ইসলামের দৃষ্টিতে নবজাতকের আগমনের পর করণীয়

17

 

মানুষ আশরাফুল মাকলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব। মাতৃগর্ভ হতে মানুষের আগমন একটি স্মরণীয় ও আনন্দের ঘটনা। শিশুর জন্মে আনন্দ প্রকাশ করা এবং শিশু ও শিশুর মাতা-পিতার জন্য দোয়া করা পুণ্যের কাজ।
মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরত করার পর মুহাজির সাহাবীদের যে প্রথম সন্তান জন্ম গ্রহণ করেন তাঁর নাম আবদুল্লাহ ইবনে জোবাইর (রা.)। তাঁর দুনিয়াতে শুভ আগমনের পর সাহাবীগণ আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন।
হযরত হাসান বসরী (রহ.)’র নিকট দুইজন মানুষ একটি নবজাতক শিশুসহ হাজির হলো। তাঁরা হাসান বসরী (রহ.)’র নিকট জানতে চাইলো, শিশুর জন্মে আমরা কি ধরনের আনন্দ প্রকাশ করবো ? তিনি বললেন, ‘তোমরা এভাবে বলো, সন্তানটির হায়াতে বরকত দান করুন এবং সন্তানদাতা মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া’।
দুনিয়াতে শিশুর আগমনের পর প্রথম তাকে উত্তমরূপে গোসল প্রদান করে তার ডান কানে আজান এবং বাম কানে ইকামত প্রদান করা ইসলাম ধর্মের নিয়ম।
হযরত আবু রাফি (রা.) বর্ণনা করেছেন, আমি আল্লাহর রাসুল (দ.)কে দেখেছি, হযরত হাসান (রা.) জন্মের পর তিনি তাঁর কানে নামাজের আজানের মত আজান দেন। (সূত্র : তিরমিজী শরীফ, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা-১৮৩)
বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, হযরত হাসান (রা.) দুনিয়াতে জন্ম গ্রহণ করার পর প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) তাঁর ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামত প্রদান করেন। (সূত্র : বায়হাকী শরীফ)
আজান ও ইকামতের মাধ্যমে নবজাতক শিশুকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তোমার জীবনের আজান ইকামত শেষ হয়েছে এখন শুধু জানাজার নামাজের জন্য সংক্ষিপ্ত সময় অপেক্ষা।
বিশ্ব বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ইমাম গায্যালী (রহ.)লিখেছেন, ‘মানুষের জীবন স্বপ্নময়। নিদ্রায় যখন স্বপ্ন দেখে তখন স্বপ্নের ঘটনাগুলোকে মানুষ মনে করে বাস্তব। নিন্দ্রা ভঙ্গের পর বুঝতে পারে স্বপ্ন স্বাপ্নিক দুনিয়াটাই বাস্তব।
মৃত্যুর পর মানুষ বুঝতে পারবে দুনিয়াটা স্বপ্ন, পরকালের অনন্ত জীবনই বাস্তব। মানুষ মাত্র স্বপ্নময় সংক্ষিপ্ত জীবনের জন্য দুনিয়াতে আসা।
নবজাতকের মুখে খেজুর চিবিয়ে অথবা কোন মিষ্টি মুখে দেয়া এবং সপ্তম দিনে একটি সুন্দর অর্থের নাম রাখা সুন্নাত। আল্লাহর রাসুল (দ.) ইরশাদ করেছেন, নবজাতকের সুন্দর নাম রাখা পিতা-মাতার উপর কর্তব্য। (সূত্র : কালজুল উম্মাহ,১৬ খন্ড, পৃষ্ঠা-৪১৭)
অপর এক হাদিসে মহানবী (দ.) ইরশাদ করেছেন, নবজাতক শিশুর সাথে আকীকা সম্পর্কযুক্ত। জন্মের সপ্তম দিবসে প্রাণী জবেহ করে নাম রাখবে এবং মাথা মুন্ডন করবে। (সূত্র : তিরমিজী শরীফ ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা-১৮৩)
