ইসলামে ফাতওয়ার গুরুত্ব

16

ড. মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী

বাংলাদেশে ফাতওয়া একটি আলোচিত বিষয়। দাঁড়ি টুপিওয়ালা দেখলে একসময় চোর ডাকাত পুলিশেরা সম্মান করতো। বর্তমান অনেক ক্ষেত্রে দাঁড়ি টুপিওয়ালাকে চোর ডাকাতের মত গ্রেফতার করছে। কারণ একশ্রেণী জঙ্গি, সন্ত্রাসী ইসলামের এই সুন্নতী লেবাসকে ব্যবহার করে কলংকিত করছে। তদ্রুপ একশ্রেণীর কাঠমোল্লা ফাতওয়া নামক প্রয়োজনীয় বিষয়কে অপব্যবহার করে কলংকিত করছে। যে সকল লোকের ইসলামের গভীর জ্ঞান নেই, সে সমস্ত লোকের ফাতওয়া দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ। ফাতওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিধায় ফাতওয়ার বিষয়ে কিছু আলোকপাত করা প্রয়োজন মনে করছি।
যে কোন প্রশ্নের উত্তর দেওয়াকে আভিধানিক অর্থে ফতোয়া বলে। হযরত সোলায়মান (আ.) রাজত্বকালে সারা সম্প্রদায়ের রাজা বিলকিস তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সর্বোচ্চ পরিষদের কাছে পরামর্শ চেয়ে বলেছিলেন, ‘আমাকে ফাতওয়া দাও’। হযরত ইউসুফ (রা.) বন্দী থাকা অবস্থায় তাঁর কাছে মিশরের বাদশাহর এক স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয়েছিল। স্বপ্নটি ‘সাতটি মোটাতাজা গাভী সাতটি দুর্বল গাভীকে খেয়ে ফেলছে’ স্বপ্নটি ব্যাখ্যা চেয়ে ‘আমাদেরকে ফাতওয়া দিন’ কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে। উক্ত দু’স্থানে ফাতওয়া শব্দটি সমস্যা সমাধানেই ব্যবহার করা হয়েছে।
ইসলামের শরীয়তের পরিভাষায় দ্বীনি সমস্যা সমাধানকে ফাতওয়া বলে। পবিত্র কোরআনে ফাতওয়া বিষয়টি কয়েক স্থানে উল্লেখ হয়েছে। যেমন : ‘মানুষ আপনার নিকট ফাতওয়া জানতে চায়। আপনি বলে দিন, মাতাপিতাহীন নিঃসন্তান ব্যক্তি সম্বন্ধে আল্লাহপাক তোমাদের নিকট ফাতওয়া বলে দিচ্ছে। ( ৪: ১৭৬)
হাদিসে পাকেও ফাতওয়া শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে আমাদের আত্মস্থ হয় যে, ‘ফাতওয়া’ মানে দ্বীনি সমস্যার সমাধান।
ফাতওয়া ইসলামের হুকুমের উৎস। মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম আল্লাহর অহিবাণী দ্বারা ফাতওয়া প্রদান করেন। নবীজীর বাণী দ্বারাও ফাতওয়া প্রদান করা হয়েছে। তিনি যতদিন দুনিয়ার জগতে ছিলেন ততদিন সাহাবায়ে কোরআন কোন ফাতওয়া প্রদান করেননি। কম সংখ্যক সাহাবীকেই তিনি ফাতওয়া প্রদানের অনুমতি প্রদান করেছেন। বিখ্যাত সাহাবী হযরত মু’য়াজ বিন জাবল (রা.) কে আল্লাহর রাসুল (দ.) ইয়ামেনের গভর্নর নিয়োগ করে প্রেরণ করেন। তাঁর কাছে একবার জানতে চাওয়া হলো তুমি বিভিন্ন সমস্যার সমাধান কীভাবে কর ? তিনি উত্তরে বললেন, আমি প্রথম কোরআনের আলোকে সমাধান করি। কোরআনে সমাধানে না পেলে হাদিসের আলোকে সমাধান করি। হাদিস হতে সমাধান বের করতে না পারলে নিজে ইজতিহাদ করে রায় প্রদান করি। নবীজী তাঁর জন্য দোয়া করে বিদায় দিয়েছিলেন তাঁকে। (আবু দাউদ শরীফ, পৃ: ৩২৪)
সাহাবায়ে রাসুল (দ.)’র যুগেও ফাতওয়া প্রচলন ছিল। সাহাবায়ে কেরামের সময়কালে মোহর নির্ধারণ ব্যতীত এক মহিলার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীর মিল হওয়ার পূর্বেই স্বামী মারা যায়। এই অবস্থায় মহিলার মোহর কত হবে তা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন মাসউদ (রা.)’র দরবারে হাজির হন। তিনি উপস্থিত সাহাবীদেরকে বললেন, কোরআন ও হাদিসে এধরনের কোন নির্দেশনা আমি পাচ্ছি না বিধায় আমি আমার ইজতিহাদ (গবেষণা) দ্বারা রায় প্রদান করছি। এই রায়ে তিনি ‘মাহরে মিস্ল’ (মেয়েটির বোন বা ভাইয়ের নির্ধারিত মোহর) সমান মোহর বলে রায় প্রদান করেছিলেন। এটি দিল একটি ফতোয়া। (সূত্র : নুরুল আনোয়ার পৃ: ২৪৬)
