ইবাদতে ভরা বসন্ত মাহে রমজান

16

এম সাইফুল ইসলাম নেজামী

অন্য সময় ভোররাতে মুয়াজ্জিন সাহেরের মধুর কণ্ঠে যখন ধ্বনিত হয় ‘আসসালাতু খায়রুম মিনান নউম’ অর্থাৎ ঘুম থেকে নামাজ উত্তম। এ সুমহান কল্যাণের আহবানে বান্দার শরীরে স্পন্দন জাগে না। গভীর ঘুমে মগ্ন বান্দা। অভিশপ্ত শয়তান জেঁকে বসে গর্দানের কিনারে। কুমন্ত্রণা দেয় আরেকটু ঘুমানোর। পক্ষান্তরে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে ফজরের নামাজ অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে ফজরের সালাত আদায়ের ফলে ব্যক্তির দেহ-মন ফুরফুরে ও প্রফুল্ল হয়ে যায়। প্রভুর প্রেমে সিক্ত মুমিন আরামের ঘুমকে হারাম করে ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করবেন। আর মহান আল্লাহ তার প্রতিদান দেবেন না, তা কী কখনো হয়? সহিহ মুসলিম শরীফের বর্ণনা: মদিনার মুনিব (দ.) ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি ফজরের সালাত জামাতের সঙ্গে আদায় করে, আল্লাহ তায়ালা তার আমলে দাঁড়িয়ে সারারাত নফল নামাজ আদায়ের সওয়াব দিয়ে দেন! সুবহানাল্লাহ। সারারাত ঘুমিও নফল আদায়ের সাওয়াব। বাহ, কী চমৎকার! বুখারী শরীফে এসেছে, যে ব্যক্তি ফজরের সালাত আদায় করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের সবচেয়ে বড় নিয়ামত দান করবেন। অর্থাৎ সে জান্নাতে মহান আল্লাহর দিদার লাভে ধন্য হবে। অতঃপর মহাসৌভাগ্যবান ওই ব্যক্তি আল্লাহকে পূর্ণিমার রাতের আকাশের চাঁদের মতোই স্পষ্ট দেখবে। সুবহানাল্লাহ। আল্লাহকে দেখার স্বাদ কার না জাগে? ফজরের নামাজেই আছে এ লোভনীয় অফার। ফজরের নামাজ আল্লাহকে পাওয়ার মাধ্যম। অবশ্য সে নামাজ হতে হবে নবীপ্রেমে সিক্ত, একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত। অন্যের মুখে নিজের প্রশংসা শুনতে যে-কারো ভালো লাগে। আর তা যদি হয় গুনাহমুক্ত ফেরেশতাদের মুখে; তাহলে তো আর কথাই নেই। সর্বাধিক প্রশংসিত নবী মোস্তফা (দ.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি ফজরের সালাত আদায় করবে, আল্লাহর ফেরেশতারা আল্লাহর কাছে ওই ব্যক্তিকে ভালো মানুষ হিসেবে সাক্ষী দেবেন।’ ভালো মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য আমরা কী না করি! অথচ এ সুযোগ যে, ফজরের নামাজে, তার প্রতি আমাদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। অন্য আর এগারো মাসে ঘুমের কারণে এ কল্যাণ থেকে মাহরুম হলেও, প্রশিক্ষণের মাস রমজান, ফজরের নামাজের অবারিত বরকত হাসিলের সুযোগ করে দেন। হে প্রিয় বন্ধু মাহে রমজান! তোমাকে ধন্যবাদ। কৃতজ্ঞ তুমি ও তোমার সৃষ্টিকর্তার প্রতি। তোমার বিধান চালু না হলে ইবাদতের মগজে পৌঁছা সম্ভবই হতো না। কিছুক্ষণ বিশ্রাম। মহান প্রভুর নিয়ামত ঘুম। মাহে রমজানে মুমিনের ঘুমও ইবাদত। অবশ্য তা যদি হয় পবিত্র অবস্থায়। সেই সুবহে সাদিকের পূর্বমুহূর্তে বরকতময় সাহারি গ্রহণপূর্বক শুরু হয়ে যায় মাহে রমজানের অন্যতম প্রধান আবশ্যকীয় আমল সিয়াম-সাধনা। রোজা সাধারণ কোন আমন নয়। নিঃসন্দেহে এটি একটি সাধনা। সাধনা আর পরীক্ষা ছাড়া কেউ কস্মিনকালেও কোনকিছু অর্জন করতে পারেনি। রোজায় আছে পরীক্ষা ও সাধনা। পরম আরাধ্য মওলাকে পাওয়ার সাধনা। মহান আল্লাহর নির্বাচিত বান্দার কাতারভুক্ত হওয়ার সাধনা। দুনিয়া-আখেরাতের ভয় ও চিন্তাকে জয় করে আল্লাহর নৈকট্যধন্য প্রিয় বান্দাদের (ওলী-আউলিয়া) আমল রোজা। প্রভু প্রদত্ত অর্ডার কেরি করতে আমরা একমাস রোজা পালন করলেও আল্লাহর মকবুল বান্দারা হরদম মশগুল থাকতেন এই সাধনায় (রোজা)। সিয়াম বা রোজা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, দাম্পত্য মিলন ও রোজা ভঙ্গ হওয়ার সকল বিষয় থেকে দূরে থাকা। রমজান মাসে রোজা কেন্দ্রিক ফরজ শুধুমাত্র একটি। আর তা হলো পূর্ণ এক মাস রোজা পালন করা। এ সংক্রান্ত স্পষ্ট নির্দেশ মিলে সর্বযুগের সর্বাধুনিক গ্রন্থ আল-কুরআনে। সুরা বাকারার ১৮৩ নং আয়াতে বলা হচ্ছে, ‘হে মোমিনগণ! তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হলো, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের প্রতিও; যাতে করে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।’ মালিকের এ চিরসত্য ঘোষণা আল্লাহপ্রেমিদের অন্তরে মুক্তির ভরসা জোগায়। খোদাভীতি অর্জনের অনন্য সোপান সিয়াম-সাধনা। রোজা ঢালাওভাবে সবার জন্য ফরজ নয়। রোজা ওই সব ব্যক্তির ওপর ফরজ, যারা প্রাপ্তবয়স্ক, স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন ও শারীরিকভাবে রোজা পালনে সক্ষম। যদি কেউ সফর অবস্থায় থাকে (শরীয়ত নির্ধারিত দূরত্বে) অথবা অসুস্থতার কারণে রোজা পালনে অপারগ হয়(অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে); তবে তাদের জন্য রয়েছে ফুরসতের সুযোগ। রোজা পরে কাজা আদায় করার বিধানও রয়েছে তাদের জন্য। মা-বোনদের বিশেষ সময়ে রোজার বিধান তাদের জন্য শিথিল করা হয়েছে। অবশ্য পড়ে কাজা আদায় করে দিতে হবে। কঠোরতার নাম ইসলাম নয়। ইসলাম মুক্ত ও সৌন্দর্যের নাম। বিশেষত রোজার মধ্যে ইসলামের অপরূপ সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। মহান আল্লাহর মহানুভবতা রোজায় বেশি পরিস্ফুটিত হয়। মুসাফির আর রোগীর জন্য রোজা কাজা করার অবকাশ রব্বে করিমের মহানুভবতার পরিচয়। যেমন মহান আল্লাহর বাণী, তোমাদের মধ্যে যদি কেউ অসুস্থ থাকে অথবা সফরে থাকে তবে তাদের নির্ধারিত সংখ্যা (রোজা) পরে পূর্ণ করে নেবে; আর যারা রোজা পালনে অক্ষম, তারা (প্রতি রোজার বিনিময়ে) একজন মিসকিনকে খাদ্য ফিদইয়া দেবে। আর যারা উত্তম কর্ম অতিরিক্ত বেশি করবে, তা তার জন্য কল্যাণকর। যদি তোমরা রোজা পালন করো, তবে তা তোমাদের জন্য, যদি তোমরা বুঝতে!” এ আয়াতের শেষাংশে স্পষ্ট বর্ণনা রোজা আমাদের কল্যাণে। আমরা রোজা রাখলেও আল্লাহর কোনো লাভ নেই, না রাখলেও আল্লাহর কোন ক্ষতি নেই; বরং আমাদের কল্যাণে আল্লাহ রোজার বিধান জারি করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ। মেডিকেল সাইন্সও তা বলে। লেখার কলেবর বৃদ্ধি হয়েছে যাওয়ার আশঙ্কায় সেদিকে যাচ্ছি না। অন্য দিন হবে সে আলোচনা। এগারো মাস উদরপূর্তি ভোজন করে যারা উদরপীড়ায় ভুগছে, রোজা তাদের জন্য মহৌষধ। রোজা আত্মাকে যেমন পরিশুদ্ধ করে ঠিক তেমনি দেহের চালিকাশক্তিও বাড়ায়। যদিওবা তা খালি চোখে ধরা পড়ে না। সিয়াম পালনকারীদের সম্মানে আল্লাহ জান্নাতকে বিশেষভাবে সজ্জিত করেন। মায়ার নবী (দ.) বলেছেন, যে ব্যক্তি পূর্ণ ইমানের সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের আশায় রমজানে রোজা পালন করবে, তার অতীতের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ রোজা পালনের মাঝে রয়েছে মাগফিরাতের গ্যারান্টি। আল্লাহর রহমত পাওয়ার নিশ্চয়তা। আগুন (জাহান্নাম) থেকে বেঁচে মঞ্জিলে মকসুদে (জান্নাত) পৌঁছানোর সওগাত। হাদিসে কুদসিতে মালিকের ভাষ্য- রোজা আমার জন্য, আমি নিজেই রোজার প্রতিদান প্রদান করবো।
