ঈদে মিলাদুন্নবী পালন ও অর্পিত কর্মভার

22

সৈয়দ মুহাম্মদ জুলকরনাইন

মাযহাব অর্থ হচ্ছে পথ, মত বা ধর্ম। ইসলামী আদর্শ অবিকল ও সুরক্ষিত রেখে সে অনুযায়ী জীবন যাপনকারী মাযহাব ‘আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা’য়াহ’ হচ্ছে মুসলমানদের সে অংশের প্রতিনিধিত্বকারী, যারা রাসূলে করীম (দ.) এর ইন্তেকালের পর সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচিত খলিফা হযরত আবু বকর ছিদ্দীক (রা.) কে বিনা আপত্তিতে মেনে নিয়েছিলেন। সে ধারাবাহিকতা (Succession) রক্ষা করে খোলাফায়ে রাশেদীন, অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীনসহ পৃথিবীর বিখ্যাত মুজতাহেদীনের পথ অনুসরণ করে আসছে সুন্নিরা। প্রাসঙ্গিক বিষয় মিলাদুন্নবী (দ.) পালন করা (Observe) নিয়ে সুন্নি চিন্তাধারা (Ideology) এর সাথে ভিন্নতা রয়েছে বহু আলিম, মুফতি কিংবা বিরুদ্ধবাদী গবেষকদের সাথে। তবে ইসলাম অনুসারীদের মধ্যে সর্ববৃহৎ সম্প্রদায় হচ্ছে সুন্নিজামাত। তাঁদের মতে মীলাদুন্নবী (দ.) পালন করা প্রকৃত মু’মিনদের নৈতিক কর্তব্য। কারণ জাগতিক সব কিছুর উপরে নবী মুহাম্মদ (দ.) তাঁদের কাছে অধিক প্রিয়। আতীকুল্লাহ, নে’মত বা অনুগ্রহ কিংবা সফলতা (Godsend) যাই বলি না কেন- সকল প্রাপ্তিতে আনন্দিত হওয়া মানব চরিত্রের অংশ। কিন্তু সে প্রাপ্তি যখন সমগ্র মানব জাতির জন্যে হয় এবং স্বয়ং পালনকর্তা আল্লাহ তা’আলা বলেন যে, ‘মু’মিনদের নিকট নবী তাদের প্রাণাপেক্ষাও প্রিয়। নবীপত্নীগণ মু’মিনদের মাতৃস্বরূপ (সূরা আহযাব: ৬)’। উপরন্তু বিশুদ্ধ হাদীস বুখারী শরীফে হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (দ.) ইরশাদ করেন: ‘তোমাদের মধ্যে কেউ প্রকৃত মু’মিন হতে পারবে না যতক্ষণ না আমি তার পিতামতা, সন্তান-সন্তুতি এবং অন্যান্য সকল মানুষের চেয়ে তার কাছে অধিকতর প্রিয় হব।’
বিশ্বনবী (দ.) এর শুভ আগমনের সময় পৃথিবীর সামগ্রিক অবস্থা পর্যালোচনা করলেও বলতে হয়, সে অন্ধকার যুগে প্রিয় নবী (দ.) অবশ্যই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় নে’মত। তিনিই মানুষকে উদ্ধার করেছেন শোষণ নির্যাতন থেকে। তাঁর বদৌলতে মানুষ খুঁজে পেয়েছে প্রকৃত স্রষ্টার পরিচয়। মানুষ গুণাবলী অর্জন করে কল্যাণের পথে অগ্রবর্তী হতে পেরেছে নবী মুহাম্মদ (দ.) এর কারণেই। পরকালে অনন্ত জীবনের শান্তি, এবং আল্লাহর কঠিন শাস্তি থেকে মুক্তির দিক নির্দেশনা দিয়ে যে নবী (দ.) সৎ জীবনযাপন তথা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সব ধরণের খারাপ, ক্ষতিকর, অশুভ এবং অসাধু কার্যকলাপ নির্মূল করেছিলেন, তাঁর ত্রিশটি গুণবাচক নামের একটি হচ্ছে নবী-উর-রহমান অর্থাৎ করুণার দূত। আরেক নাম সিরাজুম মুনীরা অর্থাৎ আলোকময় প্রদীপ। সাম্য, মৈত্রী এবং ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে আল্লাহর রাসূল (দ.) কে অসহনীয় যন্ত্রণার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবু তিনি একমাত্র আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করে নবুয়তি দায়িত্ব পালন ও মানবতার বিশ্ব গড়ে তোলেন। তাই আল্লাহ তা’আলা হাদীসে কুদসীতে ইরশাদ করেন ‘লাওলাকা লামা খালাকতুন আফ্লাক।’ অর্থাৎ (হে হাবীব! আমি আপনাকে সৃষ্টি না করলে কোন কিছুই সৃষ্টি করতাম না)। হাদীসে কুদসী পবিত্র কুরআন না হলেও আল্লাহর কথাই, যা রাসূলে (দ.) কে স্বপ্নের মাধ্যমে অথবা তাঁর অন্তরে ‘ইলহাম’ করে পাঠিয়েছেন- অত:পর প্রিয় রাসূল (দ.) সে কথাগুলোই নিজ ভাষায় উম্মতের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। সুতরাং, এমন নবীর (দ.) শুভ আগমনে খুশী বা আনন্দ প্রকাশ করা যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। কুরআন শরীফে এ ব্যাপারে নির্দেশনাও আছে। যেমন: সূরা ইউনুছের ৫৮ নম্বর আয়াতে করীমাতে ইরশাদ হয়েছে, ‘কুল বি-ফাদ্বলিল্লাহি ওয়া বিরাহমাতিহী ফাবিযালিকা ফাল্ইয়াফ্রাহু, হুয়া খাইরুম মিম্মা ইয়াজমাঊন।’ অর্থাৎ (হে হাবীব (দ.) আপনি বলুন! আল্লাহ পাকের অনুগ্রহ ও তাঁর দয়া প্রাপ্তিতে তারা যেন আনন্দ প্রকাশ করে। এটা তাদের সকল ধন দৌলত সঞ্চয় করা অপেক্ষা শ্রেয়)।
বহুকাল আগে থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, যদি কোন জাতি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন ধরণের নে’মত বা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হয়েছে সেদিনকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যে ঈদ বা আনন্দ প্রকাশ করে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছে। যেমন: হযরত মুহাম্মদ (দ.) মক্কায়ে মুকাররামা থেকে হিযরত করে মদীনা মুনওয়ারার প্রান্ত সীমানায় পৌঁছলে তাঁকে স্বগত জানানোর জন্যে তৎকালীন ইয়াসরীবের (মদীনা) শিশু, যুবক, বৃদ্ধ, বণিতা তাঁদের বাসভবনের ছাদে উঠে পড়েন এবং বালকেরা রাস্তায় নেমে আসে। প্রিয় নবীকে (দ.) বরণ করতে সমস্বরে উচ্চারণ করতে থাকেন, আল্লাহু আকবার, ক্বাদ্ জা-আ রাসূলুল্লাহ (দ.) ইত্যাদি। এটি বিশুদ্ধ মুসলিম শরীফের কিতাবুজ যুহুদ ওয়ার রাকায়েকে এসেছে। আরো একটি হাদীস বুখারী শরীফের বিজয় অধ্যায়ে হযরত আবু বকর ছিদ্দীক (রা.) তাঁর দেখা ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন সবুজ পাগড়ী পরিহিত আল্লাহর রাসূল (দ.) সম্মুখে ছিলেন। ডানে বামে প্রধান চার খলীফা আর পেছনে সারিবদ্ধভাবে অন্যান্য সাহাবীগণ ধ্বনি কিংবা তক্বীর দিতে দিতে আল্লাহর ঘরের চতুর্দিকে একত্রিত হন। হযরত ঈসা (আ.) এর একটি দোয়ার কথা পবিত্র কুরআনের সূরা মায়েদায় ১১৪ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে এ রকম ‘রাব্বানা আন্যিল আলাইনা মাঈদাতাম মিন্নাচ্ছামায়ী তাকুনু লানা ঈদান লিআউয়ালিনা ওয়াআখিরিনা।’ অর্থাৎ (হে আল্লাহ আমাদের উপর আপনি আসমান হতে রিযিক বা ভোজ ভর্তি থালা অবতীর্ণ করুন। তাহলে আপনার সে নে’মত প্রাপ্তির দিবস হবে আমাদের ও আগে পরের সকল জাতির জন্যে ‘ঈদ’ বা আনন্দের দিন) সে কারণে খ্রিষ্টানরা ঐ রিযিক প্রাপ্তির দিনকে খুশীর দিন বা বিশেষ দিবস হিসাবে পালন করে। আর সে দিনটি হচ্ছে রবিবার। নাসাঈ শরীফে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করে বলেন, নবী করীম (দ.) ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয় এটি ঈদের দিন, মহান আল্লাহ মুসলমানদের জন্যে দান করেছেন। সুতরাং যে জুম’আর নামাযে আসবে সে যেন গোসল করে, সুগন্ধি মেখে এবং Toothbrush ‘মিসওয়াক’ করে আসে।’
আমরা আল্লাহ তা’আলার বিধি-বিধান কিংবা তাঁর অবতীর্ণ কুরআনুল করীমের উপর সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস স্থাপন করেছি। সুতরাং প্রিয় রাসূল (দ.) যে আমাদের জন্যে শ্রেষ্ঠ নে’মত এবং সৃষ্টি জগতের জন্যে কল্যাণ স্বরূপ তাও পবিত্র কুরআনেরিই ঘোষণা। সে কারণে তাঁর জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখা মুস্তাহ্সান, মাহমুদ ও আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের তরীক্বাহ বা পদ্ধতি। খ্যাতনামা শায়খুল হাদীস, মুফাসসিরে কুরআন মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী (রাহ.) ঈদে মিলাদুন্নবী উদ্যাপন করাকে মুস্তাহাব বলেছেন। অন্যদিকে আল্লাহ তা’আলা কোন নে’মত প্রাপ্তিতে শোকর আদায় করার নির্দেশনা দিয়েছেন সূরা আল ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াতে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘ওয়ায্কুরু নি’মাতাল্লাহি আলাইকুম’ অর্থাৎ (আমার প্রদত্ত নে’মতের স্মরণ বা চর্চা কর)। হযরত মুহাম্মদ (দ.) এর পৃথিবীতে শুভ আগমন যে সোমবার তা বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু রাসুনুল্লাহের তাঁর জন্ম তারিখ নিয়ে যেমন মতপার্থক্য রয়েছে, তেমন ইন্তেকালের তারিখ নিয়েও রয়েছে ভিন্নমত। শেষনবী মুহাম্মদের (দ.) ওফাত দিবস নিয়ে চারটি অভিমত বা রেওয়ায়তের কথা জানা যায়। যেমন: ১০, ১২, ১৫ রবীউল আউয়াল এবং ১১ রমজান। এখানে দুটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া অত্যাবশ্যক। প্রথমত যারা বলেন, মিলাদুন্নবীর দিনকে ঈদ হিসাবে পালন অযৌক্তিক (Illogical) তাঁদের নিশ্চয় জানা থাকার কথা যে, হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করা হয়েছে শুক্রবার। কিন্তু তিনি ঐ দিন ইন্তেকাল করলেও শুক্রবারকে শোকের