উন্নয়নে পাল্টে যাবে ‘অপরাধের স্বর্গরাজ্য’

188

রাহুল দাশ নয়ন

সীতাকুন্ডের জঙ্গল সলিমপুর মানেই অপরাধের ‘ভীতিকর আস্তানা’ হিসেবেই চিনতো মানুষ। অবৈধ দখলদাররা পুরো এলাকাটিকে পৃথক নীতিমালায় পরিচালনা করতো। প্রশাসন, সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কারোও জন্যই নিরাপদ ছিল না জঙ্গল সলিমপুর। পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণে ছিল ভূমিদস্যু ও চিহ্নিত অপরাধীরা। বাইরে থেকে সলিমপুর পাহাড়ের চাকচিক্য চোখে পড়লেও ভেতরের সাম্রাজ্য কারো দৃষ্টিগোচর ছিল না। সেই সাম্রাজ্যেই এবার দৃষ্টি দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে ‘অপরাধের স্বর্গরাজ্যখ্যাত’ জঙ্গল সলিমপুরকে পাল্টে দিতে চান তিনি। সলিমপুরের তিনটি ও আশপাশের আরো দুটি মৌজার তিন হাজার ১০০ একর খাস জমিতে উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে জেলা প্রশাসন। আর এতেই খাস জায়গা বরাদ্দ পেতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. মমিনুর রহমান পূর্বদেশকে বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরের উন্নয়নে মাস্টার প্ল্যানের কাজ এগিয়ে চলছে। সীমানা চিহ্নিতকরণ কাজও চলছে। সেখানকার তিন হাজার ১০০ একর খাস জমিতে বড়ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এধরনের সুন্দর জায়গা চট্টগ্রামে আর নেই। লিংক রোড হওয়ার কারণে সলিমপুরের গুরুত্ব বেড়েছে। আমাদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেভাবে খাস জায়গা চেয়েছে সেভাবে আমরা দিতে পারছি না। প্রয়োজনের তাগিদেই আমরা সলিমপুরকে বেছে নিয়েছি। কারণ জঙ্গল সলিমপুর এতদিন অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য ছিল। এটি দখলে রেখে ভূমিদস্যুরা স্ট্যাম্পের মাধ্যমে জায়গা বিক্রি করেছে। অপরাধীরা সেখানে বসতি গেড়েছে। আমরা সলিমপুরে সকল ধরনের জমি ক্রয়-বিক্রয় বন্ধে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করবো। উন্নয়নের স্বার্থে প্রকৃত ভূমিহীন-গৃহহীনদের পুনর্বাসন করে যারা দুই তলা, চারতলা বাড়ি করেছে তাদেরকে উচ্ছেদ করা হবে।’
জঙ্গল সলিমপুরের উত্তরে ভাটিয়ারী বিএমএ, দক্ষিণে সিডিএ কর্তৃক নির্মিত বায়েজিদ লিঙ্ক রোড। এই রোডটি হওয়ার পর জঙ্গল সলিমপুরের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। সেখানের জায়গার উপর দৃষ্টি দেয় ভূমিদস্যুরা। সীতাকুÐের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় তিনটি মৌজা আছে। এগুলো হলো- জঙ্গল সলিমপুর, জঙ্গল লতিফপুর ও জঙ্গল ভাটিয়ারী। হাটহাজারীর জালালাবাদ ও নগরীর কাট্টলীর উত্তর পাহাড়তলী। এই পাঁচটি মৌজায় প্রায় ৩০৭০ একর খাস জমি আছে। এরমধ্যে জঙ্গল সলিমপুরে সাড়ে ১২০০ একর, জঙ্গল লতিফপুরে ২৫০ একর, জঙ্গল ভাটিয়ারীতে ১৩০০ একর, জালালবাদে ২০০ একর, উত্তর পাহাড়তলীতে ১০০ একরের মতো খাস জায়গা আছে। ইতোমধ্যে স্পোর্টস ভিলেজ, হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, সাফারি পার্ক, ইকো পার্ক, বিনোদন কেন্দ্র, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র, পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কাস্টমস ডাম্পিং হাউজ, অবৈধ বসবাসকারীদের পুনর্বাসন, সবুজ শিল্প এলাকা, চট্টগ্রাম সেনানিবাস ও বিএমএ, আনসার ও ভিডিপি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন বিভিন্ন প্রকল্প করার জন্য জায়গা চেয়েছে। আরোও অনেক সংস্থা প্রতিনিয়ত জায়গা পেতে আবেদন করছে।
জঙ্গল সলিমপুরে যে খাসজমিগুলো আছে এরমধ্যে ১৪০০ একর ব্যবহার করার মতো ভূমি আছে। বিপুল পরিমাণ খাস জমি উদ্ধার করলে অধিগ্রহণ ব্যতিত সরকারি খাস জমিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। এতে প্রকল্প ব্যয় অনেকাংশে কমে যাবে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে পরিকল্পিত উপায়ে সবুজায়ন ও বনায়নের মাধ্যমে উন্নয়ন করলে চট্টগ্রাম নগরের উপর চাপ কমবে।
