ইয়াজিদ: দুনিয়া ও আখিরাতের অভিশপ্ত এক নরঘাতক

69

মোহাম্মদ গোলাম হোসাইন

মাহে মহররম। হিজরি নববর্ষের প্রথম মাস। এই মাসের দশ তারিখকে ইয়াওমে আশুরা বলা হয়। বিভিন্ন কারণে এই দিনটি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। সৃষ্টির সূচনা থেকে এই দিনটি অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে। বিশেষ করে ৬১ হিজরীর ১০ই মহররম সংঘটিত হয়েছিলো কারবালা প্রান্তরে এক হৃদয়বিদারক মর্মান্তিক ঘটনা। যে ঘটনাকে স্মরণ করে কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক ইমানদার মুমিন মুসলমানদের অন্তরে রক্তক্ষরণ হবে। কারণ এই দিনে নির্মম ভাবে শহিদ হতে হয়েছিল শেষ নবী ও শ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয় দৌহিত্র জান্নাতি যুবকদের সর্দার হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) কে। আর এই হত্যাকাÐের মূল খল নায়ক হলো ইয়াযিদ বিন মুয়াবিয়া। পিতার ইন্তিকালের পর জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল করে অন্যায় অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতন ও পাপের সা¤্রাজ্য কায়েম করে এই পাপিষ্ঠ। এছাড়াও নবী বংশের সাথে দুশমনীর সীমালঙ্ঘন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিলো যে, যার ফলশ্রæতিতে কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটলো। পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনা হামলা চালিয়ে সাড়ে সাতশত সাহাবী এবং অসংখ্য তাবেঈ ও তাদের সন্তানদের হত্যা করা হলো। এছাড়াও আরো অনেক জঘন্যতম কর্মকাÐের দরুন ইয়াযিদ দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত হলো।
ইয়াযিদের পরিচয় : কাতেবে ওহী জলিলুল কদর সাহাবী হযরত আমীরে মুয়াবিয়া (রাঃ)। যিনি ছিলেন খোলাফায়ে রাশেদীনের পর উম্মতে মুহাম্মাদীর প্রথম শানদার বাদশা। যার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখিয়ে হযরত ইমাম হাসান (রাঃ) খিলাফতের মহান দায়িত্ব তুলে দেন। আল্লাহর কুদরত বুঝা দায় গেণ বুজুর্গ ও সম্মানীত সাহাবীর ঘরেই জন্ম নিলো পাপিষ্ঠ ইয়াযিদ। আল্লামা ইমাম জালাল উদ্দীন সুয়ূতি (রহঃ) ‘তারিখুল খোলাফা’ গ্রন্থে বলেন- ইয়াযিদ ২৫ অথবা ২৬ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করে। আর তার মৃত্যু সম্পর্কে ‘ বেদায়া ওয়ান নেহায়া’ গ্রন্থে আল্লামা ইবনে কাছির বলেন- ইয়াযিদ ৬৪ হিজরী’র রবিউল আউয়াল মাসের ১৪ তারিখ মৃত্যুবরণ করে। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিলো ৩৮ বছর। তার দুঃশাগণকাল ছিলো ৩বছর ৬মাস।
ইয়াযিদের চরিত্র : ইয়াযিদের আসল চরিত্র তখনই প্রকাশ পেয়েছিলো, যখন তার পিতা হযরত আমীরে মুয়াবিয়া (রাঃ) ইন্তিকাল করেন। মূলত ক্ষমতা দখলের পূর্বেও তার চরিত্র খারাপ ছিলো।
আল্লামা ইবনে কাছির বলেন- ক্ষমতা দখলের পূর্বেও সে খেল-তামাশা, ঠাট্টা, মশকারী ও মন্দ কাজে লিপ্ত থাকতো। (বেদায়া-৮/২২৬) আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতি বলেন- ইয়াযিদ ছিলো এমন ব্যক্তি যে মাতা,কন্যা ও বোনদের বিবাহ করা বৈধতা দিয়েছিলো। সে ছিলো মদ্যপায়ী এবং নামাজে তওয়াক্কা করতো না। (তারিখুল খোলাফা-১৬৬)
ইয়াযিদ সম্পর্কে রাসূলে পাকের ভবিষ্যতবাণী : পাপিষ্ঠ ইয়াযিদ সম্পর্কে রাসূলে পাক (দরুদ) পূর্বেই ভবিষ্যতবাণী করেছেন। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রহঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন- আমি রাসূলে পাক (দরুদ) কে বলতে শুনেছি – কুরাইশদের কিছু যুবকদের হাতে আমার উম্মত ধ্বংস হবে। তখন মারওয়ান বললেন- এই সমস্ত যুবকদের প্রতি আল্লাহর লানত। (বুখারী-মুসলিম) এজন্য হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) সর্বদা দোয়া করতেন- আমি যুবক শাসক থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। হে আল্লাহ আমাকে ৬০হিজরি পর্যন্ত এবং যুবকদের শাগণ পর্যন্ত হায়াত দিওনা। আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন- যুবক শাসকদের মধ্যে সর্বপ্রথম হলে ইয়াযিদ এবং সে উক্ত হাদিসের ইঙ্গিতপূর্ণ ব্যক্তি। (উমদাতুল ক্বারী-১২/১০০)