সাহাবায়ে রাসুল (দ.)’র পর ইসলাম আরো ব্যাপক ভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বহু দেশ-জাতির কাছে ইসলামে আলো প্রসারিত হয়। তখন বহু ভাষা গোষ্ঠির সমস্যার কারণে নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়। সে সব সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ে ফাতওয়ার। তখন ফাতওয়া দেওয়ার অধিকারী ছিল তাবেঈগণ। কোন কোন তাবেঈ তাক্ওয়া অবলম্বন করার কারণে ফাতওয়া প্রদান হতে বিরত থাকে। কিছু প্রজ্ঞাবান তাবেঈ কোরআন হাদিস গবেষণা করে ফাতওয়ার মাধ্যমে নতুন নতুন সমস্যার সমাধান করেন। তাঁদের অশেষ পরিশ্রমের ফলে ফিক্হ শাস্ত্রের অনেক অমূল্য গ্রন্থ রচনা হয়।
যারা কেরআন হাদিসের আলোকে জটিল সমস্যার সমাধান দিতে পারে তাদেরকে বলা হয় মুফতি। আজকাল দেখাযায় অনেক অনবিজ্ঞ ব্যক্তিও মুফতি উপাধী গ্রহণ করে নিজকে হাজির করছে। মুফতি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন না করে ফাতওয়া প্রদান করছে বলে সমাজে আজ বিভ্রান্তি ছড়িয়ে এবং ‘ফতোয়াবাজী’ শব্দটি গালিতে পরিণত হয়েছে।
আল্লামা খতিবে বাগদাদী (রা.) তাঁর ‘আল ফিক্হ ওয়াল মুতাফাক্কিহ’ গ্রন্থে লিখেছেন, সরকারি ভাবে প্রতিটি আলেম ও মুফতির যোগ্যতা দেখা প্রয়োজন। সবদিক দিয়ে যে সব ব্যক্তি ফতোয়া প্রদানের যোগ্যতা রাখে শুধুমাত্র তাঁরাই ফতোয়া প্রদান করতে পারবে এবং যাদের সে যোগ্যতা নেই তাদেরকে ফতোয়া প্রদান হতে কঠোর ভাবে বিরত রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ইসলামের বিদ্বগ্ধ ব্যক্তিবর্গ ফতোয়া প্রদানকারীর কিছুগুণাগুণ প্রয়োজন মনে করেছেন। যেমন, (১) মুফতিকে মুসলমান হতে হবে। (২) ফেকাহ শাস্ত্রে মাসালা-মাসাঈল, উসুলে ফিক্াহ, নাসিখ, মানসুখ এবং ইসলামে আহকাম সম্পর্কে গবেষণা ধর্মী জ্ঞান থাকতে হবে। (৩) তাঁকে তাক্ওয়াবান পরহেজগার ন্যায়বান হতে হবে। (৪) তাঁকে ইসলামের পরিভাষা, ফিক্াহ’র পরিভাষা, ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত মুস্তাহাব, হারাম, হালাল, মাকরূহ-মুবাহ সম্পর্কে জানতে হবে (৫) সকল মানুষের প্রতি সমান দৃষ্টিতে থাকতে হবে। (৬) মুফতিকে সামাজিক নিয়মনীতি ও যুগ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। (৭) মুফতিকে জ্ঞনা যোগ্য মুফতি হতে শিক্ষা দীক্ষা নিতে হবে। (৮) মুফতির আমল, চরিত্র, ন্যায় পরায়ণতা এবং শিক্ষায় মুসলমানদের জন্য দৃষ্টান্তস্বরূপ হতে হবে।
যে কোন ভাবে ফাতওয়া দেওয়া যায় না, ফাতওয়া প্রদানের কিছু নিয়মনীতি। নিয়মনীতিগুলো মেনেই ফাতওয়া প্রদান করতে হয়। ফাতওয়া প্রদানকারী (মুফতি) কোন সমস্যা দেখতে পেলে এবং এই সমস্যা সমাধান জরুরি মনে করলে অথবা কেউ কোন সমস্যা সম্পর্কে তাঁর কাছে ইসলামের নির্দেশনা জানতে চাওয়া হলে তখন তিনি কোরআন গবেষণা করে সমাধান বের করবেন। তা সম্ভব না হলে হাদিস দ্বারা সমাধান করবেন। তাও সম্ভব না হলে ইজমা (তৎকালীন আলেমদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত)’র উপর ভিত্তিকে মতামত দিবেন। তাও যদি সম্ভব না হয় তাহলে কোরআন হাদিসের আলোকে নিজের বিবেক খাঁটিয়ে সমস্যার সমাধান দিবেন। একটি শরীয়তের পরিভাষায় ‘কিয়াস’ বলা হয়। এই কিয়াসের সিদ্ধান্ত শুধু গবেষক ও মুফতিগণই দিতে পারবেন।

লেখক : কলাম লেখক, রাজনীতিক