উন্মুক্ত খাল-নালায় নিরাপত্তা বেষ্টনী দিবে চসিক

26

নিজস্ব প্রতিবেদক

গত এক বছরে উন্মুক্ত খাল-নালায় পড়ে মারা গেছেন চার জন। এ নিয়ে চলছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতা। তবে জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাসহ যে সেবা সংস্থাই কাজ করুক না কেন ঝুঁকিপূর্ণ সব খাল-নালায় নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণের দায়িত্ব সংস্থাটির প্রকৌশল বিভাগকে বাস্তবায়ন করার নির্দেশ দিয়েছেন সিটি মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী।
গতকাল সকালে আন্দরকিল্লা পুরাতন নগর ভবনের কে বি আবদুচ ছাত্তার মিলনায়তনে চসিকের ৬ষ্ঠ পরিষদের ১৭তম সাধারণ সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ নির্দেশনা দেন। সভায় জলাবদ্ধতা নিয়ে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। বর্ষায় দুর্ভোগ কমাতে নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডে একযোগে বিশেষ দলের মাধ্যমে চলমান ক্র্যাশ প্রোগ্রাম, মেগা প্রকল্পের বাইরে থাকা ২১টি খালের সীমানা নির্ধারণ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে নিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠানকে কাজ তাড়াতাড়ি করার তাগাদা এবং বারইপাড়া খাল খনন প্রকল্পে যাতে টাকা অপচয় না হয় সেদিকে নজর দেওয়ার নির্দেশনা দেন মেয়র।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রেক্ষিতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বনির্ভরতার ভীত মজবুত করতে ঢাকা ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মত ২৬টি খাত থেকে রাজস্ব আদায় করতে চায় চসিকও। এ নিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময়ে প্রতিনিধি প্রেরণসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রাজস্ব বিভাগের প্রতি নির্দেশনা ছিলো সাধারণ সভায়। এদিকে নগরীতে মাত্র ৮৫ হাজার প্রতিষ্ঠান ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছে, আওতার বাইরে আরও প্রায় ৩ লাখ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানকে ট্রেড লাইসেন্সের আওতায় আনলে পারলে বছরে ১০০ কোটি টাকা রাজাস্ব যোগ হবে। প্রতিমাসে অন্তত একদিন স্থানীয় কাউন্সিলরদের সহযোগিতা নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।
এদিকে সরকারের রূপকল্প ২০৪১ এর সাথে মিল রেখে চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন এলাকায় মাস্টার প্লান প্রণয়ন করা হয়েছে। এই মাস্টার প্ল্যানে চসিকের প্রতিটি ওয়ার্ডে এস.টি.এস (সেকেন্ডারি টান্সফার স্টেশন) ও টিজি স্থাপনের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মেয়র সেক্ষেত্রে নগরীতে ইমারত বা টাওয়ার নির্মাণ করতে গেলে যে প্ল্যান অনুমোদন দেয়া হবে তাতে সিটি করপোরেশন থেকে ছাড়পত্র নেয়ার বাধ্যবাধকতা করার প্রস্তাব করেন মেয়র। এমনটি না হলে নগরীর জলাবদ্ধতা সহ অন্যান্য যে সমস্যার সৃষ্টি হয় তা নিরসন সম্ভব হবে না, মন্তব্য তাঁর।
সভায় মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর বলেছেন, ট্যানেল চালু হলে নগরীর গুরুত্ব যেমন বেড়ে যাবে তেমনি যানবাহনের চাপও বৃদ্ধি পাবে। এই বিবেচনায় বর্জ্য ব্যবস্থপনাকে আধুনিকভাবে সাজাতে হবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে তা দূরীকরণে কঠোর হতে হবে। সেলক্ষ্যে সরকার কর্তৃক প্রণীত ‘কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আইন ২০২১’ এর মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নিতে চসিক বাধ্য হবে। এ জন্য গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি ও মাইকিং এর মাধ্যমে প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রচার প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এর পরও যদি বিষয়টি কেউ অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয় তাহলে জরিমানা সহ দÐের বিধান রয়েছে, যা ২ লক্ষ টাকা জরিমানা, ২ বছরের জেল বা উভয় দÐ প্রয়োগ ছাড়া অন্য কোনো গত্যন্তর নেই। তিনি যোগ করেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে স্বল্প মেয়াদি ব্যবস্থা হিসেবে ক্র্যাশ প্রোগ্রামের যে কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে তার আওতায় নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডের নালা নর্দমার মাটি উত্তোলন, পানি প্রবাহ বৃদ্ধি করার জন্য পুরোদমে কাজ অব্যাহত রয়েছে। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডে একযোগে চসিকের বিশেষ দলের মাধ্যমে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চলছে।
