ইসলামে জ্ঞান-বিজ্ঞান

12

ড. মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী

ইসলাম ধর্ম জ্ঞান বিজ্ঞান সাধনায় ব্যাপক গুরুত্বারোপ করেছেন।একসময় জ্ঞান বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষে ছিল মুসলমানগণ। বর্তমান তা ইহুদিরা দখলে নিয়ে বিশ্ব নেতৃত্ব দিচ্ছে। মুসলমানগণ ভোগ বিলাসে মত্ত, নেই কোন পরিকল্পনা। আমরা বহু ফেরকায় বিভক্ত হলেও ইহুদি-খৃস্টানেরা পোষা সাম্রাজ্যবাদীদের নিকট আমরা মুসলমান। মুসলমানদের মুসলমানিত্ব বজায় রাখতে হলে মেধার রাজ্য দখল করতে হবে। আমাদের দেশের মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত আলেমগণ মনে করেন আরবি জানা লোকই আলেম বা জ্ঞানী। আবার দাবি করা হয় যে কোরআন পাকই সকল জ্ঞানের উৎস। তাই যদি সত্য হয় সকল জ্ঞান বিজ্ঞান কোরআনিক এবং জ্ঞান বিজ্ঞানীরাই আলেম। কোরআন পাকের প্রথম অহী ‘ইকরা’(পড়) যখন নাযিল হলো তখন তো ইসলামী পড়ার কোন জ্ঞানই ছিল না। এতে বুঝবার জ্ঞান বলতে ধর্মীয় নয়, জগতের যা জ্ঞান বিজ্ঞান সব পড়ে আত্মস্থ করতে হবে। আজ আমাদের সমাজের অনেক মাদ্রাসার শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি জ্ঞান বিজ্ঞানের একাধিক শাখা প্রশাখায় বিচরণ না করেও আল্লামা (মহাজ্ঞানী) লিখতে বিবেক নাড়া দেয় না। পবিত্র কোরআনে বর্ণনা করা হয়েছে জ্ঞানের সামান্য অংশ আমাদের নিকট অর্পণ করা হয়েছে অথচ তারা নিজেরাই আল্লামা বলে জাহির করে নির্লজ্জভাবে। ইহুদি খ্রিস্টান নাস্তিক বিজ্ঞানী কিছু আবিষ্কার করলে মুসলমানগণ হইচই করে বলে এটা কোরআনে আছে, তারা কোরআন গবেষণা করে আবিষ্কার করছে। আমি তাদের স্পষ্টভাবে বলতে চাই, কোরআন থাকলে অমুসলমানদের আগে আপনারা আবিষ্কার করলেন না কেন, তার বিচার হওয়া উচিৎ। তারা কষ্ট করে গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কার করবে আমরা ফতোয়া দিয়ে কৃতিত্ব নেব তা অন্যায়।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের কারণেই আল্লাহ পাক জাল্লে শানহু মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করে জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়া হয়। আদম(আ:) কে সেজদা করতে ফেরেস্তাদের নির্দেশ দেয়ার কারণ ছিল মূলত জ্ঞান। আজকের এই যুগসন্ধিক্ষণে মুসলমান হিসাবে বিশ্বের দরবারে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান বিজ্ঞান সাধনা করতে হবে। আমাদের সবকিছু ছিল কেন হারিয়ে গেল তা আত্মোপলব্ধি করতে হবে। আল্লামা ইকবাল বলেছেন, আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান আমরা পেঁচা হয়ে গেলাম, আমাদের জিয়াফত আমরা কাঙ্গাল রইলাম।
আজ দলিত মথিত মুসলমানদের ভাবার সময় হয়েছে, মুসলিম বিশ্বের দেশে দেশে যখন ইটের দালান ছিল হোয়াইট হাউজ তখন কাঠের ঘর। দজলা ফোরাতের তীরে যখন ছিল লক্ষ গ্রন্থের গ্রন্থাগার তখন ইউরোপের লাইব্রেরিতে মাত্র পঞ্চাশ গ্রন্থের সমাহার। আমেরিকা তখন আবিষ্কার হয়নি। আমরা যখন মসলিন ব্যবহার করি আজকের সভ্য বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ তখন অর্ধ-উলঙ্গ।কোরআনের সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের আবিষ্কার হারিয়ে পশ্চাতে চলছি। কোরআন কি চুমু খেতে শুধু নাযিল হয়েছে? এই মহাগ্রন্থ পড়তে হবে, বুঝতে হবে, জ্ঞান-বিজ্ঞান আবিষ্কার করতে হবে, বাস্তবায়িত করতে হবে তার আদর্শ সমাজে। অসংখ্য রহস্যভরা পবিত্র কোরআন। এককালে রহস্যের জট খুলতে মুসলিম মনীষীগণ গবেষণা করে নতুন নতুন অজানা বিজ্ঞানের দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। জ্যামিতি, গণিত, সৃষ্টির রহস্য জ্যোতিরবিদ্যা, রসায়ন, পদার্থ, প্রাণিবিদ্যা, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, চিকিৎসা শাস্ত্র সবই মুসলমান মনীষীদের আবিষ্কারের ফসল। তারাই ছিলেন আধুনিক বিজ্ঞানের পথপ্রদর্শক। মুসলমানদের অবহেলায় অলসতায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধনভাÐার হারিয়ে গেল। চলে গেল ইহুদি জয়নবাদীদের হাতে। নির্ভরশীল হয়ে গেলাম আমরা ফতোয়ার ওপর। বললাম, ইংরেজি ইহুদি খ্রিস্টানদের ভাষা, তা শিক্ষা অনৈসলামিক। সেদিন থেকে আমাদের পশ্চাদপদতা শুরু। ‘ফতোয়া’ একটি ভাল অস্ত্র অপব্যবহারে মানব সমাজে ভোতা (তোয়াবাদী) হয়ে গেল।