দিন বলা হয়নি। দ্বিতীয়ত ইন্তেকালের তিন দিন পর শোক প্রকাশ শরীয়ত সম্মত নয়। অন্যদিকে নবী করীম (দ.) এর ‘বিলাদত’ বা জন্মদিন নিয়ে কমপক্ষে দশটির বেশি তারিখের কথা জানা যায়। ঐ সকল তারিখের মধ্যে হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) এর পৌত্র মুহাম্মদ বিন আলী আল বাকির (১১৪ হি.) বর্ণনা করেছেন রাসূলুল্লাহ (দ.) এর জন্ম তারিখ ১০ রবিউল আউয়াল। ঐতিহাসিক (বিতর্কিত) মুহাম্মদ বিন আমর আল ওয়াকিদী (৭৪৭-৮২৩ খ্রি:) এ মত পোষণ করেন। মুহাম্মদ ইবনে সা’দ ইবনে মানিল হাশিমি (৭৮৪-৮৪৫ খ্রি:) তাঁর বিখ্যাত ‘আত-তাবাকাতুল কুবরা’য় দুটি তারিখ ২ ও ১০ রবিউল আউয়ালের কথা উল্লেখ করেছেন। তৃতীয় হিজরি শতকের আরব ঐতিহাসিক আবু আব্দুল্লাহ আল-যুবাইর বিন বাকার (৭৮৮-৮৭০ খ্রি.) মত দিয়েছেন যে, বিশ্বনবী (দ.) এর জন্ম পবিত্র রমযান মাসে। তাঁর যুক্তি হলো, আল্লাহর রাসূল (দ.) এর চল্লিশ বছর পূর্তিতে যেহেতু নবুয়াত প্রাপ্তি সে কারণে অবশ্যই তাঁর জন্ম রমযানে। আবার প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ও হাদীস বিশারদগণের কাছে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য অভিমত হলো, আবরাহার হস্তী বাহিনী ধ্বংস হওয়ার ৫০ বা ৫৫ দিন পর রাসূল (দ.) ৮ রবিউল আউয়াল সোমবার সুব্হে সাদিকের সময় হযরত আবু তালিবের বাসভবনে জন্মগ্রহণ করেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), জুবাইর ইবনে মুতঈম (রা.), কুতুব উদ্দীন কাসতালানি (রহ.) ও আইনজ্ঞ, ধর্মপ্রচারক এবং ইসলামের শাইখ আব্দুর রহমান বিন আলী বিন মুহাম্মদ বিন আবুল ফারাজ বিন আল জাওযী (১১১৬-১২০১ খ্রি.) সহ অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও জীবনীকার এ বিষয়ে একমত হয়েছেন। স্পেনের বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফক্বীহ আবু মুহাম্মদ আলী বিন আহমদ বিন সাঈদ বিন হাযম (৯৯৪-১০৬৪ খ্রি.) ৮ রবিউল আউয়ালের মতটিকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন। লিসবনের বিচারক ও খ্যাতনামা মুসলিম পন্ডিত ইউসুফ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল বার (৯৭৮-১০৭১ খ্রি.) বলেন, সকল ইতহিাসবেত্তা ৮ তারিখ সঠিক বলে মনে করেন। ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) এর উপর সর্বপ্রথম লিখিত গ্রন্থ ‘আত-তান্বীর ফী মাওলিদিল বশীর আন-নাযীর’ এ লেখক আল্লামা হাফেজ আবুল খাত্তাব ইবনে দিহইয়া কালবি (১১৫০-১২৩৫ খ্রি.) উপরোক্ত তারিখের উল্লেখ করেন। অনেকের মতে বিশ্বনবী (দ.) মাহে রবিউল আউয়াল এর ১২ তারিখে দুনিয়াতে তশরীফ এনেছেন। এ ব্যাপারে নামজাদা ইতিহাস-রচয়িতা মুহাম্মদ বিন ইসহাক বিন ইয়াছার বিন খিয়ার (৭০৪-৭৭০ খ্রি.) পক্ষে অভিমত প্রদান করেছেন। হাফিজে হাদীস