হুসাইন (রাঃ)’র সাথে ইয়াযিদের আচরণ : আল্লামা ইবনে জওযী বলেন- ইয়াযিদের ব্যাপারে সবগুলো বর্ণনা যাচাই-বাছাই করার পর প্রসিদ্ধ মত হলো যে, হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)’র শির মোবারক শামে পৌছার পর যখন ইয়াযিদের সামনে রাখা হলো তখন সে শামবাসীকে একত্রিত করলো। অতঃপর হাতের লাঠি দ্বারা শির মোবারকের উপর আঘাত করতে লাগলো। আর ইবনে যুবারীর কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলো -‘হায়! বদরের নিহত আমার মুরব্বিগণ যদি এ অবস্থা দেখতো। খাযরাজ গোত্রের তলোয়ারগুলো আজ আক্রমণ করেছে।’ (তাযকিরাতুল খাওয়াস-২৬১) ইবনে জওযী আরো বর্ণনা করেছেন- হযরত যায়েদ বিন আরকাম (রাঃ) বলেন- আমি ইয়াযিদের দরবারে উপস্থিত ছিলাম। এমতাবস্থায় হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)’র শির মোবারক সেখানে নিয়ে আসা হলো। তখন ইয়াযিদ তার হাতের লাঠি দ্বারা ইমাম হুসাইন (রাঃ)’র ঠোঁটের উপর আঘাত করতে লাগলো এবং কবিতা বলতে লাগলো।
মদিনা শরীফে গণহত্যা : মদিনাবাসী বিদ্রোহ করলে ইয়াযিদ বাহিনী মক্কা ও মদিনায় হামলা করে ৭ শত নেতৃস্থানীয় আনসার ও মুহাজির সাহাবীকে হত্যা করে। তাছাড়া মহিলা ও শিশুসহ প্রায় ১০ হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। ধন-সম্পদ লুন্ঠন করলো এবং ১ হাজার কুমারী নারী ধর্ষণ করলো। তিনদিন জন্য মদিনা শরীফে আযান ইকামত বন্ধ ছিলো। তাদের হামলা থেকে আল্লাহর ঘরও রক্ষা পায়নি। (বিদায়া ৮/২১১ ও ইমাম যাহাবী’র তারিখুল ইসলাম)
ইয়াযিদের প্রতি দুনিয়া ও আখেরাতে লানত : ইয়াযিদ এতো বড় পাপিষ্ঠ যে, নবী বংশের প্রতি জুলুম নির্যাতন ও মক্কা-মদিনা আক্রমণ এবং নিরীহ মুসলমানদের হত্যা করে আল্লাহ ও প্রিয় রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে। এজন্য তার ব্যাপারে ফয়সালা সরাসরি কুরআনে বর্ণিত হয়েছে।আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- যারা আল্লাহ ও তার রাসূলকে কষ্ট দেয় আল্লাহ তাদের প্রতি দুনিয়া ও আখেরাতে লানত করেন।তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন লাঞ্ছনাকর শাস্তি। (সূরা আহযাব-৫৭) রাসূলে পাক (দরুদ) ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি মদিনাবাসীকে জুলুম করবে, ভয় দেখাবে, আল্লাহ তাকে ভয় দেখাবেন। তার প্রতি আল্লাহর লানত, ফিরিস্তাদের লানত এবং সকল মানুষের লানত। আল্লাহ পাক কিয়ামতের দিন তার কোন আমল গ্রহণ করবেন না। (মুগণাদে আহমদ ৪/৫৫) অপর বর্ণনায় এসেছে, রাসূলে পাক (দরুদ) ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি মদিনাবাসীর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করবে সে এমন ভাবে ধ্বংস হবে যেমন ভাবে লবণ পানিতে মিশে যায়। (বুখারী শরীফ)
পাপিষ্ঠ ইয়াযিদের শেষ পরিণতি : আল্লাহ পাক এই পাপিষ্ঠকে বেশিদিন বাঁচতে দেন নি।মদিনাবাসীর উপর হামলার কিছু দিন পরেই মাত্র ৩৮ বছর বয়সে মৃত্যু হয়। তার সকল দাম্ভিকতা ও অহংকার মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন। দুনিয়া ও আখেরাতে লানতের উপযুক্ত হয়েছে। সর্বশেষ ফয়সালা মহান আল্লাহ পাকের পবিত্র বাণী—- জেনে রেখ! জালিমদের উপর আল্লাহর লানত। (সূরা হুদ-১৮) বড় দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে কিছু পথভ্রষ্ট ইয়াযিদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তারা ইয়াযিদকে কারবালার ঘটনার জন্য দায়ী নয় বলে মিথ্যাচার করছে এবং বানোয়াট ও ভিত্তিহীন ঘটনাবলী বর্ণনা করে তাকে নির্দোষ প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। আল্লাহ পাক আমাদের সবাই সত্য বুঝার তাওফিক দান করুন আমিন।

লেখক : খতিব-বায়তুল আমান জামে মসজিদ
কুমারী দীঘির পাড়, বন্দর, চট্টগ্রাম