ঈদ মোবারক ছড়িয়ে পড়ুক শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা

9

 

‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।
তোর সোনা-দানা, বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ
দে যাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ
দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর আজ পশ্চিম আকাশে শাওয়ালের একফালি চাঁদ দেখা দিলেই ঈদের সওগাত নিয়ে আসবে কাল তথা সোমবার। অন্যথায় বহু কাক্সিক্ষত ঈদ উল ফিতর উদযাপিত হবে মঙ্গলবার। ঈদ মানে আনন্দ। দীর্ঘ একমাস মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিতে সিয়াম সাধনার পর শাওয়ালের চাঁদ উঠার সাথে সাথে রোজার আবশ্যকীয়তা শেষ হয়, ভাঙতে হয় রোজা। এরপর পর পরম তৃপ্তিতে আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করে সকল মানুষের সাথে উৎসব উদযাপন করাটাই ঈদ। ঈদে সকলের প্রত্যাশা থাকে একটি সুখ-সমৃদ্ধ ও মঙ্গলময় জীবনের। সেই সাথে ফরিয়াদ থাকবে, ঈদে সবার জীবন হয়ে উঠুক আনন্দময় ও নিরাপদ। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, গত দুই বছর বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মুসলমানরা মুক্তমনে আনন্দ উৎসবের মধ্যে ঈদ উদযাপন করতে পারেন নি। এবার করোনা মহামারির তাÐব না থাকায় অবস্থা স্বাভাবিক হয়েছে। মুক্তমনে ঈদের বাজার থেকে শুরু করে ঈদযাত্রায় পর্যন্ত সাধারণের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে ঈদের আমেজ। আশা করা যায়, সর্বশেষ পর্যন্ত এ আনন্দের আমেজ অব্যাহত থাকবে। অন্যান্য উৎসব থেকে এ ঈদের পার্থক্য হল- সবাই এর অংশীদার। সবার মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার মধ্যে রয়েছে অপার আনন্দ। ঈদের দিন ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই ঈদগাহে গিয়ে এক কাতারে শামিল হয়ে মহান আল্লাহর কাছে দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় শেষে ক্ষমা প্রার্থনা করে। ঈদের আগের এক মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মুসলমান আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার ব্রতে লিপ্ত ছিল। এসময় উপবাস যাতনা সম্ভ্রমের মাধ্যমে অপরের দুঃখ-কষ্ট বুঝতে সচেষ্ট হয়। রোজার প্রধান লক্ষ্য ত্যাগ ও সংযম। রমজানের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারলে তা হবে সবার জন্য কল্যাণকর। দুর্ভাগ্যজনক যে, রমজান সংযমের মাস হওয়া সত্তে¡ও একশ্রেণীর ব্যবসায়ী বাড়তি চাহিদার সুযোগ নিয়ে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দিয়ে অধিক মুনাফা করেছেন। অবশ্যই সরকারের সদিচ্ছা ও প্রশাসনের অধিক সতর্কতার ফলে সর্বশেষ বাজার নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। তবে ঈদের বাজারের পোশাক-পরিচ্ছেদ ও অন্যান্য সামগ্রীর বাজার মূল্য চাওড়া ছিল। এর পাশাপাশি ঈদে ঘরমুখো মানুষ স্বজনদের কাছে ফিরে যেতে এবার ভোগান্তি হয়েছে তুলনামূলক কম। এবার রমজান মাসে আইনশৃংখলা পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক ছিল বলা যায় । মলম পার্টির তৎপরতা, ছিনতাই, জালনোট ও বিচ্ছিন্ন কিছু প্রতারণার ঘটনা ঘটলেও আগের যেকোন সময়ের চেয়ে পরিবেশ ভালো ছিল।
আমরা জানি, আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অনেক সমস্যা আছে, আছে অনেক সংকট। তা সত্তে¡ও বিভিন্ন জাতীয় উৎসবে শ্রেণী-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ শরিক হয়। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী প্রিয়জনকে নতুন পোশাক ও উপহার সামগ্রী কিনে দেয়। যারা সারাবছর জীর্ণ পোশাকে থাকে, তারাও ঈদের দিনে সন্তানদের গায়ে নতুন পোশাক পরাতে চায়। ঈদের আনন্দ কেবল একা ভোগ করলে হবে না, গরিব-দুঃখী মানুষকে তাতে শামিল করতে হবে। এটিও ইসলামের শিক্ষা। এ কারণেই ধনীদের জন্য জাকাত ফরজ করা হয়েছে। কবি নজরুলের উল্লেখিত চরণেও তার ইঙ্গিত রয়েছে। ঈদের নামাজ আদায়ের আগেই ফিতরা দেয়ার নিয়ম। ফিতরার উদ্দেশ্য, দারিদ্র্যের কারণে যাতে কেউ আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়, তার নিশ্চয়তা বিধান করা। সচ্ছলরা সঠিক নিয়মে জাকাত-ফিতরা আদায় করলে হতদরিদ্র মানুষগুলোও ঈদের খুশির ভাগ পেতে পারে। রমজান সংযমের মাস হলেও অনেকে
খাওয়া-দাওয়া ও কেনাকাটার পেছনে অঢেল অর্থ ব্যয় করেন। দরিদ্র স্বজন বা প্রতিবেশীর প্রতি অনেকে কোনো দায়িত্ব পালন করেন না। ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসে ব্যস্ত থাকেন। এটি ইসলামের বিধানের পরিপন্থী। ঈদ উদযাপনের সময় আমাদের এ কথাটিও মনে রাখতে হবে। এবার ঈদে ৯ দিনের সরকারি ছুটির ফাঁদে পড়েছে দেশ। এতে হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশসহ জরুরি সেবা কার্যক্রম, বাণিজ্যিক কর্মকান্ড ইত্যাদি যেন অচল বা স্থবির হয়ে না পড়ে, সরকারকে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। উৎসব-আনন্দে সংশ্লিষ্টরা যেন দায়িত্বের কথা ভুলে না যান।
ঈদ আসে সাম্যের আহবান নিয়ে। ইসলাম শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে আনন্দ, সৌহার্দ্য ও স¤প্রীতি। ঈদ উপলক্ষে রাজনৈতিক নেতা ও সমাজপতিরা শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। এ দৃষ্টান্ত কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে যদি তারা সমাজে ও রাজনীতিতে শুভেচ্ছা ও সম্প্রীতির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারেন, তা হবে সমগ্র জাতির জন্য আনন্দের সংবাদ। ঈদুল ফিতরের আনন্দ সবাই ভাগাভাগি করে নেবে, এটাই প্রত্যাশা। ঈদ মোবারক।