা কেউ বুঝল না। তাঁর উপকারের কেউ দাম দিল না তো দিল না, উল্টো তাঁকে আরো লাঠির গুঁতা মারল। সেই সাথে বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাঁকে পাটাপুতায় পিষে ফেলাহল। বড় দুঃখের কথা, মানুষ উপকার বুঝে না! এদিকে নারায়ণগঞ্জে দেখুন না কি অকান্ড হয়ে গেল। শামীম ওসমান সাহেব, যিনি ২২ বছর যাবৎ তাহাজ্জুদ পড়ছেন, দৈনিক ৭০/৮০ রাকাত নফল নামাজ পড়েন। তাঁর মত ব্যক্তিত্ব কত কষ্ট করে সুদীর্ঘকাল ব্যাপী নারায়ণগঞ্জকে সামাল দিয়ে রেখেছেন। সেই শান্তিপূর্ণ নারায়ণগঞ্জ আজ বেসামাল করে দিল নিছক এক র‌্যাব কর্মকর্তা ছাত্রলীগ নেতাদের কুত্তার মত পিটিয়ে। ঐ র‌্যাব কর্মকর্তাকে বলছি, শামীম সাহেব আছেন তো তাই বুচ্ছো না কত ধানে কত চাল। একবার তিনি ছেড়ে দিলে হাল, দেখব কি করে তুমি দাও সামাল? ছাত্রলীগ নেতাদের কুত্তার মত পিটাও- উপকারে লাঠির গুঁতা? দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝনা। উপকারীর উপকার স্বীকার তো করছই না, উল্টো আরো তার অপকারে মেতে উঠেছ!
অনেকে বলেন, মেয়েদের বুদ্ধি কম। এখন দেখছি কথা সত্যি। মালালাকে ধন্যবাদ অবশেষে বিয়ের উপকারিতা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন। কারণ উনাদের মত সেলিব্রেটিরা বিয়ে নিরুৎসাহিত করলে, বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে নাটোরের বাগাতিপাড়ার মত পরীক্ষা বাদদিয়ে সব শিক্ষার্থী বিয়ের পিড়িতে বসে যাবে তাও আমরা চাই না। কারণ এত তাড়াতাড়ি শাদির উপযোগিতা বুঝে গেলে, সবাই আবার বনলতা সেন হয়ে যাবে না তো!
আচ্ছা বিচারক কামরুন্নাহার ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটামটা কেন দিলেন? ৭২ ঘণ্টা দিয়ে বেচারি ফেঁসে গেলেন, বিচারিক ক্ষমতাটা চলে গেল। আসলে ৭২ সংখ্যাটা আমদের জাতীয় জীবনে বড় তাৎপর্যপূর্ণ। ৭২ শুনলে প্রথমে যা মনে আসে তা বাহাত্তরের সংবিধান। আবার ৭২কে উল্টালে হয় ২৭। এ ২৭ সংখ্যাটিও আমাদের জীবনে বড় তাৎপর্যপূর্ণ। রমজানের ২৭ তারিখের রজনি আমরা মুসলিমদের অতি পবিত্র একটি রাত। রজব ২৭- এর রজনিও আমরা অতি পবিত্র মনে করি। ফলে ৭২ সংখ্যাটির ব্যবহারে সংযম সাধন করা দরকার। কামরুন্নাহারের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ ছিল। ৭২-এর আরেকটি দিক রয়েছে। বাহাত্তরে পাওয়া, মানে বুদ্ধিহীন হওয়া। এখন কি তাহলে কামরুন্নাহারকে বাহাত্তরে পেয়েছে? হলেও হতে পারে. সম্ভবত কাজ করতে করতে ভীমরতিতে ধরেছে। তাই দিন আর ঘণ্টা এক করে ফেলেছেন। নইলে তো ৭২ ঘণ্টা যে তিন দিন, তা তাঁর মনে থাকার কথা। আর তিন দিনে যে কিছু হয় না তা তো আমরা জানি। এমনকি তিনদিনে বন্ধুর দেখাও মিলে না। তাই তো রুনা লায়লা গেছেন, ‘বন্ধু তিনদিন তোর বাড়িত গেলাম দেখা পাইলাম না, বন্ধু তিনদিন।’
সুতরাং তিনদিনে যেখানে বন্ধুর দেখা পায় না, সেখানে তিনদিনে ওসির দেখা কোত্থেকে পাবে? আর ওসির দেখা না পেলে মামলাও হবে কোত্থেকে? কি আশ্চর্য দেখুন! আমরা তিন- এর খেলায় আটকে গেছি। কোন মন্ত্রপাঠ করবেন তো তিনবার পড়তে হবে। প্রতিযোগিতা শুরু করবেন? তিন পর্যন্ত গুনতে হবে। বিয়ে করবেন? তিনবার রাজি বলতে হবে। তালাক দিবেন? তিন তালাক দিতে হবে। ধর্ষণের বিচার চাইবেন? তিনদিনের মধ্যে মামলা করতে হবে। নইলে আলামত নষ্ট। ভাবুন এবার কি কষ্ট! এমনকি কালও তিন, অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত। সবদিকে আমাদের তিনের খেল। আবাদিতেও তিন, বরবাদিতেও তিন, অর্থাৎ উপকারে তিন, অপকারেও তিন। তবে তিনের এমন কূটকৌশল আমরা মানতে পারছিনা। কারণ আলামত নষ্টের অজুহাতে তিনদিন পর মামলা না নেওয়ার বিধান চালু হলে ধর্ষক তো টেনশন ফ্রি হয়ে যাবে। তিনদিন আটকে রেখে ধর্ষিতাকে সে নিজে বাড়ি পৌঁছে দেবে। বাসের হেল্পারও তাই ইদানিং ধর্ষণের হুমকি দেয়! জনাব কামরুন্নাহার এমন উপকার আমরা চাই না। কারণ তাতে থাকবে লাঠির গুঁতা বোনাস আরো পাটাপুতা। মনে হয় কামরুন্নাহার দিন বলতে গিয়ে বলে ফেলেছেন ঘণ্টা, হাহাহাহা।
লেখক: প্রাবন্ধিক