একজন অর্থনীতিবিদ বলেছেন, সমাজে মানুষের কল্যাণকামী না জায়েজ কোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ফতোয়া দিতে আগে আলেম সমাজকে তার চেয়ে ভালো কল্যাণকামী ব্যবস্থা প্রচল করে না জায়েজের বিরুদ্ধে ফতোয়া দেয়া উচিৎ।অন্যথায় ফতোয়া দিলেই মানুষ তা গ্রহণ করবে না। নাজায়েজ ব্যবস্থাটাই সমাজকে গ্রাস করবে। কবি জীবনানন্দ দাশের মা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’। বাংলায় প্রবাদ প্রচল আছে,‘স্বাধীন দেশের দাবি আজ, কথা কম বেশি কাজ। মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত আলেম সমাজ কথা বলেন, ওয়াজ করেন আর ফতোয়া দেন কিন্তু ব্যক্তি জীবনে আপ্ত বাক্যের প্রতিফল কোথায়? তাদের অসিয়ত শুনবো কিন্তু খসিয়ত দেখব না? সুধীর দত্তের কবিতা ‘উট পাখির মত চোখ বুঝে বলবো,অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে‘?
একুশ শতকের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আক্ষেপ করে বলতে চাই, কোথায় আমাদের আব্বাসি খলিফা মামুনুর রশীদ। কোথায় তার ’বাইতুল হিকমা’। আছে কি এখন বিজ্ঞানের বহু বিষয়ের মুসলিম জনকগণ? জাপানের নিরক্ষর শিশু যখন কম্পিউটার নিয়ে খেলা করে আমাদের শিশুরা তখন গরুর রচনা শিখছে। শিখছি বাতাসের দুধে কত পানি দিলে কত ওজন হবে তাও। পৃথিবী নামক গ্রহটি কোথায় যাচ্ছে, আর আমরা কোথায় আছি! দিন বদলে গেছে, আগের সেদিন কি আছে? সব পরিবর্তন আর পরিবর্তন। আমরা পড়েছি আ-তে আম, এখন আ-তে আকাশ সংস্কৃতি। ই-তে ইঁদুর, এখন ই-তে ইলেক্ট্রনিক। উ-তে পড়েছি উট, এখন উ-তে উপগ্রহ। একুশ শতকের এই চ্যালেঞ্জ আমরা টিকে থাকার উপযোগী কিনা সে প্রশ্ন সকলের বিবেক জাগ্রত হওয়া উচিৎ।
মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত সমাজ সুশিক্ষা ও দুর্নীতি মুক্ত শিক্ষার আওয়াজ বুলন্দ করে কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের দিকে দৃষ্টি দিলেই দেখতে পাই টেবিলে টেবিলে ঘুষ আর ঘুষ। ঘুষ ছাড়া কোন কাজই হয় না। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যেখানে ধর্মীয় আদর্শিক জ্ঞানের আলো বর্জিত সেখানে বিধিতে না থাকলেও বিশ গজের মধ্যে দু’টি মাদ্রাসার অনুমোদন হয় অর্থের জোরে। কথায় আছে টাকা যখন কথা বলে সত্য তখন চুপ থাকে। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে অধ্যক্ষ মহোদয়গণের টাকার খেলায় সত্য আজ তিরোহিত ।
রবীন্দ্রনাথ একসময় বিশ্বব্যাপী সভ্যতার সঙ্কটে উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন। আজ এই মুসলমানদের চারিত্রিক সঙ্কট দেখে আমরা উদ্বিগ্ন হচ্ছি না কেন? আমরা মুসলমান বলেই!
‘ইসলাম’ কি মুসলমানদের উপযোগী? একটি ধর্ম একটি সম্প্রদায়ের উপযোগী হতে হবে। তা না হলে আদর্শগত সাদৃশ্য থাকবে না। একজন ইউরোপীয় দার্শনিক ইসলাম ধর্ম চর্চা করে মন্তব্য করেছেন, ইসলাম ধর্ম শ্রেষ্ঠ,জাতি নিকৃষ্ট। ইসলামের আদর্শ ও শ্রেষ্ঠত্ব আমরা মুসলমান হিসেবে গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছি বলেই এ ধরনের মন্তব্য করতে সাহস হয়েছে। ইসলাম একটি মানবতাবাদী ধর্ম হয়ে কেন আমাদের নিকট প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি এবং কেনই বা আমরা সে আদর্শ গ্রহণ করিনি তা এক গবেষণার বিষয়। আজ এই গবেষণা আমি গবেষকদের হাতে ছেড়ে দিলাম।

লেখক : কলাম লেখক, রাজনীতিক