স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনজুর কাদের হেমায়েত উদ্দিন বলেন, সেখানে উন্নয়ন করতে গেলে সামাজিক সুবিধাগুলো বন্ধ করতে হবে। দখলদারদের সরিয়ে দিতে হবে। জরিপকালে আমরা খালগুলোর মুখ বের করেছি। প্রাথমিকভাবে ৪৫০ একর জমি ব্যবহার করতে পারবো। প্রস্তাবিত কারাগার করতে গেলে পাহাড়সহ রেখেই করা যাবে। যে প্রস্তাবগুলো এসেছে সেগুলোর বেলায় পাহাড়কে সাথে নিয়েই অনেক কিছু করা সম্ভব। কালচারাল, স্পোর্টস ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জন্য এই জায়গাটি একদম সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ১৯৮৪ সালে সবুজে ভরপুর ছিল সলিমপুর। ২০০০ সালে পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি তৈরি হয়। প্রাথমিক জরিপে এপর্যন্ত ৩০ শতাংশ সবুজ বিলীন হয়েছে। সাত মিটার থেকে ৬০ মিটার উচ্চতার ৪০০ একর সম্পূর্ণ পাহাড় একেবারে নিচিহ্ন হয়ে গেছে। ৯০ দশক থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সেখানে কোনো জনবসতি ছিল না। কিন্তু ২০০০ সালের পর বিভিন্ন এলাকা থেকে অপরাধ করে আসা লোকজন সেখানে বসতি স্থাপন করতে থাকে। এতে খাস জমির অবৈধ দখল, প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট, নির্বিচারে পাহাড় কর্তন ও সবুজায়ন ধ্বংসের পাশাপাশি পাহাড় ও ভূমিধসের কারণে প্রাণ ও সম্পদহানি ঘটতে থাকে। ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত সরকারি হিসেবে চট্টগ্রামে ২২৭ জন মানুষ পাহাড়ধসে মারা যান। ২০১৯ সালেই জঙ্গল সলিমপুরে ৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
খাস জমি দখলে ১৩টি সমাজ : যুগ্ম নিবন্ধন অফিসের তথ্যনুযায়ী ১৫টি হাউজিং সোসাইটি নিবন্ধন নিয়েছে। এরমধ্যে ১৩টি সক্রিয় আছে। এগুলো হলো- আলীনগর ভূমিহীন সমবায় সমিতি, ছিন্নমূল বহুমুখী সমবায় সমিতি, একতা ভূমিহনি সমবায় সমিতি, নূরনবী শাহ হাউজিং সমবায় সমিতি, জঙ্গল সলিমপুর জনকল্যাণ কর্মজীবী সমবায় সমিতি, গোলপাহাড় ভূমিহীন সমবায় সমিতি, আল মদিনা সমবায় সমিতি, মায়ের আঁচল সমবায় সমিতি, ভিত্তিহীন সমবায় সমিতি, চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল সংগ্রামী বস্তিবাসী সমবায় পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা হাউজিং সমবায় সমিতি, নবীনগর বহুমুখী সমবায় সমিতি ও আলীনগর বহুমুখী সমবায় সমিতি। ১১টি হাউজিং সোসাইটি আছে জঙ্গল সলিমপুর মৌজায়, দুটি সমিতি আছে আলীনগরে। তাদেরকে উচ্ছেদ করতে গেলেই ১৩টি সমাজের মসজিদে মাইকিং করে উস্কানি দেয়া হয়। তখন লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে মহিলারা।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. নাজমুল আহসান বলেন, ‘ভূমি বিরোধ নিয়ে অনেক মামলা হলেও জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে কোনো অভিযোগ হয় না। যে কারণে সেখানে প্রকৃতপক্ষে ভূমিদস্যুরা কিভাবে অবস্থান গেড়েছে তা নিয়ে ধারণা ছিল না। এখনই জঙ্গল সলিমপুরে উন্নয়ন সম্ভব না হলে এটি আরো দখল হয়ে যাবে। মূলত জমি দখলের জন্যই সেখানে বেশকিছু সমাজের উৎপত্তি হয়েছে। এ সমাজের সমাজপতিরা একেকজন মাফিয়া ডন। এরা সাইনবোর্ডের আলোকে ২০ হাজার থেকে ৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে স্ট্যাম্পে দখলস্বত্ত্ব বিক্রি করছে। সন্ত্রাসী ও বিভিন্ন জায়গা থেকে পালিয়ে আসা আসামিরাই সেখানে বসবাস করে। তারা প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ৫-১০টির মতো মামলা আছে।’
পাহাড় দখল প্রক্রিয়া : পাহাড় কেটে প্রথমে সিঁড়ির মতো করে। পরে স্কেভেটর, ড্রাম্প ট্রাক নিয়ে প্লট আকারে বাউন্ডারি দেয়। বাউন্ডারি দেয়ার পরে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেলেই পাহাড় সমতল করে ফেলে। আলীনগরে পানি নিষ্কাশনে সুন্দর ড্রেন করেছে। প্লটের সামনে মসজিদ, মন্দির, প্যাগাড়া নির্মাণ করে পেছনেই পাহাড় কাটা হয়। ২০০০ সালেও সবুজ ছিল আলীনগর। ২০০৭ সালে সেখানে বড় ধরনের পাহাড়ধস হয়। বায়েজিদ লিংক রোড হতে হাতের ডানদিকে জঙ্গল সলিমপুরে যাওয়ার জন্য যে রাস্তাটি করেছে তা সম্পূর্ণ পাহাড় কেটে সমতল করা হয়েছে। রাস্তার দুপাশে তাকালে সুন্দর পাহাড় দেখা যাবে। কিন্তু পাহাড়গুলোর পেছনের পাহাড় নিধন হয়েছে। দূর থেকে এই এলাকাটি শিল্পজোন মনে হলেও মূলত সেখানে পাহাড় কেটে ধাপে ধাপে ঘরবাড়ি তৈরি হয়েছে। অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। আর বেলে মাটির পাহাড় হওয়ায় পানি ধরে রাখতে না পেরে পাহাড়ধস হয়।