মহান আল্লাহর এ ফরমান, রোজাদারকে তোলে দেয় এক অনন্য উচ্চতায়। সত্যিকার অর্থে রোজ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। রাত্রিশেষে গোলাপী আলোর আভা পূর্বাকাশে। এখনো ফুটেনি দিনের আলো। পূর্ব গগনে সূয্যিমামা এখনো হাসেনি। সকালের শুভ্র স্নিগ্ধ হাওয়া। কী এক জান্নাতি পরিবেশ! এ হাওয়া গায়ে লাগনোও পূণ্যের। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পাঠশালা মকতব থেকে ভেসে আসছে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সুর: বিসমিল্লাহর রহমানির রাহিম। আল হামদুলিল্লা-হি রাব্বিল ‘আ-লামীন। আররাহমা-নির রাহীম…। এ সুর পবিত্র কুরআনের। এ সুরের রচয়িতা পরোয়ার দিগার। যে সুরে আছে প্রেম। আছে মুগ্ধতা। আছে আলো। যে আলো হেরার। যে আলো লওহে মাহফুজের। যে আলোতে আলোকিত ব্যক্তিজীবন। যে আলোর ঝলকানিতে অজ্ঞতার তিমির মুক্ত হয়েছে এ নীল গগন। রমজান আর কুরআন একই সুত্রে গাঁথা। বলা হয় কুরআনের মাস রমজান। সুরা বাকারায় আল্লাহ তায়ালা বলেন, রমজান মাস, এতে নাজিল হয়েছে কুরআন, যা মানুষের দিশারি ও স্পষ্ট নিদর্শন এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। রমজান হলো কুরআন চর্চার মোক্ষম সময়। প্রিয়নবীর জীবনাদর্শও সে কথা বলে। বুখারী শরীফের এসেছে: সাহেবে কুরআন নবী মোস্তফা (দ.) প্রতি রমজানে হজরত জিবরাইল (আ.)-কে অবতীর্ণ পূর্ণ কুরআন একবার শোনাতেন এবং হজরত জিবরাইল (আ.)ও প্রিয়নবী (দ.)-কে অবতীর্ণ পূর্ণ কুরআন একবার শোনাতেন। প্রিয়নবী (দ.)-এর জাহেরি জীবনের শেষ রমজানে মহানবী (দ.) রুহুল আমিন (আ.)-কে পূর্ণ কুরআন শরিফ দুবার শোনান এবং সৈয়দুল মালায়েকা (আ.)-ও মহানবী (দ.)-কে পূর্ণ কুরআন শরিফ দুবার শোনান। এতে পরিষ্কার হয়ে যায়, রমজান মাস হলো কুরআন শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ, কুরআন পঠন-পাঠন ও কুরআন চর্চার মাস। মাহে রমজান কুরআন নাজিলের মাস হওয়ায় এ মাসে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের সওয়াবও অপরিসীম। প্রিয় নবীর বাণী- অন্তরের কলুষতা পরিষ্কার করার উপায় হলো বেশি বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করা এবং কুরআন তেলাওয়াত করা। সাহেবে কুরআন (দ.) আরও বলেছেন, রোজাসমূহ এবং কুরআন আল্লাহর দরবারে বান্দার জন্য সুপারিশ করবে।
দিনে রোজামুখে কুরআন তেলোয়াত করা। রাতে তারাবির জামাতে হাফেজে কুরআনদের মন্ত্রমুগ্ধ কণ্ঠে তেলাওয়াত শুনে বরকত হাসিলের সুযোগটা শুধুমাত্র রমজানেই পাওয়া যায়। কুরআনে কারিম তেলাওয়াতের মতো শুনলেও একই রকম সওয়াবের সুসংবাদ আছে। কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অফুরন্ত কল্যাণ লাভ করার জন্য রমজানই হচ্ছে সর্বোত্তম সময়। স্বাভাবিক সময়ে কুরআন শরিফের একটি হরফ তেলাওয়াতে দশটি নেকি অর্জনের ঘোষণা আছে। কিন্তু মাহে রমজানে কুরআন তেলোয়াতের আছে বিশেষত্ব। আর তা হলো এ মাসের তেলাওয়াতে একটি নেকি দশ থেকে সাতশত গুন পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এখন ধরুন আপনি মাহে রমজানে কুরআন শরীফের একটি হরফ তেলাওয়াত করলেন। আপনার ঝুলিতে দশটি নেকি। অতঃপর রমজানের সাথে কুরআনের সম্পর্কের কারণে তা দশ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। রমজানের কারণেই এই নফল ইবাদতটি আল্লাহর দরবারে ফরযের মর্যাদায় গণ্য হচ্ছে। সুতরাং, যারা মাহে রমজানে কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করেন নিঃসন্দেহে তারা অফুরন্ত সাওয়াবের অধিকারিই হয়ে থাকেন। মাহে রমজানের রহমতের ঝর্ণাধারা তখনই আপনাকে প্রাণবন্ত করবেন যখন আপনি বৈধ উপার্জনে পবিত্র রমজান উপভোগ করবেন। সাহারি, ইফতারের আহার যদি অবৈধ উপার্জনে হয়; স্রেফ উপবাস হিসেবেই গণ্য হবে আপনার রোজা। ঘুষের টাকায় আহার করে নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতসহ কোনো ইবাদতই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। রোজা থেকে শিক্ষা নিয়ে ঘুষ থেকে নিজে বাঁচুন। নিজের ও দেশের উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় ঘুষ! চলবে

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক