ইসলামে পবিত্র কুরবানির গুরুত্ব ও তাৎপর্য

8

 

মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম কুরবানি হযরত আদম আলায়হিমুস সালাম’র দুই পুত্র হাবিল ও কাবীল’র কুরবানি। দুজনই কুরবানি দিল, আল্লাহতা’য়ালা হাবীলের কুরবানি কবুল করলেন, হাবীলের যে দুম্বাটি আল্লাহ কবুল করেছিলেন, সেটিকে আল্লাহর হুকুমে হযরত ইসমাঈল (আ.)’র বদলায় কুরবানি দেয়া হয়। ইব্রাহীম (আ.) কে ঈমানের কঠিন পরীক্ষায় শতভাগ সাফল্য দান করে হযরত ইসমাঈল (আ.)’র পরিবর্তে এ দুব্বাটি আল্লাহতা’য়ালা কুরবানি হিসেবে কবুল করেন।
জিলহজ্ব মাসের প্রথম দশদিনের ফজিলত: পবিত্র চন্দ্রমাস জিলহজ্বের চাঁদ উদিত হওয়ার প্রথম দশ দিবা-রাত্রির গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেছেন, শপথ ফজরের সময়ের, শপথ দশ রজনীর, শপথ জোড়া-বিজোড়ের। বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যা হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, হযরত জাবের (রা.) হতে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, দশ রাত্রি হলো ঈদুল আযহার প্রথম দশ দিন-রাত্রি, বিতর অর্থ বিজোড়, দ্বারা আরাফা দিবস, ‘আশ শাফউ’ দ্বারা ‘নাহর’ তথা কুরবানির দিন। (তাফসীর দুররুল মনছুর, খন্ড ১০, পৃ. ২৪৫)
প্রত্যেক নবী রসূলের যুগে কুরবানির বিধান ছিল: প্রত্যেক নবী রসূলের ইতিহাসে কুরবানীর প্রমান পাওয়া যায়। আল্লাহতা’য়ালার পক্ষ হতে নাযিলকৃত সকল শরীয়তেই কুরবানীর বিধান ছিল। কালক্রমে ইসলামের এক অপরিহার্য বিধান হিসেবে মুসলিম বিশ্বেরসর্বত্র ঈমানের পরিচায়ক ইবাদত হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনুল করীমে এরশাদ হয়েছে, ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানির বিধান দিয়েছি, তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সকল চতুস্পদ জন্তু দিয়েছেন সেগুলোর উপর যেন তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে তোমাদের ইলাহই একমাত্র ইলাহ। (সূরা: হজ্ব: ২২:৩৪)
মুত্তাকীদের কুরবানি কবুল হয় : আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের চতুস্পদ জন্তু ও মাংসের দিকে দেখেন না। তিনি বান্দার অন্তরের নিষ্ঠা, বিশুদ্ধতা দেখেন। কেবল মাংস ভক্ষণ ও পশু জবেহকরার মাধ্যমে রক্তপাত করার নাম কুরবানি নয়, বরং আল্লাহর রাস্তায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তত থাকার মানসিকতা লালন করা এবং দৃঢ় প্রত্যয়ে ইসলামের বিধানের প্রতি সর্বোচ্চ আনুগত্য প্রদর্শন করাই কুরবানির মূলশিক্ষা। তাকাওয়া বা পরহেজগারী ভিত্তিক জীবন গঠনের চেতনায় যার প্রচেষ্টা প্রতিফলিত হয়নি তার কুরবানি মূল্যহীন। আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না এর গোশত ও রক্ত, পৌঁছায় তোমাদের তাক্বওয়া।’ (সূরা: হাজ্ব, আয়াত: ২২, ৩৭) লৌকিকতা ও পশু ক্রয়ের প্রতিযোগিতা নয় কিংবা সমাজে বিত্ত বৈভব ও ধনসম্পদের প্রাচুর্যতা প্রদর্শনের জন্য নয়। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে পরকালীন সাফল্য ও নাজাত লাভের উদ্দেশ্যে কুরবানি করতে হবে। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আপনি বলুন! আমার নামায, আমার কুরবানি সমূহ আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু সবই আল্লাহর জন্য, তিনি প্রতিপালক সমগ্র বিশ্বজাহানের।’ (সূরা: আনআম: ১৬৩)
হাদিস শরীফের আলোকে কুরবানীর গুরুত্ব: হযরত যায়িদ ইবন আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হেআল্লাহর রাসূল! এ কুরবানি কী? তিনি বললেন, এটা তোমাদের পিতা ইব্রাহীম (আ:)’র সুন্নত, তাঁরা আবার বললেন, এতে আমাদের কি কল্যাণ নিহিত আছে? তিনি বললেন, এর প্রত্যেকটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকী রয়েছে, তাঁরা পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, বকরীর পশমেও কি তাই? জবাবে নবীজি বললেন, বকরীর প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি করে নেকি রয়েছে। (ইবনে মাযাহ ২য় খন্ড, পৃ: ২২৬, তিরমিযী ও মিশকাত শরীফ)।
সামর্থ্য থাকা সত্তে¡ও কুরবানি না করা গুনাহের কাজ: হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত, নবী করিমসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি সামর্থ থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করেনা, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে। (ইবনে মাযাহ শরীফ) উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, প্রিয় নবী (দ.) এরশাদ করেছেন,আদম সন্তান কুরবানির দিন কুরবানির চেয়ে আল্লাহর নিকট অধিকপ্রিয় কোন আমল করেনা। কিয়ামতের দিবসে আল্লাহ তায়ালা কুরবানির পশুকে তার শিং ক্ষুর ও পশম সমূহসহ উপস্থিত করবেন, কুরবানির পশুর রক্ত জমিনে পতিত হওয়ার পুর্বেই আল্লাহর নিকট কুরবানি কবুল হয়। অতএব তোমরা খুশী মনে কুরবানি করো। (ইবনে মাযাহ শরীফ, হাদিসস নং ৩১২৬)।
কুরবানি করা ওয়াজিব: হানাফী মযহাবের মতানুযায়ী কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য নিম্নে বর্ণিত শর্ত অপরিহার্য: স্বাধীন পুরুষ বা মহিলা হওয়া, মুসলিম হওয়া (অমুসলিমের উপর ওয়াজিবনয়), নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক হওয়া, প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া, আকেল বা বোধশক্তি সম্পন্ন হওয়া (নির্বোধ বা পাগলের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়), প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা মোটা তাজা পশু কুরবানি করো, কেননা কুরবানির পশু পুলসিরাতে তোমাদের বাহন হবে।
কুরবানির পশু সুন্দর ও নিখুঁত হওয়া বাঞ্চনীয়: গরু, মহিষ, উট, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা ইত্যাদি চতুস্পদ হালাল গৃহপালিত পশু দ্বারা কুরবানি করা জায়েজ। গরু কমপক্ষে ২ বছর, ছাগল কমপক্ষে ১ বছর, উট ৫ বছর বয়সের হতে হবে।
অংশীদারী কুরবানি: গরু, মহিষ, উট এ তিন প্রকার জন্তুর প্রত্যেকটিতে এক হতে সাত জনেরনামে কুরবানী করা জায়েজ, এক পশুতে কয়েক জন শরীক থাকলে সন্দেহমুক্ত থাকার জন্য মাংস সমপরিমানে ওজন করে নিতে হবে।
কুরবানির মাংস ভাগ করার নিয়ম: কুরবানি দাতা পশুর মাংস তিন ভাগ করে এক ভাগ এতিম, মিসকীন ও দরিদ্রদুস্থকে দান করা। একভাগ আত্মীয় স্বজনকে দেয়া, একভাগ নিজে রাখা মুস্তাহাব। কুরবানির সময়: ১০ জিলহজ্ব কুরবানী করা উত্তম। এদিন কোনকারণে সম্ভব না হলে ১২ জিলহজ্ব পর্যন্ত কুরবানী করা জায়েজ।
কুরবানির পশু নিজ হাতে জবেহ করা মুস্তাহাব: নিয়ম জানা থাকলে নিজ হাতে জবেহ করা মুস্তাহাব। অন্য জনের দ্বারা জবেহ করলে সামনে উপস্থিত থাকা উত্তম। কুরবানির পশুর মাথা দক্ষিণে এবং পিছনের দিক উত্তর দিকে রেখে ক্বিবলামুখী করে শায়িত করে নিম্নের দুআ পাঠকরবে। ইন্নী ওয়াজ্জাহাতু ওয়াজহিয়া লিল্লাযী ফাত্বারাস সামাওয়াতীওয়াল আরদ্বা হানীফাঁও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকীন। ইন্না সালাতীওয়ানুসুকী ওয়া মাহয়ায়া ওয়া মামাতী লিল্লাহি রব্বিল আলামীন। আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়ালাকা বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর। বলে কুরবানির পশু যবেহ করবে। (আবু দাউদ শরীফ)
উম্মতের পক্ষ থেকে নবীজির কুরবানি: উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) হতে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানির বকরী জবেহ করেছেন এবং এ দুআ পাঠ করেছেন, হে আল্লাহ এ কুরবানি আমার, আমার পরিবারবর্গ এবং আমার উম্মতের পক্ষ থেকে কবুল করুন। (মুসলিম শরীফ, ২য় খÐ, পৃ:১৫৬)
লেখক: অধ্যক্ষÑ খতিব ও ইসলামি গবেষক