দুই মন্ত্রী ও মুখ্যসচিবের পরিদর্শনে গতি আসে : চট্টগ্রামে হার্ট ফাউন্ডেশনের জন্য জায়গা চেয়ে আবেদন করা হয় জেলা প্রশাসনের কাছে। এই হার্ট ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন চট্টগ্রামের সন্তান ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউস। তিনি এ ফাউন্ডেশনের সভাপতিও। কিন্তু খাস জায়গার অভাবে জায়গা দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এরমধ্যে গত ১৪ মে হার্ট ফাউন্ডেশনের জন্য জায়গা দেখতে যান মুখ্যসচিব। এরপরেই মূলত সলিমপুরবাসী বুঝতে পারে সেখানে সরকারের নজর পড়েছে। এরপর গত ১৪ জুলাই ও ২৪ জুলাই দশদিনের ব্যবধানে তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ ও ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন করেন। মূলত দশ দিনের ব্যবধানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুইজন মন্ত্রী অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত এলাকাটি পরিদর্শনে গেলে জঙ্গল সলিমপুরের উন্নয়ন পরিকল্পনা গতি পায়। পরিদর্শন শেষে জঙ্গল সলিমপুরকে উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়ার জন্য উৎকৃষ্ট জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করেন দুই মন্ত্রী।

উচ্ছেদ প্রক্রিয়া : ২০১৭ সালে জেলা প্রশাসন প্রথম উচ্ছেদের চেষ্টা করে জঙ্গল সলিমপুরে। তখন জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ নামে রিট করা হয়। মূলত সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণে থাকা ১৩টি সমাজ একত্রিত হয়ে এই রিটটি করে। ২০২২ সালের ২ মার্চ এই রিটের নিষ্পত্তি হয়। সেখানে বলা হয়, ভূমিহীন-গৃহহীনদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে তাদেরকে উচ্ছেদ করা যাবে না। রিটের এমন নির্দেশনা পেয়েই জেলা প্রশাসন উচ্ছেদ পরিকল্পনা হাতে নেয়। পাশাপাশি ভূমিহীন-গৃহহীনদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়। গত ২ আগস্ট প্রথমবারের মতো বড়ধরনের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে চালানো সেই অভিযানে ১৭৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি ৭০০ একর ভূমি দখলদারদের কবল থেকে উদ্ধার করা হয়। উচ্ছেদকালে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেও প্রশাসনের চাপের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয় দখলদাররা।
গত ৩০ জুলাই মুখ্যসচিবের সাথে মতবিনিময় সভায় বক্তব্যকালে সীতাকুন্ডের উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম আল মামুন বলেন, ‘একসময় সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ ছিল আক্কাছ বাহিনীর হাতে। পরে মশিউর বাহিনীর উত্থান হয়। ছিন্নমূলে সাদেক, গফুর মেম্বার, রিপন, আরিফ (সিটি কলেজ) এরাই নাকি টাকা তুলে নেতৃত্ব দেয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অপরাধীরা এসে সেখানে বসবাস করছে। রোহিঙ্গারাও বসবাস করছে। সম্প্রতি চারজন রোহিঙ্গা পাসপোর্ট পর্যন্ত করে ফেলেছে।’