মুসলমানের নাম আল্লাহর রাসুল (দ.)এর নামে রাখা বড় কল্যাণ ও ফজিলতের ব্যাপার। মাহবুবে খোদা হযরত মোহাম্মদ (দ.) ইরশাদ করেছেন, ‘কারো নাম মোহাম্মদ’ হলে তাঁকে প্রহার ও অসম্মান করবে না। যে ব্যক্তি তিন সন্তান জন্ম দিল অথচ একটির নামও ‘মোহাম্মদ’ রাখলো না সে জাহিলের মত আচরণ করলো। কারো ঘরে এক, দুই অথবা তিনজনের নাম ‘মোহাম্মদ’ রাখলে তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। ‘মোহাম্মদ’ নামের মধ্যে বরকত আছে। যে ঘরে অথবা সভায় ‘মোহাম্মদ’ নামের মুসলমান থাকবে সেখানে বরকত হবে।
কোন শিশুর দুনিয়াতে আগমন হলে তার জন্য ছেলে হলে দু’টি ছাগল, মেয়ে হলে একটি ছাগল জবেহ দ্বারা সপ্তম দিবসে আকীকা করা সুন্নাত। আকীকা করা পুণ্যের কাজ। আকীকার কারণে সন্তান সুস্থ তাকে। আকীকার দ্বারা আল্লাহর নিকট শুকরিয়া আদায় করা হয়। ইসলামের পূর্ববর্তী সময়েও আকীকার প্রচলন ছিল।
উন্মুল মোমেনিন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, মহানবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) ইরশাদ করেছেন, ইহুদীরা ছেলে সন্তানের আকীকা করে, মেয়ের করে না। তোমরা ছেলে জন্য দু’টি ছাগল আর মেয়ের জন্য একটি ছাগল জবেহ করে আকীকা করো। (সূত্র : বায়হাকী শরীফ)
মহানবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) শিশুর জন্মের সপ্ত দিন আকীকা করতেন। তাঁর নিজের আকীকাও সম্পাদিত হয়েছিল দুনিয়াতে শুভ আগমনের সপ্তম দিনে।
হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রা.)’র বংশের এক মহিলা মানত করলো যে, আবদুর রহমানের স্ত্রীর কোন সন্তান জন্ম হলে আমি একটি উট জবেহ করবো। উম্মুল মোমেনিন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) একথা শুনে বললেন, না তা হতে পারে না। রাসুল (দ.) এর সুন্নাত হলো ছেলের জন্য দু’টি কম বয়সের ছাগল আর মেয়ের জন্য একটি ছাগল আকীকা দিবে। এই আকীকা জন্মের সপ্তম দিনে করা উত্তম। তা সম্ভব না হলে চতুর্দশতম দিনে, তাও সম্ভব না হলে একবিংশতম দিনে আকীকার অনুষ্ঠান করবে। (সূত্র : মুস্তাদরাক হাকিম, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা-২৩৯)
নবজাতকের মাথা মুন্ডনের পর আকীকা করতে হয়। মাথার চুলের ওজন পরিমাণ স্বর্ণ অথবা রূপা বা তার সমমূল্য অর্থ সাদকা করা সুন্নাত।
হযরত মাওলা আলী (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) হযরত হাসানের পক্ষ হতে ছাগলদ্বারা আকীকা করে ছিলেনআর বলেছিলেন, হে ফাতিমা ! হাসানের মাথা মুÐিয়ে দাও এবং তাঁর চুলের সমপরিমাণ ওজনের রূপা সাদকা কর। হযরত আলী (রা.) বললেন, আমি হাসানের চুলের ওজন করে দেখলাম তার মূল্য এক দিরহাম। (সূত্র : তিরমিজী শরীফ, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা-১৮৩)
আমাদের সমাজে নানা কুসংস্কার প্রচলন আছে। ধর্মের নামে মুসলমানের মাঝেও অনেক কুসংস্কারের প্রচলন হয়েছে। শিশুর আকীকায়ও আমরা কুসংস্কার দেখতে পাই। অনেক মুসলমান মনে করেন, আকীকার গোস্ত মাতা-পিতা, দাদা-দাদি, নানা-নানি খাওয়া বৈধ নয়। অথচ ইসলামে এ নিয়মের কোন ভিত্তি নেই। অনেকের ধারণা এই যে, শিশুর চুল মুÐানোর শুরুতেই আকীকার পশু জবেহ করতে হবে, অথচ এটি কোন ধর্মের নিয়ম নয়। আকীকার অনুষ্ঠান উপলক্ষে উপহার নেওয়ার ও দেওয়া নিয়ম ইসলামের বিধান নয়। সমাজের অনেক প্রথা আছে যেগুলোকে ইসলামের বিধান মনে করা হারাম হিসেবে গণ্য। এসকল হারাম কাজ হতে মুসলমানদের দূরে থাকতে হবে।

লেখক : কলাম লেখক, রাজনীতিক