ইমাম কুস্তালানি (রহ.) বলেছেন, প্রসিদ্ধ মতানুসারে ১২ রবিউল আউয়াল নবী করীম (দ.) এর শুভ আগমন হয়েছে। পবিত্র রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখ মক্কা শরীফের অধিবাসীগণ হুজুরে আকরাম (দ.) এর জন্মস্থান পরিদর্শন করার রেওয়াজ (Convention) এখনো চালু রেখেছেন। শরহুল মাওয়াহিব ১ম খন্ড ২৪৮। ইবনে ইসহাকের সংকলিত মুহাম্মদ (দ.) এর জীবনী পুনরায় সম্পাদনাকারী আবু মুহাম্মদ আব্দ আল-মালিক বিন হিশাম (রহ.) রাসূল (দ.) এর জন্ম হস্তীর বছর বা ‘আমুল ফীল’ ১২ রবিউল আউয়ালে হয়েছে জানিয়েছেন। সীরাতে ইবনে হিশাম ১ম খন্ড ১৫৮। ‘তারীখুল রুসুল ওয়াল মুলূক’ প্রণেতা আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারীর আল তাবারী (৮৩৯-৯২৩ খ্রি.) ও অনুরূপ মত পোষণ করেন। ২ খন্ড ১২৫। মরক্কোতে জন্মগ্রহণকারী পন্ডিত ও সমাজবিজ্ঞানী আবু যায়েদ আব্দুর রহমান বিন মুহাম্মদ বিন খালদুন আল হাদরামী (১৩৩২-১৪০৬ খ্রি.) ১২ রবিউল আউয়াল রাতের শেষ ভাগে মহানবী দুনিয়াতে শুভাগমণের কথা বলেছেন এবং তিনি ঐ বছরকে হস্তী বাহিনীর বছর হিসাবে উল্লেখ করেছেন। সীরাতে নববীয়্যা ৮১। মুহাদ্দিস, ফক্বীহ, মুফাস্সির ও ইতিহাসবেত্তা ইমাম ইসমাঈল ইবনে ওমর ইবনে কাছীর (১৩০১-১৩৭৩ খ্রি.) (রহ.) বলেন, ১২ রবিউল আউয়ালই হযরত মুহাম্মদ (দ.) এর বিলাদত বা জন্ম তারিখ হিসাবে জমহুর ওলামায়ে কিরামের নিকট প্রসিদ্ধ। শরহুল মাওয়াহিব ২ খন্ড, ২৪৮, আল্ বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩য় খন্ড ১০৯। উপমহাদেশের খ্যাতনামা আলিমে দ্বীন ও হাদীস শরীফের সুদক্ষ মু’আল্লিম আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলবী (রহ.) বিশ্বনবী (দ.) এর জন্ম দিবস হিসাবে ১২ রবিউল আউয়ালকে মশহুর বা বিখ্যাত বলেছেন।- মা সাবাতা মিনাস্ সুন্নাহ্ ফি আইয়্যামিস সুন্নাহ্ ৮১।
যে সকল ‘বিদ্বান’ বা পন্ডিত ব্যক্তি ঈদে মিলাদুন্নবী কিংবা শুধু মিলাদুন্নবী (দ.) পালনের বিপক্ষে মত দিয়েছেন তাঁদের যুক্তি (Argument) হচ্ছে মধ্য যুগের বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ও মুহাদ্দিস ইসলামী ধর্মতত্ত¡বিদ শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুর রহমান আল-ছাখাবী (১৪২৮-১৪৯৭ খ্রি.) লিখেছেন, ‘ইসলামের সম্মানজনক প্রথম তিন যুগ অর্থাৎ সালফে সালেহীনদের (সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীন) কোন একজন থেকেও মাওলীদ পালনের ঘটনা খুঁজে পাওয়া যায় না। এ উদযাপন পরবর্তী যুগে উদ্ভাবিত। অতঃপর সকল দেশের বৃহৎ শহরগুলোর মুসলমানগণ প্রিয় নবী (দ.) এর জন্ম দিবস পালন করে আসছেন। এ মাসের রাত্রে তাঁরা বিভিন্ন প্রকার দান-সদকা করেন, জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব বা আনন্দপ্রকাশ ও সুন্দর খানাপিনার আয়োজন করেন। রাসূলে করীম (দ.) এর জীবনী নিয়ে আলোচনা সভা বা মাহফিল সর্বোপরি জনকল্যাণমূলক কাজে তাঁরা মনোনিবেশ করেন।’ তবে তাঁদের বড় অভিযোগ হলো: মিলাদুন্নবী পালনের ক্ষেত্রে শিয়াগণের অগ্রণী ভূমিকা ৩৫৮ হিজরীতে উবাইদ বংশের রাফেযী ইসমাঈলী শিয়াগণ মিশরকে ফাতেমী সালতানাতের কেন্দ্রে রূপান্তরের পরবর্তী সময়ে খলীফা আল মুয়িজ্জু লি-দ্বীনিল্লাহ মিলাদুন্নবীর প্রচলন শুরু করেন। তিনি হযরত আলী (রা.), হযরত ফাতিমা (রা.), ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হুসাইন (রা.) এর জন্ম দিবসও পালন করতেন। কিন্তু মিশরের বাইরে এ প্রচলন মুসলিম বিশ্বে তখনো ছড়িয়ে পড়েনি। মিলাদুন্নবী (দ.) উদযাপনে যাঁদের আপত্তি তাঁদের দ্বিতীয় মতটি এই যে, মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন ইরাকের ‘ইরবিল’ প্রদেশের শাসক আবু সাঈদ কুকবূরী। আল্লামা মুহাম্মদ ইবনে আহম্দ ইবনে ওচমান ইবনে ক্বাইয়ুম আবু আব্দুল্লাহ শাম্ছুদ্দীন আয-যাহাবী (১২৭৪-১৩৪৮ খ্রি.) কুকবূরীর পরিচয় প্রসঙ্গে লিখছেন; ‘ধার্মিক এবং সম্মানিত সুলতান মুযাফ্ফর উদ্দীন আবু সাঈদ কুকবূরী ইবনে আলী ইবনে বাকতাকীন ইবনে মুহাম্মদ আল-তুরকমানী’ নামটি তুর্কী ভাষার। তুর্কী বংশের এ শাসনকর্তা ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) প্রচলন করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
এখন যাঁরা যত্নসহকারে ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের পক্ষে উনাদের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ যেমন: মুহাদ্দিস মুফাস্সির, ফক্বীহ ও মুজাদ্দিদ আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (১৪৪৫-১৫০৫ খ্রি.) রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রণীত কিতাব ‘আল-হাবী লিল্ ফাতাওয়া’ ১ খন্ড ১৮৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, হযরত মুহাম্মদ (দ.) এর দাদা হযরত আব্দুল মুত্তালিব কর্তৃক আক্বীকা দেয়ার পর নবুয়ত প্রাপ্তির পরবর্তী সময়ে পুনরায় আক্বীকা দেয়া এবং প্রতি সোমবার প্রিয় নবী (দ.) এর রোযা রাখা এক প্রকার মিলাদ উদ্যাপন। ইমাম সুয়ূতী (রহ.) আরো লিখেছেন, হযরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত একদিন তিনি রাসূলুল্লাহ (দ.) সহ আবু আমের আনসারী (রা.) এর বাসভবনে উপস্থিত হলে দেখেন যে, তিনি অর্থাৎ ঐ আনসারীর সন্তান সন্তুতি, আতিœয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও গোত্রীয় সকলকে নিয়ে নবীজী (দ.) এর বিলাদাত বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। তাঁর বক্তব্য শুনে এবং জামায়েত দেখে আল্লাহর রাসূল (দ.) ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা তাঁর করুণার দরজা তোমাদের জন্যে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন আর তোমার (আনসারী) জন্যে ফিরিশতাগণ ক্ষমা প্রার্থনা করছেন।’ রাসূল (দ.) আরো বলেন, ‘যে তোমার অনুরূপ করবে, সেও নাজাত পাবে।’ হযরত আল্লামা শিহাব উদ্দীন আহমাদ বিন হাজার হায়তামী (রহ.) প্রণীত ‘আন নি’মাতুল কুবরা আলাল-আলাম ফী মাওলিদি সাইয়্যিদি ওয়ালাদি আদামের ভাস্য মতেও স্পষ্ট যে, সাহাবায়ে কেরামগণ মীলাদুন্নবী (দ.) এর ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। যেমন: ১ম খলীফা হযরত আবু বকর ছিদ্দীক (রা.) ফরমান, রাসূল (দ.) এর মিলাদুন্নবীতে যিনি এক দিরহাম খরচ করেছেন তিনি বেহেস্তে আমার সঙ্গী হবেন। ২য় খলীফা হযরত ওমর ফারুক্ব (রা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী (দ.) কে মর্যাদা দিলেন তিনি বরং ইসলামকেই জিন্দা করলেন। ৩য় খলীফা হযরত ওসমান (রা.) এর ফরমান হচ্ছে, যিনি মীলাদুন্নবী (দ.) উদযাপনে এক দিরহাম খরচ করলেন তিনি যেন হুনাইন ও বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণের নেকি পেলেন। ৪র্থ খলীফা হযরত আলী (রা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি মিলাদুন্নবী (দ.) কে সম্মানের সহিত পালন করার উদ্যোগ নেবেন, তিনি ঈমানের সম্পদ নিয়ে মৃত্যুবরণ করবেন এবং হিসাব ছাড়া বেহেস্তে প্রবেশাধিকার পাবেন:- ৭-৮।
ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) সম্পর্কে মতপার্থক্য থাকলেও সন্তোষজনক ভাবে বলা যায়, বর্তমানে বিশ্বের ৩২টি দেশে সরকারি ছুটির পাশাপাশি সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এশিয়ার কমপক্ষে ৮টি দেশের মধ্যে মিলাদুন্নবী পালনে বাংলাদেশ অনেকটা এগিয়ে। রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ সমগ্র দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঈদে মিলাদুন্নবীর কার্যক্রম দেখা যায়। যার মধ্যে রয়েছে (ক) নফল নামায, রোযা পালন, দরুদ শরীফ পাঠ ও না’তে রাসূল (দ.) পরিবেশন। (খ) সদকা-খায়রাত, তবারুক বিতরণ (কাঙ্গাল দরিদ্রদের প্রাধান্য দিয়ে)। (গ) সাহায্যের হাত প্রসারিত করে কয়েদি মুক্তি এবং মযলুমের পাশে দাঁড়ানো। (ঘ) শরীয়ত সম্মতভাবে আনন্দ প্রকাশ, ধর্মীয় আলোচনা, জুলুছ বা ধর্মীয় শোভাযাত্রা (শব্দ দূষণ ও অপরিচ্ছন্ন না করে)। (ঙ) ইসলামী বিষয়ের উপর বিতর্ক প্রতিযোগিতা, ওয়াজ মাহ্ফিল, ইসলামী সভ্যতার নিদর্শনের উপর কেলিগ্রাফী (ঈধষষরমৎধঢ়যু) প্রদর্শন। (চ) জাতীয় ও কলিমা খচিত কিংবা আল্লাহ এবং রাসূল (দ.) এর নাম খচিত পতাকা উড়িয়ে, বড় বড় ভবন তথা শুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আলোকসজ্জা ইত্যাদি।
লেখক: রাজনীতিক, প্রাবন্ধিক ও সভাপতি- মুহিব্বানে আল্ মুনাওয়ার পরিষদ