মেয়র আরো বলেন, পবিত্র ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে নগরীকে ৮ ঘণ্টার মধ্যে পরিচ্ছন্ন করার ব্যাপারে সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। কোরবানীর দিন থেকে পরবর্তী তিন দিন যাতে উপজেলা থেকে জবাইকৃত পশুর চামড়া নগরীতে প্রবেশ না করে সে ব্যাপারে চামড়া ব্যবসায়ী, লবণ ব্যবসায়ী, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর সাথে যৌথ মতবিনিময় সভা করে উপজেলা পর্যায়ে চামড়া লবণজাত করার প্রস্তুতি নেয়া হবে। নগরবাসীর পশুর বর্জ্য নিদিষ্ট জায়গায় রাখার সুবিধার্থে ১ লাখ পলি ব্যাগ সরবরাহ করা হবে জানিয়ে বলেন, বিগত বছর কোরবানীর বর্জ্য অপসারণে চসিক সারা দেশে যে সুনাম অর্জন করেছে তা থেকে যেন আরো উত্তরণ ঘটানো যায় সে প্রচাষ্টা চালানো হবে।
মেয়র বলেন, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন ও উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারইপাড়া খাল খনন প্রকল্পের জন্য ১৩৭০ কেটি টাকা এবং নগরীর সামগ্রীক সড়ক ও যোগাযোগ উন্নয়নে যে ২৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন তা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। ২৫০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কাউন্সিলরদের কাছ থেকে কাজের তালিকা সংগ্রহ করে এবং তাদের মতামতকে অগ্রাধিকার দিয়ে সততা, জবাবদিহিতা ও কাজের গুণগত মান অক্ষণœ রেখে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। নগরীতে জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্প বহির্ভূত ২১টি খাল চিহ্নিত করে সীমানা নির্ধারণ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য কনসালটেন্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রæততার সাথে সম্পন্ন করার জন্য প্রধান প্রকৌশলীকে নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, সিলেটের বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে চসিকের কাউন্সিলর ও কর্মকর্তাদের একদিনের সম্মানি ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ে প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং বন্যাপরবর্তী চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য চসিকের একটি মেডিক্যাল টিম প্রেরণ করা হবে।
মেয়র সৌন্দর্যবর্ধনের যে সমস্ত ফেন্সিং করা হয়েছে তা পুনরায় সংস্কার করে দৃষ্টিনন্দন করার জন্য প্রকৌশল বিভাগকে নির্দেশনা দেন। এছাড়া মিড আইল্যান্ডে সৌন্দর্যবর্ধনকারী নিদিষ্ট প্রজাতির বৃক্ষ রোপণ এবং রোপিত গাছ গুলোকে সঠিক পরিচর্যা করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশ দেন। মেয়র টাইগারপাস চত্বরটি পূর্বকোণের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ইউসুফ চৌধুরীর নামে নামকরণের বিষয়টি সাধারণ সভায় অনুমোদন লাভ করায় এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পত্র প্রেরণ করতে সংশ্লিষ্ট শাখাকে নির্দেশনা প্রদান করেন।
সভার শুরুতে সিলেট সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোণা এবং সীতাকুন্ডে বি.এম. কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাÐে নিহত ও আহতদের পরিবার পরিজনের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানানো হয়। এ ছাড়াও নগরীর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে মোনাজাত করা হয়।
চসিক ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব খালেদ মাহমুদের সঞ্চালনায় সভায় আরো বক্তব্য রাখেন প্যানেল মেয়র মো. গিয়াস উদ্দিন, আফরোজা কালাম, বর্জ্য স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি মোবারক আলী, পানি ও বিদ্যুৎ স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি মো. মোর্শেদ আলম, অর্থ স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মো. ইসমাইল, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম, প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা লুৎফুন নাহার, প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিম আকতার চৌধুরী, ভারপ্রাপ্ত প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ও মেয়রের একান্ত সচিব মুহাম্মদ আবুল হাসেম।